গল্প- 'আচারকাহিনি' by মোহাম্মদ আজম

ই কাহিনি হয়তবা সম্পূর্ণরূপে আপনাদের কানে যাবে; কিংবা, এমনও হতে পারে—যেমনটা প্রায়ই হয়ে থাকে—আধখেচড়া হয়ে বেগানা কারো হাত ধরে পৌঁছে যাবে আপনার দ্বারে। যেভাবেই পৌঁছাক না কেন, আপনি এর অসাধারণত্ব কম-বেশি আঁচ করতে পারবেন। আপনি নিজগুণে ফাঁকা ফাঁকা ভাংতিগুলোকে কাটাস্থান জোড়া লাগানোর মতো করে অনায়াসে ভরিয়ে দিয়ে চিক্কন-নধর দেবীপ্রতিমার মতো আখ্যানটি আস্বাদন করে থাকবেন। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ সময় কিছুতেই আপনার পাঁচ বছরের দীর্ঘ সময়কে ফালি ফালি করে কেটে দেখার উৎসাহ জাগবে না। পাঁচ বছর অনেক দীর্ঘ সময়।


আর আসলেই এখন যে কাহিনিটি হাতের মুঠোয় নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছেন আপনি, তার ১৮২৬ দিনের অনেকগুলো দিন কোনো শারীরিক-মানসিক চিহ্ন না রেখেই হাপিস হয়ে গেছে। এর মধ্যে, মনে করা যাক, সর্বমোট ৩৮ দিন ঝড়ো-হাওয়াসহ বৃষ্টি এসে দক্ষিণ-পূর্ব করিডোর সংলগ্ন তাকটির গ-দেশ পর্যন্ত ভিজিয়ে দিয়েছিল। এখন, আমরা যেহেতু শুনছি বা শুনব কেবল আচারকাহিনি, এবং সাধারণভাবে অহেতুক অনুসন্ধিৎসায় কথককে মাঝপথে বিভ্রান্ত না করার পাঠ ইংরেজিশিক্ষার দৌলতে আত্মস্থ করেছি, সেহেতু ঝড়োহাওয়াময় বৃষ্টিবাদলার দিনগুলো থেকে আমরা এই কাহিনিতে কেবল সে দিনগুলোরই চিহ্ন বিচড়ে দেখব, যেসব দিনে বারান্দার নিবিড় তাকে মাঝারি ও বড় আকারের বৈয়ামগুলো পরদিন রোদে শুকাতে দেয়ার জন্য তুলে রাখা ছিল। পাঁচ বছর যথেষ্ট দীর্ঘ আর প্রয়োজনীয়। তখন হয়ত সময় সম্পর্কে আপনার অর্জিত জ্ঞান এই একরৈখিক আখ্যান উপভোগের ক্ষেত্রে একটা ছোট্ট চোরাকাঁটার মতো বাধা হয়ে দাঁড়াবে; আর ইতিহাসের চক্রাকার আবর্তন, দুর্ঘটনা ইত্যাকার নানা হাতছানির মোহনমায়ায় আটকা পড়ে আপনি দেখতে শিখবেন পঞ্চাশ বছর আগের এক শ্যাওলা-পড়া স্যাঁতস্যাঁতে পুকুরঘাট। সেখানে পানের বাটা পায়ের কাছে রেখে কোহিনুর বেগম তার নাতনির কচি হাতের উকুনবাছা উপভোগ করছে। আপনি কোহিনুর বেগমের ঈষৎ উৎসুক চোখজোড়াকে পশ্চিমপাশে মাটিতে সার বেঁধে রাখা বৈয়ামগুলোর পার্শ্বদেশ ঘেঁষে বিচরণ করতে দেখবেন। এসবই ঘটে যাবে আপনার চোখের সামনে; কারণ, গ্রন্থপাঠের অভিজ্ঞতাহেতু অতীত আর বর্তমানের আপাত-ব্যবধানটি ঘুচিয়ে নেবার একটা সহজাত ক্ষমতা আপনার জন্মেছে; আর এই সুযোগে পঞ্চাশ বছর সময়কে আপনার নিকট-অতীত বলেই ভ্রম হবে। যেভাবে আশি বছরের জীবন-কাটানো গম্ভীর বৃদ্ধা তার নানিবাড়ির ক্ষীর-ওঠা দুধ খাওয়ার স্মৃতি তালাশ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে—মন লয় কাইলকার কথা, এহনো জিব্বায় লাইগ্যা রইছে। আরেকটি কারণে আপনার কাছে দৃশ্যটি সুদূরের মনে না-ও হতে পারে। তখন বিকালের আলো আস্তে আস্তে মজে আসায় ঘরের পুবচালের টিন উঠানের মধ্যভাগ পর্যন্ত হালকা ছায়া ফেলেছে, আর পুকুরপাড়ের ঘন গাছের ঝোঁপ চারপাশটাকে ক্রমশ মলিন করে দিয়ে এই নানি-নাতনিকে হালকা ছায়ার মায়ায় ঢেকে দিচ্ছে। দৃশ্যটি গেলবার নড়াইল ভ্রমণের সময় ছবির শেখের বাহিরবাড়িতে বসে মনোযোগ দিয়ে অনুভব করায় আপনার কাছে আপ-টু-ডেট মনে হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর হয়তবা জীবনানন্দে প্রবল ইমান থাকায় আপনি আপ্তবাক্যের মতো বলে উঠবেন—গ্রামবাংলার এইসব দৃশ্য নষ্ট হয়ে যাওয়া ঘড়ির কাঁটার মতো স্থির হয়ে আছে। এবং নিজের এই সর্বসাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়ে আপনি আরেকবার দেখে নেবেন হাজিবাড়ির পুকুরপাড়ের দৃশ্যটি। তখন কোহিনুর বেগম সম্ভবত নাতনিকে উকুন-বাছা ক্ষান্ত দিতে বলবে, আর প্রচুর অনুগত ছাত্র পাওয়ার সন্তোষে আনন্দ চেপে পথ চলা শিক্ষকের মতো করে এগিয়ে যাবে বৈয়ামগুলো গুছিয়ে নেয়ার জন্য। আর একদিন রোদে দিলেই এগুলো তুলে রাখার উপযোগী হয়ে উঠবে।
