ভিওআইপি : ছয় মাসেই ক্ষতি ৫০০ কোটি টাকা by কাজী হাফিজ

অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) বা অবৈধ কল টার্মিনেশনের কারণে শুধু গ্রামীণফোনের ছয় মাসের হিসাবেই ২০৫ কোটি টাকার আন্তর্জাতিক ভয়েস কল লাপাত্তা হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত নভেম্বরের শুরু থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত দেশের চারটি আন্তর্জাতিক গেটওয়ের (আইজিডাব্লিউ) মাধ্যমে গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের কাছে


বিদেশ থেকে যে পরিমাণ কল এসেছে, তা থেকেই এই দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে।
গত মে মাসে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে এক চিঠির মাধ্যমে এই বিপর্যয়ের তথ্য বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে জানানো হয়। 'গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশে আসা আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ হ্রাস' শিরোনামের ওই চিঠিতে গ্রামীণফোনের পক্ষে রেগুলেটরি ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক তাইমুর রহমান উল্লেখ করেন, 'কয়েক মাস ধরে আইজিডাব্লিউ অপারেটরদের কাছ থেকে আমাদের নেটওয়ার্কে আন্তর্জাতিক কল কম আসার বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি। এভাবে আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে সার্বিক টেলিকম খাত তথা দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।' ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, 'খুব সম্ভব অবৈধ কল টার্মিনেশনের (এটি মূলত ভিওআইপির মাধ্যমেই হয়ে থাকে) কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।'
এক হিসাব থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছয় মাসে দেশের আরো পাঁচটি মোবাইল অপারেটর ভিওআইপির অবৈধ কারবারের কারণে প্রায় ২৯৫ কোটি টাকার আন্তর্জাতিক কল হারিয়েছে।
ভিওআইপির অবৈধ কারবার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত বিটিআরসির একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, দেশে আরো আইজিডাব্লিউ, আইসিএক্স লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গত অক্টোবরে এ বিষয়ে আবেদনপত্র আহ্বান করার পরপরই বৈদেশিক কলের এ বিপর্যয় শুরু হয়। সম্ভবত নতুন এসব আইজিডাব্লিউ, আইসিএক্স চালু হওয়ার আগে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় 'যত পারো কামিয়ে নাও' দুর্নীতি শুরু হয়ে যায়। বিদ্যমান অপারেটরদের সঙ্গে যুক্ত একটি অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ
ছাড়া টাকার অবমূল্যায়ন বা টাকার তুলনায় ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও এ ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ভিওআইপিতে আগে সরকারি মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সিম বেশি ব্যবহৃত হলেও সম্প্রতি এর কাছাকাছি চলে এসেছে বাংলালিংক। এর পরেই রয়েছে এয়ারটেল। ভিওআইপি কল শনাক্তকারী যন্ত্রের মাধ্যমে গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে পরীক্ষিত ভিওআইপি কলগুলোতে টেলিটকের ৪১ শতাংশ, বাংলালিংকের ৪১ শতাংশ ও এয়ারটেলের ১৮ শতাংশ সিম ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। মার্চে টেলিটকের ৪২ শতাংশ, বাংলালিংকের ৪২ শতাংশ ও এয়ারটেলের ১৪ শতাংশ; এপ্রিলে বাংলালিংকের ৪২ শতাংশ, টেলিটকের ৩৮ শতাংশ ও এয়ারটেলের ১৮ শতাংশ সিম ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রামীণফোন ও সিটিসেলের সিম/রিম-এর ব্যবহার এ ক্ষেত্রে শূন্য। আর রবির সিম ব্যবহৃত হয়েছে ১ শতাংশ।
সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ভিওআইপির অবৈধ কারবার বেড়ে যাওয়ার আরেকটি সূচক হচ্ছে স্থানীয় কল আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়া। কারণ ভিওআইপির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কল স্থানীয় কল হিসেবে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। এটা এখন ঘটছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিটিআরসির একজন কমিশনারের নেতৃত্বে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছিল। ওই কমিটির পক্ষ থেকে কারিগরি কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।'
