সময়ের প্রতিধ্বনি-বন্ধুহীন শেখ হাসিনা উভয় সংকটে by মোস্তফা কামাল

বিষয়টি পুরনো হয়ে গেছে। তার পরও প্রসঙ্গটি তুলতে চাই। ২৯ জুন। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগের কথা। অধিবেশন কক্ষে দুই নেত্রী বসে আছেন। সবার দৃষ্টি তাঁদের দিকে।
দেশ ও জাতির জন্য তাঁরা কী দিকনির্দেশনা দেন তা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বক্তব্য দিয়েছেন। পরে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টিভি মিডিয়ার সুবাদে দুজনের বক্তব্যই সরাসরি উপভোগ করেছি।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তৃতা শুনে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছি। আমি কী বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য শুনছি, নাকি প্রধানমন্ত্রীর? বিরোধী দলের নেতা তো সাধারণত সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বক্তৃতা দেন। সরকারকে নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করেন। অথচ তা না করে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় বক্তৃতা দিলেন। মনে হলো, জাতির উদ্দেশে তিনি ভাষণ দিচ্ছেন। তাঁর এত প্রাণবন্ত বক্তৃতা (লিখিত) নিকট-অতীতে শুনিনি। তাঁর বক্তৃতার ভাষা, শব্দ চয়ন এবং বাচনভঙ্গি প্রশংসনীয়। তিনি এ বিষয়ে যে কিছু 'হোম ওয়ার্ক' করেছেন, তার প্রমাণ মেলে চমৎকার বক্তব্যে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাঁর বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন; তবে খোঁচা মেরেছেন এই বলে যে 'আমাদের লিখিত ড্রাফটের প্রয়োজন হয় না।' কেন প্রয়োজন হয় না, তা বোঝার ক্ষমতা হয়তো আমাদের নেই। তবে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, খালেদা জিয়ার বক্তৃতায় যত বেশি আশাবাদী হয়েছি, শেখ হাসিনার বক্তব্যে তত বেশি হতাশ হয়েছি। হতাশ হয়েছেন সাধারণ মানুষও। অনেকে তা অকপটে বলছেনও। খালেদা জিয়ার বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যকে নতুনভাবে সাজাতে পারতেন। তিনিও টেস্টম্যানশিপ একটা বক্তৃতা দিয়ে জাতিকে মুগ্ধ করতে পারতেন। এটা শেখ হাসিনার জন্য একটা বড় সুযোগ ছিল। সেই সুযোগ না নিয়ে তিনি উল্টোপথে হাঁটলেন। তিনি পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে পুরো বক্তৃতাপর্বকে বিরক্তির পর্বে পরিণত করেন।
আমাদের বিশ্বাস ছিল, বঙ্গবন্ধুর রক্ত যাঁর ধমনিতে বহমান, তিনিই সব স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করবেন। কারণ তিনি সব হারিয়েছেন। বিনিময়ে পেয়েছেন বাঙালি জাতির ভালোবাসা। সেই ভালোবাসায় তিনি দু-দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁর আর চাওয়া-পাওয়ার কী আছে! তা ছাড়া ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি এ দেশের মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। সেই অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন বলেই আমরা ভেবেছিলাম। কিন্তু সেই আশা যখন দুরাশায় পরিণত হয়, তখন কেবলই হতাশ হতে হয়।
হতাশ করেছেন খালেদা জিয়াও। তিনি ওয়াশিংটন টাইমসে কোনো নিবন্ধ লেখেননি বলে দাবি করেছেন। অথচ লেখাটি যে তাঁরই ছিল, তার যথেষ্ট প্রমাণাদি রয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক দি ওয়াশিংটন টাইমসের মতামত কলামে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার লেখাটি প্রকাশিত হয়। লেখার শিরোনাম ছিল, 'দ্য থ্যাংকলেস রোল ইন সেভিং ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ'। লেখায় তিনি সরকারের তুখোড় সমালোচনা করেন। মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতির জন্য তিনি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া জিএসপি সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেন। এই লেখা প্রকাশের পর সর্বত্র হৈচৈ পড়ে যায়। সরকার বিষয়টি নিয়ে বেশ বক্তৃতা-বিবৃতিও দেয়। তখন খালেদা জিয়ার কোনো বক্তব্য শোনা যায়নি।
বিষয়টি রহস্যের সৃষ্টি করে ২৯ জুন খালেদা জিয়া সংসদে দাঁড়িয়ে যখন বললেন, লেখাটি তাঁর নয়। তাহলে লেখাটি কার? যে লেখা খালেদা জিয়ার নামে প্রকাশিত হলো, এত হৈচৈ হলো! তখন কেন খালেদা জিয়া প্রতিবাদ জানালেন না। বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। এখন কেন অস্বীকার করা হচ্ছে? ২ জুলাই ওয়াশিংটন টাইমসের নির্বাহী সম্পাদক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, লেখাটি খালেদা জিয়ারই। এরপর তিনি কী বলবেন? এই লেখাটি শুধু দেশের জন্যই নয়, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতি হয়েছে। দেশপ্রেমিক কোনো মানুষ এটা মেনে নেয়নি এবং মেনে নিতে পারে না। ব্যাপারটা নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো ঘটনা।


গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর শোচনীয় পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব রীতিমতো ভেঙে পড়েছে। কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। দলের এই হতাশা কাটাতে শেখ হাসিনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। অথচ দলের এই ক্রান্তিকালে তিনি শেখ রেহানার মেয়ের বিয়েতে যোগ দিতে লন্ডনে চলে যান। কেউ কেউ এমনও মন্তব্য করেছেন, নেতা-কর্মীদের লজ্জায় ডুবিয়ে তিনি বিয়ের উৎসবে যোগ দিতে গেছেন! যেভাবেই বিষয়টিকে দেখা হোক, ক্ষমতাসীন দল এবং সরকার উভয় সংকটে পড়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুব সহজ নয়।
বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পর পর পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবির পর বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটি জোরালো হয়ে গেল। এই দাবির প্রতি বিপুল সমর্থন জানিয়েছেন পাঁচ সিটির নাগরিকরা। এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি বাস্তবায়ন করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। তা ছাড়া দেশে এখন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলেও বিএনপির বিপুল বিজয় হবে এবং ক্ষমতাসীন দলের শোচনীয় পরাজয় ঘটবে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও এটা এখন স্বীকার করেন। এখন শেখ হাসিনাও হয়তো উপলব্ধি করবেন। সেই উপলব্ধিটা আগেভাগে হলেই ভালো। না হলে বিপদেই পড়তে হবে বলে মনে হচ্ছে।
শেখ হাসিনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি কি আগামীতে বিএনপির অধীনে নির্বাচনে যাবেন, নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করবেন? এ দুটির যেকোনো একটি পথ তাঁকে বেছে নিতে হবে। কোনোটাই এখন আর তাঁর জন্য সুখকর হবে না। যদিও শেখ হাসিনা বারবারই বলছেন, বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করলে তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় চলে আসবে, সেই আশঙ্কা থেকে তিনি তত্ত্বাবধায়কে ফিরবেন না। কিন্তু তৃতীয় শক্তি যদি আসেই, তাহলে কি সংবিধান বহাল রেখে আসবে? তারা তো সংবিধান স্থগিত রেখেই আসবে। শুধু শুধু সংবিধানের দোহাই দিয়ে লাভ কী? তা ছাড়া সংবিধান তো মানুষের কল্যাণেই করা হয়। এটা তো আসমানি কিতাব নয় যে কোনো অবস্থাতেই তা পরিবর্তন করা যাবে না!
আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। পাঁচ সিটি করপোরেশনে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সরকারের অবস্থান খুবই নাজুক হয়ে গেছে। প্রশাসনে ইতিমধ্যেই গা-ছাড়া অবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন আর কাউকে কাছে পাবে না আওয়ামী লীগ। যাঁরা সুবিধা নেওয়ার, তাঁরা আগেই নিয়ে নিয়েছেন। সবাই সরকারের বিদায়ের ক্ষণ গণনা শুরু করে দিয়েছেন। সরকারি অফিসগুলোতে এখন কাজের পরিবর্তে আলোচনা আওয়ামী লীগের বিদায় কিভাবে হবে তা নিয়ে। তাঁরা এখন বিএনপির দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে পড়েছেন।
সুবিধাভোগীরা আগেভাগেই কেটে পড়ছেন। তাঁদের এখন নতুন ঠিকানা বিএনপি। বিএনপির নেতা-কর্মীরাও বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন। ভাবখানা এমন যে তাঁরা ক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন। তাঁদের মনোবল অনেক গুণ বেড়ে গেছে। আর ক্ষমতাসীন নেতা-কর্মীরা একেবারেই চুপসে গেছেন। এটা আওয়ামী লীগের জন্য বিপদ বটে! আরেকটি বিপদ সামনে দাঁড়িয়ে। সেটা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ এখন অনেকটাই বন্ধুহীন। জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে মহাজোটে ভাঙন ধরতে পারে। বামপন্থীদের সঙ্গেও গাঁটছড়া ভাবটা নেই। বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে অনেক আগেই দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ফলে দেশীয় বন্ধুরা অনেক দূরে সরে গেছে। আন্তর্জাতিক বন্ধুদেরও হারাচ্ছে। ড. ইউনূসকে হেনস্তা করার খেসারতও সরকারকে দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়াটা উত্তম হবে। এতে হয়তো সাময়িকভাবে আওয়ামী লীগ ব্যাকফুটে থাকবে। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। পাঁচ বছর পর আবার আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় আসা কঠিন হবে।
বিষয়টিকে আওয়ামী লীগ যদি ভুল হিসেবে দেখে এবং তা শোধরানোর উদ্যোগ নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষও ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখবে। আর গোঁ ধরে থাকলে আওয়ামী লীগ আরো বেশি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এখন সিদ্ধান্তের ভার শেখ হাসিনার ওপর। গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের স্বার্থের কথা চিন্তা করে তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর আওয়ামী লীগের টিকে থাকাটাও নির্ভর করছে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
mostofakamalbd@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.