বস্তুত পঞ্চাশ বছরের পুরানা সাম্প্রতিককে চর্মচোখে চাখতে পারার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটা আপনাকে সংশয়ে ফেলে দেবে যে আদৌ পাঁচ বছর সময়কে যতটা অংক কষে নিখুঁত গুরুত্বে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছি আমরা, তা প্রাসঙ্গিক কিনা। একথা নিরেট সত্য যে, এই সময় পরিসরে অন্তত ৩৮ দিনের ঝড়োহাওয়া শত্রুবৎ আচরণপূর্বক আচারের কৌটাগুলো রাখার তাকটিকে আংশিকভাবে ভিজিয়ে দিয়েছিল আর কৌটাগুলোর সুদৃশ্য সজ্জা আর মসৃণ পার্শ্বদেশের জন্য এক অহেতু নরম করুণায় জোহরা বেগম নিজের জন্য বরাদ্দ করা অর্ধরজনীর ঘুম থেকে কিঞ্চিৎ ছাটাই করেছিলেন। এর একটা কারণ হয়ত ছিল বৈয়ামের ভিতরে, যেখানে বিচিত্র সব আচারের প্রত্যেকটি কণায় মাখামাখি হয়ে আছে তার অতি ব্যক্তিগত দিনলিপি; আর বৈয়ামগুলোর বাইরের পুরা প্রাঙ্গণ জুড়ে আছে তার ছোট্ট নাতনি রাইসা। নানা রঙের কাগজে বৈয়ামগুলো মুড়িয়ে আরো বহু রঙে তার আঁকাআঁকি। তার কতক অংশে মূর্ত হয়ে আছে বরই-তেতুল-জলপাই-গাজরের আনাড়ি সব রিয়েলিস্টিক-ইম্প্রেশনিস্টিক শিল্পকর্ম, অন্য অংশটা বিশুদ্ধভাবে বিমূর্ত। নানান আঁকিবুকি আর রঙের বিস্তার । রাইসাকে জিজ্ঞেস করলে সে কালবিলম্ব না করে বলবে, ‘এ রকমই তো ভালো’। সেই ভালোর জন্য জোহরা বেগমের একটা উদ্বেগ তো থাকতেই পারে। কিন্তু সত্য সবসময়ই এক তুলনামূলক পর্যালোচনা। যেমন, জোহরা বেগমের নরম করুণাকে আমাদের আমলে না নিলেও চলে। এই বাড়ির সুপরিসর বারান্দার দেয়াল ঘেঁষে যে সুদৃশ্য তাকে তার আচারের কৌটাগুলো রাখা আছে, তা এতটাই সুরক্ষিত যে, সম্ভবত জোহরা তার শৈশবের একটি স্মৃতি রোমন্থন করার স্বার্থে বা স্মৃতি সংরক্ষণের ছলেই, রাত জেগে ঝড়োবৃষ্টির অত্যাচারকে স্মরণ করেন। জোহরা তার নানির কথা স্মরণ করেন, নানির সাথে আবশ্যিক সম্পর্কের মতো আরো অনেক কিছু চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে—নানির পিতলের সুরমাদানি, শক্ত মিশরিদানার মতো জমে যাওয়া খেজুরের গুড়, কালো পাড়ে কাজ করা সাদা শাড়ি, আর অবশ্যই বৈয়ামের আচার। একদিনের কথা মনে পড়ে তার। আসরের ওয়াক্ত ধরে আসায় নানি তাড়াতাড়ি গিয়েছিলেন নামাজ সারতে। আর এরই মধ্যে সারা আকাশ কালো করে হতাশার মতো ঝরঝরে বৃষ্টি যত্নআত্তির কোনো সুযোগ না-দিয়েই ভিজিয়ে দিতে থাকে বৈয়ামগুলো। জোহরা বেগম নানির কুঁচকে আসা গালের ভাঁজে বেশ মানানসই মায়াবি চোখ স্মরণ করতে পারে। ঐ বিকালে বৈয়ামগুলো ঘরে তুলতে তুলতে তাঁর নুয়ে আসা শরীরের অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার মাঝে চোখের বদলে যাওয়া ভাষাটিও তার চোখে ভাসে। আজও সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কোন অনুমান বা আবেগের বশে নানির চোখজোড়া কুঞ্চিত কুঠুরির মধ্যে তিক্ততার এরকম উদ্ধত ফলা হয়ে উঠেছিল।

সেদিন ফজরের নামাজের পর জোহরা বেগম তসবি ঘুরাতে ঘুরাতে তার বহুকাল আগে গত হওয়া নানিকে পরিষ্কার দেখতে পায়। হালগেরস্তি আর মাতবর স্বামীর মাতবরি মিলিয়ে নানিকে এক বড় সংসারই সামলাতে হত। বড়বাড়ির গিন্নিপনায় নানির সুনামও কম হয়নি। কিন্তু অন্য অনেক সময়ের মতো, এখন, এই ভোরের ম্রিয়মাণ আলোর নিস্তব্ধতার মধ্যে জোহরা বেগম তার নানিকে আচারের বৈয়ামের পাশেই বসে থাকতে দ্যাখে। হয়ত তার নিজের চাকরিজীবী স্বামীর দরিদ্র সংসারে হাল-গেরস্তির পরিসর না-পাওয়ায় সংসারের আর দশ রকমের কাজে কুশলি হয়ে ওঠার মরতবা তার কাছে কখনোই ধরা পড়ে নাই। এ বাসার কেউ এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। ঠিকা ঝি রহিমার মা’র আসতেও দেরি আছে। নাতনি রাইসা হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যে উঠে আসবে। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে এসে বসবে দাদির পাশে। এই নবমবর্ষীয়া বালিকা কী কারণে যেন দাদিকে বেশি বেশি পছন্দ করে। আর জোহরা বেগমও রাইসার প্রতি তার পক্ষপাত একেবারেই আড়াল করতে চান না। এই বাসার আর কারো সঙ্গেই তার এতটা যায় না। না, কেউ তার সাথে খারাপ আচরণ করে না। করার কথাও নয়। তার যত্নআত্তিতে তো কোনো ঘাটতি নেই-ই, কোনোরকম ঔদ্ধত্যের কথাও কেউ কখনো ভাবেনি। তিনি নিজেই বরং কেমন যেন একপ্রকার কুণ্ঠায় প্রায় সারাক্ষণই নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকেন।

