ফলোআপ : 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ৬-পরিবারের প্রশ্ন, এ কী করল র‌্যাব by সুমন বর্মণ

নরসিংদীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ছয়জনের মধ্যে দুজন ছাত্র। তারা হলো নরসিংদী শহরের দক্ষিণ বিলাসদী এলাকার হোসেন মোল্লার ছেলে নাহিদ মোল্লা এবং ভেলানগর এলাকার আবুল হাসেমের ছেলে আরিফ মিয়া। তাদের মধ্যে নাহিদ মোল্লা সাটিরপাড়া মীর এমদাদ উচ্চ বিদ্যালয় এবং আরিফ মিয়া কারারচর মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সদ্য সমাপ্ত মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।


আর দুজনের বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ। তারা হলো- শিবপুরের বান্দারদিয়া গ্রামের গিয়াস উদ্দিন আফ্রাদের ছেলে মাসুদ আফ্রাদ ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়ার সাইদুর রহমান।
র‌্যাব বলেছে, নিহতদের সবাই ছিনতাইকারী। ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তারা নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে আহতরা দাবি করেছে- ফাঁদে ফেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। নিহতদের কারো কারো পরিবার এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তাদের প্রশ্ন- 'এ কী করল র‌্যাব?'
গত সোমবার দুপুরে নরসিংদী সদর উপজেলার নরসিংদী-মদনগঞ্জ সড়কের খাটেহারা এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ছয়জন নিহত হয়। আহত হয় দুই র‌্যাব সদস্যসহ আরো পাঁচজন। নিহতদের মধ্যে অন্য দুজন হলো- নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা এলাকার আবদুল আওয়ালের ছেলে মাইক্রোবাসচালক মোশারফ হোসেন ও পলাশ উপজেলার নোয়াকান্দা গ্রামের আক্কাছ উদ্দিনের ছেলে জামাল মিয়া।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় র‌্যাব-১১ নরসিংদী ক্যাম্পের কম্পানি কমান্ডার মেজর খন্দকার গোলাম সারোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আরিফ পারিবারিকভাবেই সন্ত্রাসী। তবে নাহিদের ব্যাপারে এলাকাবাসীর আফসোস রয়েছে। অল্প বয়সে সে প্রাণ হারিয়েছে। প্রকৃত পক্ষে ঘটনার সময় কে পরীক্ষার্থী, কারো বিরুদ্ধে মামলা আছে কি না সেটা যাচাই করার সুযোগ থাকে না।'
এই র‌্যাব কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন, 'তারা যদি ভালো মানুষ হয়, তাহলে জামালের মতো একজন দুর্ধর্ষ ডাকাতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে কিভাবে?'
গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে বিলাসদী মহল্লায় নাহিদ মোল্লার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পাশে সড়কে লাশ বহনের খাটিয়া রাখা হয়েছে এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসছে নাহিদের লাশ দেখার জন্য। তখনো বাড়িতে লাশ আসেনি। নাহিদ দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড়।
সেখানে কথা হয় নাহিদের চাচা ইদন মোল্লার সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, নাহিদ নরসিংদী মীর ইমদাদ স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ভালো কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য কোচিং করছিল। সম্প্রতি পারিবারিক একটি ঝগড়ায় প্রতিপক্ষরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। সোমবার সকাল ১০টার দিকে সে হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে যায়। হাসপাতাল থেকে আসার পর দুপুর পৌনে ১টার দিকে শাওন, আরিফ ও শামীম নামের তিনজন বাড়ি থেকে নাহিদকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর সন্ধ্যায় তারা নাহিদের মৃত্যুর খবর পান।
নাহিদের মা নাসিমা বেগম বলেন, 'এ কী করল র‌্যাব? আমার ছেলেকে গুলি করে মারল! আমার ছেলে কোনো খারাপ কাজ করত না। তার পরও কেন আমার ছেলেকে মরতে হলো?'
এলাকাবাসী ওসমান মোল্লা জানান, নাহিদ ভালো ছেলে হিসেবে এলাকায় পরিচিত। কী কারণে তার এ করুণ পরিণতি তা বলতে পারছি না।
একই অবস্থা শহরের ভেলানগর এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে আরিফ মিয়াদের বাড়িতে। র‌্যাবের গুলিতে ছেলে হারানোর শোকে মা জুলেখা বেগম আহাজারি করছেন। আশপাশের লোকজন তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কোনো সান্ত্বনাই থামাতে পারছিল না তাঁর কান্না। শোকে বিহ্বল আরিফের বাবা আবুল হাসেমও।
আরিফের চাচাতো ভাই হাবিবুর রহমান বলেন, 'আরিফ কারারচর মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। তিন দিন তাবলিগ জামায়াতে কাটিয়ে রবিবার বাড়িতে ফিরে আসে সে। সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাড়িতেই ছিল। দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ নানিবাড়ি মাধবদীতে যাওয়ার কথা বলে তার বাবার কাছ থেকে ৫০ টাকা নেয়। পরে সন্ধ্যায় তার মৃত্যুর সংবাদ পাই। আরিফ দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয়।'
