নতুন ‘রাজনীতি’ সিটি নির্বাচন, কী পাবে ঢাকাবাসী? by এ কে এম জাকারিয়া

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে কারা প্রার্থী হচ্ছেন, কারা পাচ্ছেন সরকারি দলের সমর্থন? বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে তো? অবরোধ-হরতালের মতো আন্দোলন অব্যাহত রেখে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কৌশলটি কী? তাদের চূড়ান্ত প্রার্থীই বা কারা হবেন? এসব বিষয়ে আগ্রহ ও প্রশ্নের মধ্যেই এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে ঢাকাবাসী। বিএনপির সম্ভাব্য দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর এ নিয়ে ‘রাজনীতি’ আরও জমে উঠেছে বলেই মনে হয়। ‘অরাজনৈতিক’ এই নির্বাচনের ‘রাজনৈতিক’ দিকই ঘুরেফিরে আলোচনার বিষয়। কিন্তু এই নির্বাচন থেকে আমরা ঢাকাবাসী কী পাব বা আদৌ কিছু পাব কি না—এই বিষয়গুলো খুব গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয় না।
ঢাকা নিয়ে ‘রাজনীতিই’ যে রাজনৈতিক দল ও সরকারগুলোর কাছে আসল, সেটা এত দিনে প্রমাণিত। ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ নির্বাচন হয়েছে ২০০২ সালে। এরপর এত দিন কেন নির্বাচন হয়নি? এর পেছনে কাজ করেছে রাজনীতি ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। নিজেদের একজনকে মেয়র নির্বাচিত করে তাঁর মাধ্যমে ঢাকাকে সব সময় সরকারগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ঢাকার উন্নয়ন, এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বা সেবার বিষয়গুলো আদৌ কোনো বিবেচনার বিষয় নয়। ব্যবস্থাপনার সুবিধা হবে—এই দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা শহরকে দুই ভাগে ভাগ করলেও এ ধরনের একটি নজিরবিহীন কাজের পেছনে যে বিষয়টি মুখ্য ছিল, তা আসলে ঢাকার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এটা পরিষ্কার যে ঢাকা সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠান, সরকারি দলের প্রার্থী বাছাই, তাঁর জয়লাভের সম্ভাবনা—এসব হিসাব-নিকাশ মেলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ঢাকাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বিশ্বের বড় ও পুরোনো কোনো শহরের ক্ষেত্রে এমন নজির নেই। একক সিটি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঢাকার চেয়ে বড় ও জনবহুল শহরগুলো চলতে পারলে ঢাকা কেন চলবে না?
আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা ভাগ করেছে সেই ২০১১ সালে। এর পরও দীর্ঘদিন সিটি নির্বাচন হয়নি। কেন? পরিষ্কার কারণটি হচ্ছে, সরকার চায়নি। সীমানা নিয়ে জটিলতার দোহাই দিয়ে এই নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। এখন যখন সরকারের মনে হয়েছে যে নির্বাচন করতে হবে, তখন সব বাধাই কেটে গেল। সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই তো মনে হচ্ছে দেশের আইন! এখন কেন নির্বাচন অনুষ্ঠান জরুরি হয়ে পড়ল? প্রথমত, বিরোধী দলের অকার্যকর হয়ে পড়া লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সরকারের নানা ধরনের দমন-পীড়নে বিরোধী বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপি সাম্প্রতিক লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির মতো ভুল রাজনৈতিক কৌশল এবং তা কার্যকর করতে গিয়ে নাশকতা, সন্ত্রাস ও বর্বরতার পথ ধরায় দলটির বিরুদ্ধে সরকারের দমন-পীড়ন বাড়িয়ে দেওয়ার কাজটি সহজ হয়ে যায়। বিএনপিকে ছিন্নভিন্ন করতে এই সুযোগকেই কাজে লাগায় সরকারি দল। বিএনপির বড় নেতাদের প্রায় সবাই এখন জেলে, অন্যদের বেশির ভাগই পালিয়ে আছেন। দলটির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ যে কায়দায় হাওয়া হয়ে গেলেন, তা দলের মধ্যে আতঙ্ক ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এমন একটি পরিস্থিতিতে সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ বিএনপিকে চূড়ান্ত বেকায়দায় ফেলার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়।