এরকম কাহিনি আপনারা এত বেশি দেখেছেন যে, এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলা নিরর্থক। এই ঢাকা শহরের অলিগলিতে, বাসাবাড়ি আর ফ্ল্যাটঘরগুলোতে মানবিক সম্পর্কের এরূপ দুর্নিবার টানাপোড়েন হরহামেশাই অভিনীত হয়ে থাকে। মিরপুর ১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এই উচ্চমধ্যবিত্ত ফ্ল্যাটবাড়িতে বিশেষ ব্যতিক্রম কিছুই ঘটে নাই। বছর সাতেক আগে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের সুবেশ কর্মকর্তা বদিউল আলম যখন পাঁচতলার দক্ষিণ-পূর্বদিকের ফ্ল্যাটটি কিনে নেয় ষোল লক্ষ টাকা নগদে, তখনো এমন কোনো আহামরি ব্যাপার ঘটেনি যে তা পৃথকভাবে উল্লেখ করতে হবে। বদিউল আলমের স্ত্রী অহনা যে সুন্দরী হবে, আর বেশ মোটা বেতনে চাকরি করবে একটা টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিতে, তা-ও বেশ স্বাভাবিক ঘটনাই বৈকি। বাংলাদেশের কম বেতনের সরকারি চাকুরেদের বড় ছেলেরা অনেকেই বদিউল আলমের মতো প্রকৌশল বিদ্যায় পাঠ নিয়েছে, এবং বড় ছেলে হবার সুবাদে পিতার মৃত্যুর পর কিংবা পিতা বিদ্যমান থাকতেই সংসারের হাল ধরেছে—এরকম তো বড় কম ঘটেনি। ফলে ভাই-বোন, কন্যা, স্ত্রী আর মাকে নিয়ে বদিউল আলমের এই ফ্ল্যাটবাড়িতে ঠিক কী ধরনের জীবনচিত্র প্রতিনিয়ত মঞ্চস্থ হয়ে চলছে, তা বোঝার জন্য সমাজবিজ্ঞান পড়ার দরকার পড়ে না। এখন আপনাকে যদি স্রেফ এইটুকু জানানো যায় যে, জোহরা বেগমের ছোট পুত্রের নাম ছিল রতন, আর নটরডেম কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে এসে সে তার নামটি পাল্টে শিশির করেছে, তাহলে আপনার অনুমান করতে কষ্ট হবে না যে, এ দেশের ভবিষ্যৎ আর অতীত বিষয়ে তার নিশ্চয়জ্ঞান হয়েছে, আর তাই আমেরিকা-প্রবাসী হবার প্রস্তুতিকল্পে ব্রিটিশ কাউন্সিলে সে নিয়মিত ক্লাস করতে যায়, আর কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে ১৪ নম্বর কুইক সার্ভিস বা ৯ নম্বর সেফটি সার্ভিসে গম্ভীর হয়ে বসে থাকে। কিংবা যদি আপনার জানা থাকে যে, ইঞ্জিনিয়ার বদিউল আলমের কনিষ্ঠা ভগিনী এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে, আর তাকে কলেজ-ড্রেস পরেই বেরোতে হয় সকালে, তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন, নিউমার্কেটের তৃতীয় তলা থেকে ঝেড়েবেছে কেনা জিন্সগুলো পরার সুযোগ কম পাওয়ায় মাঝেমধ্যেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। অবশ্য মানবচরিত্রের বহুস্তর জটিলতা সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল থাকায় আপনি এই দুই তরুণ-তরুণী সম্পর্কে নিশ্চয়ই কোনো একরৈখিক সিদ্ধান্ত নেবেন না। যেমন, আপনার ভাবা ঠিক হবে না যে, রতন ওরফে শিশির নামের যুবাটি নিশ্চয়ই অসৎ-সঙ্গের পাল্লায় পড়েছে, কিংবা কিংস-এ বান্ধবীর সাথে বসে সে ভাইয়ের টাকা উড়ায়। আর সামিয়ার ক্ষেত্রে একটা তথ্য তো মনে রাখতেই হবে—জোহরা বেগমের জন্য আচার তৈরির কয়েকটি দারুণ রেসিপি সে তার এক বান্ধবীর মা’র কাছ থেকে নিজে থেকে সংগ্রহ করে এনেছে।

কিন্তু এই ফ্ল্যাটটি কেমন যেন বেশি সাজানো-গুছানো। নিজের আগেকার দরিদ্র সংসারের তুলনায় বেশ কতকটা দায়দায়িত্বহীন। সবাই নিজনিজ মতো খায়-দায়, ঘুমায়, বাইরে যায়,কাজ করে। চৌকোণা ফ্ল্যাটটার চারকোণায় চারটা ঘর। মাঝে এমাথা-ওমাথা লম্বা খোলা জায়গা। লম্বা জায়গাটার চারকোণায় রুম চারটা ঠিক জায়গামতোই থাকে। দেয়ালের সাথে এখানে-ওখানে জুতমতো লাগানো আলমিরা-রেক-দেরাজ। সবকিছুই নিয়ম মেনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। আর ঘরের লোকগুলোও কি ঘরটার মতো হয়ে গেল? সকাল আটটার মধ্যেই পুরা ঘর ফাঁকা। সবাই যার যার কাজে বেরিয়ে যায়। থাকে শুধু রহিমার মা। সে-ই কাজকর্ম করে। জোহরা বেগম টুকটাক হাত লাগান, দেখাশোনা করেন। খালি ঘর অবশ্য তার জন্য ভালোই হয়েছে। প্রায়ই বসে পড়েন বড়-ছোট নানান কিসিমের গামলা আর বৈয়াম নিয়ে। দেশের বাড়ির মৌসুমি কাজ এখানে গত পাঁচ বছর ধরে একটা নিত্য-নৈমিত্তিক মূর্তি পেয়েছে।

