চারদিক- একজন প্রতিমাশিল্পীর গল্প by ফারুখ আহমেদ

আকাশজুড়ে সাদা মেঘের আনাগোনা। শরতের ফুল শিউলি আর শরতে ফোটে কাশফুল। সঙ্গে সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে ছুটে আসে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দুর্গোৎসব উপলক্ষে প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজারের ওপর পূজামণ্ডপ তৈরি হয়।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসব। দশমীর দিন বিসর্জনের জন্য প্রতিমা বসানো হয় ষষ্ঠীর দিন। অর্থাৎ চার দিন একটি প্রতিমা পূজামণ্ডপে থাকে, কিন্তু সেই মহাযজ্ঞ শুরু হয়ে যায় চার মাস আগে খুব ঘটা করে। প্রথমত রথযাত্রার দিন প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করতে হয়, এটাই ঐতিহ্য। সঙ্গে প্রতিমা তৈরির শুরুতে প্রতিমাদের উদ্দেশে পূজা দেওয়ার রীতি রয়েছে। এটুকুই আনুষ্ঠানিকতা, তারপর কাজ শুরু।
সাভার ধামরাইয়ের বলাই পাল একজন প্রতিমাশিল্পী। শাঁখারীবাজারে তাঁর একটি দোকান আছে। তাঁর ছেলেবেলার গ্রাম শিমুলিয়ার নামানুসারে দোকানের নাম শিমুলিয়া শিল্পালয়। সারা বছর টুকটাক কাজ করেন। পাথর তো পাওয়া যায় না, তাই সিমেন্ট দিয়েই পাথরের কাজ চালিয়ে নেন। তা ছাড়া পিতলের ডাইস করেও তিনি প্রতিমা তৈরির কাজ করে থাকেন। দুর্গাপূজার চার মাস আগে হয়ে পড়েন মহাব্যস্ত। পুরান ঢাকার প্রায় সব পূজামণ্ডপের প্রতিমাই তাঁকে গড়ে দিতে হয়। এগুলো হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব, সূত্রাপুর, হেমন্ত দাস রোড, রূপচন্দ্র দাস লেন, পাতলা খান লেন, শাঁখারীবাজার ও ইমামগঞ্জের পূজামণ্ডপের প্রতিমা। আর এর বেশির ভাগ তৈরি হয় নর্থব্রুক হল রোড জমিদারবাড়ির বিশাল এলাকায়। নিয়ম করে প্রতিবছরই এমন হয়। যেমন এ বছরও তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা আগের মতোই ১৩ সেট পূজামণ্ডপের কাজ শুরু করেছেন। সকাল ১০টায় শুরু হয়ে সেই কাজ চলে রাত তিনটা পর্যন্ত। বলাই পাল ও তাঁর সঙ্গীদের উৎসাহ দেওয়ার লোকেরও কমতি নেই। একদিন রাতের বেলা নর্থব্রুক হল রোডের জমিদারবাড়ি গিয়ে সেই মহাযজ্ঞের কিছু নমুনা দেখা গেল। সেখানেই দেখা হয়ে যায় বলাই পালের সঙ্গে। বলাই পাল ও তাঁর কর্মিবাহিনী কাজ করে চলেছেন, আশপাশের অনেকেই এসেছেন তাঁর কাজে বাহবা দিতে।
ভাদ্র মাস শেষ, আষাঢ় মাসে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। তিনি ও তাঁর শিল্পীরা সেই রথযাত্রার পর থেকেই প্রতিমা নিয়ে পড়ে আছেন। এর মধ্যেই তাঁরা মনসা আর বিশ্বকর্মার কাজ করবেন।
আমি বলাইদার সঙ্গে কথা বলি আর ছবি তুলে চলি। তাঁদের সুনিপুণ হাতেই গড়ে উঠবে দুর্গা, অসুর, সিংহ, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকেরা—চারদিকে কী এক মুগ্ধতা কেবল। তবে অসুর খুব ভয়ংকর। তাকে দেখে ভয় পেতে হয়। এক ১০-১২ বছরের ছেলে বাবার সঙ্গে প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে এসে অসুর দেখে ভয়ে চুপসে গিয়ে বাবার বুকে মুখ লুকাল। দেখে আমার বুকটাও কেমন কেঁপে কেঁপে উঠল। আবার সেই শিশুটিই রাজহাঁসের সামনে গিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। ইতিমধ্যে কাজের বিরতি পড়েছে। চলে এসেছে চায়ের সঙ্গে ঝালমুড়ি। বলাইদা নেমে আসেন দুর্গামায়ের কাছ থেকে। তিনি আমাকে এক বাটি মুড়ি এগিয়ে দিয়ে নিজে মুড়ির পুরো বলটি টেনে নেন, সঙ্গে সঙ্গে হাত লাগান তাঁর সহকর্মীরা।
বলাই পালের সংসার বলতে বউ আর এক ছেলে ও মেয়ে। বাড়িতে অর্থাৎ সাভারে এখন আর যাওয়া হয় না। কেউ থাকেও না সেখানে। আত্মীয়স্বজন দাওয়াত-টাওয়াত দিলে তবেই পৈতৃক ভিটা দেখা হয়। তিনি কেবল ঢাকায়ই প্রতিমা তৈরির কাজ করেন না, ঢাকার বাইরেও তাঁকে কাজ করতে হয়। বাইরের কাজ নিজের লোকেরা করে। তিনি কেবল তদারকি করেন। ঢাকার কাজে পুরোটা সময়ই তাঁকে দিতে হয়। চেষ্টা করেন কাজের ভিন্নতা আনতে। প্রতিমার মূল হচ্ছে তার চেহারা। তাঁর প্রাণপণ চেষ্টা থাকে চেহারা যতটা পারা যায় সুন্দর করা। সে চেষ্টায় ফলও পেয়েছেন বলাই পাল। মানুষের প্রশংসা-ভালোবাসার সঙ্গে সর্বজনীন পূজা কমিটির পুরস্কার। জীবনের জন্য পুরস্কার আর ভালোবাসা যে যথেষ্ট নয়, সেটা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পান। কারণ, এ কাজে পারিশ্রমিক খুব কম। জীবন চলা দায়। ভগবানের কৃপা ভেবেই তিনি কাজ করে চলেছেন।
কথায় কথায় রাত বাড়ে, এবার বিদায় নিতেই হয়। আমি যখন চলে আসব, তখন বলাইদা বলেন, ‘আমি এই কাজ করে জীবন-যাপন করছি ঠিক আছে। কিন্তু দাদা, আমার সন্তানকে কখনো এই পেশায় আনব না!’
ফারুখ আহমেদ
farukh.ahmed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.