দয়া করে প্রেসক্লাবে দেয়াল তুলবেন না by সোহরাব হাসান

সব দেশে জাতীয় প্রেসক্লাব নেই। আমাদের আছে। সব দেশে সাংবাদিক ইউনিয়নও রাজনৈতিক কারণে ভাগ হয় না। আমাদের দেশে হয়েছে। এখন প্রেসক্লাবটিও ভাগাভাগি হওয়ার পথে। ইতিমধ্যে প্রেসক্লাবের নতুন ও পুরোনো কমিটি একে অপরের বিরুদ্ধে বাগ্যুদ্ধ এবং আইনি লড়াইয়ে নেমেছে।
জাতীয় প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে, স্বাধীনতার আগে যা পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাব নামে পরিচিত ছিল। এর প্রথম সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে মুজিবুর রহমান খাঁ ও জহুর হোসেন চৌধুরী। তাঁরা দুজন দুই রাজনৈতিক মেরুর মানুষ ছিলেন। কিন্তু পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় ছিলেন এককাট্টা। প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় আরও উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন খায়রুল কবির, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবদুস সালাম, এবিএম মূসা, কে জি মুস্তাফা, হাসানুজ্জামান খান, সৈয়দ নূরউদ্দিন প্রমুখ। তাঁদের কেউ বেঁচে নেই। থাকলে হয়তো এভাবে আমরা সংকটে পড়তাম না।
জাতীয় প্রেসক্লাব পেশাজীবী সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান হলেও আর পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মতো নিছক বিনোদনকেন্দ্র নয়। প্রেসক্লাব অবশ্যই সাংবাদিকদের পেশাগত সুযোগ–সুবিধা ও মর্যাদার বিষয়টি দেখবে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশ ও জনগণের প্রতি তার দায়দায়িত্বও বিস্মৃত হতে পারে না। সব দেশেই প্রেসক্লাব বাক্স্বাধীনতা তথা চিন্তাচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করে থাকে। মানুষ যখন তার মনের কথা জাতীয় সংসদে জানাতে পারে না, সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে পেঁৗছাতেও ব্যর্থ হয়, তখনই তারা গণমাধ্যমকর্মী এবং তঁাদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রেসক্লাবে ছুটে আসে। অতীতে জাতীয় প্রেসক্লাব জাতির মনন ও চিন্তার কেন্দ্র ছিল। রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উপযুক্ত জায়গা ছিল এটি। ১৯৬৪ সালে যখন পাকিস্তানি শাসকেরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দেয়, তখন এই প্রেসক্লাব থেকেই দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতারা ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ ব্যানার নিয়ে মিছিল বের করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার বন্ধ করে দিলে এই প্রেসক্লাব থেকেই লেখক-বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীরা মিছিল বের করেছিলেন। এমনকি গেল শতকের আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারী দলের নেতাদের অস্থায়ী ঠিকানা ছিল এই প্রেসক্লাব। বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলকারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে প্রেসক্লাবে আসতে দেওয়া হয়নি, মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
কিন্তু নব্বই-পরবর্তী ‘গণতান্ত্রিক’ শাসনামলে প্রেসক্লাব সেই ঐতিহ্য ও ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পারেনি, ইউনিয়ন ভাগ হয়ে গেছে, প্রেসক্লাবের টেবিল–চেয়ারগুলোও আমরা আলাদা করে ফেলেছি। ১৯৯৩ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপির ইঙ্গিতেই সাংবাদিক ইউনিয়ন বিভক্ত হয়ে গেল। এখন প্রেসক্লাবের নিচতলায় আলাদা অফিস, আলাদা নেতৃত্ব। এর আগে ১৯৯২ সালের ২১ জুন বিরোধী দলের একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢুকে সাংবাদিকদের লাঠিপেটা করে; প্রেসক্লাবের দরজা–জানালাও ভেঙে ফেলে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসক্লাবে হামলার ঘটনা এটাই প্রথম। কিন্তু এ হামলাকারীেদর বিচার হয়নি। একযোগে আমরা সেই দাবিও জানাতে পারিনি। পরবর্তীকালে বিভক্ত ইউনিয়নের ঐক্য নিয়ে অনেক দেনদরবার, অনেক বৈঠক হয়েছে, অনেক যৌথ কমিটি হয়েছে, কিন্তু ইউনিয়নকে এক করা যায়নি।
ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক ইউনিয়নের সঙ্গে পূর্বাপর সরকারগুলো যেমন সমঝে চলার চেষ্টা করত, মালিকেরাও ইউনিয়নকে ভয় করতেন। এরশাদের আমলে কেবল বাংলাদেশ অবজারভারকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ২৬ দিন পত্রিকা বন্ধ ছিল। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর এরশাদের সেন্সরশিপের প্রতিবাদে বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে যান। এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে আর কোনো পত্রিকা বের হয়নি। সাংবাদিকের কলম যে কতটা শক্তিশালী, সেটি সেদিন আমরা দেখিয়েছিলাম কলম বন্ধ রেখে। এখন বিভক্ত ইউনিয়নের পক্ষে সেই সাহসী ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে প্রেসক্লাবে যে সংকট চলছে, সেটি কেবল ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনের সংকট নয়। সংকটটি হলো নীতি ও মূল্যবোধের। সংকটটি হলো পেশাদারত্ব ছাপিয়ে অসাধু দলীয় রাজনীতির আধিপত্য। প্রেসক্লাবের সংকটের শুরু যখন অসাংবাদিকদের সদস্যপদ দেওয়ার মাধ্যমে দল ভারি করার চেষ্টা চলে। ২০-২২ বছর ধরে সাংবাদিকতা করেও অনেকে আজও প্রেসক্লাবের সদস্য হতে পারেননি। আবার ১০-১৫ বছর আগে সাংবাদিকতা পেশা ত্যাগ করে কিংবা অন্য পেশা ও ব্যবসায়ে সক্রিয় থেকেও যথারীতি ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবের সদস্যপদ ঠিক রেখেছেন। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানে তঁাদের নেতৃত্ব দিতেও কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। জাতীয় প্রেসক্লাবের কমিটি নিয়ে এখন যে অস্থিরতা চলছে, তার মূলে রয়েছে দলীয় রাজনীতি। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম পার্টিকে সভা করার অনুমতি দেয় প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ এবং সেই সভায় গোলাগুলিতে একজন মারাও যায়। এর প্রতিবাদে ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে পরিচিত সদস্যরা পদত্যাগ করেন। এই সুযোগে প্রতিপক্ষ পছন্দসই কয়েকজনকে কো–অপ্ট করে এবং অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে কম্পিউটার অপারেটরকেও সদস্য করে নেয়। অনেকে এটিকে ২০০৬ সালে সাবেক সিইসি বিচারপতি এম এ আজিজের ভোটার তািলকার সঙ্গে তুলনা করেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবের চলমান সংকটের ন্যায্য সমাধান হলো অসাংবাদিকদের বাদ দিয়ে একটি সুষ্ঠু ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও নির্বাচন। কিন্তু আগের ব্যবস্থাপনা কমিটি কিংবা তাদের প্রতিপক্ষ সেদিকে নজর দেয়নি। বরং তারা পদ ভাগাভাগির লক্ষ্যে তথাকথিত সমঝোতার চেষ্টা চালায়। বিএনিপ–সমর্থক সাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটি ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিপক্ষকে ১০+৭ সমীকরণে ছাড় দিতে রাজি হয়। অপরপক্ষ এটা মেনে নেয় এ কারণে যে ভোটাভুটি হলে তাদের জয়ের সম্ভাবনা কম। কিন্তু উভয় পক্ষের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকেরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকার করে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে যেমন একজন জামায়াতের সমর্থককে প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মেনে নেওয়া কঠিন, তেমনি রাজনীতিতে চরমভাবে