জোহরা বেগম পুত্র-কন্যা পরিব্যাপ্ত হয়ে স্বামীবিহীন অভাবহীন জীবনযাপন করতে থাকেন। সকলের অব্যাহত চোখের উপর বেশ প্রান্তীয় গৃহিণী হয়ে। মিরপুর ১১ নং বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এই সচ্ছল ফ্ল্যাটে এরকম দায়িত্বকর্তব্যরিক্ত প্রৌঢ়ার গিন্নিপনার কী অবকাশই বা আর থাকতে পারে। এই নিস্তরঙ্গ, কপালের বামপাশে কালশিটে-পড়া জোহরা বেগম প্রায় অকস্মাৎ পরিবারের আর আশপাশটার মনোযোগের কেন্দ্রে আসীন হন। আপনারাও নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারবেন, গেলবার বিখ্যাত আচারকোম্পানি ‘মাসকাট’ ‘দিনের শুরু’ পত্রিকার সাথে যৌথ উদ্যোগে আচার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। জনৈকা জোহরা বেগম কাঁপা কাঁপা হাতে অনুষ্ঠানের সভানেত্রী প্রফেসর ইলোরার হাত থেকে পুরস্কারের চেক এবং ক্রেস্ট গ্রহণ করছে—এরকম ছবি পত্রিকাটি পরের দিন ফলাও করে প্রচার করায় ‘মাসকাট’ কোম্পানি এবং বিশেষত ‘দিনের শুরু’ পত্রিকার জনহিতকর উদ্যোগ বিষয়ে আপনারা মধুর কেন্টিন অথবা শাহবাগ অথবা ভুরুঙ্গামারি থানা সদরে হোসেন আলির দোকানে চা খেতে খেতে আলাপ করে থাকবেন। স্বভাবতই প্রতাপশালী কোম্পানি আর দৈনিকটি এসব আলোচনার অস্থিমজ্জা দখল করে থাকায় জনৈকা জোহরা বেগম কে-যেন-একজন হয়ে গল্পরাশির আশপাশটায় ঘুরাঘুরি করতে করতে মিলিয়ে যায়। কিন্তু ঐ দিন সন্ধায় আপনাদের মধ্যে যারা মিরপুর ১১-র ৩২ নম্বর বাড়ির ৪-বি ফ্ল্যাটে উপস্থিত ছিলেন, তাদের জানতে বাকি নাই, জোহরা বেগমকে ঘিরে একটা ছোটখাট আন্তরিক উৎসব বেশ জমে উঠেছিল। নিশাত জাহান আরার উচ্ছ্বাসটা বেশি হলেও আন্তরিক ছিল; আর অন্য সবাই—আমন্ত্রিত বা এ বাড়ির—বিনয় ও শ্রদ্ধায় গ্রহণ করেছিল জোহরা বেগমকে। কেউ যদি তখন খুব মনোযোগ দিয়ে তার ছোট ছেলে কিংবা মেয়ের চোখের নড়াচড়া পরীক্ষা করত তাহলে দেখতে পেত, তাদের চেনা মাকে একছটা অচেনা আমেজে তারা দেখছে।

ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য বেশ কিছুদিন আগে। সেদিন দুপুরে অহনা তার কয়েকজন বান্ধবীকে খেতে বলেছিল। জোহরা বেগমকেও তারা সঙ্গে বসিয়েছিল। আর এ বাসার স্বাভাবিক বাস্তবতার মতো বেশ কয়েকপদ আচারও হাজির ছিল টেবিলে। নিশাত নামকরা কোম্পানির মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। খানা-খাদ্যে তার রুচিশীল আগ্রহ আছে। আগ্রহ আছে খালাম্মার আচারের কৌটায়ও। আজ গরুর মাংসের ভুনার সাথে পরিবেশন করা একটা আচার তাকে বিশেষভাবে আপ্লুত করে। জিব্বার মাঝবরাবর বেশি করে আচার তালুর সাথে কায়দা করে চেপে রেখে গলার দিকে রস নামিয়ে দিতে দিতে সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে থাকে। এই মেয়েটার আমোদ-আল্লাদ তার ঢলঢলে মুখের মতোই বেশি বেশি। পেঁয়াজের ভিত্তিতে বিচিছাড়া তেতুলমাংশের কাইকে মিহি আর মিষ্টি করে সরিসার তেলে জবজবে করে তৈরি করা হয়েছে এ আচার। টেবিলে বাটি রাখার সময় জেহরা বেগম বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন, এটা গরুর মাংসের সাথে নেয়াই ভালো। নিশাতের উচ্ছ্বাস মেখে টেবিলের বাকিরা এই আচারের দিকে মনোযোগী হয়, তুলে নেয়, তার উচ্ছ্বাসকে অনুমোদন করে, আর চোয়ালের উঠানামায় কোনো বিরাম না দিয়ে গল্পসমেত খেতে থাকে। নিশাত কিন্তু টাকরায় জিব্বা চেপে রেখেই অনেকক্ষণ খাওয়া বন্ধ রাখে, সবার খাওয়া চেয়ে দেখে একটু-আধটু করে, আর কিয়ৎক্ষণ পর আবার শরীর ও গলায় ঢেউ খেলিয়ে ঘুরে তাকায় জোহরা বেগমের দিকে—পেঁয়াজ বেজ করে বানানো, তাই না খালাম্মা? বেশ একটু শব্দ করেই জিজ্ঞাসা করে নিশাত। জোহরা বেগম প্রথমে হয়ত কথাটা বুঝতে পারেন না। একটু সময় লাগে কুণ্ঠা ভেঙে ঘাড় কাত করতে। সম্মতি পেয়ে তাকে আর পায় কে? তার সেই ডগমগ অবস্থা একসময় শেষ হয়, খাওয়াও শেষ হয়, কিন্তু আচার প্রসঙ্গটি শেষ হয়নি। আচার প্রতিযোগিতার খবরটি সেই দিয়েছিল; আর খালাম্মার কাছ থেকে নিজেই রন্ধন-প্রণালি সংগ্রহ করে নিজের ভাষা ও চেষ্টায় তৈরি করেছিল কয়েকটি রেসিপি। দু-চার ছটা রং মেশাতেও ভোলেনি।

