ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষিবিষয়ক নীতি ও কৌশল by এ এম এম শওকত আলী

ন্যান্য বিষয়ের মধ্যে প্রধান হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। খসড়া কৃষিনীতিতেও একই কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাসহ এ-সংক্রান্ত সব উন্নয়ন দলিলেই এ কথা বারবার বলা হয়েছে। এ উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব হয়েছে কি না সে বিষয়টি বিতর্কের ঊধর্ে্ব নয়। কারণ প্রতিবছর সরকারি খাতে দুই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়।


অন্যদিকে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে যে এখন খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ প্রধান খাদ্য চালের ওপর চাপ হ্রাস করার তথ্য রয়েছে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, বড় বড় শহরে এ ধারা লক্ষণীয় হলেও পল্লী অঞ্চলের জন্য এ যুক্তি প্রযোজ্য নয়। কোনটা সত্যি? খাদ্য ঘাটতির বিষয়ে খাদ্যশস্য উৎপাদনের ধারা লক্ষণীয়। খাদ্যশস্য উৎপাদন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি গবেষকসহ অন্য সবাই স্বীকার করে। এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক যুক্তি উল্লেখ করা হয়। তা হলো, জনসংখ্যাসংক্রান্ত তথ্য নির্ভুল নয়। কারণ এটা সব সময়ই কম দেখানো হয়। কারো মতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যাঁরা ভূমিকা পালন করেন তাঁরা এ তথ্যের মাধ্যমে নিজেদের সাফল্য প্রচার করেন। পক্ষান্তরে কিছু গবেষকসহ অন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন যে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ সঠিক নয়। এ পরিমাণ অধিক হারে নির্ণয় করা হয়। এ ক্ষেত্রেও বলা হয় যে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সব সময়ই নিজস্ব দক্ষতার পরিচয় দিতে গিয়ে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে থাকে। তাদের নির্ণয় করা পরিমাণের সঙ্গে পরিসংখ্যান বিভাগের পরিমাণে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। শেষোক্ত বিভাগের পরিমাণ সব সময়ই কম হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলো, পরিমাণ নির্ণয়ে দুই বিভাগের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম। খাদ্য চাহিদা নির্ণয়ের বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত। খাদ্য চাহিদা নির্ণয়ের দায়িত্ব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে পরিসংখ্যান বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষার নাম বসতবাড়িভিত্তিক আয়-ব্যয়সংক্রান্ত সমীক্ষা Household Income Expenditure Survey, HIES)। এর আগে এ জরিপে খাদ্য গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে তথ্যসংক্রান্ত কিছু বিভ্রান্তি ছিল। অর্থাৎ চাল ও গমের বিষয়েই ছিল এ বিভ্রান্তি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যনীতি পরিবীক্ষণ সেলের দায়িত্ব হলো খাদ্য চাহিদা নির্ণয় করা। পরিসংখ্যান বিভাগের সঙ্গে এর নিবিড় সমন্বয় ছিল না। ২০০৮ সালে সমন্বয়ের কাঠামো অধিকতর শক্তিশালী করা হয়। এ সত্ত্বেও চাহিদাসংক্রান্ত বিভ্রান্তির কোনো সমাধান এখন পর্যন্ত হয়নি। খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে যে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের একটি যোগসূত্র রয়েছে। অন্যদিকে এ যুক্তিও সত্য যে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্য গ্রহণের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে পল্লী অঞ্চলে। এসব দরিদ্র বা হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কেউ এক বেলা, কেউ দুই বেলা বা কেউ আধা বেলা খাদ্য গ্রহণ করে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির জন্য এরা খাদ্য গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি করে। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হবে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সীমায় তারাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না। অর্থাৎ আয়-ব্যয়ের বৈষম্য। এ কথা অনস্বীকার্য যে আয়ের বৈষম্য দূর করা যায়নি।
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বহু উদ্দেশ্যের বর্ণনা করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি হলো_এক. শস্য উৎপাদন ও কৃষক পরিবারের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির ধারা নিশ্চিতকরণ। দুই. দক্ষিণাঞ্চলে সেচাবাদ বৃদ্ধিসহ উচ্চ ফলনশীল বোরো ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং তিন. ফলনের পার্থক্য দূরীভূত এবং কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। প্রথমটি কৃষক পরিবারের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। দ্বিতীয়টি দক্ষিণাঞ্চলে বোরো ধান উৎপাদন এবং এ উদ্দেশ্যে সেচের ব্যবস্থা করা। তৃতীয়টি ফলনের পার্থক্য কমিয়ে আনা। কৃষক পরিবারের আয় বৃদ্ধির বিষয়টি কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের বাজারমূল্যের সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে কৃষকদের উৎপাদন খরচ হ্রাসসহ উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গেও জড়িত। এ কথা সর্বজনবিদিত_কৃষকরা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা কোনো সময়ই উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না। কারণ দুর্বল বাজারব্যবস্থা, যার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। দরিদ্র হওয়ার কারণে