কমিউনিটি ক্লিনিকে যাচ্ছেন না চিকিৎসকেরা by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

রাজশাহীতে চিকিৎসক ছাড়াই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কমিউিনিটি ক্লিনিকগুলো। পালা করে (রোস্টার) এগুলোতে চিকিৎসক যাওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা যাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও স্বাস্থ্য সহকারীরা যান।


তবে অভিযোগ রয়েছে, মূলত এলাকার স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা (সিএইচসিপি বা কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার) ক্লিনিকগুলো চালাচ্ছেন। তাঁরা সাধারণ কিছু বড়ি দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করছেন। রাজশাহী সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার নয়টি উপজেলায় বর্তমানে ২২৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। প্রস্তাবিত রয়েছে আরও ২৫২টি। এর মধ্যে সাতটি নির্মাণাধীন। বাকিগুলো জায়গাজমি পাওয়া সাপেক্ষে নির্মাণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
২০১১ সালের ১৬ মে পরিচালক (স্বাস্থ্য) রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় থেকে জারি করা এক চিঠিতে চিকিৎসক ও চিকিৎসা সহকারীদের (মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট) নির্ধারিত কমিউনিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে এক দিন করে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। এই দায়িত্ব পালনের সময় ব্যর্থতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনার জন্য ওই চিকিৎসক ও চিকিৎসা সহকারীকেই দায়ী থাকতে হবে বলে হুঁশিয়ারি করে দেওয়া হয়েছে। এই চিঠির আলোকে প্রতিটি উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসক ও সহকারীদের দায়িত্বের রোস্টার তৈরি করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্লিনিকগুলো নির্মাণ শুরু করে। পর্যায়ক্রমে এর নির্মাণকাজ চলেছে। এ পর্যন্ত ২২৭টি ক্লিনিক নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
রাজশাহী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি) এই নির্মাণকাজ করেছে। এইচইডি রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান বলেন, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকের পেছনে সরকারের কমবেশি ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
ক্লিনিকগুলো পরিচালনার জন্য প্রতিটি ক্লিনিক এলাকায় একটি করে কমিউনিটি গ্রুপ রয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য পদাধিকার বলে এই কমিটির সভাপতি। অথচ এই কমিটির লোকেরা জানেনই না, এই ক্লিনিকে একজন চিকিৎসকের (এমবিবিএস ডাক্তার) রোগী দেখার দায়িত্ব রয়েছে। বাঘা উপজেলার দিঘা ক্লিনিকের সভাপতি আবদুল আজিজ বলেন, এ ধরনের চিকিৎসক তাঁদের ক্লিনিকে বরাদ্দ আছে কি না তাঁর জানা নেই।
সরেজমিনে জানা গেছে, কোনো কোনো ক্লিনিকে প্রথম প্রথম দু-এক দিন চিকিৎসক গেলেও সিএইচসিপির প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর আর কোনো চিকিৎসক যাচ্ছেন না। গত জুলাই মাসে সিএইচসিপির প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। কোনো কোনো ক্লিনিকে শুরু থেকেই এক দিনের জন্যও চিকিৎসক যাননি। বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের রোস্টার খতিয়ে দেখা গেছে, সেখানকার একজন চিকিৎসককে (সহকারী সার্জন) বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকে মাসে চার দিন এবং সাস্থ্য সহকারীকে আট দিন কমিউনিটি ক্লিনিকে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা এই দায়িত্ব পালন করছেন না।
গত ৩১ অক্টোবর উপজেলার নওটিকা কমিউনিটি ক্লিনিকে রোগী দেখার দায়িত্ব ছিল সহকারী সার্জন মুহম্মদ তামজীদ আলীর। সে দিন ওই ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী মেহেতাজ শাহরিন ছাড়া আর কেউ নেই সেখানে। স্থানীয় লোকজন বলেন, তাঁরা কোনো দিন এখানে সহকারী সার্জনের মতো কোনো চিকিৎসক পাননি।
রোস্টার অনুযায়ী পরের দিন ১ নভেম্বর তেপুকুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে দায়িত্ব ছিল স্বাস্থ্য সহকারী আরিফা খাতুনের। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ক্লিনিকটি বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, কোনো দিনই এই ক্লিনিকে কোনো চিকিৎসক তাঁরা দেখেননি। গৃহবধূ মারুফা খাতুন বলেন, ‘ডাক্তাররা কেউ আসেই না।’ জানতে চাইলে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, তাঁদের চিকিৎসকদের রোস্টার অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। কয়েকজন চিকিৎসকও বদলি হয়ে গেছে। ওই রোস্টার আর কার্যকর নেই। এখন সুযোগ পেলে চিকিৎসকেরা কমিউনিটি ক্লিনিকে যান বলে দাবি করেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার সব উপজেলাতেই একই অবস্থা চলছে। তানোরের চান্দুড়িয়া ক্লিনিকে কোনোদিনই কোনো চিকিৎসক যাননি। এই ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ফরিদা খাতুন বলেন, ২০১১ সালের নভেম্বরে তাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন। তারপর থেকে এখানে মাঝেমধ্যে একজন স্বাস্থ্য সহকারীই চিকিৎসা দেন। রাজশাহীর সিভিল সার্জন শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য একটি কমিউনিটি গ্রুপ আছে। সহকারী সার্জন যান না এমন কোনো অভিযোগ কোনো গ্রুপ করেনি। তবে যে সার্জন বদলি হয়ে গেছেন বা ওই জায়গা এখনো ফাঁকা রয়েছে, এমন ক্ষেত্রে না যাওয়ার অভিযোগটি সত্য হতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.