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আশির দশকের গোড়ার দিকে হাতিয়া থানার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কলম করার ব্যাপক প্রচলন হয়েছিল। বিশেষ করে দেশি বরই গাছে বোল বরইয়ের কলম লাগিয়ে বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই লম্বাটে বড় বড় বরই ফলানোর সাফল্যের প্রেক্ষাপটে ৩ নং সুখচর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিকর্মী আবুল আসাদ পুরস্কৃত হয়েছিল। চারদিকের ম্যাড়ম্যাড়ে দেশি গাছগুলোর স্মার্ট ও ফলনশীল হয়ে ওঠার সেই কর্মমুখর দিনগুলোতেও রহমানিয়া মাদ্রাসার সিনিয়র মোদাররেস হাজি বেলায়েত মাথায় ঈষৎ ডান দিকে হেলানো কিস্তি টুপি পরে বাম হাতে ক্যাসিও ওয়াটার প্রুফ ঘড়ি আর ডান হাতে বাজারের থলিসহ খানিকটা ডান দিকে হেলে সাহেবানিবাজার থেকে বাড়ির পথে যাতায়াত করতে থাকেন। বস্তুত সৌন্দর্য ও ফলনশীলতার এসব সাম্প্রতিক আয়োজন অনেকদিন তাঁর দৃষ্টির অগোচরেই রয়ে যায়। সে বছর মাঘ মাসের শেষ দিকের এক শুক্রবার সকালে অনেক বেলা পর্যন্ত কুয়াশায় চারদিক অগম্য থাকার ফলে তাঁর বাজারে যাবার বিশেষ বিলম্ব হয়ে যায়। হাতের ঘড়িটি যথেষ্ট বিলম্ব না হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ দাখিল করলেও জুমার নামাজের প্রস্তুতির ব্যাপারে তিনি অকারণ শঙ্কা বোধ করতে থাকেন, আর দ্রুত বাড়ি পৌঁছার আভ্যন্তর তাগিদে রহমানদের বাড়ির পিছন দিক দিয়ে ক্ষেতের আইল বরাবর দ্রুত পথ চলতে থাকেন। সহসা ভারি একটা কিছু তাঁর কপালের ডানপাশটা আঘাতের ভঙ্গিতে ছুঁয়ে গেলে সময় নষ্ট হবার সম্ভাবনা মনে চেপে ধরে তাঁকে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। তখন ফলভারানত বরই গাছের মিষ্টি অবয়ব তাঁর নজরে আসে। তিনি বুঝতে পারেন একগোছা লম্বা ছিপছিপে বরই তাঁকে আঘাত করেছে। পুরো ব্যাপারটা তাঁকে এতটাই অভিভূত করে যে সে বছরই দরকারি খোঁজখবর শেষে লোক ডেকে তিনি তাঁর ঘরের উত্তর-পূর্ব দিকে ডালপালা ছড়িয়ে ঈষৎ নতমুখ দাঁড়িয়ে থাকা বরই গাছটির ডালপালা ছেটে সম্ভাব্য সবগুলো প্রাঙ্গণ বোল বরইর কলমে সজ্জিত করে ফেলেন। আপনারা হয়ত আঁচ করতে পারবেন, তাঁর সেজ মেয়ে জোহরার কথা এ সময় তাঁর বারবার মনে হয়েছে, যদিও তিনি এ বিষয়ে একটি বাক্যও আগাম উচ্চারণ করেননি। কপালে বিদেশি বড়ইর মিঠাকড়া আঘাত তাঁকে হয়ত মেয়ের সন্তুষ্টির ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছিল। এই বাড়িতে আরো দু-চারটি বরই গাছ থাকলেও এই গাছটিকেই সবাই একমাত্র গাছ রূপে সমীহ করে আসছে। প্রতিবেশি আর কিছু আত্মীয়-পরিজনকে বিলানোর পরও দেদার বরই প্রতিবছরই থেকে যেত নুন-মরিচ দিয়ে ঘরের দরোজার সিঁড়িতে বসে টপাটপ খাওয়ার জন্য, আর অবশ্যম্ভাবীভাবে একটা অংশ বিচিত্র সব আয়েশি আর নিখুঁত পরিচর্যার মধ্য দিয়ে আচার রূপে ঢুকে যেত বৈয়ামে। জোহরার সাথে গাছটির একটু বেশি মালিকানাস্বত্ব জুড়ে গিয়েছিল এই আচারের বেশেই। আরেকটা কারণ অবশ্য ছিল। গাছের যে স্থানটায় দুটো মোটা ডাল উত্তর-দক্ষিণ দুদিকে ভাগ হয়ে বসার একটা সুবিধাজনক আসন বানিয়ে রেখেছে, সে পর্যন্ত তিন লাফে উঠে গিয়ে কিংবা দরকার হলে ডানে-বাঁয়ে আরো একটু এগিয়ে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বাছাই করা বরই পাড়ায় এ মেয়ের জুড়ি ছিল না। বাপের নজর এড়িয়েই সে কাজটা করত। তবু হাজি সাহেবের চোখে পড়েছে অনেকবার। এত ডাঙর মেয়ের গাছ-বাওয়ার দৃষ্টিকটু দিকটা তাঁর মনেও এসেছে। কিন্তু কেন যেন