বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী-পুরুষ সমতা পর্যালোচনা by ড. আনোয়ারা বেগম শেলী

নারী-পুরুষ শারীরিক পার্থক্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। নারী-পুরুষের এই জৈবিক পার্থক্য বা গঠনগত পার্থক্য শারীরবৃত্তীয়ভাবে। আর সামাজিকভাবে গড়েওঠা নারী-পুরুষের পরিচয়, সামাজিকভাবে নির্ধারিত নারী-পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক সমাজ কর্তৃক আরোপিত। এ ধরনের বৈষম্য অবশ্যই পরিবর্তনীয়।


জেন্ডার-বৈষম্য সৃষ্টি হয় সামাজিকভাবে। নারী-পুরুষের এই সামাজিক পার্থক্য পরিবর্তন করা যায় বলে তা দূর করা জরুরি।
দারিদ্র্য যেমন উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, তেমনি জেন্ডার-বৈষম্য থাকলে দারিদ্র্য দূর হয় না। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হলে অসাম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন সহজ হয়ে আসে। দরিদ্র পরিবারও আয় বাড়লে শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়। স্বাস্থ্যরক্ষা, পুষ্টি ইত্যাদির ওপর নজর দিতে শুরু করে; সাধারণত যেসব ক্ষেত্রে জীবনের উষালগ্ন থেকে ছেলে এবং মেয়েশিশুর বৈষম্য শুরু হয়। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল নারীর গুরুত্ব বিবেচনা করে বেগম রোকেয়া কী সুন্দর স্বপ্ন এঁকেছেন তাঁর বিভিন্ন রচনায়। বেগম রোকেয়ার 'পদ্মরাগ' উপন্যাসে কল্পিত একটি আশ্রমের নাম 'তারিণী ভবন', যেখানে নিঃস্ব, অবহেলিত, রোগাক্রান্ত নারীরা স্থান পায়, শিক্ষা পায়, সেবা পায়। তারিণী বিদ্যালয়ে মুখস্থবিদ্যা না পড়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। কল্পিত 'তারিণী ভবন' কেন্দ্রের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বঙ্গ নারীকে রচনা করার যে স্বপ্ন বেগম রোকেয়া দেখেছেন, তা রোকেয়ার ভাষায় 'নারীরা আপন আপন জীবিকা উপার্জনে সক্ষম, তাহারা আত্মনির্ভরশীল হয় এবং যেন ভবিষ্যতে পিতা, ভ্রাতা, স্বামী-পুত্রের গলগ্রহ না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া হয়।' সমাজের তুলনামূলক বেশি দারিদ্র্যপীড়িত অংশ হিসেবে নারীকে তাই শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ ধরতে হবে জরুরিভাবে। বেগম রোকেয়ার আকাঙ্ক্ষা যদি এ দেশের প্রত্যেক নারীর জীবনে বাস্তব হয়ে আসে, তাহলে সে তার অধঃস্তন অবস্থার উন্নয়ন নিজেই ঘটাতে পারবে।
নারীকে তার অবস্থা ও অবস্থানের উন্নয়ন করতে হলে তারা যেসব ক্ষেত্রে বৈষম্য বা অসাম্যের শিকার হচ্ছে তার অবসান করতে হবে এবং তাকে নিজস্ব প্রতিবাদের ভাষা অর্জন করতে হবে। নারীর অবদান, ত্যাগ, গৌরব করার ক্ষেত্রগুলোকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। আমাদের দেশে সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ, অবদান, ত্যাগকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সমাজকে, রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে নারীর প্রয়োজনে নয়, দেশের প্রয়োজনে নারীর উন্নয়ন জরুরি। আর এই বোধ থেকে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা তৈরি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে জ্ঞানতাপস, ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ লিখেছেন, 'মানবদেহের দুই চোখ, দুই হাত, দুই পা, সমাজদেহে তেমনি নর ও নারী। যে দেহে এক চোখ কানা, এক হাত নুলা, এক পা খোঁড়া, সে দেহ বিকলাঙ্গ। নারী জাতির সুষ্ঠু উন্নতি ব্যতীত সমাজকে সমুন্নত বলা যায় না।' এখনো আমাদের অধিকাংশ চলচ্চিত্র বা নাটকে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রটি মায়াবতী, ছলনাময়ী, নির্ভরযোগ্য প্রেমিক, দায়িত্বশীল স্ত্রী, সাজগোজপ্রিয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ নারী ঘরের আঙিনায় সীমাবদ্ধ, কর্মক্ষেত্র তথা স্বাধীন পেশায় বড় একটা দেখা যায় না। যদিও কেউ নারীকে ডাক্তার, নার্স বা পুলিশ অফিসার করে শেষ পর্যায়ে তাদের এমন অসহায় হিসেবে দেখায় বা এমন বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়, তাকে উদ্ধার করার জন্য বীরবিক্রম নায়কের প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সমাজের এই চিরাচরিত মানসিকতা বদলাতে হবে।
