অধিকার- আইন দিয়ে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন by মোহাম্মদ হেলাল

সম্প্রতি বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেশ জোরেশোরে কথা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের বাড়িভাড়া নিয়ে। যুক্তি একটাই—সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে বাড়িভাড়া। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের। সামর্থ্য কিন্তু বাড়ছে দিন দিন। তবে বাড়িভাড়া বাড়ছে তার চেয়েও বেশি হারে।


বিশ্বের মেগাসিটিগুলোর মধ্যে খুব সম্ভবত ঢাকাই একমাত্র শহর, যেখানে এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একজনের আয়ে সংসার চলে। তবে একজনের আয়ে সংসার চলা খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। হয়তো আমরাও এই দিক থেকে অন্যান্য মেগাসিটিগুলোর দিকেই এগোচ্ছি। সে জন্যই হয়তো বা অধুনা বিয়ের বাজারে চাকরিজীবী পাত্রীদের কদর বাড়ছে। বাড়ছে সেই সব পাত্রীদের কদর, যাদের ঢাকায় বাড়ি আছে। ‘বাড়িভাড়ার লাগাম টেনে ধরার জন্য দরকার এর নিয়ন্ত্রণ। সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব’—এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই চলছে সাম্প্রতিক বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা। কীভাবে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় জনমত তৈরি করে, তা-ই মূল চিন্তার বিষয় অনেকের কাছে। এই চাপ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর সঠিক প্রয়োগ করা। প্রয়োগের আগেই এই আইনের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন-পরিবর্ধন নিশ্চিত করা।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ অনুসারে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রকের লিখিত আদেশ ছাড়া বাড়িওয়ালা তার ভাড়াটের কাছ থেকে অগ্রিম বাবদ এক মাসের অতিরিক্ত কোনো ভাড়া, জামানত, প্রিমিয়াম বা সেলামি নিতে পারবেন না, বাড়িওয়ালা তার ভাড়াটেকে বাড়িভাড়ার রসিদ তাৎক্ষণিকভাবে বুঝিয়ে দিতে বাধ্য থাকবেন, মানসম্মত (স্ট্যান্ডার্ড) ভাড়া কার্যকর হওয়ার দুই বছর পরই কেবল বাড়িওয়ালা চাইলে তা পরিবর্তন করতে পারবেন, মানসম্মত ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হতে পারবে না, ভাড়াটে যত দিন নিয়মিতভাবে ভাড়া পরিশোধ করতে থাকবেন এবং ভাড়ার শর্তসমূহ মেনে চলবেন, তত দিন পর্যন্ত তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না, আইনসম্মত ভাড়া প্রদানে রাজি থাকলে বাড়ির মালিক পরিবর্তিত হলেও ভাড়াটেকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। ঢাকা শহরে বসবাসরত মানুষ মাত্রই বলবেন, তারা এই আইন সম্পর্কে জানেন না। অবশ্যই আইনজীবী গোছের কিছু লোক ছাড়া।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়িওয়ালারা এক মাসের বেশি ভাড়া অগ্রিম নেন। ছয় কিংবা এক বছরের ভাড়া অগ্রিম নিতেও আমি দেখেছি ও শুনেছি। আজ অবধি এ কারণে কাউকে দণ্ডিত হতে দেখিনি কিংবা শুনিনি; বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী যা হওয়ার কথা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়িওয়ালারা রসিদ দেন না। অনেক ক্ষেত্রে ভাড়াটেরাও তা চান না। ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রায়ই দুই বছরের বাধ্যবাধকতা মানা হচ্ছে না। তবে ‘মানসম্মত ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হতে পারবে না’ ধারাটি মানা হচ্ছে। মানার কারণ একটাই যে এই ধারাটিই ত্রুটিপূর্ণ। বর্তমানে আমি যে ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকি তার বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকার মতো। এই ধারামতে, আমার ফ্ল্যাটের বার্ষিক ভাড়া সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা হতে পারে। মাসে সর্বোচ্চ এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। অথচ আমি ভাড়া দিই ২২ হাজার টাকা। এই বাজারমূল্যের জায়গায় সরকারের রেকর্ডের মূল্য ধরলেও ভাড়া ২২ হাজার টাকার অনেক বেশি হবে। এই ধারা সাত-আট বছরে বাড়ির বাজারমূল্য তুলে আনার টার্গেটের মতো পুরোনো মানের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত। যা কোনো অর্থনৈতিক নিয়মপ্রসূত চিন্তা নয়। কারণ, একটা বাড়ি বানানো হয় ৫০, ৬০, ৭০ কিংবা ১০০ বছরের জন্য—সাত-আট বছরের জন্য নয়। আর উচ্ছেদ বিষয়ে তো কোনো আইনকানুনের বালাই নেই। যখন তখন চলে যেতে পারে বলে দেন বাড়িওয়ালারা।