জোহরাকে তিনি কিছু বলেন নাই। এখন বাপবেটি সমান আগ্রহে ডাল-ছাটা ঠুইড্ডা গাছে নতুন সব সম্ভাবনার ঝিলিক আবিষ্কার করে পৃথক পৃথকভাবে রোমাঞ্চিত হতে শুরু করে। আর তাদের রোমাঞ্চকে অবারিত করতেই বুঝি তাগড়া সব ঝকঝকে নতুন ডালে গাছটা বছর না ঘুরতেই ঝাকড়া হয়ে ওঠে। আর ফলভারনত উর্বর তরুণীর মতো সুঢৌল লম্বাটে বরইয়ে সয়লাব হয়ে যায়। এই গাছের পুরানা ভোক্তারা দ্রুত ভুলে যায় পুরু গোলগাল পুরুষ্ট দেহ, টকটক মিষ্টি স্বাদ, আর হলদেটে লাল আভার ঘন সৌন্দর্য। পশ্চিমা তরুণীর লম্বাটে চোয়ালের সৌন্দর্যে সিøম, স্মার্ট দেহবল্লরী জাগিয়ে নতুন ডালগুলোতে ঝুলতে থাকে বিপুল আস্বাদ। জোহরার বৈয়ামগুলা ধোয়ামোছার একটা নিখুঁত পর্ব পার হয়ে বারান্দার চালে শুকাতে থাকে। বৈয়ামের বাহারে যুক্ত হয় নতুন কয়েকটি। পুব-দক্ষিণ কোণায় তির্যকভাবে আকাশের দিকে উঠে গেছে যে ডাল দুটি, সেগুলোতে ফলন হয়েছিল ভালো, বোধ করি রোদ-বাতাসের আদরে বরইগুলোর অন্তত পুব-দক্ষিণ পাশ কমনীয় এক সাদাটে মসৃণতায় চোখ ধাঁধিয়ে দেয়ার জন্যই জোহরা তার আচারের জন্য এ দুটি ডাল বরাদ্দ করে রাখে। আরেকটা বাস্তব কারণও অবশ্য ছিল। বেশ উপরে থাকায় বরই পাড়ার কঞ্চিগুলো নিচ থেকে এ দুই ডালের নাগাল পেত না। তাই ছুটা বরই শিকারির অভিলাষ থেকে তারা সহিসালামতেই রেহাই পেয়ে গিয়েছিল। গভীর মনোযোগ না দিয়েও আপনাদের মধ্যে অভিজ্ঞরা আন্দাজ করতে পারবেন, জোহরার মিশন সফল হয় নাই। বড়-লম্বাটে গোটা ফলগুলো তিন দিবস চুলায় জ্বলার পরও নমনীয় কোমলতা হাসিল না করে অটল গাম্ভীর্যে বলবৎ থাকার পর দ্বিতীয় দফায় নতুন পথ ধরে সে। প্রতিবেশী বান্ধবী আকলিমাকে সঙ্গে নিয়ে একটা পুরা রাত পার করে দ্যায় ছোটখাট এক গামলা বরইয়ের পৃষ্ঠদেশকে চাক্কুর নির্মম-নিপুণ আদরে ফুঁড়ে ফেলতে। তার অভিজ্ঞতা বলছিল এতে কাজ হবে। কিন্তু তাকে তৃতীয় দফায় রাত জাগতে হয়। এবার বিচি থেকে মাংশকে কুচি কুচি করে আলগা করা হয়। কিন্তু তার পরম যতœকে পুরাপুরি উপেক্ষা করে আর নমনীয় আনুগত্যের গভীর আকাক্সক্ষাকে বিন্দুমাত্রও আমলে না এনে টুকরাগুলা ঘাড়-ত্যাড়া বন্ধুর মতো আয়ত্তাতীত থাকে। সত্যি বলতে কী , বিরাট ব্যর্থতা ও হতাশার মধ্যেও জোহরা বারকয়েক না হেসে পারেনি। তার মনে এক রকমের দার্শনিক ভাবের উদয় হয়েছিল—যে সুন্দর বশ মানে না তার আভিজাত্যে কী লাভ! এ সময় হয়ত তার বারবার হাবিবের কথা মনে হয়েছে। তার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই সহপাঠী হাবিব। ঘাড়ত্যাড়া হাবিব। কেন মনে হয়েছে কে জানে। অবশ্য আপনারা আন্দাজ করতে পারবেন, জোহরার এই মিশন একেবারে বিফলে যায় নাই। সম্ভবত আকৃতি-সাদৃশ্যের জন্যই পরে সে বরইর বদলে জলপাই ট্রাই করেছিল।


পত্রিকা থেকে সেবার পরের সপ্তাহে ফলো-আপ করার জন্য একটি মেয়েকে পাঠিয়েছিল; আপনারা জানেন, এরকমটাই রেওয়াজ, আর আন্দাজ করতে পারবেন, এই মেয়েটি চটপটে সপ্রতিভ হবে, আশপাশে দু-একটা টুংটাং কুশল বিনিময়ের পর সে জোহরা বেগমের সাথে একান্তে কথা বলার কায়দা করে নিতে পারবে। আপনার যদি পর্দার আড়াল থেকে কিংবা জানালার ফাঁক দিয়ে এ ধরনের সাক্ষাৎকারপর্ব দেখার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকে থাকে, এ ধরনের জোহরা বেগম আর নুসরাত শারমিনদের মধ্যকার কথোপকথন, তাহলে আপনি চট করে বলে দিতে পারবেন, শুরুতে জোহরা বেগমের কুণ্ঠাটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। হয়তবা এই কুণ্ঠা নিজের অপ্রমিত ক্রিয়াপদগুলোর জন্য, কিংবা হয়ত এমনি এমনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সাবলীলভাবেই কথা বলে যেতে পারবে। কারণ এমনও হতে পারে যে ব্যাকপকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে কথা বলার সময় মেয়েটির অন্য সব অস্তিত্বকে ছাপিয়ে জিন্স প্যান্টটি বড় হয়ে উঠায় নিজের ছোট মেয়ের সাথে এই মেয়েটির মিল লক্ষ করে তার স্বস্তি পাওয়া উচিত না-কি অস্বস্তি, তা ঠিক করতে না