সংবিধানের চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়া by এ এম এম শওকত আলী

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে সংবিধান চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। বিতর্কের কয়েকটি ধারা লক্ষণীয়_১. রায়ের আলোকে চূড়ান্তকরণের এখতিয়ার কার? সংসদের, না আদালতের। স্মরণ করা যেতে পারে, রায় প্রকাশের অব্যবহিত পরই সংসদ একটি কমিটি গঠন করে।


ওই কমিটিকেই দায়িত্ব দেওয়া হয় রায়ের আলোকে এ বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করার জন্য। অবশ্য কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য বলেছিলেন, রায়বহির্ভূত কিছু বিধান সংবিধানে সংযোজন করা হবে। কারণ এ এখতিয়ার সংসদের রয়েছে। এর পরই প্রধান বিচারপতিসহ আইনমন্ত্রীর একটি বিপরীতধর্মী উক্তি মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণ জানতে পারে। তাঁদের মতে, রায়ের আলোকে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করাই যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ এ উক্তির বলে সংসদ কর্তৃক গঠিত কমিটিকে অকার্যকর করা হলো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কমিটি এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পুনর্মুদ্রণের বিষয়টিও চূড়ান্ত হয়েছে।
২. বিতর্কের অন্য ধারাটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। প্রধান বিরোধী দলের এক মুখপাত্রের মতে, ইচ্ছামতো কিছু বিধান সংবিধানে সংযোজন করলে ভবিষ্যতে তাঁরা ক্ষমতায় এলে তা বিলুপ্ত করবেন। এ ধরনের বক্তব্য বিগত কয়েক দশকের সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক ধারারই প্রতিফলন মাত্র। অনেকের মতে, সংসদীয় কমিটি গঠনের আগে একটি নিরপেক্ষ কমিশন দ্বারা সম্পূর্ণ বিষয়টি যাচাই করা অধিকতর সংগত ছিল। এই যুক্তির সপক্ষে বলা যায়, উপমহাদেশের সব দেশেই এ প্রথা অতীতে অনুসৃত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্মলগ্নে অবশ্য গণপরিষদ কমিটিই গঠন করা হয়েছিল। এর পরবর্তী পর্যায়ে সংসদ ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধন করে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করে, যা মূল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে অতিক্রম করে। তবে ওই বছরই দেশে প্রথমবারের মতো সামরিক শাসনের ফলে ফরমানের বদৌলতে সংবিধানের একাধিক অংশে সংশোধন সাধিত হয়। এসব সংশোধনও মূল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে বিলুপ্ত করে। মূল সংবিধানের মৌলিক উদ্দেশ্য ও চেতনাকেও বিলুপ্ত করা হয় ১৯৮২-পরবর্তী সামরিক শাসনামলে।
৩. প্রথমে হাইকোর্ট, পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সামরিক শাসনামলের কিছু সাংবিধানিক পরিবর্তন আইনবহির্ভূত ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তাঁদের এ রাজনৈতিক অবস্থান যে একেবারেই সহজ ছিল না, তা পরবর্তী পর্যায়ে দৃশ্যমান হয়। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিমসহ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এখন সংবিধানে অক্ষুণ্ন থাকবে। আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ লেখকরাও এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অভিমত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং উলি্লখিত দুই বিধান সাংঘর্ষিক।
৪. পুনর্মুদ্রিত সংবিধান এখনো জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত না হলেও একটি বাংলা দৈনিকে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানী এক সাংবাদিক পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ধরে নেওয়া যায়, তিনি পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের খসড়া দেখেই সমালোচনা করেছেন। কারণ এখন পর্যন্ত সরকার প্রকাশিত সংবাদের বিপক্ষে কোনো বক্তব্য প্রকাশ করেনি। তাঁর সমালোচনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল নির্বাহী এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব। অর্থাৎ বিচার বিভাগের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি সম্পর্কিত। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর অধস্তন বিচার বিভাগের বিচারকদের ক্ষেত্রেই এ বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে প্রযোজ্য। তবে উচ্চতর বিচার বিভাগের বিচারক নিয়োগ এবং পদোন্নতির বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত। এ ব্যাপারে বলা যায়, অধস্তন বিচার বিভাগের প্রাথমিক নিয়োগের বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের কোনো কর্তৃত্ব এখন নেই। ১৯৯৯ সালের সুপ্রিম কোর্টের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী জুডিশিয়াল কমিশন গঠিত হয়ে এ কাজটি করছে। বদলি ও পদোন্নতির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশেই সরকার যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদেশ জারি করে।
