নিত্যজাতম্-জনতা জনার্দন, নাকি জনতা জঞ্জাল by মহসীন হাবিব

যে জাতি আগেই সভ্যতা অর্জন করেছে, তাকে অস্বীকার না করে বরং অনুসরণ করাই শ্রেয়। অন্যের শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা গ্রহণ করার মধ্যে দোষের কিছু নেই; বরং দোষ আছে নিজের প্রতি অন্ধ আস্থা, অন্যের ভালো চর্চাকে সন্দেহের চোখে দেখা এবং গ্রহণ না করার মধ্যে।
ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশকে ছলেবলে দখল করে উপনিবেশ বানিয়েছিল। সেটা সত্যি। তাই আজও আমরা ব্রিটেনকে শোষক বলে গালি দিই। কিন্তু এ ব্রিটিশদের যে ভালোমানুষি আছে, ছিল এবং এখনো আছে, তা একেবারেই গ্রহণ করতে পারলাম না। জোর করে নীল চাষ করানোর কাহিনী, ময়ূর সিংহাসন নিয়ে যাওয়ার সেই সত্য কাহিনী আমাদের শিশুরাও জানে। কিন্তু জানে না এই ব্রিটিশদের অনেক অনুকরণীয় কাহিনী। আমরা চোখ বুজে থেকে, কান বন্ধ রেখে সেসব এড়িয়ে যাই। ২০০ বছর শাসন করে ইংরেজ আমাদের যে সুশিক্ষা দিয়েছে, এর একটিও আমরা গ্রহণ করেছি বলে কেউ বলতে পারে না; কিন্তু কুশিক্ষা যা দিয়ে গেছে, এর একটিও আমরা মাটিতে পড়তে দিইনি। যাক, আমরা ইংরেজের গুণকীর্তন করতে বসিনি। বসেছি 'স্বাধীন', 'আধুনিক', 'ডিজিটাল' বাংলাদেশ সভ্যতা থেকে কতটা দূরে অবস্থান করছে, তার একটি সরল অঙ্ক কষতে।
১৯১০ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন ব্যারন লর্ড হার্ডিঞ্জ অব পেনহার্স্ট। আমরা তাঁকে লর্ড হার্ডিঞ্জ বলেই চিনি। তাঁর সময়টা ছিল ভারত উপমহাদেশের জন্য ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছিল হার্ডিঞ্জের সময়, কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল এরই একটি নোট পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে। রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত সফর করেছিলেন হার্ডিঞ্জ ভাইসরয় থাকাকালে। সর্বোপরি এই লর্ড হার্ডিঞ্জ ভাইসরয় থাকতে পদ্মা সেতু, থুক্কু, মাফ করবেন, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তৈরির মতো অসাধ্য সাধিত হয়েছিল। (হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণকালে ইংরেজ কর্মকর্তারা যখন দাঁড়িয়ে কাজ তদারক করতেন, তখন দেশীয় জমিদাররা বজরা নিয়ে সেই ব্রিজ তৈরির কাজ দেখতে যেতেন। তাঁদের সঙ্গে থাকত বাঈজি আর মদের বোতল। এ সত্য দয়া করে কেউ অস্বীকার করবেন না।)
এই হার্ডিঞ্জ 'পার্মানেন্ট আন্ডার সেক্রেটারি অ্যাট ফরেন অফিস' হিসেবে ব্রিটেনের রাজনীতিতেও ছিলেন অতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী হার্বার্ট হেনরি অ্যাসকুইথ তাঁকে ভারতের ভাইসরয় করে পাঠাতে চাইলে দুবার রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড বাধা দিয়েছিলেন। তিনি চাইতেন, হার্ডিঞ্জ তাঁর কাছাকাছি থাকুক। যা-ই হোক, সপ্তম এডওয়ার্ডের মৃত্যুর পর অ্যাসকুইথ আবার তাঁকে ভাইসরয় করার প্রস্তাব দেন। এবার আর গদিনসীন রাজা পঞ্চম জর্জ নিষেধ করলেন না।