কোণঠাসা বিএনপির পক্ষে ছাড় দেওয়াও অসম্ভব। এ কারণেই তারা সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। ইতিমধ্যে বিএনপির সমর্থক গ্রুপের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। তারাও জামায়াত–সমর্থক সাধারণ সম্পাদকের ব্যাপারে আপত্তি জানায়। ফলে দুই পক্ষের সমঝোতা ভেস্তে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন পদত্যাগ করে এবং বিদায়ী ব্যবস্থাপনা কমিটি সাধারণ সভা স্থগিত করে এক মাস পর বিশেষ সাধারণ সভা আহ্বান করে। কিন্তু তাদের প্রতিপক্ষ এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে নির্ধারিত দিনেই সাধারণ সভা আহ্বান করে একটি কমিটি ঘোষণা করে। এই কমিটিতে আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের মধ্য থেকে সভাপতিসহ ১০ জন এবং বিএনপির বিদ্রোহী সমর্থকদের মধ্য থেকে সাতজনকে নেওয়া হয়। কিন্তু আগের ব্যবস্থাপনা কমিটি ৭+১০ এই সমীকরণ না মেনে আদালতের শরণাপন্ন হয়। প্রেসক্লাবে উভয় পক্ষ নিজেদের বৈধ নেতৃত্ব বলে দাবি করে এবং প্রেসক্লাব অঙ্গনে সভা–সমাবেশ চলছে।
আমরা সাংবাদিকেরা দেশের গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলি, রাজনীতিকদের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করি। আমরা সাংবাদিকেরা সরকার ও বিরোধী দলের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দাবি করি। কিন্তু আমাদের কাজে কতটা জবাবদিহি আছে? প্রেসক্লাবের নির্বাচন নিয়ে যা হয়ে গেল, সেটি আইন কীভাবে দেখবে জানি না, কিন্তু একজন পেশাজীবী গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে লজ্জিত বোধ করছি। সাংবাদিকতার মূল শক্তিই হলো নীতি–নৈতিকতা।
সাংবাদিক সমাজ আরও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে কবি শামসুর রাহমান, যিনি দেশের বরেণ্য কবিই ছিলেন না, অধুনা লুপ্ত দৈনিক বাংলার সম্পাদকও ছিলেন, তাঁকে এই প্রেসক্লাব সদস্য না করে সদস্য করেছিল আলবদর নেতা কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লাকে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাঁদের ফাঁসি হয়েছে। সে সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার সাংবাদিকদের মধ্যে কজন প্রতিবাদ করেছিলেন? কেউ কি কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন? কেন করেন নি?
সম্প্রতি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে আদালত সংশোধিত তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন করতে বলেছেন। প্রেসক্লাবের সমস্যার সমাধান কী?
এই প্রেসক্লাব অনেক সংগ্রাম, অনেক ত্যাগের প্রতিষ্ঠান। আমরা এখেনা বিশ্বাস করতে চাই, ইউনিয়ন ভাগ হলেও প্রেসক্লাব ভাগ হবে না। অনেক জ্যেষ্ঠ সদস্য আছেন, যঁারা অতীতে প্রেসক্লাব ও ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আছেন তোয়াব খান, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, গোলাম সারওয়ার, হাসান শাহরিয়ার, িরয়াজউদ্দিন আহমদ, হাবিবুর রহমান মিলনের মতো প্রবীণ সদস্য। আছেন নতুন প্রজন্মের অনেক দলনিরপেক্ষ সাংবাদিক, যঁারা প্রেসক্লাবটিকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান। তাঁরা বর্তমান সংকট উত্তরণে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে পারেন। ভূমিকা নিতে পারেন সম্পাদক পরিষদও।
সবেশষে সবিনয় নিবেদন, দলীয় স্বার্থে সাংবাদিক ইউনিয়ন ভাগ করেছেন, দেয়াল তুলেছেন, দয়া করে জাতীয় প্রেসক্লাবে আরেকটি দেয়াল তুলবেন না। দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার নয়, জাতীয় প্রেসক্লাব হোক পেশাজীবী সাংবাদিকদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
hsohrab03@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.