অন্যদিকে হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ, পরবর্তীকালে স্থায়ীকরণ এবং পদোন্নতির ব্যাপারেও সুপ্রিম কোর্টের, মূলত প্রধান বিচারপতির সুপারিশেই এ কাজগুলো সম্পাদিত হয়। অনেকের মতে, ১৯৭২-এর সংবিধানে এ ধরনের পরামর্শের বাধ্যবাধকতা ছিল। এ বিষয়টি সংবিধানে পুনরায় ফিরে আসবে কি না, তা নিয়েও অনেকের সন্দেহ রয়েছে। লক্ষণীয়, রাষ্ট্রপতি অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগের পরও একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি নিয়োগপ্রাপ্তদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেননি। পরবর্তী প্রধান বিচারপতি এ কাজটি করেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, তিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। পত্রিকান্তরে জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চারজন বিচারপতি নিয়োগ করায় হাইকোর্টের সাতজন বিচারপতি ছুটিতে আছেন। তাঁরা অবশ্য ব্যক্তিগত কারণেই ছুটি নিয়েছেন। তবে প্রকাশিত সংবাদে এটাও বলা হয়েছে, এর আগে ছুটি গ্রহণকারী বিচারপতিরা ইস্তফা দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। এ বিষয়টি মুখ্য নয়। যে বিষয়টি মুখ্য, তা হলো, বর্তমানে বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি বহুল বিতর্কিত। কারণ রাজনৈতিক। এক সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্তরা পরবর্তীকালে বাদ পড়ে এবং পুনরায় ফিরে আসে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমেই তাঁরা পুনর্নিয়োগ লাভ করেন। এ ধারার অবসান হলেই মঙ্গল।
এ ধরনের ঘটনা থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের পারস্পরিক সম্পর্ক ও এখতিয়ার। সংবিধানে যদি বিচারপতি নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশের বিষয়টি উহ্য থাকে তাহলে সাধারণ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি সংবিধানে বর্ণিত যোগ্যতা সাপেক্ষে যেকোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতাবান। অন্যদিকে পরামর্শ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা যদি সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, তাহলে পরামর্শ উপেক্ষা করে রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দিলে তা হবে বেআইনি বা অসাংবিধানিক। তবে এ বিষয় কার্যকর করার কোনো উপায় নেই। কারণ নিয়োগপ্রক্রিয়া গোপনীয়ভাবেই চূড়ান্ত করা হয়। যে কয়জন বিচারপতিকে ইতিপূর্বে শপথ করানো হয়নি, তাঁরা কি তাহলে সুপারিশকৃত ছিলেন না? এ প্রশ্নের উত্তর কোনো দিনই পাওয়া যাবে না।
সংবিধান চূড়ান্তকরণের দায়িত্বে সংসদীয় কমিটি হয়তো সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বাইরেও কিছু বিধান সংবিধানে যুক্ত করবে। আগেই বলা হয়েছে, এ বিষয়ে কমিটির একজন মুখপাত্র উক্তি করেছেন। ওই মুখপাত্র সংসদীয় কমিটিতে যেকোনো রাষ্ট্রীয় কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের হাজিরা বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের বিষয়টিও বলেছেন। এর সপক্ষে যুক্তি হলো, ইতিপূর্বে বিচার বিভাগসহ কিছু স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের সমন জারি করা সত্ত্বেও তাঁরা সংশ্লিষ্ট কমিটিতে হাজির হওয়া থেকে বিরত ছিলেন। প্রশ্ন হলো, স্বাধীন বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে কি না। এ ক্ষেত্রে সংসদের এখতিয়ার সম্পর্কিত বিধান স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট বিধানে বলা আছে, সংসদ আইন দ্বারা সাক্ষীদের হাজিরা বলবৎ করার এবং শপথ ঘোষণা বা অন্য কোনো উপায়ে সাক্ষ্য গ্রহণ আইন দ্বারা নিশ্চিত করবে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হয়নি।
জনমনে আশঙ্কা, এ আইনের অপব্যবহার হলে বিচার বিভাগ কখনো স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে না। এ ব্যাপারে সম্প্রতি ভারতীয় চিফ ভিজিল্যান্স কমিশনারের মামলায় ওই কমিশনার সুপ্রিম কোর্টকে বলেছেন, ৪৩৫ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৫৩ জনের বিরুদ্ধেই অনিষ্পন্ন ফৌজদারি মামলা রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থা কী, তা জানা নেই। অন্যদিকে বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের কিছু সংসদ সদস্য বিচারপতিদের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে অভিসংশনের (ওসঢ়বধপযসবহঃ) বিধান করার পক্ষপাতী। যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ভারতেও এ প্রথা রয়েছে। প্রশ্ন হলো, ১৯৭২-এর সংবিধানে অভিসংশনের কোনো বিধান ছিল না, কিন্তু এখন কেন? বিচারপতিদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিদ্যমান সংবিধানে বিধান রয়েছে। তাহলে কি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি বিলুপ্ত হবে। যদি হয়, তাহলে মূল সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ক্ষুণ্ন হবে না। যদি হয়, তাহলে কি উচ্চতর আদালত নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকবেন?

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

No comments

Powered by Blogger.