‘রাষ্ট্রদূত’ মূসার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা by মিজানুর রহমান খান

মেরিল্যান্ডে মার্কিন জাতীয় মহাফেজখানায় কাজ করতে গিয়ে এবিএম মূসার নামটি দেখে প্রীত হয়েছিলাম। তাঁর সংক্রান্ত মার্কিন নথির কথা ঢাকায় তাঁকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁকে তা দেখানো হয়নি। এ নিয়ে লেখাও হয়নি। দুটি নথিতে তাঁর উল্লেখ পাই। প্রথমটি লিখেছেন ‘আমেরিকান মুক্তিযোদ্ধা’খ্যাত একাত্তরের মার্কিন কনসাল অর্চার কে. ব্লাড। এই নথিটি রীতিমতো জামাতার বিরুদ্ধে শ্বশুরের মধুর চক্রান্তভেদের সঙ্গে তুলনীয়। মূসাকে এটাও বলা হয়নি। বাষট্টির মে মাসে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতির পদ তাঁকে ছাড়তে হয়। যদিও নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটেছিল, তদুপরি এর পেছনে অন্তত ব্লাডের মনে হয়েছিল, কলকাঠি নেড়েছিলেন তাঁরই শ্বশুর আবদুস সালাম। ব্লাড বাষট্টিতেও ঢাকায় ছিলেন।

১৯৬২ সালে মূসা ছিলেন ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার-এর বার্তা সম্পাদক। ১৯৬২ সালের ১৭ মে অর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন, অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম মনে করেন মূসা এমন একটি পদে রয়েছেন, যার সঙ্গে পত্রিকা ব্যবস্থাপনার বিষয় একান্তভাবে জড়িত। আর এ রকম পদে থেকে কর্মরত সাংবাদিকদের কোনো সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয় নথিটি ১৯৭২ সালের ২১ নভেম্বরে প্রস্তুত। এটি তৈরি করেছেন ডব্লিউ স্কট বুচার। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে তিনি তখন বাংলাদেশ ডেস্কের কর্মকর্তা। স্কট বুচার লিখেছেন, মূসা ঢাকার শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক এবং সরকার-মনোনীত প্রশাসক। তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য ইউএসআই আয়োজিত নির্বাচনী প্রেস ট্যুরের একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের গোড়া পর্যন্ত তিন সপ্তাহ অবস্থান করেন। ওয়াশিংটনে অবস্থানকালে তিনি ইউএসএইডের উপপ্রশাসক মরিস উইলিয়ামস, কান্ট্রি ডিরেক্টর লেইনজেন এবং এনইএর স্পেশাল কনসালট্যান্ট রাষ্ট্রদূত আরমিন মেয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উইলিয়ামসের সঙ্গে বৈঠকে মূসা বাংলাদেশের জন্য মার্কিন সহায়তা এবং এর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। মূসাকে এ সময় বাংলাদেশে মার্কিন সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির একটি নথি হস্তান্তর করা হয়।
দেশবাসী গতকাল সাংবাদিক মূসার প্রতি শ্রদ্ধা ও বিদায় জানালেন। সেই সঙ্গে এতকাল সবার অগোচরে থাকা ‘রাষ্ট্রদূত মূসা’র প্রতিও
আমরা শ্রদ্ধা জানাই, জানাই গভীর ও বিনম্র ভালোবাসা।
বাহাত্তরের ১০ নভেম্বরে মূসা বৈঠক করেছিলেন ব্রুস লেইনজেনের সঙ্গে, যিনি ১৯৭৯ সালে ইরানের জিম্মি সংকটকালে আলোচিত হয়েছিলেন। লেইনজেনের সঙ্গে যেসব বিষয় নিয়ে মূসা সেদিন আলোচনা করেছিলেন, তা ৪২ বছর পরেও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। মূসা তাঁকে বলেছিলেন, তিনি
যেসব মার্কিনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন, তাতে তাঁর মনে হয়েছে মার্কিনরা মনে করেন বাংলাদেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।
‘মার্কিন সরকার কি মনে করে যে বাংলাদেশ একটি ভারতীয়/ সোভিয়েত তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে?’ মূসার এই প্রশ্নের উত্তরে লেইনজেন বলেছিলেন, ‘আমরা বুঝতে পারি যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এর উৎস হচ্ছে ভূগোল এবং গত বছরের (একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ) ঘটনাবলি।’
লেইনজেন স্বীকার করেন যে এটা খুবই স্বাভাবিক একটি আন্তরাষ্ট্রীয় বিষয়। তবে মূসাকে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে বাংলাদেশে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থ আছে। এই ‘প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থ’ বলতে কী বোঝায়, তারও একটি ব্যাখ্যা পেলাম এই নথিতেই। সেখানে বলা হয়েছে, এটা হলো ‘মানবিক কারণে বাংলাদেশের পুনরুদ্ধারকাজে সহায়তা এবং স্থিতিশীলতাকে উৎসাহ জোগানো।
লেইনজেন মূসার কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এবং সংক্ষেপে অতীতে বাংলাদেশকে দেওয়া ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বিষয়ে অবহিত করেন।
আমরা লক্ষ করি যে যুক্তরাষ্ট্র বাহাত্তরেই মনস্থির করেছিল বাংলাদেশে তারা তাদের সহায়তা সংকুচিত করবে। মূসাসংক্রান্ত নথিটি কিন্তু সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্কট বুচার অবস্থাটি বর্ণনা করেছিলেন এভাবে। ‘মূসাকে এটাও জানিয়ে দেওয়া হয় যে বাংলাদেশকে বর্তমানে যেভাবে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে তার কাছাকাছি কিছু দিতে পারার সম্ভাবনাও হ্রাস পাবে।’ এ সময় লেইনজেন মূসার কাছে ‘সিমলার চেতনার’ (ইন্দিরা-ভুট্টো চুক্তি) প্রতি মার্কিন সমর্থন উল্লেখ করেন। এবং আশা প্রকাশ করেন যে সিমলা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বিস্তৃত করবে এবং উভয় দেশ তাদের সমস্যা সমাধানে একটি ভিত্তি খুঁজে পাবে।
রাষ্ট্রদূত মেয়ার মূসার কাছে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের অগ্রগতিতে এবং বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় সহায়তা দিতে পেরে মার্কিন সরকারের সন্তোষ প্রকাশ করেন। বুচার লিখেছেন, ‘মূসা সম্মত হয়েছেন যে বাংলাদেশকে দেওয়া মার্কিন সহায়তা খুবই সন্তোষজনক কিন্তু মূসা ইঙ্গিত দেন যে এটা যেভাবে প্রচার পাওয়া উচিত, সেভাবে তা জনসমক্ষে প্রচার পায়নি।’
এর পরই আমরা মূসাকে একজন ঝানু রাষ্ট্রদূত হিসেবে উদ্ভাসিত হতে দেখি। বুচারের ভাষায়, মূসা এ সময় অভিমত প্রকাশ করেন যে বাংলাদেশকে মার্কিন সহায়তা সত্ত্বেও গত বছরে ভারত-পাকিস্তান সংকটকালে যুক্তরাষ্ট্রের অজনপ্রিয় নীতির ফলে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অকপট, অকুতোভয়, সত্যভাষী মূসাকে আমরা আরও ঝলসে উঠতে দেখি। কারণ, বুচার উল্লেখ করেন, ‘মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনায় সপ্তম নৌবহর পাঠানোর কথা উল্লেখ করে মূসা তাঁর বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।’ তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.