মূল রচনা: স্যামসন এইচ চৌধুরী-শ্রদ্ধার্ঘ্য by ফারুক চৌধুরী

স্কয়ার হাসপাতালের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি স্কয়ার হাসপাতালের ১০০৭ নম্বর কেবিনের একজন রোগী হিসেবে। ৭ জানুয়ারির বিষাদমাখা ভোরে শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় স্যামসন চৌধুরীর মরদেহ এই হাসপাতালেরই হিমঘর থেকে পাবনা নিয়ে যাওয়া হলো।


অদৃষ্টের লিখন যে সেই সকালেই আমি একটি ‘রুটিন’ চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। কোনো অঘটন না ঘটলে সুস্থ হয়েই দু-এক দিনের মধ্যে বাড়ি ফেরার আশা রাখি। স্যামসন চৌধুরীর সৃষ্ট ব্যবস্থাপনা এমনই যে হাসপাতালে এসে ধারণাই করা যায় না যে স্যামসন চৌধুরী বেঁচে নেই। নিয়মমাফিক হাসপাতাল চলছে, যেন কিছুই ঘটেনি। সুষ্ঠু আর বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাপনার এটাই তো হলো সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান।
ওই কথাগুলো কিন্তু হাসপাতালটি সম্বন্ধে আসলে যে কথা বলতে চাইছি, তা নয়। মাত্র কদিন আগে ২০১১-এর ডিসেম্বরের ১২ তারিখের কাকডাকা ভোরে মরণাপন্ন অবস্থায় আমি হাসপাতালটির ইমার্জেন্সিতে আসি। সেখান থেকে আমাকে প্রথমে সিসিইউ এবং পরে হাসপাতালের ১০২৪ নম্বর কেবিনে স্থানান্তরিত করা হয়। যে রোগে আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম, তাকে সাধারণ ভাষায় হূদ্যন্ত্রের বাম অংশে অবস্থিত ‘ভ্যান্ট্রিকল’ বিকল হওয়ার অবস্থা বলে আখ্যায়িত করা হয়। এককথায় ৭৮ বছর বয়সের আমি এই হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য কর্মীর পরিচর্যায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। আমার অসুস্থতার কথা শুনে লন্ডনে অবস্থানকারী আমার এক চিকিৎসক ভাগনে আদেল হাই লন্ডন থেকে ছুটে আসে। সে আমাকে অবাক-বিস্ময়ে বলেছিল যে তার ধারণায় স্যামসন চৌধুরীর স্কয়ার হাসপাতালে পরিচর্যার মান, লন্ডনের যেকোনো হাসপাতালের পরিচর্যার মানের চেয়ে কম নয়। আমি মনে করি, লন্ডনে কর্মরত একজন উচ্চ মানের চিকিৎসকের এ প্রশংসাবাণীর অনেক কিছু স্যামসন এইচ চৌধুরীর প্রাপ্য। স্কয়ার হাসপাতাল ছিল বলেই আমি আজ জীবিত রয়েছি এবং চার সপ্তাহের ব্যবধানে হাসপাতালটিতে দুবার (অবশ্য বিভিন্ন কারণে) ভর্তি হয়ে স্যামসন চৌধুরীর প্রতি আমার এ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারছি।
এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবায় আমাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির আত্মতুষ্টিও মিশে আছে। দুঃখ রইল, স্যামসন ভাই, যাঁর সঙ্গে সত্তরের দশক থেকে আমার পরিচয়, আমার এই অভিজ্ঞতার কথা জেনে যেতে পারলেন না। কিন্তু আমি চাই, আমার পাঠকেরা তা জানুন—তাই নার্সের কলম ধার করে হাসপাতালের কাগজেই আমি লেখাটি প্রথম আলোয় পাঠালাম।
এ হাসপাতাল সম্বন্ধে স্যামসন ভাই আর তাঁর ছেলে তপন চৌধুরীর সঙ্গে আমার অনেকবার কথা হয়েছে। তাঁরা দুজনেই জানেন যে হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমার জোরালো সমর্থন সব সময়ই ছিল। আমি অবশ্যই চাইব যে হাসপাতালটির সুনাম কিছু মাত্রায় হলেও আমাদের দেশের বিত্তবান, কিন্তু সাধারণ রোগে আক্রান্ত রোগীদের বিদেশ, বিশেষ করে, কলকাতা যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা হলেও কমাবে। আমি নিজেও কলকাতার একজন পিশাচ চিকিৎসকের খপ্পরে পড়েছিলাম কয়েক বছর আগে। আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে একজন পাঞ্জাবি ভারতীয় বন্ধুর উপদেশে আমি তাঁর খপ্পর থেকে মুক্তি পাই। নইলে হূদয়ের (শারীরিকভাবে) কথা বলতে ব্যাকুল আমার কথাটি না বলাই রয়ে যেত। চিকিৎসা অঙ্গনে বাংলাদেশের করুণ অবস্থার সুযোগ অনেক বিদেশি চিকিৎসকই নিয়ে থাকেন এবং নিচ্ছেন। স্কয়ার হাসপাতালের মতো হাসপাতালগুলো এ দুঃখজনক প্রবণতা রোধ করতে পারবে বলে আশা করি।
স্যামসন এইচ চৌধুরী এ দেশের মুষ্টিমেয় মানুষের একজন, যাঁকে আমি শ্রদ্ধা করতাম অনেক সময় দূরে থেকেও। আমি অসুস্থ অবস্থায় টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি শোক আর ভালোবাসায় সিক্ত তাঁর প্রতি এ দেশের সব শ্রেণীর মানুষের অনাবিল শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।
স্যামসন ভাই, আর কখনো পাশাপাশি বসে আপনার সঙ্গে বিরল মুহূর্তগুলো কাটানোর অবকাশ হবে না। তবে আপনার সঙ্গে পরিচয় আর হূদ্যতা আমার জীবনের মূল্যবান সঞ্চয় হয়ে থাকবে।
 ফারুক চৌধুরী: সাবেক কূটনীতিবিদ

No comments

Powered by Blogger.