সমমজুরির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে, যার একটা স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিত। এর পাশাপাশি নারী-শ্রমিকের ক্ষেত্রে আরো যে বিষয়গুলো লক্ষণীয়_উৎপাদনের এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নারী-শ্রমিকের মজুরি নির্ভর করে পণ্যের সংখ্যা বা ওজনের ওপর ভিত্তি করে, শ্রমঘণ্টা বা শ্রমদিবস হিসাবে নয়। যেমন কত কেজি চিংড়ির মাথা ছাড়ানো হলো, কত মণ আলু ওঠানো হলো, কয়টা শার্ট বা সোয়েটারের সেলাই শেষ হলো ইত্যাদি। এতে নারীর মানবিক মর্যাদা বা শ্রম মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আবার এমনও দেখা গেছে_ওপরে বর্ণিত কারখানাগুলোতে নারীর বেলায় যে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেছে, বছরের পর বছর সে শ্রমিকই থেকে যাচ্ছে। অপরদিকে পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে অনেককে প্রশিক্ষণ দিয়ে বা অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে পরবর্তী সময়ে সুপারভাইজরি বা ব্যবস্থাপনার স্তরে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সমদৃষ্টির প্রয়োজন।
সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি জটিলতাপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সরকারি সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নারীকে বিবেচনা করা হয় না_যা মোটেই কাম্য নয়। খাসজমি বা খাস জলাশয় বরাদ্দ পাওয়ার আইনে বলা আছে, 'দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাসজমি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম বিবেচনায় রাখা হবে।' কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা হলো, কোনো দরিদ্র নারীর আবেদনে বরাদ্দ প্রদানকারীরা ইতিবাচক সাড়া দেয় না। প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে, কৃষির সঙ্গে নারীর নিবিড় সম্পর্ক চিরন্তন কিন্তু কৃষক বলতে বোঝানো হয় পুরুষকে, কৃষির কথা যেন পুরুষেরই কথা। এই মনোভাবের পরিবর্তন প্রয়োজন।
একটি সুখী, সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে নারী-পুরুষ সম্পর্কের উন্নয়ন অত্যাবশ্যকীয়। জেন্ডার-সমতার জায়গাটি পুরুষের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া তৈরি করা সম্ভব নয়। জন্ম-জন্মান্তরের চলে আসা বৈষম্য কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সচেতনতা, আলোচনা, ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্রের মানবাধিকার-সংক্রান্ত আইনকানুন ঠিকমতো প্রয়োগ করা হলে নারী সামাজিক অনুশাসনের খারাপ দিকগুলো থেকে মুক্ত হতে পারে। জেন্ডার ইস্যুগুলোকে আলাদা ইস্যু বা বিশেষ বিবেচনার ইস্যু_এভাবে দেখা ঠিক হবে কি না তা ভাবতে হবে। হয়তো এতে করে প্রতিপক্ষ, বিপক্ষ_এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। জন্ম নিতে পারে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত শিক্ষক Dr. H. Z. Benitez-এর পরামর্শগুলো খুবই যুৎসই মনে হয়েছে, যা বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়_'বিরোধ নয়, সহযোগিতাই হতে হবে বাস্তবসম্মত কৌশল। আবেগের আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ না করে মহিলাদের হতে হবে দৃঢ়চিত্ত এবং ধৈর্যশীল। মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, ভ্রাতৃত্ববোধই হতে পারে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীত অবস্থা। কাজেই দ্বন্দ্ব এড়িয়ে এগিয়ে যেতে হলে মহিলাদের সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আবিষ্কার করতে হবে।'
লেখক : গবেষক

No comments

Powered by Blogger.