স্বাধীনতার সূর্যোদয় ১৯৭১ by ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

মধ্যরাতের অন্ধকারে জানালা দিয়ে দেখেছি স্লটারিং মেশিনে একের পর এক মানুষ হত্যা আর চাপা আর্তনাদ। আমি দেখেছি, খুলনার গল্লামারী রেডিও স্টেশনের সামনে খালের দু'পাশে হাজার হাজার তরতাজা লাশ। একতলা বাড়িসমান লক্ষজনের মাথার খুলি। এই নয় মাসের তাণ্ডবলীলা।

মাত্র নয় মাসে এ দেশের রাজাকার বাহিনীর সহায়তা ছাড়া এত হত্যাকাণ্ড কখনোই সম্ভব ছিল না। কেননা, পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্রুতলয়ে এই নৃশংস নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। কিন্তু এ দেশে মানচিত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য এ দেশের গোলাম আযম-নিজামী-সাঈদী-মুজাহিদরাই দায়ী। তাই এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচারকাজ অত্যন্ত কঠোরভাবে হোক। আমরা আশাবাদী


১৯৭১! মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি বলিষ্ঠ অধ্যায়। এই যুদ্ধে আমরা যারা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছি, তাদের সবারই পুনর্জন্ম লাভ হয়েছে। আমি তখন ২৩ বছর বয়সের তরুণী। তিন সন্তানের জননী। ঘর-গৃহস্থালি আর একটি জুট মিলে ঋৎড়হঃ ফবংশ পষবৎশ-এর চাকরি করি। রাজনৈতিক পরিবারে থাকলেও আমি এসবের কিছুই বুঝতে পারতাম না। মা রওশন হাসিনা আওয়ামী লীগ অন্তঃপ্রাণ। নমিনেশনের জন্য ঢাকা-যশোর-খুলনা আসা-যাওয়া করছেন। তার কাছে যেটুকু শুনতে পেতাম ততটুকুই আমার রাজনৈতিক জ্ঞান। তবে স্বদেশের প্রতি যে ভালোবাসা সেটা অকথিত ভাষা, যা আমার প্রাণেমনে সঞ্চিত চিরজাগ্রত। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান দুই দেশ, দুই গোষ্ঠী, দুই ভাষা। খুব জোর করেই বাঙালির ওপর উর্দুওয়ালাদের চাপ পড়েছিল। আমাদের সংস্কৃতি ওদের সংস্কৃতি_ সম্পূর্ণ ভিন্ন। না বুঝে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে হতো 'পাক সার জমিন সাদ বাদ'। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে স্কুল-পাঠশালার শিশু-কিশোররা গান করে 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'। ভাবতে বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে। আমরা স্বাধীন বাংলার গান গাইছি। ৩০ লাখ মানুষের আত্মদানে হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সূর্যোদয়। নিরস্ত্র বাঙালি পাকিস্তানের সমরাস্ত্রকে পদদলিত করে জয় করে এনেছিল বাংলাদেশের গৌরবকে।
রবীন্দ্রনাথের সুর এবং সহায়তা_ সব মিলে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। কিন্তু ইদানীং অনেক স্কুলে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয় না। বিষয়টি দেখার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাই।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ক্ষোভ তুষের আগুনের মতো জ্বলছিল। '৭০ সালের নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন নিরঙ্কুশ ভোটে জয় লাভ করলেন, তখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের রেসকোর্সের ভাষণ সমগ্র বাঙালিকে একত্র করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ভাষণ আর কখনোই হয়নি। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের বক্তৃতাও এভাবে সমগ্র জাতিকে একত্র করতে পারেনি। জাতির জীবনে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের দিনটি স্মরণীয়। নিরস্ত্র বাঙালি লাঠিসোটা নিয়ে প্রস্তুত। এই উর্দু শাসন থেকে বাঙালি জাতিকে বাঁচাতেই হবে। স্বদেশের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রস্তুত। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব বাঙালি জাতির পিতার এ ভাষণে শক্তি লাভ করে। ২৫ মার্চ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (রূপসী বাংলা) যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর আলোচনা ব্যর্থ হয়, তখন অতর্কিত হামলায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালির ওপর আক্রমণ করে। সারাদেশে গুলি চলে।
