বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৩৯০ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। আলী আশরাফ, বীর প্রতীক যুদ্ধে আহত হন তিনি ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিক। একদিন রাতে আলী আশরাফসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা আকস্মিক আক্রমণ চালান সাদুল্লাপুর থানায়। গাইবান্ধা জেলার উপজেলা সাদুল্লাপুর।


আক্রমণের শুরুতেই থানায় অবস্থানরত বাঙালি-অবাঙালি পুলিশ প্রতিরোধ দূরের কথা, সব পালিয়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হলো অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও গুলি।
মুক্তিযোদ্ধারা হস্তগত অস্ত্রশস্ত্র ও গুলি নিয়ে রওনা হলেন হাইড আউটের উদ্দেশে। তখন ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। তাঁদের হাইড আউট মোল্লার চরে। থানা সদর থেকে বেশ দূরে। সকাল হওয়ার আগেই ফিরতে হবে সেখানে।
থানা আক্রমণের সাফল্যে মুক্তিযোদ্ধারা উৎফুল্ল। পথে তাঁদের জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে। তাঁরা বুঝতেও পারলেন না। বল্লমজাড় গ্রামে পৌঁছামাত্র মুক্তিযোদ্ধারা পড়ে গেলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অ্যামবুশে। আকস্মিক আক্রমণে তাঁরা দিশেহারা। বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধা অসংগঠিত অবস্থায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেন।
আলী আশরাফ ও তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধা এতে দমে গেলেন না। চরম বিপদেও মাথা ঠান্ডা রেখে সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। তাঁদের এ প্রতিরোধ পাকিস্তানি সেনাদের বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়।
কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা তখন সংখ্যায় অনেক কম। সে জন্য তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন পশ্চাদপসরণের। কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দিক দিয়ে তাঁরা পশ্চাদপসরণ শুরু করলেন। আলী আশরাফ ও তাঁর দুই সহযোদ্ধা গুলি করতে করতে পিছু হটছিলেন। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেননি। তাঁদের দিকে ছুটে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে এলএমজির গুলি। তিনজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।
এ অবস্থায় তাঁদের পক্ষে আর পশ্চাদপসরণ করা সম্ভব হয়নি। গ্রামবাসী কয়েকজনের সহায়তায় আশ্রয় নেন একটি বাড়িতে। ওই বাড়ির গৃহকর্তা, অন্যরা তাঁদের খুব সহায়তা করেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। কিছুক্ষণ পর রক্তের দাগ দেখে ওই বাড়িতে হাজির হলো একদল পাকিস্তানি সেনা। তাঁরা ধরা পড়েন । পাকিস্তানি সেনারা আলী আশরাফের দুই সহযোদ্ধা ইসলামউদ্দিন ও ওমর ফারুককে তখনই হত্যা করে। তাঁরা দুজন ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর এয়ারম্যান। তাঁকে পাকিস্তানিরা আটক করে গাইবান্ধায় নিয়ে যায়।
পরে আলী আশরাফ ঘটনাচক্রে বেঁচে যান। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গাইবান্ধায় তাদের যে ক্যাম্পে নিয়ে যায়, সেই ক্যাম্পের একজন ক্যাপ্টেন ছিল তাঁর পরিচিত। ওই ক্যাপ্টেন তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এরপর তাঁকে নাটোর জেলে পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৩ ডিসেম্বর তিনি আরও কয়েকজনের সঙ্গে জেল থেকে পালিয়ে যান।
আলী আশরাফ চাকরি করতেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন ঢাকায়। তখন তাঁর পদবি ছিল করপোরাল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা থেকে পালিয়ে ময়মনসিংহ হয়ে ভারতে যান। সেখানে তিনি যুদ্ধে ইচ্ছুকদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন। পরে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সে। এরপর তাঁকে ১১ নম্বর সেক্টরের মানকারচর সাবসেক্টরে পাঠানো হয়। কিন্তু সাদুল্লাপুর ছাড়া আর কোনো অপারেশন বা যুদ্ধে তিনি অংশ নিতে পারেননি।
মুক্তিযুদ্ধে বিশেষত, সাদুল্লাপুরের বল্লমজাড় গ্রামের যুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য আলী আশরাফকে বীর প্রতীক খেতাব প্রদান করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ২৮৬।
আলী আশরাফ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। মেজর হিসেবে অবসর নেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ময়মনসিংহ পৌরসভার কাশরে। বর্তমানে বাস করেন ঢাকায় (বাড়ি ৫, সড়ক ১১, মোহাম্মদী হাউজিং মোহাম্মদপুরে)। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ আলী হায়দার, মা আমিনা খাতুন, স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে।
সূত্র: আলী আশরাফ বীর প্রতীকের সাক্ষাৎকার; নিয়েছেন রাফিয়া চৌধুরী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৬।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.