আলোচনা- 'টেলিভিশন কি পত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী' by ফরিদুর রেজা সাগর

টেলিভিশন যখন এদেশে প্রথম আসে তখন অনেকের ধারণা হয়েছিল, এদেশের চলচ্চিত্র ব্যবসায় ধস নামবে। এখনো বাংলাদেশ টেলিভিশন কিংবা অন্যান্য স্যাটেলাইট চ্যানেলে শুক্রবার দুপুর বেলা যে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দেখানো হয় সেটা নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনেকের ক্ষোভ রয়েছে।
তাদের ধারণা, শুক্রবার টেলিভিশনে প্রচুর লোক সিনেমা দেখার কারণে সেদিন হলে গিয়ে সিনেমা দেখে না। অথচ শুক্রবার হলো এই দেশে ছবি রিলিজের প্রথম দিন। যাত্রা শুরু করার পর টেলিভিশন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। আর চলচ্চিত্রের গতি আগের চেয়েও বেগবান হয়েছে। দর্শক-শ্রোতাদের কাছে অন্তত তাই মনে হয়েছে।টেলিভিশনের কারণে বরং চলচ্চিত্রের ব্যবসা বেড়েছে। মিনি পর্দায় বিজ্ঞাপন, নানারকম অনুষ্ঠানের কারণে বড় পর্দা আরো জনপ্রিয় হয়েছে মানুষের কাছে। আমাদের দেশে শুধু নয়, বিদেশেও টেলিভিশনের কারণে বহু ছবি সুপারহিট হয়েছে। আবার স্যাটেলাইট টেলিভিশন আসার পর যখন নিজেরাই ছবি প্রযোজনা শুরু করল তখনও অনেকে বলেছিল বড় পর্দাকে ছোট পর্দায় নিয়ে আসার ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন মানুষ বুঝতে পারছে ছোট পর্দার মানুষদের প্রযোজিত বড় পর্দার ছবিগুলো আমাদের চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। ইদানীং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ছায়াছবির গান, ছায়াছবির অংশবিশেষ কিংবা পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি প্রদর্শনের চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে টক শো। এই টক শোগুলো সাম্প্রতিক ঘটনার ওপর যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে টক শোর বিষয়বস্তুগুলো আসছে পত্রিকার পাতা থেকে।এর বাইরেও অনেক চ্যানেল সরাসরি সেদিনের প্রকাশিত সংবাদপত্রই দেখিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে 'সংবাদপত্র' পাঠক পাচ্ছেন ভোরবেলা। কিন্তু টেলিভিশন দর্শকরা সেই সংবাদ দেখে ফেলছেন মাঝরাতে। শুধু দেখে ফেলা নয়, সেই সংবাদের ওপর আলোচনা-পর্যালোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।প্রথম দিকে সংবাদপত্র মালিকদের এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ছিল তীব্র আপত্তি। কারণ তাদের ধারণা ছিল টেলিভিশনে পত্রিকা দেখিয়ে ফেললে পত্রিকার মূল আকর্ষণই চলে যাবে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তেমন কিছুই ঘটেনি। দৈনিক পত্রিকা সকালবেলা যেখানে টাকা দিয়ে কিনতে হয়, সেখানে মাঝরাত্তিরে একটা নয়, অনেক পত্রিকা যদি বিনা পয়সায় দেখে নেয়া যায় তবে লোকেরা কেন টাকা দিয়ে পত্রিকা কিনবে?তবে সংবাদপত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত সবার ধারণা ভুল প্রমাণ করে দৈনিক পত্রিকার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছেই। যে লোক নিয়মিত কেবল একটি পত্রিকা রাখত টেলিভিশনে মাঝরাতে বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ দেখে কোনো কোনো সংবাদের প্রতি বা ফিচারের প্রতি আগ্রহ অনুভব করে পরদিন তিনি একের অধিক পত্রিকা কিনে ফেলেন।একই কথা টক শোগুলোর জন্য প্রযোজ্য। টক শোতে পত্রিকার পাতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পর দর্শকরা স্বাভাবিকভাবেই আশা করতে পারে, মূল খবর পত্রিকার পাতায় কেমন হয়েছে সেটা দেখার জন্য। বলাই বাহুল্য, পত্রিকার সংবাদকে কেন্দ্র করে টেলিভিশন পর্দার টক শোগুলো মূলত পত্রিকার বিক্রিই বৃদ্ধি করেছে। টেলিভিশনের কারণে যেমন পত্রিকার পাঠকের কোনো কমতি হয়নি, তেমনই পত্রিকার পাঠকদের কারণেও টেলিভিশনের দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময় পত্রিকার পাতায় সিনেমার বড় বড় বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। টেলিভিশন অনুষ্ঠানের কোনো খবরই থাকত না। