সিডনির মেলব্যাগ- কাউন্সিল নির্বাচন গণতন্ত্র ও বাঙালীর মনতন্ত্র by অজয় দাশ গুপ্ত

আরও একটি নির্বাচন প্রত্যক্ষ করলাম গত সপ্তাহে। কাউন্সিল বা স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচন হলেও পুরোপুরি জাতীয় আমেজ ছিল এই নির্বাচনে। অস্ট্রেলিয়ার ইলেকশন ক্যারেকটার একেবারে সাদামাটা, উত্তেজনাহীন, আবেগবর্জিত, এমনকি উৎসাহহীনও বটে।


যার মূল কারণ মানুষ রাজনীতিবিমুখ। বিমুখতা মানে কিন্তু অসচেতনতা নয়। এক শ’ ভাগ শিক্ষিত মানুষের দেশে রাজনীতি অচল কিছু হতে পারে না। বরং এদের ভালো দিকটি হচ্ছে তাঁরা যা জানেন ঠিকভাবে জানেন, যা জানেন না তা নিয়ে কথা বলেন না। বিশ্ব রাজনীতির গতি-প্রকৃতি ভালো বোঝেন বলেই জর্জ বুশকে প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে হয়, টনি ব্লেয়ার বা যুদ্ধবাজরা শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত এই দেশেও বাতিল মাল হিসেবে চিহ্নিত হন। একইভাবে তালেবান বা জঙ্গীবাদের প্রতিও সমান অনাগ্রহী এ দেশের মানুষ। ধর্ম ও বিশ্বাসের নামে কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও অন্ধত্বের চর্চা রোধ করতেও এগিয়ে যাচ্ছেন এরা। প্রায়ই ছোট-বড় ঘটনায় তালেবান ও ধর্মীয় জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, সুগঠিত মতামত আর রাষ্ট্রের পদক্ষেপেই তার নজির দেখতে পাই। ফলে ঢালাওভাবে রাজনীতিবিমুখ বলা যাবে না, তবে রাজনীতি চর্চায় উৎসাহহীনতা প্রকট। এর কারণও দুর্বোধ্য কিছু নয়। মানুষের সময় নেই, এক অদ্ভুত দেশ। মূলত জন্মগ্রহণ, স্কুলিং আর পাশ্চাত্য জীবন প্রবাহে বড় না হলে জীবন সত্যি ক্লান্তিকর। বিশেষত কাজের বেলায়, প্রতিটি মানুষকে নিজের কাজ নিজে করতে হয়। অফিসের বিগ বস থেকে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারী, রেল, জাহাজ, বাস বা ফেরি-ট্যাক্সি চালনা যার যা পেশা হোক না কেন, সব নিজের হাতে। তিনশ’ পঁয়ষট্টি দিনে চব্বিশ ঘণ্টা মানুষের মন-মর্জি বা শরীর এক থাকে না। কোন কোন সময় সে ক্লান্ত বা অবসাদগ্রস্ত হতেই পারে। ‘রবীন্দ্রনাথের ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু’র সময় নেই এই দেশে। হাসপাতাল বা নার্সিং হোমে ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত কেউ পানি এনে দেবে না, এমন কি অনেক রেস্তরাঁ হোটেলেও নয়। ব্যক্তিগতভাবে গত এক যুগে যে পরিমাণ বাসন কোসন ধুতে হয়েছে বা ধুয়ে যাচ্ছি, সহজেই আমি ঢাকার হোটেলে পয়ঃপরিষ্কারের চাকরি পেয়ে যেতে পারি। সারাদিনের খাটুনির পর স্বামী-স্ত্রী সন্তানরা নিজের কাজ নিজে করার দেশে পলিটিকস বা রাজনীতি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতোই। তাছাড়া যে দেশে বিদ্যুৎ যায় না, লোডশেডিং নেই, গাড়ি ঠিক সময়ে যাতায়াত করে, হরতাল নেই, অবরোধ নেই, ব্যাংক থেকে টাকা লুণ্ঠন নেই, সবাই মোটামুটি একই মানের জীবনযাপন করে সে সমাজে রাজনীতি নিয়ে উগ্র বা ব্যগ্র হবার সময় কোথায়? দরকারইবা কি?
