যুদ্ধ ও শান্তি-চিরস্থায়ী যুদ্ধের যুগ by জন পিলজার

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংবাদ শুনুন। আফ্রিকায় আক্রমণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ঢুকে পড়েছে সোমালিয়ায়। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে তাদের যুদ্ধক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে ইয়েমেনে আর এখন হর্ন অব আফ্রিকায়। ইরান আক্রমণের প্রস্তুতি চলছে।


এরই অংশ হিসেবে ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে আনা হচ্ছে ভূগর্ভের গভীরে ঢুকে বা মজবুত তল ভেদ করে অনেক গভীরে গিয়ে বিস্ফোরণক্ষম বোমা (bunker-buster)।
গাজায় আমেরিকার সরবরাহকৃত ভূগর্ভস্থ দেয়ালের পেছনে গাজার অসুস্থ, পরিত্যক্ত জনগণ চাপা পড়ছে। এদের বেশির ভাগই শিশু। এই দেয়ালের উদ্দেশ্য আবারও অন্যায় দখল কায়েম করা। ল্যাটিন আমেরিকায় কলম্বিয়ার জমিনে সাতটি সামরিক ঘাঁটির বন্দোবস্ত করে নিয়েছে ওবামা প্রশাসন। ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর ও প্যারাগুয়ের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রিয় সরকারগুলোর শক্তিক্ষয়ের যুদ্ধে লিপ্ত করার জন্য এই ঘাঁটিগুলো তাদের দরকার ছিল। ইত্যবসরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিরক্ষা’মন্ত্রী রবার্ট গেটস অভিযোগ করছেন, ‘সাধারণ [ইউরোপীয়] জনগণ ও রাজনীতিক শ্রেণী’ যুদ্ধের এতটাই বিরোধী যে তারা শান্তির পথে ‘প্রতিবন্ধক’।
আমেরিকার এক জেনারেলের মতে, আফগানিস্তানে আক্রমণ যতটা না বাস্তব যুদ্ধ, তার অধিক ‘মস্তিষ্কের যুদ্ধ’। এমনিভাবে তালেবানের ‘কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো’ থেকে সম্প্রতি ‘মারজাহ নগর মুক্ত’ করাও পুরোপুরি হলিউডি কায়দায় সত্য উৎপাদন। মারজাহ কোনো নগর নয়; সেখানে তালেবানের কোনো কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। মুক্তিদাতা এই বীরেরা সচরাচর যেমন বেসামরিক ব্যক্তিদের হত্যা করে, তেমনি এখানেও করেছে। অথচ যেটা বলা হয়েছে তা পুরোপুরি বানোয়াট। এই মস্তিষ্কের যুদ্ধের উদ্দেশ্য স্বদেশে বানোয়াট সংবাদ পৌঁছে দেওয়া; একটি ব্যর্থ ঔপনিবেশিক অভিযান যেন মনে হয় যথার্থ ও দেশপ্রেমাত্মক, যেন মনে হয় দ্য হার্ট লকারই বাস্তব।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রগুলোর জন্য বহু দূরের তালেবান বা অন্য কোনো অন্তর্মুখী উপজাতীয় গোষ্ঠী হুমকি নয়, বরং নিজ দেশের নাগরিকদের যুদ্ধবিরোধী প্রবৃত্তি বড় হুমকি। গত বছরের জানুয়ারি মাসে গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণের প্রতিবাদকারী অসংখ্য তরুণের ওপর যে কঠোর ও নির্মম দণ্ডাদেশ দেওয়া হলো, তা থেকেও বিষয়টা স্পষ্ট হচ্ছে। কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে বেসামরিক পুলিশ ঘিরে রেখেছিল। বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর যারা প্রথমবারের মতো আইন অমান্য করেছে, তাদেরও অত্যন্ত লঘু অপরাধে দেওয়া হয় আড়াই বছরের কারাদণ্ড। এই লঘু অপরাধে সাধারণত কোনো বিচারিক দণ্ডাদেশ দেওয়া হয় না। অবৈধ যুদ্ধের প্রকৃত চেহারা জনসম্মুখে প্রকাশ করে দেওয়া গুরুতর ভিন্নমত এখন আটলান্টিকের দুই পারেই গুরুতর অপরাধে পরিণত হয়েছে।
