ভাষাসংগ্রামী গোলাম মাওলা by কাজী নজরুল ইসলাম

মহান ভাষা আন্দোলন ও জাতিগত ঐতিহ্যের প্রতীক জাতীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রাণপুরুষ ভাষাসংগ্রামী ডাক্তার গোলাম মাওলা। ১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গোলাম মাওলা।


কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূ-তত্ত্ব বিষয়ে এমএসসি পাস করার পর ১৯৪৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। কলকাতায় ছাত্র অবস্থাতেই মাওলার সঙ্গে সখ্য হয় বঙ্গবন্ধুর।
১৯৪৮ সালে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ গঠন করা হলে গোলাম মাওলা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মনোনীত হন। ঢাকা মেডিকেলের দ্বিতীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে মাওলা '৫২-এর জানুয়ারিতে ভিপি নির্বাচিত হন। ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি মিলনায়তনে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ডা. গোলাম মাওলা অন্যতম সদস্যপদ লাভ করেন।
সে সময়ে ঢাকার ২২ পঞ্চায়েতের সর্দার ছিলেন পুরান ঢাকার লায়ন সিনেমা হলের মালিক কাদের সর্দার। ১৯ ফেব্রুয়ারি মাওলার পরামর্শে শরফুদ্দিন আহমেদ, ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী ('৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী) ও ডা. মঞ্জুর কাদের সর্দারের বাড়িতে গিয়ে তাকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ভূমিকা নিতে অনুরোধ জানান। কাদের সর্দার এতে রাজি হন। ২০ ফেব্রুয়ারি গোলাম মাওলা কয়েকজন মেডিকেল ছাত্রের প্রস্তাবে মাইক ভাড়া করে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত দেন। তিনি ২ ছাত্রকে ডেকে হোস্টেল থেকে ২৫০ টাকা উঠিয়ে আনতে বললে ছাত্ররা মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যে ৪৫০ টাকা উঠিয়ে আনে। ২১ ফেব্রুয়ারি গোলাম মাওলা, আবদুল মতিন, অলি আহাদ ও সামসুল আলম শক্ত অবস্থানে থাকেন পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙার সিদ্ধান্তে।
একুশের গুলিবর্ষণের পরপরই বিকেলে নেতারা জরুরি বৈঠকে মিলিত হন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। সেখানে আন্দোলনের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হয়। সভায় গোলাম মাওলাকে আহ্বায়ক করে নতুন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিকেলের ছাত্ররা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে মেডিকেল কলেজের যে স্থানে প্রথম গুলি চালানো হয়েছিল সেখানেই শহীদ মিনার স্থাপন করা হবে। সিদ্ধান্ত মতে নির্মাণাধীন নার্সেস কোয়ার্টারের ইট-বালু-সুরকি আর হোসেনী দালান সড়কের পুরান ঢাকাইয়া পিয়ারু সরদারের গুদাম থেকে সিমেন্ট এনে সারা রাত জেগে ১০ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট প্রস্থের ঐতিহাসিক প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ শফিউর রহমানের বাবা মৌলভী মাহাবুবুর রহমান প্রথমবার উদ্বোধন করেন শহীদ মিনারের। দ্বিতীয় বার ২৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে মিনার নির্মাণ করা হয়েছে এ খবর মুহূর্তের মধ্যে পেঁৗছে যায় বিভিন্ন এলাকায়। দলে দলে নারী-পুরুষ এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে থাকে শহীদ বেদিতে। টাকা-পয়সা দান করতে থাকে। অনেক গৃহবধূ তাদের হাতের স্বর্ণালঙ্কারও খুলে দিয়েছেন মিনারের পাদদেশে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সেনা ও পুলিশ সদস্যরা ভেঙে ধূলিসাৎ করে দেয় শহীদ মিনারটি।
এমবিবিএস পাস করার পর গোলাম মাওলা পূর্ব পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ভাইজির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। '৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নড়িয়ায় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। কিছুকাল পর তিনি মারা গেলে '৫৬ সালে ওই আসনে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মাওলাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনী এলাকার ভোজেশ্বরের একটি জনসভায় এসেছিলেন। গোলাম মাওলার পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, 'গোলাম মাওলা আমার চেয়েও বেশি শিক্ষিত, তিনি বিএসসি, এমএসসি ও এমবিবিএস, তাকে আপনারা ভোট দিন'। ১৯৬২ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মাদারীপুরের একটি আসন থেকে গোলাম মাওলা আওয়ামী লীগের টিকিটে এমএনএ নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে বিরোধী দলের হুইপ নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৫৬ থেকে '৫৭ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। একপর্যায়ে জাতীয় রাজনীতি ছেড়ে মাদারীপুর এসে চিকিৎসক হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন। তিনি গরিব রোগীদের থেকে কখনও পয়সা নিতেন না। উপরন্তু গরিবদের বিনা পয়সায় ওষুধও সরবরাহ করতেন। '৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদদের রক্তে ঢাকার পিচঢালা রাজপথে যে আল্পনা আঁকা হয়েছিল তাতে ডা. মাওলা বাঙালি জাতির মুক্তির ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। তাই তিনি অনাগত মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতাকে ইঙ্গিত করে তার সহকর্মী ও বন্ধুদের বলতেন, 'বাঙালির সুদিন আসবে, হয়তো আমি সেদিন থাকব না বা দেখব না, তোমরা তা অবশ্যই ভোগ করবে'। মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করে গোলাম মাওলা স্বাধীনতা লাভের ৫ বছর আগে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ১৯৬৭ সালের ২৯ মে মৃত্যুবরণ করেন।
২০১০ সালে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলীর অক্লান্ত চেষ্টায় ভাষাসংগ্রামী মরহুম ডা. গোলাম মাওলাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন। এ ছাড়া জাতীয় বীর কর্নেল (অব.) শওকত আলীর কল্যাণে কীর্তিনাশা নদীর ওপর নির্মিত সেতু ও নড়িয়ায় একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে গোলাম মাওলার নামে। ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে বিশেষ অনুরোধ করে শওকত আলী ২০০৭ সালের ২৫ এপ্রিল ধানমণ্ডির ১নং সড়কটির নামকরণ করান গোলাম মাওলার নামে। এ ছাড়া শওকত আলী সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় শরীয়তপুর সরকারি পাবলিক লাইব্রেরিকে ২০০৯ সালে ' ভাষাসংগ্রামী ডা. গোলাম মাওলা পাবলিক লাইব্রেরি' নামকরণ করান। গোলাম মাওলার নামে কয়েকটি সংঘ, সংসদ বা ক্লাব জাতীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা জানা যায়। এর মধ্যে ডা. গোলাম মাওলা তরুণ স্মৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেক আগে। ১৯৯৭ সালের ২ মে ভাষাসংগ্রামী ডা. গোলাম মাওলা স্মৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
 

No comments

Powered by Blogger.