সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

সাতচল্লিশ
সেই কোনকালে কখন কীভাবে বাঙালির আদি পূর্বসূরিরা ধর্মচিন্তায় নিজেদের যুক্ত করেছিলেন, তা দিনক্ষণ দিয়ে নির্দিষ্ট করার উপায় নেই। তবে প্রাচীনকালে আদিমানবের মধ্যে যেভাবে ধর্মচিন্তার সূচনা হয়েছিল, বাঙালির ধর্মচিন্তার ধারা যে তার বাইরে ছিল না তা ইতিহাসের যুক্তিতেই অনুমান করা যায়। প্রাগৈতিহাসিক যুগের শিকারি মানুষকে প্রতিনিয়ত নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয়েছে। অস্তিত্বের প্রয়োজনেই শিকারকে সহজলভ্য করা ছিল তাদের কামনা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে গিয়ে প্রায়ই তারা অসহায় হয়ে পড়ত। এসব কারণেই আদিমানব শিকারে সাফল্য লাভ করার জন্য কামনা করত অদৃশ্য কোনো শক্তির কৃপা। প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ ভিন্ন ভিন্ন শক্তির প্রতীক হিসেবে তার সামনে প্রকাশিত হতো। আদিমানব যখন কৃষি সভ্যতার সূচনা করল, তখন থেকে প্রকৃতি নির্ভরতা তার অনেকগুণ বেড়ে গেল। কৃষিজীবী মানুষের কাছে মাটি হল শক্তি, শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা দিল বৃষ্টি, সূর্য, নদী, বন্যা, বজ্র - সবকিছু। অসহায় মানুষের সামনে প্রকৃতি কখনও এসেছে চণ্ড রূপ নিয়ে, আবার কখনও মনে হয়েছে আশীর্বাদের প্রতীক। এভাবেই সে নিজের জীবন ও জীবিকার স্বাচ্ছন্দ্যের প্রত্যাশায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির ওপর দেবত্ব আরোপ করতে থাকে। আর এভাবেই ক্রমান্বয়ে মানুষ সৃষ্টি করে ধর্মীয় ধারণা।
বাংলার আদিবাসীদের ধর্মীয় আচরণ অনুসন্ধান করলে এরই প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন ফুল-ফল, পশুপাখি, পাহাড়-পর্বত, নদী, বৃক্ষ সবকিছুই পরিণত হয় দেবতায়। আর এসব দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য নিজেদের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নানা আচার-অনুষ্ঠানের পূজা পার্বণের আয়োজন করত তারা। বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর ভেতর এই প্রকৃতি পূজার রেশ এখনও টিকে আছে। পরবর্তীকালে এ দেশে প্রতিষ্ঠিত বড় বড় ধর্মের আচরণবিধিতে কোথাও কোথাও আদিবাসী ধর্মচিন্তার প্রভাব ছুঁয়ে গেছে। বিশেষ করে হিন্দু সমাজে এর উদাহরণ বিরল নয়। যদিও মূল হিন্দু ধর্মের সাংস্কৃতিক আচরণ নয়, তবু গ্রামবাংলায় হিন্দুদের মধ্যে গাছ পূজার প্রচলন রয়েছে। আদিবাসীদের ভক্তির অনুসঙ্গী হয়ে ভক্ত হিন্দুর পূজা লাভ করছে বটগাছ, তুলসীগাছ আর শেওড়া গাছ। হিন্দু পূজার আনুষ্ঠানিকতায় এবং প্রসাদ আয়োজনে স্থান করে নিয়েছে ফল-ফুল, গাছপাতা; গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এসেছে কলাগাছ, আম আর বেল পাতা, নানা ধরনের ফুল; আর প্রসাদ তৈরিতে জায়গা করে নিয়েছে হরেক রকম ফল। এগুলো সবই সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের চমৎকার উদাহরণ।
আমাদের কৃষিজীবী আদিবাসী সম্প্রদায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য বা উৎপাদন বৃদ্ধির আশায় প্রকৃতিকে সন্তুষ্ট করতে চাইত। তাই তারা উৎপাদিত দ্রব্য উৎসর্গ করত অদৃশ্য দেবতার উদ্দেশে। পরবর্তী সময়ে হিন্দু ধর্ম দর্শনে যখন দেবদেবীর প্রতিমূর্তি তৈরি হল তখনও নিষ্ঠাবান হিন্দু ভুলে যায়নি পূর্বসূরিদের সাংস্কৃতিক আচরণ। তাই দেবতা বা দেবীর পাদপদ্মে উৎসর্গ করা হতে থাকে ইক্ষু, কলা, চালকুমড়া ইত্যাদি। আদিবাসী ঐতিহ্য থেকেই নানা ব্রত অনুষ্ঠানে জায়গা করে নিয়েছে ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ, আলপনা আঁকা, পান, সুপারি, নারিকেল, কলা, আমপাতা দিয়ে ঘট সাজানো, ঘটের গায়ে আলপনা আঁকা ইত্যাদি। বাঙালি মুসলমান সমাজে বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে এ ধারার ঐতিহ্যের প্রভাব এখনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। রক্ষণশীল মুসলমানের চোখে এসব ‘হিন্দু আচরণ’ বলে নিন্দিত হয়। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট স্পষ্ট নয় বলেই আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না যে, এসব আচরণ নিরেট ধর্মীয় নয়- বরঞ্চ নিখাদ সাংস্কৃতিক। এর জন্ম হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মের ভেতর নয়; তা বেড়ে উঠেছে আদি বাঙালির প্রতিদিনের জীবনবোধ থেকে। তাই এসব আচার-অনুষ্ঠান যুগধর্ম অতিক্রম করে বাঙালির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ কারণে এর উত্তরাধিকারী ধর্ম-নির্বিশেষে সব বাঙালি।

No comments

Powered by Blogger.