প্রসঙ্গত, দেশের মোবাইল ফোন গ্রাহকদের মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৪১.৬ শতাংশ। বাকি ৫৮.৯৪ শতাংশ বাংলালিংক, রবি, এয়ারটেল, সিটিসেল ও টেলিটকের মিলিয়ে। এ অবস্থায় ধারণা করা হচ্ছে, উল্লেখিত ছয় মাসে আরো প্রায় ২৯৫ কোটি টাকার আন্তর্জাতিক কল হারিয়েছে অন্য মোবাইল ফোন অপারেটররা। তাই বলা যায়, সব মিলিয়ে ওই ছয় মাসে ভিওআইপির অবৈধ কারবারের কারণে দেশের ছয়টি মোবাইল ফোন অপারেটরের আন্তর্জাতিক কল গায়েব হয়েছে ৫০০ কোটি টাকার। এর বাইরে ল্যান্ডফোনের হিসাব তো রয়েছেই।
গ্রামীণফোনের চিঠির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগের তুলনায় ওই ছয় মাসে বৈধ পথে জানা হিসাবের মধ্যে আসা গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের কাছে কল কমে গেছে মোট ৮৩ কোটি ৮০ লাখ ৫১ হাজার ৪১ মিনিট। প্রতি মিনিট কলের চার্জ তিন সেন্ট হিসাবে এর মূল্যমান বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০৪ কোটি ৯০ লাখ ৩৪ হাজার ৭৯৫ টাকা এবং এই বিপুল অঙ্কের টাকা থেকে বিটিআরসি ৫১.৭৫ শতাংশ, গ্রামীণফোন ২০ শতাংশ, ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জগুলো (আইসিএক্স) ১৫ শতাংশ এবং আইজিডাব্লিউগুলো ১৩.২৫ শতাংশ টাকা পেতে পারত।
গ্রামীণফোনের ওই চিঠিতে আরো জানানো হয়েছে, গত অক্টোবরে তাদের নেটওয়ার্কে আন্তর্জাতিক কল এসেছিল ১৪ কোটি ৮৯ লাখ ৮৮ হাজার ৫২টি, যা সময়ের হিসাবে ৯৪ কোটি ৫৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৭ মিনিট। এর আগের মাসগুলোতেও গড়ে একই পরিমাণ কল আসে। কিন্তু নভেম্বর থেকে কল কমতে থাকে। নভেম্বরে ৯২ কোটি ২৭ লাখ ২৮ হাজার ৩৯৪ মিনিটের ১৪ কোটি ৪৩ লাখ ৮৫ হাজার ৬৭৩টি কল আসে। ডিসেম্বরে অক্টোবরের তুলনায় ১৩ শতাংশ কল কমে যায়। এ মাসে ৮২ কোটি ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ৩০৪ মিনিটের ১৩ কোটি ১৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯০২টি কল আসে। জানুয়ারিতে কমে ১৫ শতাংশ। এ মাসে ৮০ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ২১১ মিনিটের মোট ১২ কোটি ৩৩ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭টি কল আসে। ফেব্রুয়ারিতে কমে অক্টোবরের তুলনায় ২১ শতাংশ। এ মাসে আসে ৭৪ কোটি ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৯২৬ মিনিটের মোট ১১ কোটি ৮৬ লাখ ১২ হাজার ৩৬৪টি কল। মার্চে কমে ১৩ শতাংশ- ৮২ কোটি ৫৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫৯ মিনিটের মোট ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭৮১টি। এপ্রিলে ২৫ শতাংশ কমে হয় ৭১ কোটি ৩৬ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৭ মিনিটের মোট ১০ কোটি ৮৬ লাখ চার হাজার ৩৫৫টি কল। এ মাসেই অক্টোবরের তুলনায় ২৩ কোটি ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ মিনিট কল কম আসে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মে মাসে এবং চলতি মাসেও এ পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং অবনতি বহাল রয়েছে।
প্রসঙ্গত, তদন্ত কমিটির সুপারিশে পরিস্থিতি উন্নয়নে মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ল্যান্ডফোন ও আইজিডাব্লিউসহ বিভিন্ন গেটওয়ে অপারেটর বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কম্পানি লিমিটেড বা বিটিসিএলের কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভিওআইপির চোরাকারবারিদের শনাক্ত এবং আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণ নির্ণয়ে কমিটির ব্যর্থতার জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিসিএলের অসহযোগিতাকেই দায়ী করা হয়।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান আরো বলেন, 'ভিওআইপিতে ব্যাপক হারে মোবাইল ফোনের অনিবন্ধিত বা সঠিকভাবে নিবন্ধিত হয়নি এমন সিম ব্যবহার হচ্ছে। যথাযথভাবে সিম নিবন্ধনের ব্যবস্থা হলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। এ বিষয়ে বিটিআরসির সঙ্গে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। গত ১৩ জুন বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে এ বিষয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। আমরা আশা করছি, খুব শিগগির যথাযথভাবে সিম নিবন্ধন, পুনর্নিবন্ধনের কাজ চালু হয়ে যাবে। আমরা এর আগে সিম বিক্রির যে গাইডলাইন তৈরি করে দিয়েছিলাম, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। আমরা এখন ওই গাইডলাইনকে বিধানে পরিণত করতে যাচ্ছি, যা মানতে মোবাইল অপারেটররা বাধ্য হবে। অনিবন্ধিত সিম কারো কাছে পাওয়া গেলে এর দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরকেই নিতে হবে।'

No comments

Powered by Blogger.