ভ্রমণ- 'গৌড়ের পথে পথে' by মৃত্যুঞ্জয় রায়

চাঁপাইনবাবগঞ্জ গেলে অনেকে শুধু সোনা মসজিদ দেখেই ফিরে আসেন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় কিছু নিদর্শন ওই মসজিদের আশেপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এমন কিছু বিশেষ দ্রষ্টব্যের সন্ধান নিন এই লেখা থেকে।

শীত যে কী, তা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ পেঁৗছে। ঘন কুয়াশা ঢাকা পথঘাট, আমবাগান। সকালে সূর্যের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সূর্যের ওমের জন্য অপেক্ষা না করেই মহানন্দার পাড় ধরে পাকা রোড বেয়ে এগুতে লাগলাম স্থলবন্দর সোনা মসজিদের দিকে।
প্রায় পাঁচশ বছরের পুরনো মসজিদে যখন গিয়ে পেঁৗছলাম তখন একটু একটু করে রোদ উঁকি দিচ্ছে। বিশ টাকার নোটের উপর ছাপানো মসজিদটি দিয়েই শুরু হলো আমাদের গৌড় পরিভ্রমণ। মধ্যযুগে গৌড় ছিল ভারতবর্ষের এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। গৌড় নগরীর অবস্থান ছিল এখনকার মালদা জেলার দক্ষিণে গঙ্গা ও মহানন্দা নদীর মাঝখানে। গঙ্গা ও মহানন্দা নদী আজও বয়ে চলেছে। কিন্তু হারিয়ে গেছে প্রায় পাঁচশ' বছরের পুরনো গৌড় নগরী।
প্রায় কুড়ি মাইল লম্বা ও চার মাইল প্রস্থ নিয়ে ছিল সেকালের গৌড়ের অবস্থান। ১৪৫০ থেকে ১৫৬৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত গৌড় ছিল তৎকালীন বাংলার রাজধানী। সে সময়ে গৌড় নগরীতে গড়ে ওঠে নানা রকম স্থাপনা ও স্থাপত্য। ১৫৭৫ সালে এক ভয়াবহ মহামারীর ফলে নগরীটি পরিত্যক্ত হয়। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় এর নিদর্শনগুলো।
বর্তমানে গৌড়ের সবচেয়ে ভালো অবস্থায় টিকে থাকা নিদর্শন ছোট সোনা মসজিদ। এখানের স্থলবন্দরের নামটাও হয়েছে এই মসজিদের নামে। মসজিদ প্রাঙ্গণে রয়েছে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বীরশ্রেষ্ঠ ও বীরযোদ্ধা মেজর নাজমুল হক টুলুর সমাধি। পাথরে অলংকৃত নকশায় অপূর্ব মসজিদটি সুলতানী আমলে নির্মিত। সীমান্তের ওপারে মালদায় এ রকম আর একটা মসজিদ ছিল, নাম বড় সোনা মসজিদ। আলাউদ্দিন হুসেন শাহ সেটির অনুকরণে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে এর নাম হয় ছোট সোনা মসজিদ। একসময় মসজিদের গম্বুজের শিখর সোনা দিয়ে বাঁধানো ছিল বলে শোনা যায়।
খানিক বাদে সুলতানী আমল থেকে চলে গেলাম মোগল আমলে- সুবেদার শাহ সুজার বিশ্রামাগার তোহাখানায়। দেখতে অনেকটা ঢাকার লালবাগের কেল্লার মতো। তোহাখানা জামে মসজিদটিও কেল্লার পরীবিবির মাজারের মতো। প্রায় একই রকম মোগলীয় নকশা, রঙ ও স্থাপত্যরীতি। পাশে হযরত নিয়ামতউল্লাহ শাহ (রঃ) এর মাজার। সেটিও ঘুরে দেখতে বেশ- আঙ্গিনায় উদ্যান, পাথর, কবর ও বড় বড় মহুয়া গাছ। এসব দেখে গৌড় নগরীর প্রবেশদ্বার, সোনামসজিদ স্থল বন্দরে চলে এলাম।
গৌড় শহরে প্রবেশের মূল তোরণটি পরিচিত ছিল কোতোয়ালী দরওয়াজা নামে। অনেকে বলেন, ওই দরওয়াজা দিয়েই ১২০৫ খৃষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী বাংলায় প্রবেশ করে মুসলিম যুগের সূচনা করেছিলেন। সেজন্য অনেকে এই দরওয়াজাকে দখল দরওয়াজাও বলে। সোনামসজিদ স্থলবন্দর সীমান্তে বিশাল বালিয়াদীঘির কাছে বাংলাদেশ চেকপোস্টের উত্তর সীমানায় পেঁৗছতেই দরোজাটি নজরে এলো। ইতিহাসে ওই তোরণের যে বর্ণনা রয়েছে তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। জেনারেল কানিংহাম এটিকে প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছেন। ভারতের মালদা জেলায় প্রবেশ করতে বা মালদা থেকে এ দেশে আসতে এই তোরণ পার হতে হয়।
কোতোয়ালী দরওয়াজার কাছেই গাছগাছালির মধ্যে অবহেলা-অনাদরে পড়ে আছে গৌড় জনপদের দুটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তি- দারাসবাড়ি মাদ্রাসা ও দারাসবাড়ি মসজিদ।
