রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো সুযোগ আছে কি? by বিভুরঞ্জন সরকার

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ ডিসেম্বর, ২০১৩। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করার সময় ৫ ও ৬ ডিসেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৩ ডিসেম্বর। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ আরও কিছু ছোট রাজনৈতিক দল এই তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে। বলা হচ্ছে, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে নির্বাচন ইস্যুতে কোনো সমঝোতা হওয়ার আগেই এই তফসিল ঘোষণা করায় দেশের রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়বে। বিএনপিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার পরিকল্পনা থেকেই এভাবে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা হলে নির্বাচনের তফসিল পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, সমঝোতা প্রতিষ্ঠার আদৌ কোনো সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে কি? বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য কিছু নেপথ্য উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো তথ্য কারও কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছে। অবশ্য এ আন্দোলনের কারণে সরকারের অবস্থান বা মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি, হবে এমন কোনো সম্ভাবনাও দেখা যায় না। অথচ বিরোধী দল বারবার বলে আসছে, আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর এখন অনেকেই আর মনে করছেন না বিএনপি দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে। তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ২৬ নভেম্বর থেকে সারা দেশে ৭১ ঘণ্টার রাজপথ, রেলপথ, নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি পালন করেছে। ব্যাপক সহিংসতা ও নাশকতার মধ্য দিয়ে এই অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। অবরোধের সময় কুমিল্লায় এক বিজিবি সদস্যসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ২০ জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে যেমন আওয়ামী লীগ সমর্থক আছেন, তেমনি বিএনপি-জামায়াত সমর্থকও আছেন, আছেন দল করেন না এমন সাধারণ মানুষও। অবরোধের সময় সারা দেশ ‘অচল’ করা সম্ভব না হলেও রেল যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত করতে বেশ কয়েকটি স্থানে রেললাইনে অগ্নিসংযোগ, ফিসপ্লেট খুলে ফেলার মতো নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। কয়েক জায়গায় রেলের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও আহত হয়েছেন অনেকেই। অবরোধের সময় সড়ক ও রেলপথে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ না করে যে রকম হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়েছেন তাতে যাত্রী ছাড়াও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের নিরাপদ চলাচলে এভাবে বিঘ্ন ঘটিয়ে বিরোধী দল যে আন্দোলন করছে, তার প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন আছে কি-না সেটা অবশ্য আন্দোলনকারীরা একেবারেই বিবেচনায় নিচ্ছেন না। বরং এটাই বলা হচ্ছে যে, বিরোধী দলের দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা বহাল থাকলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। এরই মধ্যে যে হরতাল-অবরোধ হয়েছে, তাতে যে পরিমাণ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, আরও ‘কঠোর’ কর্মসূচি দিলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে তা ভাবলে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। মানুষ এ ধরনের আন্দোলন চায় না। চাপিয়ে দেয়া আন্দোলনের মাধ্যমে বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করতে চায় সে প্রশ্ন দেখা দেয়াই স্বাভাবিক।
সন্ত্রাস-সহিংসতা চালিয়ে রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যতিব্যস্ত রাখা যায় কিন্তু পর্যুদস্ত কিংবা পরাজিত করা যায় না। তাই আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালিয়ে বিএনপি তাদের জনসমর্থন ধরে রাখতে পারবে বলে যদি মনে করে থাকে, তাহলে তাদের এই মনে করা খুব দ্রুতই ভুল বলে প্রমাণিত হতে পারে। নির্বাচনে অংশ নেয়াই বরং বিএনপির জন্য অধিক লাভজনক হতে পারে। বিএনপিকে বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চায় বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা যদি সত্যও হয়ে থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের এই পরিকল্পনা ব্যর্থ করার জন্য নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোনো বিকল্প আছে কি? বিএনপি এবং অন্যসব রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ পাবে না। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করলে সেই নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, এটা একেবারেই অনুমাননির্ভর কথা। নির্বাচনে সব দল অংশ নিলে যদি নির্বাচনের ফলাফল ছিনতাই করার অপচেষ্টা চালানো হয় তাহলে তখন দেশবাসীকে নিয়ে আন্দোলন করা যত সহজ হবে, এখন কিন্তু তত সহজ হচ্ছে না। এখন মানুষের সামনে কারচুপির প্রমাণ নেই। তাই বিরোধী দলের আন্দোলনে মানুষ সেভাবে সাড়া দিচ্ছে না। কিন্তু মানুষ যখন দেখবে তারা যে প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে সে প্রার্থীর বদলে অন্য প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হচ্ছে, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রতিবাদী হয়ে উঠবে। তখন সমগ্র পরিস্থিতিই যাবে বিরোধী দলের অনুকূলে।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে না বলে যে প্রচারণা চালানো হয় তার আরেকটি ত্র“টির দিক হল, সরকার নির্বাচন পরিচালনা করে না। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সে জন্যই একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার চেয়ে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারেই অধিক গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিরোধী দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যতটা সময় ও শক্তি ব্যয় করেছে, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে তার তিলাংশও করেনি। বিরোধী দলের আন্দোলন সাফল্যের মুখ দেখতে ব্যর্থ হওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে। প্রসঙ্গত এ প্রশ্নও অনেকের মনেই দেখা দিচ্ছে যে, দলীয় সমর্থকরা খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন’ নেত্রী বলে সম্বোধন করলেও তার নেতৃত্বে দেশে কোনো সফল গণআন্দোলনের নজির আছে কি? বিএনপি নেতারা নিজেরা যাই দাবি করুন না কেন, বাস্তব এটাই যে তারা কোনো সফল গণআন্দোলনের রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারেননি। এই বাস্তবতা মনে রেখে বিএনপি নেতৃত্ব যদি নির্বাচনের প্রশ্নে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সুফল ঘরে তোলার সুযোগ হয়তো তারা পেতেও পারেন। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে তাদের ‘মুখ’ থাকবে না বলে যদি মনে করা হয় তাহলে ভুল হবে। রাজনীতিতে পরিণতিটাই আসল কথা। নির্বাচন বর্জন করে যদি ক্ষতি বেশি হয়, আর অংশ নিয়ে যদি লাভ বেশি হয় তাহলে অংশ নেয়াটাই হবে বিচক্ষণতার পরিচায়ক। বিএনপি নেতৃত্বের কাছ থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশের মানুষ বিচক্ষণতাই প্রত্যাশা করে। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আওয়ামী লীগের গায়ে একটি ‘একতরফা’ নির্বাচনের কলংকচিহ্ন এঁটে দিয়ে বিএনপি যে লাভের আশা এখন করছে, নির্বাচনে যদি শেষ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং শতকরা ৫০-৫৫ ভাগ ভোটার ভোট দেন, তাহলে কিন্তু বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বড় লোকসান গুনতে হতে পারে।
দুই
২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন দেশে বিশিষ্ট ছয় নাগরিক। তারা হলেন- ড. কামাল হোসেন, ড. আকবর আলি খান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. বদিউল আলম মজুমদার, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এবং ড. শাহদীন মালিক। তারা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন, দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে দেশবাসী গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা দেশের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে (নির্দিষ্ট সময়ে কোনো কারণে নির্বাচন না হলেও যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে সে কথা কি তারা বলেছেন?)। উৎকণ্ঠিত ছয় বিশিষ্ট নাগরিককে রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালনে তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে থেকেই তিনি প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রপতির কাছে এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের একটি প্রতিনিধি দলও সাক্ষাৎ করে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে তার উদ্যোগ কামনা করেছিলেন। তখনও মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি জাতির অভিভাবক। তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকলেও সংকট সমাধানে তার একটি নৈতিক ক্ষমতা আছে বলে অনেকেই মনে করেন। সম্ভবত তার নৈতিক ক্ষমতার ওপর আস্থা রেখেই দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে ভূমিকা পালনে তার উদ্যোগ প্রত্যাশা করে তার কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়াও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ছুটে গেছেন। কিন্তু প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট এতই প্রবল যে রাষ্ট্রপতির কোনো উদ্যোগ বরফ গলানোর ক্ষেত্রে আদৌ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে মনে করতেও সংশয় জাগে। রাষ্ট্রপতি তার বিবেচনায় যেটা ভালো মনে করবেন, সেটা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কি মানবে? রাষ্ট্রপতি যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরামর্শ দেন, তাহলে বিএনপি কি নির্বাচনে অংশ নেবে? আবার বিরোধী দলের মুখ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রপতি যদি শেখ হাসিনাকে ‘সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের’ পরামর্শ দেন, সেটাও কি এখন আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দুই দল যখন সামান্য ছাড় দিতে আগ্রহী নয়, তখন রাষ্ট্রপতির কাছে ধরনা দিয়ে তাকে উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ জানালে সেটা তার জন্য স্বস্তিদায়ক হয় কি-না এটা সংশ্লিষ্ট সবারই বিবেচনায় রাখা দরকার। রাষ্ট্রপতির মর্যাদা যাতে দেশের মানুষের কাছে ক্ষুণ্ন না হয়, তার প্রতি সবার সম্মান যেন অব্যাহত থাকে সেটা নিশ্চিত করার স্বার্থেই তার কাছে এমন আবদার নিয়ে বারবার যাওয়া উচিত নয়, যে আবদার রক্ষা করার আইনি ক্ষমতা তার নেই। মানুষের মনে কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি হয় এমন কোনো কিছু করা থেকে বিরত থাকা বর্তমান সময়ে খুবই জরুরি।
জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণের একটি লাইন উদ্ধৃত করেই আজকের লেখাটি শেষ করছি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘দেশবাসীর শান্তির জন্য গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে আপনারা সমঝোতায় আসুন। দেশবাসীর কল্যাণের ওপর আর কিছুই প্রাধান্য পেতে পারে না।’
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক, কলাম লেখক

No comments

Powered by Blogger.