অন্যান্য উচ্চতর মানবিক জায়গায় নীরবতা এই নৈতিক প্রহসনের অনুমোদন দেয়। শিল্প, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও আইন, উদারনৈতিক অভিজাতবর্গ—সবখানে নিস্পৃহতা দেখা যাচ্ছে। নিস্পৃহতার বিষয়ে নানা গোঁজামিল তাঁরা দিয়ে যাচ্ছেন। হেরল্ড পিন্টার মারা যাওয়ার পর ব্রিটেনের স্বনামধন্য লেখক, শিল্পী ও আইনজীবীদের একটি তালিকা করার চেষ্টা করুন; যাদের আদর্শকে ‘বাজার’ হজম করে ফেলে না বা সেলিব্রেটি প্রতিচ্ছবি যাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলে না। এই তালিকায় এমন কেউ কি আছেন, যিনি ২০ বছর ধরে ইরাকে একের পর এক প্রাণঘাতী অবরোধ ও হামলার ফলে যে হলোকাস্ট হয়েছে সে বিষয়ে কথা বলছেন? এই অবরোধ আর হামলা ছিল ইচ্ছাকৃত। ১৯৯১ সালের ২২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিআইএ বিস্তারিত বর্ণনাসহ তাদের পূর্বাভাসে দেখিয়েছিল, কেমন করে একটি অবরোধ ইরাকে নির্মল পানিব্যবস্থাকে নিয়মতান্ত্রিক পথে ধ্বংস করবে এবং এর ফলে রোগজীবাণু ‘যদি মহামারি আকারে ছড়িয়ে না-ও পড়ে, তবু রোগের বিস্তার অনেক বেড়ে যাবে।’ তাই ইরাকি জনগণের নির্মল পানিব্যবস্থা নির্মূল করতে যুক্তরাষ্ট্র নেমে পড়ে। ইরাকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় পাঁচ লাখ শিশুর মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে নির্মল পানিব্যবস্থা ভেঙে পড়াকে উল্লেখ করেছে ইউনিসেফ। কিন্তু এই উগ্রবাদিতার স্পষ্টত কোনো নাম নেই।
আমেরিকান সাহিত্যিক নরম্যান মেইলার একবার বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও আধিপত্যের সীমাহীন অন্বেষায় ‘ফ্যাসিস্ট-পূর্ব যুগে’ ঢুকে পড়েছে। মেইলারের বক্তব্যে মনে হয়েছে সংশয় রয়ে গেছে, যেন তিনি এমন বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, যা তিনি নিজেও স্পষ্ট সংজ্ঞায়িত করতে পারছেন না। ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি এখানে যথার্থ হয় না। কারণ এটি সামনে টেনে আনে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, মানসপটে আবারও ভেসে ওঠে জার্মানি ও ইতালীয় দমননীতির স্মৃতিচিহ্ন। অন্যদিকে, আমেরিকার কর্তৃত্বপরায়ণতা যতটা না নিয়ন্ত্রণ আরোপের দমনমূলক পদ্ধতির বিষয়ে উৎসাহী, তার চেয়ে বরং সম্মতির মাধ্যমে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর পদ্ধতিতে অধিকতর আগ্রহী।
এই হলো আমেরিকানিজম, এটি একমাত্র লুণ্ঠনপরায়ণ মতাদর্শ যা নিজেকে মতাদর্শ বলে মানতে নারাজ। সর্বোত্কৃষ্ট গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে স্বৈরতন্ত্রী চরিত্রের করপোরেশনগুলোর ও রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্র হয়ে ওঠা সামরিক বাহিনীর উত্থান এবং বিপথগামী আর বোকা বানানোর জনসংস্কৃতির দিশা আগে কোনো দিন পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ইরাকে অবরোধ চলার সময়ে সেখানে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডেনিস হ্যালিডে ও হান্স ফন স্পনেক নিশ্চিত ইরাকে তাঁরা গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁরা কোনো গ্যাস চেম্বার দেখেননি সত্যি; কিন্তু অলক্ষে, অঘোষিতভাবে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আলোকপ্রাপ্তির অগ্রযাত্রা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েই এগিয়ে চলেছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
নিউ স্টেটসম্যান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
জন পিলজার: লন্ডনভিত্তিক অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা।

No comments

Powered by Blogger.