পারলেও অপরিচয়ের আভাসটা অকস্মাৎ কম মনে হওয়ায় প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চালাতে তার বিশেষ অসুবিধা হয়নি। মাঝে শুধু একবার পান খেতে গিয়ে চুনের কৌটা থেকে ডানহাতের মধ্যমা দিয়ে চুন তুলে দাঁতে আঁচড়ে নেয়ার পর আচমকা থতমত খেয়ে যাওয়াটা যতই গৌণ হোক, আপনার নজর এড়াবে না; এভাবে চুন নেয়াটা তার ছোট মেয়ে বেশ অপছন্দ করে। তবে জোহরা বেগমকে আপনি নির্ভার সজীবতায় কথা বলতে দেখেছেন নিশ্চয় ঠিক তখনই, যখন কথা হচ্ছিল প্রতিযোগিতায় পাঠানো রেসিপেগুলোর কার্যবিধি নিয়ে। তিন নম্বর রেসিপির আপাত-অপ্রয়োজনীয় উপাদান দুটো ঠিক কতটা আঁচে কী কারণে ব্যবহারযোগ্য, এ ধরনের এক চৌকস প্রশ্নের উত্তেজনায় মেয়েটি যখন আরামে সোফার পেছনভাগে হেলে বসেছিল, তখন আপনি দেখেছেন জোহরা বেগম জনৈক অভিজ্ঞ হেডমাস্টার ঢঙে ব্যাপারটা গুছিয়ে বলছিল, যেনবা সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তার বড় ছেলের সঙ্গে সকালবেলার রুটি-ভাজি খাচ্ছে। আপনি যদি নিপুণ দর্শক হন তাহলে এসময় জোহরা বেগমের মুখে কৌতূহল আর মজার এক যুগল লীলা প্রত্যক্ষ করে থাকতে পারেন। সেই লীলায় প্রশ্নকারিণীর প্রতিভার স্বীকৃতি আছে; কেননা এই রেসিপিতে ঠিক এ অংশটাই সবচেয়ে মজার। কিন্তু আপনি অন্তর্যামী না হলে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারবেন না যে জোহরা বেগমের অন্তর্দেশে এ সময় অন্য এক, বলতে কী, বিপরীত ভাব তার প্রতিভা আর নিয়ন্ত্রণ-নিরপেক্ষভাবেই প্রবহমান থাকবে, যা তাকে স্বভাবতই স্মৃতিভারাতুর আর ব্যক্তিগত করে তুলবে। এতটাই যে, এই প্রশ্নের সাফল্যের পর মেয়েটি যখন এসব রেসিপির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবে, তখন জোহরা বেগম আলগাভাবে কিছু একটা বলবেন, কিংবা হয়ত তেমন কিছুই বলবেন না, কিন্তু মেয়েটি বুঝে নেবে যে এ বিষয়ে তিনি কখনো ভাবেননি; এবং এরকমই হওয়ার কথা ভেবে, একটা স্টোরি তৈরি হওয়ার মতো যথেষ্ট উপাত্ত হাতে পাবার সান্ত¡নায় টেপরেকর্ডার গোছাতে গোছাতে মেয়েটি বিদায় চাইলে জোহরা বেগম বিদায়ও জানাবেন। কিন্তু তার মনের স্মৃতিভারাতুর ব্যক্তিগত অংশে এসবের ফলে বিশেষ ব্যত্যয় ঘটবে না। এসব রেসিপির বিবরণ অংশ আর তৈরি হয়ে যাওয়া আচারের মাঝখানে তার নানির মুখটা কেন যে এ অবেলায় আড়াআড়ি ঝুলে আছে তা কিছুতেই বুঝে উঠতে না পেরে জোহরা বেগম হেসে ফেলবেন। সে হাসি খেজুর রসের মিঠাইয়ের মতো মিষ্টি আর মোলায়েম। খেজুর গুড় দু-চারবার জোহরা বেগমও তৈরি করেছেন। কিন্তু তাতে কোনো বিশেষত্ব আনতে পারেন নাই। তাদের পরিচিত অন্তরঙ্গ আর সুদূরতম মহলগুলোতে এ বাবদ প্রায় একচেটিয়া খ্যাতিটুকু শুষে নিয়েছিল তার নানি। সাহেবানিবাজারে আপনার যদি খেজুর গুড় কিনতে যাবার কোনো অভিজ্ঞতা থেকে থাকে—হয়ত সেটা নানিজানের এন্তেকালের বেশ ক-বছর পরেই—তাহলে আপনি ক্রেতাবিক্রেতা মহলে নানিজানের মিঠাইয়ের সুনাম আর ‘সেরকম গুড় আর কৈ’ ধরনের আফসোস শুনে থাকবেন। সত্যি বলতে কী নানিজান বাজারে বিক্রির জন্য মিঠাই বানাতেন না। ঘরের সাংবাৎসরিক খাবারের মিঠাইটাই বানাতেন নিজ হাতে। টিন ভর্তি করে সার বেঁধে মিঠাই রাখা হত দরমার উপর। একপাশ থেকে টিনগুলো ক্রমে খালি হতে থাকত। কিন্তু পরের বছর শীত এসে যাওয়ার আগে আগে শেষদিকের টিনগুলো খোলার আগেই সবাই জানত এই টিনগুলোর নিচের দিকে ঘন কালচে মিঠাইয়ের নিচের স্তরে জমা হবে চিনির মতো শক্ত দানা, আর কখনো কখনো সে সব দানার একত্রগ্রথিত রূপ আকারে রীতিমত মিছরির বড়সড় চাক হয়ে স্বাদ আর গল্পের উৎস হয়ে শুয়ে থাকবে। বারবাড়িতে নারকেল-মিঠাইয়ের ভাত খেয়ে কামলারা তাদের বৌ-বেটিদের কাছে সে মিঠাইয়ের খোরবাস পৌঁছে দিত, আর দাওয়াতি গৃহস্থরা তাদের ঘরের মিঠাইয়ে সে স্বাদ না পেয়ে ‘ঘরে যতসব অলক্ষ্মী-অকর্মার বাসা’ বলে প্রায়শ শোরগোল তুলতে থাকলে তারা দল বেঁধে নানিজানের দ্বারস্থ হত এ মিঠাই তৈরির ক্রিয়াকৌশল শিখতে। জোহরা বেগম মনে করতে