হার্ডিঞ্জ ১৯১০ সালের নভেম্বরে ভারতবর্ষের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। তিনি কেন্ট শহরের ট্রামস্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ট্রামে চড়ে বন্দরে যেতে হবে। তখন ব্রিটেনে ইলেকট্রিক ট্রাম চলাচল করতে শুরু করেছে বছর বিশেক হলো। ব্রিটেনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আত্মীয়স্বজন, এলিট শ্রেণী স্টেশনে এসেছে হার্ডিঞ্জকে বিদায় জানাতে। তিনি সবার সঙ্গে করমর্দন করতে করতে দেখা গেল ট্রাম ছেড়ে দিয়েছে। কারণ ট্রামের নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে গেছে। ট্রাম তো আর প্লেন বা ট্রেন নয়- মাত্র একটি বাসের সমানসংখ্যক যাত্রী হয়তো থাকে। সবাই দৌড়ে গিয়ে ট্রামটিকে কোনোক্রমে থামিয়ে তাড়াহুড়া করে হার্ডিঞ্জকে তুলে দিল। এটি কোনো গসিপ নয়। হার্ডিঞ্জ তাঁর স্মৃতিকথা 'মাই ইন্ডিয়ান ইয়ার্স ১৯১০-১৬' গ্রন্থেই তা লিখেছেন।
এ ঘটনার জন্য ট্রামচালককে কোনো তিরস্কার শুনতে হয়নি। কেউ চালকের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা সাজিয়ে হয়রানি করতে চেষ্টা করেনি; বরং ১০০ বছর আগে ব্রিটেন কতটা নিয়মনীতি মেনে চলা এবং সময়ানুবর্তিতার ব্যাপারে সচেতন ছিল, এ ঘটনা তারই উদাহরণ। আইনের শাসন ও সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থার এ চর্চা ব্রিটেনে চলে আসছে আধুনিক ব্রিটেনের ইতিহাসের শুরু থেকেই।
হার্ডিঞ্জের ১০০ বছর পর ব্রিটেন আত্মতুষ্টি নিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকেনি। সভ্য রাজনৈতিক চর্চায় আরো অনেক এগিয়ে সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ঝড় হয়েছে। সে বন্যা বাংলাদেশের বন্যার তুলনায় নেহাত নদীর কূল ছাপিয়ে যাওয়া। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সেই বন্যায় দেড় হাজার বাড়িতে পানি উঠেছিল। বিশেষ করে, বাড়ির উঠানে দুই-তিন ফুট পানি উঠেছিল। চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যার পরোক্ষ কারণ ছিল এই ঝড় ও বন্যা। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন অতি সাধারণ মানুষদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। ঘরে ঘরে ঢুকে হাউস ইনস্যুরেন্সের অবস্থা জানতে চেয়েছেন। ঘরের মানুষের মতো ধৈর্য নিয়ে বন্যার অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন। এমনকি পোষা কুকুর-বিড়ালের খোঁজখবরও নিয়েছেন। উচ্চশিক্ষিত এই প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ছাত্রজীবনে অসাধারণ মেধাবী ছিলেন। তিনি এখনো বাইসাইকেল চালাতে খুব পছন্দ করেন। ব্রিটেনে যে চোর-বাটপার নেই, তা কিন্তু নয়। ২০০৯ সালে দুই দফা তাঁর বাইসাইকেল চুরি হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে ক্যামেরন অতি সাধারণ মানুষের মতো একটি পাবে ঢুকে চা পান করেছেন। দোকানদার ক্যামরনকে চিনতে পারেননি। পরে সাংবাদিকদের কাছে সেই পাবের মালিক বলেছেন, 'সরি, উনি ডেভিড ক্যামেরন, আমি চিনতে পারিনি।' এসব হলো সভ্য দেশের রাজনীতিবিদদের অসাধারণ সাধারণত্ব। অবশ্য ১০০ বছরে আমাদেরও একটি বড় পরিবর্তন হয়েছে, অস্বীকার করার উপায় নেই। সেটা হলো, আমাদের এখন আর বজরা নেই। দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন না হলেও বজরার জায়গা দখল করে নিয়েছে লেক্সাস, বিএমডাব্লিউসহ বিশ্বের দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি। তবে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখতে যাওয়া সেই মানুষগুলো কিন্তু এখনো দিব্যি আছে। বাহন পরিবর্তন হয়েছে মাত্র।