ছাত্র-ছাত্রী বা তারুণ্যের তো বিন্দুমাত্র আগ্রহ আছে বলেও মনে হয় না। যে নির্বাচনের কথা বলছি, তাতে ভোট দিতে গিয়েছিলাম পুত্রকে সাথে নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট, মূল ধারায় নাটক, শর্ট ফ্লিম নিয়ে ব্যস্ত ছেলেটির প্রাইমারি শিক্ষাও হয়েছে এই দেশে। অর্থাৎ স্কুলিং ও ভোটের লাইনে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল ভিন দেশী আগন্তুক। লেবার লিবারেলের ছাপমারা প্রার্থী ব্যতীত আর কাউকে তো চেনেই না, কে যে আদর্শের বা কাকে কেন ভোট দিতে হবে তাও জানে না। পাঁচ বা দশ শতাংশ ভোটার বাদ দিলে বাকিদের সবার অবস্থা এ ধরনের। তারুণ্য ব্যস্ত জীবন উপভোগে। তাদের শিক্ষা জীবন, পরীক্ষা, চাকরি বা সরকারী অনুদানে রাজনীতির কোন ভূমিকা নেই। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল বা ধর্মের নামে ছাত্র শিবিরের উন্মাদনার প্রয়োজন নেই। ফলে তাদের স্বপ্ন বা স্বপ্নের জগতে রাজনীতি নেই, আছে ফেস বুক, টুইটার, স্কাইপি বা অন্য কোন বিনোদন। ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি চাকরিজীবী পেশাজীবীর জীবনও সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত। ইউনিয়ন আছে। বেতন ভাতা নিয়ে বাদানুবাদ আছে। নেই পোস্টিং বা বদলির তদবির। অন্যায় অন্যায্যভাবে পদোন্নতি বা পদচ্যুতি। কাজ না করলে ইউনিয়ন নেতার চাকরিও ঝুলবে নাকের ডগায়। এমন দেশে রাজনৈতিক দলের প্রতি আগ্রহ না থাকাটাই তো স্বাভাবিক। তবু ভোট দিতে হয়। ভোট প্রদানের হার শুনলে চক্ষু চড়কগাছ হবারও কথা। কিন্তু রহস্যটা এই নব্বই, নিরানব্বই শতাংশ ভোট প্রদানের কারণ জরিমানা এড়ানো। বড় অঙ্কের জরিমানা এড়াতেই ভোট দিতে যাই আমরা।
যে কথা বলছিলাম, স্থানীয় কাউন্সিলের এই নির্বাচনে অর্ধডজন বাঙালীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল আনন্দের সংবাদ। এ লেখা অবধি যতটুকু জানি, কেউই জিততে পারেননি। জেতা-হারার হিসেবটাও বড় গোলমেলে। ভোটের আনুপাতিক হার, প্রার্থী পছন্দের রেটিংসহ আরও গোটা কয়েক বিষয় কাজ করে এর অন্তরালে। শ্বেতাঙ্গ বা ভিনদেশী অধ্যুষিত এই সমাজে তাঁরা যে মূলধারার রাজনীতি অনুগামী হয়ে জাতীয় পর্যায়ের ভোটে দাঁড়িয়েছেন, লেবার লিবারেলের পতাকাতলে সমবেত এই সব বাঙালীই পথিকৃৎ। জেতা হারার ভেতর তাঁদের গৌরব নেই, তাঁদের গৌরব মূলধারার অস্ট্রেলিয়ান রাজনীতিতে বাঙালীকে যুক্ত করার। যেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য গ্রামে রাত-দিন লাফালাফি দাপাদাপি চলছে সেখানে এরাই উদাহরণ। গণতন্ত্রের একশ’ পার্সেন্ট সুফল ভোগ করার পরও উগ্রতা আর আনুগত্যজাত রাজনীতি আমাদের এ দেশেও অন্ধ করে রেখেছে। এই সেদিন মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তায় কথিত লেখকের বার্তা দেখে বুঝতে পারছিলাম না এ কি কোন সভ্য মানুষের ভাষা না গুহাবাসী অসভ্যের বর্বরতা। এ দেশ আইন, নিয়ম-শৃঙ্খলার দেশ। এসব ইলেকট্রনিকস তথ্য নিয়ে আইনের শরণাপন্ন হলে বারোটা বেজে যাবে জেনেও এ জাতীয় অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ চলছে। সেই সব বাঙালীর জন্য বিগত নির্বাচন ও জয়-পরাজয়ের ধারা অনুধাবন শক্ত হলেও তাদের শিখতে হবে, সভ্যতা, ভদ্রতা, বিনয় ও সদিচ্ছার সঙ্গে গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করার ইচ্ছে না থাকলে তারা যে কোন দেশে বা পার্শ্ববর্তী পাপুয়ার জঙ্গলেও চলে যেতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট বা মিথ্যাচার দিয়ে বাঙালীকে বিভ্রান্ত করার সময় শেষ। অস্ট্রেলিয়ান নির্বাচন বারবারই এ জাতীয় শিক্ষা রেখে যায়, আমরাই শুধু বুঝি না।
dasguptajoy@hotmail.com

No comments

Powered by Blogger.