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন দৃশ্যটি পুরোপুরি উল্টে গেছে। পত্রিকার পাতায় চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনের চেয়ে বেশি থাকে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন। চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনের জন্য পত্রিকায় বিশেষ ছাড় দেয়া হতো। টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের দাপটে এখন আর সেই ছাড়ও দেয়া হয় না। শুধু বিজ্ঞাপন নয়, দৈনিক পত্রিকার বিনোদনের খবর হিসেবে এখন বহু অংশজুড়েই থাকে টেলিভিশনের খবর। শুধু টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠানসূচি নয়, অনুষ্ঠানগুলোর হাইলাইটস, ছবি সবকিছুই আগাম প্রকাশ পাচ্ছে পত্রিকার পাতায়।পত্রিকার পাতায় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সংবাদগুলো আগাম প্রকাশিত হওয়ায় অনেক দর্শকই ঠিক করে রাখতে পারেন তার প্রিয় অনুষ্ঠানটি কখন তিনি দেখবেন। ঈদের সাত দিনের অনুষ্ঠানের বিরাট বিরাট বিজ্ঞাপন দেখা যায় পত্রিকার পাতায়। এই বিজ্ঞাপনগুলো টিভি দর্শকরা নিজেদের কাছে পত্রিকার পাতা থেকে কেটে রেখে দেন শুধু কখন কোন অনুষ্ঠান দেখবেন সেটা দেখার জন্য। বড় বড় টেলিভিশন অনুষ্ঠান নিয়ে অনেক শিল্পী-কলাকুশলী ও নির্মাতার সাক্ষাৎকারও পত্রিকার অনেক অংশজুড়ে থাকে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, আগে চলচ্চিত্রের বিলবোর্ড না হলেও ব্যানার লাগানো থাকত শহরের বড় বড় রাস্তার মোড়ে। এখন টেলিভিশন অনুষ্ঠানের বিলবোর্ড লাগানো থাকে রাস্তার মোড়ে।সবকিছু মিলিয়ে একটা কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিনোদন বা জ্ঞানের জগতে দর্শক, পাঠক, শ্রোতার জন্য কোনো মাধ্যমই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সব মাধ্যমের প্রতি দর্শক, পাঠক, শ্রোতার আকর্ষণ রয়েছে। বিষয়বস্তু এবং পরিবেশনা যদি দর্শক বা পাঠকের মনমতো হয়, তাহলে সেই মাধ্যম জয় করে নেয় সবকিছু।পত্রিকার পাতায় যেমন একটি সংবাদের জন্য সাংবাদিককে লিখতে হয় অনেক চিন্তা করে, তেমনই টেলিভিশনের পর্দায়ও একটি অনুষ্ঠান বা সংবাদকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করার জন্য প্রয়োজন ঝকঝকে ও বিশ্বাসযোগ্য ছবি। যদিও টেলিভিশন দর্শকদের উপহার দিতে হয় পরিপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানের ছবি। আর পত্রিকার মানুষ দর্শকদের উপহার দেন শুধু কোনো অনুষ্ঠানের একটি ছবি। অর্থাৎ পত্রিকার পাতায় একটি ফ্রেম দিয়ে পাঠকদের বুঝিয়ে দিতে হয় পুরো অনুষ্ঠানের দৃশ্যকল্প।২০১০ সালের শুরুতে কালের কণ্ঠ নামে একটি নতুন পত্রিকার প্রকাশনার সময় তাই নতুন করে ভাবা যেতে পারে, টেলিভিশন এবং পত্রিকা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক। কালের কণ্ঠের যাত্রা শুভ হোক।=====================ফিচার- ‘অতল জলের আহ্বান' by রুবাইয়াত মনসুর  ভ্রমণ- 'গৌড়ের পথে পথে' by মৃত্যুঞ্জয় রায়  রাজনৈতিক আলোচনা- 'সেদিন বঙ্গভবনে কী ঘটেছিল  রাজনৈতিক আলোচনা- 'রাজনীতি পুরনো পথেই' by আবদুল্লাহ আল ফারুক  খবর- ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়ক  আলোচনা- 'বাংলাদেশে মিডিয়া ও তার ভবিষ্যৎ' by সাইফুল বারী  প্রবন্ধ- রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের 'অবরোধবাসিনী'  ফিচার- ‘হিমশীতল শহরগুলোর দিনরাত' by তামান্না মিনহাজ  গল্পালোচনা- ''সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর'  সাক্ষাৎকার- হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমদাদুল হক মিলন  ইতিহাস- পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাইনোসরের ফসিল 'স্যু' এর কাহিনী  খাদ্য আলোচনা- 'অপুষ্টির প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা by শেখ সাবিহা আলম  গল্পালোচনা- 'ডান রাস্তার বামপন্থী' by কাওসার আহমেদ  খবর- 'মারা যাবে না একটি শিশুও' -বিলগেটসপত্নী, মেলিন্ডা গেটস     কালের কণ্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ ফরিদুর রেজা সাগর
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল আই


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...

free counters

No comments

Powered by Blogger.