মাঝেমধ্যেই রাস্তায় যাতায়াতের সময় কোনো একটি মোড়ে আটকে পড়ি। দেখা যায়, চারপাশের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফাঁকা রাস্তায় পুলিশ শুধু ছোটাছুটি করছে- কেউ যাতে রাস্তার ওপর চলে না আসে। দীর্ঘ সময়। এমনিতেই যানজটে চরম নাজেহাল, এরপর এভাবে আটকে থাকা। কারো বুঝতে অসুবিধা নেই যে ভিভিআইপি যাবেন, তাই জনগণ নামক জঞ্জাল থেকে রাস্তাটি পরিষ্কার করে রাখা। চারদিকে তাকালে দেখা যায়, ক্লান্ত মানুষগুলো বাসে ঝুলে ঘামছে। দীর্ঘক্ষণ পর দ্রুত ধেয়ে আসে গাড়িবহর। ফাঁকা, নির্জন রাস্তা দিয়ে শোঁ শোঁ করে বেরিয়ে যান যাঁরা, তাঁদের এ দেশের মানুষ বলে মনে হয় না। মনে হয় এলিয়েন! ফরাসি বিপ্লবের সময় রাজমহীষী যেমন জানতেন না ক্ষুধার্ত জনগণ কেক রেখে কেন রুটি খেতে চায়? সম্ভবত এঁরাও জানেন না, এমন ফাঁকা, প্রশস্ত রাস্তা থাকতে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে কেন মানুষ ঝুলে থাকে? মনে মনে তখন ভাবি, নিরাপত্তা দরকার তাঁর, যিনি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। আমাদের ঘাম ঝরিয়ে যাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, তাঁরা ঢাকা শহরের যানজট নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তায় পড়েন না। যদি পড়তেন, তাহলে এক মাসের মধ্যে এ সড়ককে যানজটমুক্ত করতে পারতেন। শুধু কয়েকটি অফিস ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দিলে যানবাহনের চাকা সাবলীলভাবে চলতে পারে। এই ভিভিআইপিদের হুস করে বেরিয়ে যাওয়া দেখে মনে পড়ে, ইকুয়েটেরিয়াল গিনির প্রেসিডেন্ট থিওডোরো অবিয়াং গিইমা বাসোগোর কথা, যিনি রাষ্ট্রের সব সম্পদ প্রায় একা দখল করে ক্ষুধার্ত মানুষের মধ্য দিয়ে একদল উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ভাড়া করা মিসরীয় বডিগার্ড পরিবেষ্টিত হয়ে ছুটে যান প্রাসাদের দিকে।
আমরা দেখতে পাই, উপনিবেশিক শাসনামলের এলিট শ্রেণীর চরিত্র স্বাধীন বাংলাদেশে পুরোদস্তুর বহাল রয়েছে। নেই আইনের শাসন, সত্যিকার গণতান্ত্রিক চেতনা। আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের শাসন। শুধু ভোটগ্রহণ করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া নয়। দুই বড় দলের মধ্যে আবার শুরু হয়েছে জনগণকে সত্য-মিথ্যা বুঝিয়ে ভোট দখলের প্রতিযোগিতা। দেশ রাজনীতিবিদরাই পরিচালনা করুন। কিন্তু আমরা চাই, 'জনতা জনার্দন'- এই মানসিকতা প্রতিষ্ঠিত করে তাঁরা দেশ শাসন করুন, জনতাকে জঞ্জাল ভেবে নয়। তাহলেই আমরা সভ্য, গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করতে পারব। নচেৎ কোনো দিনও সত্যিকার মুক্তি আসবে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। ভোটের গণতন্ত্রের নামে চলতে থাকবে স্বৈরশাসন, যা স্বৈরাচারের পতনের পর থেকে গণতন্ত্রের নামে অব্যাহত রয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক
mohshinhabib@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.