সংলাপে বসার পরামর্শ নয়জন কূটনীতিকের

গুম-হত্যা, রাজপথে সংঘাত, হরতাল ও দুর্নীতির কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতেরা। এই অবস্থার উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।


গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নয়জন কূটনীতিক এই অভিমত দেন। বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর অংশীদারির চার দশকপূর্তিতে ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূতাবাস এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ঢাকা সফরের পর ইইউর কূটনীতিকেরা এক মঞ্চে বসে বাংলাদেশের রাজনীতি, সুশাসন ও বিনিয়োগ নিয়ে খোলামেলা অভিমত দিলেন। ঢাকায় এসে হিলারিও রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসার পরামর্শ দেন।
গতকাল সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বক্তব্য দেন ঢাকায় ইইউর রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা। এরপর ইইউর রাষ্ট্রদূতেরা সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক সংঘাত সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হানা বলেন, এ বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দূর করতে সরকার ও বিরোধী দলের সংযত আচরণ করা উচিত। তা ছাড়া বিষয়টি সুরাহার জন্য সংসদে ও সংসদের বাইরে তাদের সংলাপে বসা উচিত।
সংকট ভাবমূর্তির: ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত সেন্ড ওলিং বলেন, সহিংসতা ও গুমের খবর পত্রিকায় প্রধান শিরোনাম হিসেবে প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বে ভয়াবহ বার্তা পৌঁছে যায়। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন।
ইতালির রাষ্ট্রদূত গিওর্গিও গুগলিয়েমিনো বলেন, ‘আমরা সব সময় বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনার বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। কিন্তু হরতাল ও গুমের মতো ঘটনা ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা যদি অন্য দেশে চলে যেতে চান, আমরা তো তাঁদের ওপর জোর করতে পারি না।’
স্পেনের রাষ্ট্রদূত লুইস তেদা চাকোন বলেন, ‘বাংলাদেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তির পরিবর্তে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে আমরা কাজ করছি। আমরা এ কাজ না করলে প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশে চলে যাবে। এটি হওয়া দুর্ভাগ্যজনক।’
ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মাইকেল ট্রিনকুইয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সমস্যার কারণে ফরাসি বিনিয়োগকারীদের এ দেশে আনা দুরূহ। আমরা বাংলাদেশের ইতিবাচক ছবি তুলে ধরতে সচেষ্ট আছি। ভাবমূর্তির সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারেরও আমাদের সহযোগিতা করা উচিত।’
গুম ও মানবাধিকার: বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়া ও পোশাকশ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে ইইউর রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা বলেন, ‘যেকোনো ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়া উদ্বেগের। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, দুটি ঘটনার ব্যাপারে সরকার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত চালাবে।’
মানবাধিকার-পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইইউর রাষ্ট্রদূত এ নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানবাধিকার।
এ প্রসঙ্গে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আনেলি লিন্ডাল কেনি বলেন, কোনোভাবেই যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, সে ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। এ জন্য তিনি নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
সংলাপের তাগিদ: দুই দলকে সংলাপে বসাতে ইইউ মধ্যস্থতা করবে কি না, জানতে চাইলে হানা বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে সব সময় সহযোগিতা করতে চাই। রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা সব সময় আলোচনায় বসতে উদ্বুদ্ধ করে থাকি।’
যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনও সংঘাতমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এড়াতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ আয়োজনের পক্ষে মত দেন। একই মত দেন ইতালির রাষ্ট্রদূত গিওর্গিও গুগলিয়েমিনো।
দুর্নীতি: বাংলাদেশে ইইউর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে কোনো রকম দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে জানান উইলিয়াম হানা।
নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত আলফোন্স হ্যানিকেন্স বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির যেসব ঘটনা ঘটছে, গণমাধ্যমের সেগুলো তুলে ধরা উচিত। সংসদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ কোনো দলই দুর্নীতিবিরোধী শক্তিশালী আইন প্রণয়ন না করায় এটাকে তিনি হতাশাব্যঞ্জক ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেন।
সংঘাত: যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন বলেন, ‘রাজপথে সহিংসতা আর হরতাল উৎপাদন ও উন্নয়ন ব্যাহত করে। তাই হরতালে যুক্তরাজ্যের সহায়তায় পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য আমাদের যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়।’
বিনিয়োগ-পরিস্থিতি: জার্মান রাষ্ট্রদূত হোলগার মাইকেল বলেন, বিনিয়োগ-সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা জরুরি।

No comments

Powered by Blogger.