নিত্যজাতম্‌-ভেতরের ভিখুটা বেঁচে আছে! by মহসীন হাবিব

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গল্প 'প্রাগৈতিহাসিক'-এর মুখ্য চরিত্র ভিখুর সহজাত প্রবৃত্তি যখন জেগে ওঠে, তখন ন্যায়-অন্যায়, কৃতজ্ঞতা, লজ্জা- সব বোধ উবে যায়। যে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে ঘরে এনে আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে তোলে, তারই স্ত্রীর ওপর ভিখু পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।


সভ্যতার সব জাল ছিন্ন করে মানুষের এই আদিম প্রবৃত্তি কতটা তীব্র হয়ে উঠতে পারে মানিক তাঁর এই গল্পে মুনশিয়ানার সঙ্গে সফলভাবে এঁকে দেখিয়েছেন। মানিক বাবুর এ গল্প সভ্যতার সংজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আধুনিক সভ্যতা দাবি করে, মানুষ তার শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে রুচিবোধ, মননশীলতা, সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ দিয়ে সমাজব্যবস্থায় এনেছে পরিবর্তন। মানুষের ভেতরের পশু প্রবৃত্তিকে জয় করে মানুষ হয়ে উঠেছে পশুর থেকে আলাদা, উন্নত প্রাণী।
কিন্তু চারপাশের ঘটনাবলি সভ্যতার এ সংজ্ঞার সঙ্গে সব সময় খাপ খায় না। প্রাগৈতিহাসিকের ভিখুই বারবার যেন সত্য হয়ে দেখা দিচ্ছে। বরং বারবারই মনে হয়, মানুষ পোশাকি হয়েছে মাত্র। পোশাকের ভেতরের ভিখু যেন আরো পাশবিক হয়ে উঠছে। যাঁরা অতিসাধারণ জীবন যাপন করে, যাঁদের শিক্ষা নেই, অন্ন-বস্ত্রের নিশ্চয়তা নেই তাঁরা সমাজ নিয়ন্ত্রণ করেন না। তাঁদের সমাজের প্রতি দায়িত্বও ভারী নয়। তাঁদের মধ্য থেকে যখন কেউ পশুর মতো আচরণ করে ফেলে, তা সমাজকে তেমন নাড়া দেয় না। কিন্তু শিক্ষিত, দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি যখন একই কাণ্ড করে বসেন, তখন সমাজ নড়ে ওঠে। প্রশ্ন জাগে, মানুষের ভেতরের ভিখু চরিত্র কি তাহলে অনপনেয়? এখন আরো হতাশার সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে, শিক্ষক সম্প্রদায়ের মধ্যে রিপু নিয়ন্ত্রণে অপারগতার প্রবণতা যেন অধিক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের ভিকারুননিসা স্কুলের মতো একটি স্কুলের একজন শিক্ষক যে কাণ্ড ঘটালেন কিছুকাল আগে, তা অতিসাধারণ, শিক্ষাহীন একজন যুবকের জন্য আজ অস্বাভাবিক। ২০ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সল্টলেকে অবস্থিত দ্বিতীয় শাখায় পদার্থবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় একটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যখন ঠাণ্ডা মাথায় একজন ছাত্রীকে কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করতে চান, তাকে আমরা কী বলব? ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রথম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একদল শিক্ষিত, রুচিশীল অবসরপ্রাপ্ত পেশাজীবীর হাত ধরে। অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটিতে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছেন চার শতাধিক ফ্যাকাল্টি মেম্বার। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে ভারী পদে অধিষ্ঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান একজন শিক্ষিকাকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করলেন গত মাসে। তাঁর দায়িত্ব, সামাজিকতা, মানসম্মান সব কিছু পরাজিত হলো তাঁর রিপুর কাছে! একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, এর আগেও একজন শিক্ষিকা তাঁর দ্বারা উত্ত্যক্ত হয়ে (ইভ টিজিং!) চাকরি ছেড়ে বেঁচেছেন। এত ভারী পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির রিপু যদি এত তীব্র হয়, তাহলে আমাদের ভেতরের ভিখুটা এখনো শিক্ষিত সমাজের কারো কারো অন্তরে বসে নেই, তা কী করে বলি! আইএমএফের সাবেক প্রধান ডোমিনিক স্ট্রাউস কানের কথা আর বললাম না। তাঁকে নিয়ে তো রীতিমতো রগরগে কাহিনী প্রচার হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা এখানে নয়। এরও পর আছে। এসব ঘটনায় সহকর্মীদের লজ্জায় ছিঃ ছিঃ করতে দেখা যায় না কেন? একজন দায়িত্বশীল মানুষ যখন এমন জঘন্য কাজ করবেন, তখন তাঁর সহকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সবাই উদগ্রীব হয়ে পড়বেন কতক্ষণে ওই মানুষটির সংস্রব ত্যাগ করবেন- সেটা নিয়েই। এটাই