এত কিছুর পরেও আমি বাড়িওয়ালাদের আইন অমান্য করার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি না। এর কারণ একটাই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই, তারা জানেন না এই আইনের মধ্যে কী আছে। পাশাপাশি ভাড়াটেরাও জানেন না তাদের কী কী অধিকার আছে। আইনের দুই দিকের দুই পক্ষই যদি আইন সম্পর্কে না জানেন তবে এর প্রয়োগ তো না হওয়ারই কথা। সরকারও এই আইন প্রয়োগে আদৌ মনোযোগী ছিল না। তবে আইন না জানলেও মানবিক বিচার বিবেচনা থেকে কার কী করা উচিত সেই ঔচিত্যজ্ঞান সম্পর্কে আমি আলোচনা করব না। এ কথা সত্য, অকে ক্ষেত্রেই বাড়িওয়ালারা সঠিক আচরণ করেন না। বাড়াটেদের অনেক আচরণও বাড়িওয়ালাদের অনেক কঠোর হতে বাধ্য করে। প্রশ্ন হলো, এখন চাইলেই এই আইন দ্বারা বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব কি না। চাইলেই এর দ্বারা বাড়িওয়ালাদের আচরণকে প্রভাবিত করা সম্ভব কি না। এর উত্তর পেতে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
যেমন, বাড়িওয়ালারা কেন পারছে বিশাল অঙ্কের টাকা অগ্রিম নিতে, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে কিংবা যখন তখন ভাড়া বাড়াতে, বাড়ি থেকে তুলে দিতে। কারণ চাইলেই, কেউ না কেউ অনেক টাকা অগ্রিম দিচ্ছে। কেন দিচ্ছে? যত লোক বাড়ি খুঁজছে তার তুলনায় বাড়াটে বাড়ির বা ফ্ল্যাটের সংখ্যা অনেক কম। অতএব অনেকেই বাড়িওয়ালার যেকোনো চাওয়া মিটিয়ে বাড়ি চায়। এখন আইন প্রয়োগ করতে গেলেও যার সামর্থ্য আছে আইনকে পাশ কাটিয়ে বেশি অগ্রিম দিয়ে নিজের বাড়ি পাওয়া নিশ্চিত করবে। হয়তো কাগজপত্রে এসব লুকিয়ে রাখবে। একই কারণে বাড়িওয়ালারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে পারছে। পারছে যখন তখন ভাড়া বাড়াতে। বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি না হলে উচ্ছেদ করে যখন তখন নতুন ভাড়াটে পাওয়া যাচ্ছে। যদি উচ্ছেদের পর কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতো নতুন ভাড়াটে পেতে, তখন এমনটি হতো না। মোট কথা, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের বিরাট ঘাটতি। আর যখন ঘাটতি থাকবে তখন ভাড়ার ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই ঘাটতির অবসান ঘটবে। তখন সরবরাহের দিকটাতে যারা থাকবেন তারা তো বিভিন্নভাবে এই ঘাটতির সুযোগ নেবেনই। এখন আইনি প্রক্রিয়ার যে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে আমাদের দেশে, তাতে করে ভাড়াটেরা আইনের আশ্রয় নিতে যাবেন কি না। আইনি প্রক্রিয়ার জন্য যে পরিমাণ সময় ও অর্থের দরকার তা ভাড়াটেদের বেশির ভাগেরই আছে কি না, তা ভাববার বিষয়। আরও ভাবনার বিষয় আইনি প্রক্রিয়ায় বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ সরবরাহের দিকটায় যারা আছে, তাদের আরও বেশি সংখ্যায় বাড়ি বানাতে নিরুৎসাহিত করবে কি না।
ফলে বাস্তবসম্মত উপায় হবে সরবরাহের দিকটায় যারা আছে তাদের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাড়ি তৈরিতে উৎসাহিত করা। সরকারের নিজেরও সেই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া। যা এযাবৎ দেখা যায়নি। গত এক যুগে ঢাকার জনসংখ্যা দ্বিগুণ হলেও সেই হারে বাড়েনি অবকাঠামো আর বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। আবাসন খাতের অবস্থা তো আরও করুণ। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থানের কথা চিন্তা করলে। এক যুগ ধরে আবাসন খাতে যে জোয়ার দেখেছি তার পুরোটাই কিন্তু উচ্চ এবং উচ্চ-মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক। সেটা প্রাইভেট হোক কিংবা সরকারি খাতে হোক। সরকারের আবাসন খাতের রাজউক কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পগুলোর সব কয়টাই ছিল উচ্চ এবং উচ্চ-মধ্যবিত্তের জন্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় ছুটে আসা মানুষের ঢল নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যদিকে পারেনি, তাদের এই শহরে ধারণ করার জন্য উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে। আবাসন সমস্যার মতো যেসব বিষয় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে বেশি প্রভাবিত করছে, সেসব বিষয়ে গুরুত্ব না দিলে, পর্যাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ না করলে—আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে বাড়িভাড়ার মতো সমস্যার সমাধান আদৌ সম্ভব নয়।
মোহাম্মদ হেলাল: শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ডিরেক্টর, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি)।

No comments

Powered by Blogger.