চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাড়িটির মালিক ছয় ভাইয়ের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে মামলা করে -নকশা অনুমোদন ছাড়াই আটতলা ভবন by হামিদ উল্লাহ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) থেকে নকশা অনুমোদন ছাড়াই নগরের লালখান বাজারের সামসী কলোনিতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি আটতলা ভবন। এ ব্যাপারে নোটিশ দেওয়ার পরও নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখায় চউক বাড়িটির মালিক ছয় ভাইয়ের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করে।


২০০৭ সালে মামলা করার সময় ভবনটি ছিল ছয়তলা, এখন আটতলা। ভবনটির মালিক ছয় ভাই হলেন: আমজাদ হোসেন হাজারী, দেলোয়ার হোসেন হাজারী, আনোয়ার হোসেন হাজারী, ইকবাল হোসেন হাজারী, আলমগীর হোসেন হাজারী ও শাহাদাত হোসেন হাজারী। আমজাদ হোসেন হাজারী লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা এবং চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা। প্রথম আলোর কাছে তিনি দাবি করেন, কয়েক মাস আগে তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে দিয়েছেন।
আমজাদ দাবি করেন, চউক বাড়ির নকশার অনুমোদন দিয়েছে।
চউক সূত্র জানায়, অনুমোদন না নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করায় চউক ২০০৭ সালের ২৪ এপ্রিল আমজাদ হোসেনকে আইনি নোটিশ দেয়। এক সপ্তাহের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়। ওই বছরের ২০ জুন লিখিত জবাবে চউককে জানানো হয়, ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ তাঁরা নকশার অনুমোদন পেয়েছেন। পাশাপাশি চউকের নোটিশের বিরুদ্ধে রিট করলে হাইকোর্ট নোটিশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
চউক সূত্র জানায়, ওই রিট আবেদনে আমজাদ হোসেন হাজারী যে নকশা উপস্থাপন করেন, সেটি ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ মৌজার একটি বাড়ির নকশা, যার মালিক ফটিকছড়ির সাইফুদ্দিন চৌধুরী। আমজাদ হোসেনের বাড়িটি খুলশী থানায়। বিষয়টি জানানোর পর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশের মেয়াদ আর বাড়াননি। পরে ২০০৭ সালের ১৩ নভেম্বর চউকের ইমারত পরিদর্শক সৈকত চন্দ্র পাল বাদী হয়ে আমজাদ ও তাঁর পাঁচ ভাইয়ের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ফৌজদারি মামলা করেন।
আমজাদ হোসেন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁদের নকশার অনুমোদন আছে। চউকের করা মামলারও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। চউকের নকশা অনুমোদনের তারিখ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে মনে নেই। দেখে বলতে হবে।’
তবে চউকের অথরাইজেশন কর্মকর্তা মো. মনজুর হাসান বলেন, ‘ওই বাড়ির জন্য কোনো নকশারই অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আমরা তাঁকে এ ব্যাপারে চিঠি দিয়েছি। আদালতে মামলাও চলছে।’
মামলা প্রসঙ্গে চউকের আইন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘প্রতি মাসে হাজিরার তারিখ পড়ে। আমরা ওই মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছি। আদালতের রায়ের ভিত্তিতে চউক পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।’
গত রোববার সামসী কলোনিতে আটতলা ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। নিচতলায় আমজাদ হোসেনের রাজনৈতিক কার্যালয় থাকলেও তিনি বসবাস করেন পাশের একটি অ্যাপার্টমেন্টে কেনা ফ্ল্যাটে।
তিন অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক: সূত্র জানায়, কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দুদকের পরিচালক মেজর ফয়সল পাশা প্রথম আলোকে বলেন, এসব তদন্তের ঘটনায় আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে ওই তিনটি অভিযোগ থেকে আমজাদ ও তাঁর স্ত্রী হালিমা বেগমকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে দুদকের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। গত ২ সেপ্টেম্বর ওই চিঠি পাঠানো হয়।
আমজাদ হাজারী বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে রাজনীতি করি। তাই মন্ত্রী আফছারুল আমীনের পক্ষের লোক আমার পিছু নিয়েছে। আমার দলের কিছু লোক আমার বিরুদ্ধে লেগে আছে।’ তিনি বলেন, ‘রোববার রাতে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। জানতে চেয়েছি, কারা আমার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দিয়েছে।’
আমজাদ হোসেন ২০০১ সালে কাস্টমসে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। কাস্টমসে তাঁর নাম মো. আমজাদ হোসেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সাধারণ সম্পাদক আমজাদ। সরকারি চাকরি করেও রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে ২৩টি মামলা প্রত্যাহার করিয়ে কাস্টমসে চাকরি শুরু করি। দল ক্ষমতায় আসার পর দলের কিছু লোক আমার পিছু লেগেছে। তাই আমি কাগজে-কলমে কয়েক মাস আগে থেকে আর দলের সঙ্গে নেই। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন আফসার উদ্দিন।’
আমজাদ বলেন, ‘আগামীতে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আবার পুরোদমে রাজনীতি করব।’

No comments

Powered by Blogger.