সমাজের বহুকালের প্রচলিত নিয়ম। আশ্চর্যের বিষয়, উপরিউক্ত তিনটি ঘটনার কোনোটিতেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা, এমন পরিবেশ দেখা গেছে যে মানুষের ধারণা হয়েছে আদৌ কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হবে কি না তা নিয়েই। যেমন- পরিমলের জঘন্য কীর্তি ধরা পড়ার পর তার সহকর্মী কেউ কেউ নারী হয়েও সমর্থন দিতে চেষ্টা করেছেন, যা ছিল সমাজের চোখে গর্হিত। আইনের হাত থেকে রক্ষা করতে এ সহযোগিতা বলে অভিযোগ উঠেছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন মেয়েটি অধ্যাপকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে এবং শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, তখন কর্তৃপক্ষ মেয়েটিকে নির্লিপ্তভাবে বলেছে একটি লিখিত অভিযোগ দিতে। একইভাবে প্রশ্ন ওঠে, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কর্তৃপক্ষ অথবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এখন পর্যন্ত মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে? শুধু ক্যাম্পাস উন্নয়ন কমিটির কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা কি তাঁর ওই শ্লীলতাহানির চেষ্টার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ? এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ল। এক ব্যক্তি একবার অন্য এক ব্যক্তির হাতি মেরে ফেলল। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে বিচার চাইল হাতির মাহুত। গণমান্য ব্যক্তিরা বহু শলাপরামর্শ করে রায় দিলেন, হাতি হত্যাকারী লোকটি আগামী এক বছর তাঁর পুকুর থেকে মাছ মারতে পারবেন না। তখন মাছ বাঙালির খাবার তালিকায় ছিল অপরিহার্য। বিচারকরা শাস্তিটাকে মোক্ষম বলে মনে করলেন এই কারণে যে এক বছর ওই ব্যক্তি মাছ খেতে পারবেন না। এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে! হত্যাকারী ডাল-ভাতে এক বছর চালিয়ে দিল কষ্টেসৃষ্টে। এক বছর মাছ না ধরার ফলে পুকুরের মাছগুলো হয়ে উঠল ভারী, রান্নায় আরো সুস্বাদু। এক বছর পর মাছ দিয়ে ভাত খেতে খেতে হাতি হত্যাকারী তাঁর স্ত্রীকে বললেন, 'বউ, এখন থেকে সব সময় মাছ ধরা যাবে না। এ বছর মাছ খেয়ে আবার আগামী বছর মাছগুলোকে বড় হওয়ার জন্য সময় দিতে হবে।'
স্ত্রী বললেন, 'কিন্তু গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বাড়িতে যে মাছ পাঠাইতে হয়, তার কী করবা? মাছ না পাঠাইলে বদনাম অবে না?'
তৃপ্তির সঙ্গে খেতে খেতে লোকটি বললেন, 'এলাকায় হাতি দেখলে খবর দিবা, আবার একটা হাতি মারব।'
মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এখন পর্যন্ত নেওয়া ব্যবস্থা দেখে এ গল্পটিই মনে পড়ছে।
পুনশ্চ : বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা আছেন বিপাকে। কোনো কোনো সংসদ সদস্যকে ছোট পদের, নেকনজরে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাও ধমক দিচ্ছেন। পত্রিকায় আসছে। আবার চোখে পড়ার মতো প্রটোকল ভঙ্গ করে সচিবরা অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্যদের আগে আসন পাচ্ছেন। বিষয়টি লক্ষ করে যথার্থই একজন মাননীয় সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী পার্লামেন্টে তুলেছিলেন। তাঁর এ প্রশ্ন উত্থাপন দেখে খুবই প্রীত হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, একটু খোলামেলাভাবে সরকারি দলের ভেতর থেকে অসংগতি তুলে ধরার সংস্কৃতি এ সরকার শুরু করেছে। আমরা অহরহ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অপরাপর উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ সদস্যদের দলের ভুলত্রুটি তুলে ধরতে দেখি। এখন বাংলাদেশের সংসদও গণতন্ত্রের ওই দিকটির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এ প্রশ্ন তোলার কারণে প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যের প্রতি ভয়ানক নাখোশ হয়েছেন। এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়টি আলোচনায় কেন প্রধানমন্ত্রী নাখোশ হলেন, তা পরিষ্কার নয়। তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশে কি সেই চিরাচরিত নিয়মই চলবে যে সরকারি দলের কোনো সদস্য সরকারের কোনো কার্যক্রমের অসংগতি সংসদে তুলতে পারবেন না?

লেখক : সাংবাদিক
mohshinhabib@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.