ইসরাইলে কী ঘটছে by ইয়োসি মেকেলবার্গ

সরকারি দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গত দু’মাস ধরে প্রতি শনিবার সাপ্তাহিক প্রার্থনার পর হাজার হাজার ইহুদি রাস্তায় নেমে আসছেন। আরও ধনী হওয়ার জন্য নিজেদের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিকরা সুবিধা নিচ্ছেন। পুলিশের এমন বহু তদন্তের বিষয়ে গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। এটি একটি বহুবিস্তৃত বিষয় যা রাজনীতিকদের বড় একটি অংশকে গ্রাস করে ফেলেছে; যার মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কিছু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, নেসেট বা পার্লামেন্ট সদস্য এবং সিটি মেয়ররা পর্যন্ত। এমন কোনো দিন যাচ্ছে না, যেদিন আর্থিক সুবিধা বা অন্য কোনো লাভের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের নতুন খবর প্রকাশিত হচ্ছে না। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ব্যাপকতায় যে কোনো ব্যক্তির মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে, পুলিশ কি অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করার আদৌ সময় পাচ্ছে? এবং আরও খারাপভাবে দেখলে এমন প্রশ্ন করতে হচ্ছে, এসব খবর ইসরাইলি সমাজ ও এর ভবিষ্যতের বিষয়ে কী প্রকাশ করছে?
দুর্নীতি ও অপশাসন ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদে ভালো থাকা এবং টিকে থাকাকেই হুমকির মুখে ফেলছে। দেশটির স্বল্প সময়ের ইতিহাসজুড়ে ইসরাইলের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি কখনও অপরিচিত কিছু ছিল না। এ ধ্বংসাত্মক অপকর্মটি সাম্প্রতিক সময়ে বিশাল আকার ধারণ করেছে। গত এক দশকে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাবেক অর্থমন্ত্রী, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং অনেক মেয়রকে ঘুষ নেয়ার দায়ে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সর্বোপরি একজন সাবেক প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। নির্বাচিত বা নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের আচরণে সাধারণ মানুষ যেভাবে বিরক্তি প্রকাশ করছে, তা যে একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, জনগণের প্রতিবাদ মিছিলগুলোই সেটির ব্যাখ্যা করছে। ২০১১ সালের পর এমন জমায়েত আর দেখা যায়নি। ওই বছর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং যৌক্তিক ভাড়ায় বাসস্থান না পাওয়া, এমনকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। দুর্নীতিসংক্রান্ত তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ‘দ্য নেতানিয়াহু পরিবার’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ধারাবাহিক টিভি নাটক। খোদ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জড়িয়ে আছেন এমন অন্তত বড় দুটি বিষয় এবং তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলে ঘটা আরও বড় দুটি ঘটনাকে দুর্নীতি-আচরণ হিসেবে সন্দেহ করছে পুলিশ। যদিও শক্তিশালী ইঙ্গিত আছে যে, তারা দামি অনেক উপহার ও লাখ লাখ শেকেল (ইসরাইলি মুদ্রা) ব্যয়বহুল সিগারেট, মদ ও অলঙ্কার আকারে দেশে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে এমন বন্ধুদের কাছ থেকে নিচ্ছেন। একজন পত্রিকা প্রকাশককে রাজনৈতিক আনুকূল্যের বিপরীতে অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রস্তাবও অনৈতিক ও অনুপযুক্ত। এটি এমন একজন নেতার দৃষ্টান্ত, যিনি দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় আছেন এবং নিজের ও পরিবারের ভোগবাদী লাইফস্টাইলের সমর্থনের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। অধিকারের একটি শক্তিশালী বোধের অনুপস্থিতির পাশাপাশি বিচারের যে কোনো ধারণার অনুপস্থিতির ইঙ্গিতই কেবল নয়, আরও বেশি কিছুর লক্ষণ আছে দেশটিতে। যদি জনসমক্ষে এমন আচরণ প্রকাশিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়ানোর মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া হয়, তিনি কি নিজের সিগারেট ও মদ নিজে কিনতে পারতেন না? কিন্তু এটি কেবল নেতানিয়াহুর বেলায় নয়। তার স্ত্রী সারাও নেতানিয়াহুর জন্য কাজ করে এমন কর্মীদের প্রতি বাজে ব্যবহারের জন্য খবরের শিরোনাম হচ্ছেন প্রতিনিয়ত এবং তাদের বড় ছেলে ইয়াইরের ক্রমবর্ধমান বাজে আচরণও উদ্বেগের কারণ।