বিএনপির টানা অবরোধের প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। এই দফার আন্দোলন যে ব্যর্থ হয়েছে, সেটা পরিষ্কার। এ অবস্থায় ঢাকার দুই সিটি বা চট্টগ্রাম সিটির নির্বাচন নিয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া বিএনপির জন্য সত্যিই কঠিন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করেছিল এমন মত নানা মহলেই জোরালো। এর এক বছরের মাথায় বিএনপি যখন সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দিয়ে ফেলেছে, তখন সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক হবে, সেটা দলটির জন্য অবশ্যই একটি বড় ভাবনার বিষয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই এই নির্বাচনকে বিএনপির জন্য একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। কারণ, এতে ব্যর্থ আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং বিএনপির ‘মুখরক্ষার’ একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিএনপি এতটা সরলভাবে বিষয়টিকে বিবেচনা করবে বলে মনে হয় না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল বিবেচনা করে এর ‘খেসারত’ হিসেবে সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা নতুন কোনো রাজনৈতিক ভুল করে বসে কি না, সেটা অবশ্যই তাদের বিবেচনার মধ্যে থাকবে।
----২.
ঢাকা সিটির নির্বাচন নিয়ে এসব নানা ‘রাজনৈতিক’ পাল্টাপাল্টি কৌশলে কোন পক্ষ কীভাবে লাভবান হবে বা কোন পক্ষকে কোণঠাসা করা যাবে, সেটা সামনে টের পাওয়া যাবে। কিন্তু শুরুতেই যে প্রসঙ্গ তুলেছি, সেই সূত্রে এই প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক যে এই নির্বাচন থেকে কী পাবে ঢাকাবাসী? সহজ উত্তর; ঢাকার দুই অংশে দুজন নির্বাচিত মেয়র। কিন্তু এই মেয়ররা আমাদের কী দেবেন বা কী দিতে পারবেন?
ঢাকার দুই অংশে মেয়র নির্বাচিত হয়ে যাঁরা আমাদের ‘সেবা’ করতে চান, তাঁরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র কিনেছেন, জমাও দিয়েছেন। এই প্রার্থীদের অনেকের মুখে আমরা কিছু প্রতিশ্রুতির কথা শুনেছি। সাধারণভাবে তাঁরা একটি ‘আধুনিক ঢাকা’ উপহার দেওয়ার কথা বলেছেন। মনে প্রশ্ন জাগে, আধুনিক ঢাকা বিষয়টি আসলে কী? একটি আধুনিক শহরের যেসব সুযোগ-সুবিধা বা ব্যবস্থা থাকে, তা ঢাকায়ও তাঁরা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করবেন? ঢাকায় যথাযথ গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে উঠবে, চাইলেই বাসে ওঠা যাবে বা পাওয়া যাবে ট্যাক্সিক্যাব? যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খল দশা দূর হবে, বাস নির্দিষ্ট জায়গায় থামবে, উল্টো পথে গাড়ি চলবে না, অসহনীয় যানজটে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হবে না, ফুটপাতগুলো হাঁটার উপযোগী হবে, পথে-ঘাটে অবর্জনার স্তূপ জমে থাকবে না, বর্ষায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে না, শহরের খাল, পার্কগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে, সাইকেলের জন্য আলাদা লেন থাকবে। বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রায় থাকবে, শব্দদূষণ বলে কিছু থাকবে না, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ—এসবের নিশ্চয়তা থাকবে? এই তালিকা আরও দীর্ঘ করা যায়, কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বর্তমান দশা থেকে কিছু উন্নতি করা গেলেই সম্ভবত ঢাকাবাসী আনন্দে আটখানা হয়ে যাবে।
আমাদের যে মেয়ররা নির্বাচিত হবেন বা তাঁদের হাতে যে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পড়বে, তাঁরা কি এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবেন? এসব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনার জন্য যে শক্তিশালী নগর কর্তৃপক্ষের দরকার, সেই কাঠামো কি সিটি করপোরেশনগুলোর রয়েছে? ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ সিটি করপোরেশনে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে একটি ‘মেট্রোপলিটন সরকার’ করার দাবি জানিয়ে হয়রান হয়েও কিছুই করতে পারেননি। কারণ, সরকারগুলো আসলে ঢাকার ওপর ছড়ি ঘোরাতে চায় কিন্তু ঢাকার ব্যবস্থাপনার জন্য একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ দেখতে চায় না।