আমি চাকরিজীবী গৃহবধূ খালিশপুর কবরস্থানের কাছে থাকি। ব্যক্তিগত জীবনে নানা কারণে সেদিন আমি ওই একতলা বাড়িতে একেবারেই একা হয়ে পড়েছিলাম। ২৪ মার্চ সারারাত একা ঘরে দুরু দুরু প্রাণে ভয়ে কেঁপেছি। চারদিকে আগুন আর আগুন। এক পর্যায়ে আমি বোধহয় ওই রাতেই অগি্নভস্ম হব বলে মনে হয়েছিল। বাইরে ফাল্গুনের উদাস বাতাস। আমের মঞ্জরি। এ শোভা দুঃস্বপ্ন। ছুঁয়ে দেখারও অবকাশ নেই। জীবনভয়ে পলায়নপর সেই '৭১ ভীষণ ভয়ঙ্কর, যা বর্ণনার ভাষা আমার নেই। ২৫ মার্চ যশোর থেকে ছোট ভাইবোন নিয়ে আমার মা এলেন। আমার পারিবারিক বন্ধু যিনি আজকে আমার স্বামী (বিয়ার ভাই) সেদিন উপস্থিত ছিলেন। কেননা, তার বাড়িটা পরের রাস্তায় ছিল। কিন্তু সামাজিক কঠোর শাসনের কাছে আমরা কেউই মুক্ত ছিলাম না। তাই কারও বাড়িতে কারণ ছাড়া কোনো পুরুষের প্রবেশ দেখলে আশপাশের লোকজন একত্র হয়ে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিত। এ আতঙ্কে সহজে কোনো নারীর একা অবস্থানকালে তার বাড়িতে কোনো পুরুষ ঢুকতে চাইত না। পরিস্থিতির যখন মুহুর্মুহু অবনতি ঘটতে লাগল, তখন আমরা বিভিন্নভাবে পালাতে শুরু করি। কারও বাড়িতে ঠাঁই মিলছে না। যেখানে যাচ্ছি, সে বাড়ি থেকে দু'একজন কেউ না কেউ হত্যার শিকার হয়েছেন। আতঙ্ক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে শেলিং চলছে। উপায় না দেখে মাকে নিয়ে আমি খালিশপুর গোয়ালখালী গেটের কাছে কবরস্থানের সামনে লোয়ার যশোর রোড নজরে পড়ে, যে বাড়ি থেকে কয়েকদিন আগে অর্থাৎ ২৮ মার্চ আমরা পালিয়ে এসেছিলাম, সেখানেই ফিরে গেলাম। এ ক'দিনে পথে পথে পালিয়ে বেড়িয়ে আসার পর চেহারা ছারখার হয়েছে।
এসে দেখতে পাই, মধ্যবিত্ত সংসারে যা কিছু ছিল তার সবই লুট হয়েছে। কেরোসিনের চুলার পাশে কিছু চাল একটি ঠোঙায় রাখা ছিল। আলু-ডাল-পেঁয়াজ-লবণ একত্রে ধুয়ে মা একসঙ্গে চড়িয়ে দিলেন। তখন দেখি বাড়ির সামনের রাস্তায় দুটি আর্মিবোঝাই ট্রাক ধীরগতিতে ঘোরাঘুরি করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখতে পেলাম আমাদের বাড়ির সামনের বর্ধিষ্ণু পরিবার মুন্সীবাড়িতে কিছু আর্মি অফিসার ও রাজাকার মতিউল্লা গুণ্ডা ঢুকে ১৪ জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। সেদিন ছিল ৭ এপ্রিল, দুপুর ১টা। আমরা জানালা-দরজা বন্ধ করে দিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে থাকি। হত্যাযজ্ঞ শেষ করে ওরা আমাদের বাড়ির চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। আমার পারিবারিক বন্ধু বিয়ার ভাই আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। তিনি পরিস্থিতি বুঝে গেলেন। কেননা, তাকে দেশহীন উদ্বাস্তু সম্প্রদায় অবাঙালিরা বর্ণমালার প্রথম অক্ষর থেকেই হত্যার তালিকায় রেখেছিল। কারণ বিয়ার ভাইয়ের পুরো নাম ছিল আহসান উল্লাহ আহমেদ। বিয়ার গোপনে অর্থ জোগাড় করে বোমা তৈরি করে স্বেচ্ছাসেবকদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। গাছ কেটে সাত দিন ধরে লোয়ার রোড অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। এসব বিহারিরা দেখেছে এবং তার নাম হত্যার তালিকায় রাখে। এভাবেই বহু হত্যাযজ্ঞ দেখেছি। নিজেও ঈড়হপবহঃৎধঃরড়হ ঈধসঢ়-এ অবরুদ্ধ থেকে নির্যাতিত হয়েছি। নয় মাসে পলে পলে নির্যাতিত হয়েছি এবং খুন ও নির্যাতিত হতে দেখেছি বহু মা-বোনকে। শহীদ মিনারে মা-বোনের শিরশ্ছেদ করা মাথা ঝোলানো দেখেছি। মধ্যরাতের অন্ধকারে জানালা দিয়ে দেখেছি স্লটারিং মেশিনে একের পর এক মানুষ হত্যা আর চাপা আর্তনাদ। আমি দেখেছি, খুলনার গল্লামারী রেডিও স্টেশনের সামনে খালের দু'পাশে হাজার হাজার তরতাজা লাশ। একতলা বাড়িসমান লক্ষজনের মাথার খুলি। এই নয় মাসের তাণ্ডবলীলা। মাত্র নয় মাসে এ দেশের রাজাকার বাহিনীর সহায়তা ছাড়া এত হত্যাকাণ্ড কখনোই সম্ভব ছিল না। কেননা, পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্রুতলয়ে এই নৃশংস নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। কিন্তু এ দেশে মানচিত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য এ দেশের গোলাম আযম-নিজামী-সাঈদী-মুজাহিদরাই দায়ী। তাই এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচারকাজ অত্যন্ত কঠোরভাবে হোক। আমরা আশাবাদী। অপেক্ষমাণ। কল্যাণ হোক বিশ্বমানবের। কল্যাণ হোক মানব সমাজের। কল্যাণ হোক বাঙালির।

স ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী
ভাস্কর_ মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী

No comments

Powered by Blogger.