পারেন, আসলে তার নানিকে বলতে শোনেন একটা সাদামাটা পদ্ধতি—হাড়িতে রস ঢেলে ক্রমাগত জ্বাল দিয়ে যাওয়া; এর মধ্যে যে সব জায়গায় বিশেষত্ব থাকতে পারে—যেমন মাঝামাঝি দু-চার জায়গায় আগুনের আঁচ কমিয়ে দেয়া, আর বিশেষ বিশেষ সময়ে বাগান থেকে ঝাট দিয়ে আনা মান্দারের পাতা দিয়ে জ্বাল দেয়া ইত্যাদি খুব বিস্তারিত আর নিখুঁতভাবে বলেন। এসব বৌ-ঝিয়েরা পরম যতেœ নিজ- নিজ বাড়িতে এই রেসিপি এস্তেমাল করতে থাকেন আর বছরের পর বছর তাদের মিঠাই সরল তরল আকারে পরের শীত পার করে দ্যায়। ফলে মিশরিদানার জন্য—কঠিনের জন্য—তাদের সবার হৃদয় বিগলিত হতে থাকে, আর নানির মিঠাইয়ের খুশবাই সাহেবানিবাজার ছাড়িয়ে হয়ত ছড়িয়ে পড়ে রামচরণ বাজার পর্যন্ত। রেসিপি কথাটি অবশ্য জোহরা বেগম প্রথম শুনেছিলেন বৌ-এর বান্ধবীর মুখে; আর বুঝতে পেরেছিলেন, রেসিপি আগেও ছিল, তবে নাম ছিল না। তো, সেই রেসিপির সামনে নানিবাড়ির আশপাশটার বৌ-ঝিদের উৎকর্ণ মুখ জোহরা বেগম অনেকবার দেখেছিলেন, যেমন আজ দেখলেন এ মেয়েটির চঞ্চল আঁখিতারা। বলা আর শোনার মাঝখানটায় অনবরত তার নানির মুখ ঝুলে থাকতে দেখে জোহরা বেগম এ ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিমের বারান্দার প্রতি এক প্রচণ্ড টান অনুভব করেন। তাকে সাজিয়ে রাখা বৈয়ামগুলো তাঁকে প্রচ- অনুভবে আকর্ষণ করতে থাকে। তিনি সেদিকে ছুটে যান আর নাতনি রাইসাকে দেখতে পান। রাইসা হয়ত বৈয়ামগুলো দেখছিল, কিংবা আচার, কিংবা বৈয়ামের গায়ে আঁকা নিজের ছবি; কিংবা হয়ত এমনিতেই এসেছিল বারান্দায়। জোহরা বেগম কিন্তু বৈয়াম, আচার, ছবি আর বারান্দাটার সাথে জড়ানো-মিশানো এক রাইসাকে দ্যাখেন। পরম এক স্বস্তি আর আনন্দে এই রাইসাকে তিনি বুকে আঁকড়ে ধরেন—রেসিপি তৈরি থেকে পত্রিকার মেয়েটির সাথে কথা বলা পর্যন্ত অনেক কিছুর মধ্যেই হয়ত এ স্বস্তি আর আনন্দের তৃষ্ণা তৈরি হয়েছিল।
=================================
মোহাম্মদ আজম
জন্ম: ২৩/৮/১৯৭৫

mazam1975@hotmail.com
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষক।
====================================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম   গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান  গল্প- ‘অপঘাতে মৃত্যু’ ও ‘সাদামাটা’ by লীসা গাজী   গল্প- 'দ্বিতীয় জীবন' by ইরাজ আহমেদ  গল্প- 'পুষ্পের মঞ্জিল' by সাগুফতা শারমীন তানিয়া   গল্প- 'একশ ছেচল্লিশ টাকার গল্প' by কৌশিক আহমেদ  গল্প- 'একে আমরা কাকতালীয় বলতে পারি' by মঈনুল আহসান..   গল্প 'গহ্বর' by জাহিদ হায়দার    গল্প- 'পুরির গল্প' by ইমরুল হাসান  গল্প- 'নওমির এক প্রহর' by সাইমুম পারভেজ  গল্প- 'মরিবার হলো তার সাধ' by আহমাদ মোস্তফা কামাল   গল্প- 'নিষুপ্ত শেকড়' by নিরমিন শিমেল   গল্প- 'লাল ব্যাসার্ধ্ব' by শামীমা বিনতে রহমান  গল্প- 'সেদিন বৃষ্টি ছিল' by মৃদুল আহমেদ   ক. কিছুদিন হয় সেই নগরে কোন বৃষ্টি হচ্ছিল না। কিছুদ.. গল্প- 'তুষার-ধবল' by সায়েমা খাতুন  গল্প- 'কোষা' by পাপড়ি রহমান  গল্প- 'কর্কট' by রাশিদা সুলতানা   গল্প- 'তিতা মিঞার জঙ্গনামা' by অদিতি ফাল্গুনী  গল্প- 'সম্পর্ক' by তারিক আল বান্না  গল্প- 'অনেক দিন আগের দিনেরা' by রনি আহম্মেদ  গল্প- 'গাদি' by ইফফাত আরেফীন তন্বী   গল্প- 'কামলাঘাটা' by অবনি অনার্য   গল্প- 'কক্ মানে মোরগ: উদ্ভ্রান্ত মোরগজাতি ও তাহাদে.    গল্প- 'ভরযুবতী ও বেড়াল' by সাগুফতা শারমীন তানিয়া  গল্প- 'অমর প্রেম অথবা আমার প্রেম' by ইমরুল হাসান  গল্প- 'সরল রেখা' by শামীমা বিনতে রহমান   গল্প- 'রুখসানার হাসব্যান্ড' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'ভ্রম অথবা ভ্রমণ বিষয়ক গল্প' by ইফফাত আরেফীন.   গল্পিকা- 'সেল প্রেম' by আবদুশ শাকুর



bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ মোহাম্মদ আজম


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.