ঢাকার নানা দিক দেখার জন্য সরকারের কর্তৃপক্ষের অভাব নেই। দুই সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ট্রাফিক পুলিশ, রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, ঢাকা ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ, পূর্ত মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বা সেতু কর্তৃপক্ষ—এ ধরনের আরও যেসব প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ রয়েছে, এগুলোকে সমন্বয় করবে কে? একটি শহর দেখভাল, পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা বা শহরটি নিয়ে পরিকল্পনা করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ থাকলে কাজটি সহজ হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু একক কর্তৃপক্ষ তো দূরে থাক, ঢাকাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পরিস্থিতি যেন আরও শোচনীয় করা হয়েছে। যে দুজন ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হবেন, তাঁরা আন্তরিকভাবে চাইলেও আদৌ কিছু করতে পারবেন কি?
ঢাকার দেখভালের জন্য কোনো একক কর্তৃপক্ষ নেই, আবার ঢাকার নানা দিক দেখে যেসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, এগুলোর মধ্যে সমন্বয় করার কোনো কাঠামো বা কর্তৃপক্ষও নেই। এখন ধরুন, যেখানে-সেখানে বাস থামানো বা এ ধরনের বিশৃঙ্খলার জন্য সিটি করপোরেশন ট্রাফিক পুলিশের সহায়তায় অভিযান শুরু করল, তখন যে নৌপরিবহনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন শ্রমিক সংগঠনের পরিবহন শ্রমিকেরা মাঠে নামবেন না, তার নিশ্চয়তা কী? অথবা যে মন্ত্রী-সাংসদেরা উল্টো পথে গাড়ি চালান, তাঁদের ঠেকানোর বুদ্ধি কী? ঢাকার জন্য একক শক্তিশালী কোনো কর্তৃপক্ষ বা অন্তত একটি সমন্বয় কর্তৃপক্ষ থাকলে সেখানে এসব প্রসঙ্গ আলোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি হতো। গত বিএনপি সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ঢাকাসংক্রান্ত সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য একটি কাঠামো থাকলেও বর্তমানে তেমন কিছু নেই।
চার বছর ধরে ঢাকা বিশ্বের বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তালিকায় ১ ও ২ নম্বরের মধ্যে ওঠানামা করছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বাসযোগ্যতার একটি জরিপ করে আসছে। ২০১২ সালে ঢাকা হয়েছিল বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শহর। ২০১৪ সালে এক ধাপ ওপরে উঠে ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জায়গা হয়েছে ১৩৯ নম্বরে। ঢাকার চেয়ে খারাপ শহরটি হচ্ছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক, যেখানে কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। বাসযোগ্যতার এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে ইআইইউ পাঁচটি ক্ষেত্রের ৩০টি দিক বিবেচনায় নেয়। এগুলো হচ্ছে: ১. স্থিতিশীলতা, ২. স্বাস্থ্যসেবা, ৩. সংস্কৃতি ও পরিবেশ, ৪. শিক্ষা, ৫. অবকাঠামো। একটি শহরের এই দিকগুলোর দেখভাল, ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী মেট্রোপলিটন সরকার বা এ ধরনের কোনো কাঠামো। কিন্তু উল্টো ঢাকাকে ভাগ করা হয়েছে, এখন হয়তো ঢাকা দুজন মেয়র পাবে কিন্তু এর ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার কাজটি সম্ভবত আরও জটিলই হবে।
সরকার সাফল্যের সঙ্গে সিটি নির্বাচনকে রাজনীতির নতুন বিষয়ে পরিণত করে সবাইকে মশগুল করে ফেলেছে। ঢাকা শহরটির আদৌ কী হবে, তা আগের মতো বিবেচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.