দরোজা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে আমবাগানের মধ্য দিয়ে একটা দিঘীর পাড়ে পেঁৗছতেই দক্ষিণ পশ্চিমে ঘোষপুর মৌজায় চোখে পড়ল মাদ্রাসা ও মসজিদটি। গাড়ি নিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। দারাসবাড়ি দিঘির একপাড়ে মাদ্রাসা অন্যপাড়ে মসজিদ। স্থানীয় লোকেরা বলে চলি্লশ কুঠুরি মাদ্রাসা। চারদিকে ঘোরানো প্রায় বর্গাকার উঁচু ভিটার উপর চলি্লশটা ঘর বা কুঠুরি নিয়ে এটি নির্মিত। দীর্ঘদিন মাটিচাপা পড়েছিল, ১৯৭৩-৭৫ সালে মাটি খনন করে এটি উদ্ধার করার সময় প্রচুর পোড়ামাটির অলংকৃত ফলক বা টেরাকোটা পাওয়া গেছে।
দারাসবাড়ি মাদ্রাসার পরিকল্পনা ও ভূমি নকশা অনেকটা বৌদ্ধবিহারের মতো। তাই প্রাথমিকভাবে এটিকে দেখে কোনো বৌদ্ধবিহার বলে মনে হতে পারে। আনুুমানিক ১৫০৪ খৃষ্টাব্দে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এটি নির্মাণ করেন বলে ধারণা করা হয়।
মাদ্রাসার কাছেই দারাসবাড়ি মসজিদটিই ছিল বৃহত্তম মসজিদ। সুপ্রশস্ত দেয়াল, মোটা মোটা থাম, মেহরাব, খিলান ইত্যাদি দেখে সে কথা বুঝতে মোটেই কষ্ট হয়না। তবে এখন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ভারত সীমান্ত ঘেঁষা মসজিদটি পরিত্যক্ত, কোনো ছাদ নেই। শামসুদ্দিন আবুল মুজাফ্ফর ইউসুফ শাহের আমলে ১৪৭৯ খৃষ্টাব্দে এই মসজিদটি নির্মিত হয়।
এই গৌড় এলাকায় আরো অনেক দর্শনীয় স্থাপত্য ছিল। কবছর আগেই হারিয়ে গেছে গৌড় নগরীর প্রাসাদ, দুর্গ, সুউচ্চ বাইশগাজী প্রাচীর, লুকোচুরি দরওয়াজা, রাস্তাঘাট, পরিখা, টাকশাল। পরিচর্যার অভাবে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে চামচিকা মসজিদ। আর কিছুদিন পর গৌড়ের নিদর্শন বলতে এখানে হয়তো থাকবে শুধু ছোট সোনা মসজিদটি।
কীভাবে যাবেন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মহানন্দার পাড় ধরে বাসে করে যেতে হবে সোনা মসজিদ। দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলো। বাসে ভাড়া ৩০/৪০ টাকা। এখান থেকে ৩ কিলো দূরে বাংলাদেশ চেকপোস্টের উত্তর সীমানায় কোতোয়ালি দরোজা। বাসে যাওয়াই ভালো। দরোজা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে আমবাগানের মধ্য দিয়ে একটা দিঘী পেরিয়ে দক্ষিণ পশ্চিমে ঘোষপুর মৌজায় দারাসবাড়ি মাদ্রাসা ও মসজিদ। এখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। পদযুগল ভরসা।
=============================
রাজনৈতিক আলোচনা- 'সেদিন বঙ্গভবনে কী ঘটেছিল  রাজনৈতিক আলোচনা- 'রাজনীতি পুরনো পথেই' by আবদুল্লাহ আল ফারুক  খবর- ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়ক  আলোচনা- 'বাংলাদেশে মিডিয়া ও তার ভবিষ্যৎ' by সাইফুল বারী  প্রবন্ধ- রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের 'অবরোধবাসিনী'  ফিচার- ‘হিমশীতল শহরগুলোর দিনরাত' by তামান্না মিনহাজ  গল্পালোচনা- ''সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর'  সাক্ষাৎকার- হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমদাদুল হক মিলন  ইতিহাস- পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাইনোসরের ফসিল 'স্যু' এর কাহিনী  খাদ্য আলোচনা- 'অপুষ্টির প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা by শেখ সাবিহা আলম  গল্পালোচনা- 'ডান রাস্তার বামপন্থী' by কাওসার আহমেদ  খবর- 'মারা যাবে না একটি শিশুও' -বিলগেটসপত্নী, মেলিন্ডা গেটস  আলোচনা- 'সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের অঙ্গীকারঃ  নিবন্ধ- সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড-একটি দেশ একটি কবিতার জন্ম by আলীম আজিজ  আলোচনা- 'আরও একটি সর্বনাশা দেশ চুক্তির বোঝা' by আনু মাহমুদ 


কালের কণ্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ মৃত্যুঞ্জয় রায়


এই ভ্রমণ আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.