আরিফের বাবা আবুল হোসেন বলেন, আরিফের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে বিদেশে যাবে। এ জন্য সে পাসপোর্ট করেছে। কিন্তু বিদেশে যাওয়া আর হলো না। তিনি দাবি করেন, আরিফ অপরাধী নয়। তাঁর প্রশ্ন, 'কেন আমার ছেলেকে মরতে হলো।'
গতকাল দুপুরে নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের স্বজনরা মর্গে ভিড় করছে মৃতদেহ নেওয়ার জন্য। এ সময় কথা হয় নিহত মাসুদ আফ্রাদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে। তাঁরা জানান, আফ্রাদ ট্রাক চালাতেন। তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে অভিমান করে ১২ বছর আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। পরে বিয়ে করে বউ নিয়ে শিবপুরে থাকতেন। পরিবারের কোনো খোঁজখবর নিতেন না। গতকাল পরিবারের লোকজন আফ্রাদের মৃত্যুর খবর পায়। মাসুদের বাবা গিয়াস আফ্রাদ ছেলের বিষয়ে কিছু বলতে চাননি।
অন্য নিহত মাইক্রোবাসচালক মোশারফ হোসেনের খালা শাহিনুর বলেন, মোশারফ সকালে নাশতা খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। তাঁরা জানেন সে গাড়ি চালানোর জন্যই বের হয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যায় হঠাৎ গাড়ির মালিক আনোয়ার হোসেনের ছেলে নয়ন তাঁদের কাছে মোশারফের কোনো খবর আছে কি না জানতে চান। তখন তাঁরা ফোন করে মোশারফের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পান। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন র‌্যারের গুলিতে সে মারা গেছে।
মোশারফের পাঁচদোনার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার মা ফজিলা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'আমার ছেলেরে কেন র‌্যাব গুলি কইরা মারল আমরা কইতে পারি না। তয় তার নামে একটা মার্ডারের মামলা আছে। আর এ জন্য তারে র‌্যাব মাইর‌্যা ফেলাইবো?' এ কথা বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ছিনতাইয়ের শিকার ব্যবসায়ী মারুফ হোসেন রাজধানীর শ্যামপুরের রায়েরবাগ এলাকায় থাকেন। তিনি সিলেট থেকে কারচুপি কিনে ঢাকায় বিক্রি করেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সোমবার নরসিংদীতে তাঁর ভাইপোর কাছে আসেন। সকাল ১১টার দিকে তিনি ও ভাইপো পালাম ইসলামী ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে ৪০ হাজার টাকা তোলেন। এরপর তাঁরা ট্যাঙ্কি্যাবে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। পথে নরসিংদীর সালিধার ঈদগাহ মাঠ এলাকায় একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস তাঁদের গতিরোধ করে। ছিনতাইকারী তাঁর পেটে ছুরিকাঘাত করে টাকার ব্যাগটি ছিনিয়ে নেয়। তিনি স্থানীয় একটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর নরসিংদী থানায় অভিযোগ করেন। এরপর বিষয়টি র‌্যাবকে জানান।
ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার অমর চন্দ্র বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলে, একটি গাড়িতে করে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে- এমন খবর পেয়ে তারা গাড়িটি অনুসরণ করে। গাড়িটি মদনগঞ্জ সড়কের ৫ নম্বর ব্রিজ এলাকায় পৌঁছলে হঠাৎ ওই গাড়িটি থেকেই তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু হয়। এ সময় তারা গাড়ি থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করলে প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়। মূলত ফাঁদে ফেলে র‌্যাব তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে সে দাবি করে।
দুজনের বিরুদ্ধে মামলা নেই : র‌্যাবের গুলিতে নিহত ছয়জনের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা খুঁজে পায়নি পুলিশ। নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা হলো- শিবপুরের বান্দারদিয়া গ্রামের গিয়াস উদ্দিন আফ্রাদের ছেলে মাসুদ আফ্রাদ ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়ার সাইদুর রহমান।
অন্য চারজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনে মামলা রয়েছে। তবে তাদের মধ্যেও দুইজনের বিরুদ্ধে শুধু মারামারির ঘটনায় মামলা রয়েছে।
নিহত জামাল মিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সদর থানায় একটি অস্ত্র মামলা, পলাশ থানায় দ্রুত বিচার আইনে এবং মনোহরদী থানায় ডাকাতি ও মারামারি মামলা রয়েছে। সে সদর থানার অস্ত্র মামলায় আট বছর কারাভোগ করে।
মাইক্রোবাসচালক মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় হত্যা ও লাশ গুম করার অপরাধের একটি মামলা রয়েছে।
নিহত নাহিদ মিয়া ও আরিফ মিয়ার বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় মারামারির মামলা রয়েছে।
বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় মামলা : কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, ডাকাতির প্রস্তুতি, সরকারি কাজে বাধা ও হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগ এনে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেন।

No comments

Powered by Blogger.