অনেকের উৎপাদিত ফসল নিয়ে দরকষাকষির সামর্থ্য নেই। অন্যদিকে ফড়িয়ারা ফসল কাটার আগেই কৃষকদের অর্থাভাবের সুযোগ নিয়ে কম দামে আগাম অর্থ দিয়ে সব ফসল ক্রয় করে। এর নাম দাদনপ্রথা। এর আরেকটি অংশ হলো, খায় খালাসি বন্দোবস্ত। এ প্রথার আওতায় দরিদ্র কৃষক অভাবের তাড়নায় নগদ অর্থের বিনিময়ে অপেক্ষাকৃত ধনী কৃষক বা মহাজনের কাছে তাঁর জমির স্বত্ব সাময়িকভাবে হস্তান্তর করেন। শর্ত হলো, প্রদত্ত অর্থ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত মহাজন বা যে অর্থ প্রদান করে সে জমির ফসল ভোগ করবে। সমতল এলাকার দরিদ্র আদিবাসীরা খায় খালাসি বন্দোবস্তের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ নিয়ে কোনো সঠিক তথ্য নেই। এদের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রজাস্বত্ব আইনে কিছু বিধান রয়েছে। কিন্তু এর প্রয়োগ কতটুকু কার্যকর সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে বোরো চাষ বৃদ্ধির বিষয়টি সহজ নয়। কারণ সেচাবাদ বৃদ্ধি না করা হলে এ লক্ষ্য কোনো দিনই অর্জন করা সম্ভব হবে না। প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো লোনা পানির প্রভাব, যার জন্য ভূ-উপরিস্থ সেচমাধ্যম ব্যবহার করা সম্ভব নয়। অতীতে এর জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্প করা হয়েছিল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে পোল্ডার নামে বাঁধও নির্মিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ধানি জমি লোনা পানির আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি ঘেরের মাধ্যমে ধানি জমি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। চিংড়ি চাষের জন্য জমি লিজ দেওয়ার সরকারি নীতিমালাও রয়েছে। এর কার্যকারিতা নিয়েও অনেকের সন্দেহ রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বোরো চাষ বৃদ্ধির জন্য চিংড়ি ঘেরপ্রথা একটি বড় বাধা। তবে উপকূলীয় এলাকায় ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। লোনা পানিতে আক্রান্ত নয় অথবা সামান্য আক্রান্ত এমন সব এলাকায় সারের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শস্যের ফলন বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রযুক্তির নাম গুটি ইউরিয়া। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই পরিমাণ জমিতে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ ফলন বৃদ্ধি সম্ভব। বিষয়টি প্রমাণিত। কারণ অন্যান্য এলাকায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এ কথাই প্রমাণিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-১১ সময়ে অন্তত দুজন কৃষক এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে লাভবান হওয়ায় জাতীয় স্বীকৃতিও পেয়েছেন। অর্থাৎ তাঁরা বঙ্গবন্ধু কৃষিপদক পেয়েছেন। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলায় এ প্রচেষ্টা বর্তমানে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ইউএসএআইডির অর্থায়নে আন্তর্জাতিক সার উন্নয়নকেন্দ্র (International Fertilizer Development Centre বা IFDC) কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নীতি ও কৌশলবিষয়ক বহুবিধ ক্ষেত্র চিহ্নিত। এর মধ্যে একটি হলো ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি। বলা হয়েছে_এক. উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত প্রযুক্তি ব্যবহার করা, দুই. উদাহরণস্বরূপ_System Rice Intensification (SRI), Alternate Wet and Dry (AWD) irrigation পদ্ধতি এবং গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার সম্প্রসারণ করা। অতএব দেখা যায় যে ফলন বৃদ্ধির জন্য উন্নত প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। SRI মূলত ছোট বা কচি ধানের চারার ব্যবহারসংক্রান্ত প্রযুক্তি। এতে দুই কচি ধানের চারার মধ্যে দূরত্ব অধিকতর করতে হয়। এ প্রযুক্তি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। AWD পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো, কম সেচে সঠিক ফলন নিশ্চিত করা। ও FDC-এর সহায়তায় অধিক ফসল উৎপাদন প্রকল্পে এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রির কিছু গবেষকের মতে, একই বিষয়ে ব্রি উদ্ভাবিত প্রযুক্তিও রয়েছে। যদি তা-ই হয়, দেশে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ব্যবহারও উৎসাহিত করা বাঞ্ছনীয়। ইউরিয়া সারের অপ্রয়োজনীয় অধিক ব্যবহার হ্রাস করার জন্য পরিকল্পনা দলিলে লিফ কালার চার্ট ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। লিফ কালার চার্ট ব্যবহারের মাধ্যমে পাতার সবুজ বর্ণ সহজেই দৃশ্যমান হয়। এরপর ইউরিয়া সার ব্যবহারের প্রয়োজন কম হয়। তবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের ফলেও এটা নির্ণয় করা সম্ভব। ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উন্নতমানের বীজ ও প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার প্রয়োজন। এ জন্য পরিকল্পনা দলিলে হাইব্রিড বীজ ব্যবহার সম্প্রসারিত করার কৌশল চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে এর ফলে ২০ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। স্মরণ করা যেতে পারে যে সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের বিষয়ে কিছু সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, যা মিডিয়ায় প্রকাশিত। যে বিষয়গুলো তিনি চিহ্নিত করেছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

No comments

Powered by Blogger.