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে শোনা গেছে, নেতানিয়াহুর ছেলে একটি স্ট্রিপ ক্লাবের বিল দেয়ার জন্য তার বন্ধুকে (বড় গ্যাস ব্যবসায়ীর ছেলে) বলছে- এটি তো সামান্য বিনিময়, অথচ গ্যাসের একটি চুক্তি পাইয়ে দিয়ে তার বাবা ওই বন্ধুর বাবাকে বিলিয়ন ডলারের লাভ এনে দিয়েছে। ওই রেকর্ডিংয়ে নারীদের বিষয়ে নেতানিয়াহুর ছেলের মন্তব্য এবং করদাতাদের অর্থব্যয়ে রাতভর তার উল্লাস-ছোটাছুটি ও বডিগার্ড লালন করার বিষয় শুনে রাস্তার বিক্ষোভকারীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন। মাতাল অবস্থায় সে কী বলেছে- তার বিষয়বস্তু বর্তমানে পুলিশের গভীর তদন্তের বিষয়। জনগণের অর্থের অপব্যবহার ও ঘুষ নেয়া-দেয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের তদন্তকারীদের নিয়মিত তার সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করতে দেখাটা জাতীয় বিব্রতকর অবস্থা ও লজ্জাকর বিষয় হয়ে পড়েছে। প্রতিবাদকারীদের কাছে এটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে যে, সরকার পরিচালনায় তার শারীরিক সামর্থ্য আছে কিনা। কেবল প্রধানমন্ত্রীই নয়, তার আশপাশে যারা আছেন তারাও অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এমনকি তার আইনজীবীরা- তাদের বিরুদ্ধেও জার্মানি থেকে ডুবোজাহাজ কেনার একটি চুক্তি থেকে প্রচুর ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। কৌশলগতভাবে অপ্রয়োজনীয় হওয়ার পরও অনেক অর্থ ব্যয় করে ওই চুক্তির আওতায় আরও ডুবোজাহাজ জার্মানি থেকে কেনে ইসরাইল। এর বাইরে নেসেটে নেতানিয়াহুর ওপর প্রভাব বিস্তারকারী ও তার ঘনিষ্ঠ ডেভিড বিটানকেও তেলআবিবের রিশন লেটজিওন শহরের ডেপুটি মেয়র থাকাবস্থায় সন্দেহজনক ঘুষ গ্রহণ, অর্থপাচার ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। বিষয়টিকে আরও জটিল করার জন্য জোট সরকারের হুইপের পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার আগে বিটান এমন একটি আইন তৈরির জন্য চাপ প্রয়োগ করেছেন, যাতে করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শেষ করার পর কাউকে অভিযুক্ত করার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে সুপারিশ করা থেকে পুলিশকে বিরত রাখা যায়। কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা জনগণকে প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেনি; বরং কতগুলো ঘটনা যা কিনা মানুষকে অনুধাবন করিয়েছে যে, তাদের রাজনৈতিক পদ্ধতি মূল থেকে পচে গেছে- এটিই তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। যখন কঠোর পরিশ্রমী সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা ও ভাড়া পরিশোধের মতো বিষয় অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন সামান্য রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী এলিটরা ব্যতিক্রমীভাবে উচ্চমানের জীবনযাপন করছেন এবং সুবিধাজনকভাবে একে অপরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। নেতানিয়াহু তার সমস্যাগুলোর সমাধান করতে চাচ্ছেন কেবল নিজের জানা একটি পদ্ধতির- বিদ্যমান সমস্যাকে অস্বীকার এবং মিডিয়াকে দোষারোপের মাধ্যমে। অধিকন্তু, তিনি বেশি বেশি সময় ব্যয় করছেন বিদেশ সফরের মধ্য দিয়ে। এভাবে রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে পুলিশকে এড়িয়ে চলছেন প্রধানমন্ত্রী। আত্মরক্ষার জন্য তার শেষ কথা হল- তার সব ত্রুটি সত্ত্বেও ইসরাইলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য তার চেয়ে ভালো কোনো নেতা দেশটিতে নেই। তাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য একটি রাজনৈতিক বিকল্প পাওয়ার এটিই সঠিক সময়।
আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম
ইয়োসি মেকেলবার্গ : লন্ডনের রিজেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান প্রোগ্রামের প্রধান

No comments

Powered by Blogger.