জীবনযাত্রায় স্বস্তির আশা by রাজীব আহমেদ

,
২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর মহাজোট সরকারের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল ভোগ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদর। ওই বছর জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমতে থাকে।
ফলে কোনো ধরনের কারিশমা ছাড়াই দ্রব্যমূল্য কমানোর মওকা পেয়ে জনগণের বাহবা কুড়িয়েছেন মন্ত্রীরা। মেয়াদের শেষ বছরেও পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদরের আশীর্বাদ সরকারের ওপরই থাকছে। বিশ্ববাজারে কমতে থাকা পণ্যমূল্য ২০১৪ সাল পর্যন্ত কমই থাকবে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। এমন অনুকূল পরিস্থিতিতে ঘোষিত হলো ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট। ভোটের দিকে নজর রেখে বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমন কিছু করতে চাননি, যাতে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কোনো কর আরোপ হয়নি। কিছু পণ্যের কর ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা ও করমুক্ত ভাতার সীমা বাড়ার ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ উপকৃত হবে। মোটা দাগে নতুন বাজেট জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিক দিয়ে অনুকূল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজার আর ঘোষিত বাজেট মিলিয়ে আগামী অর্থবছর (জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুন) দেশের সাধারণ মানুষ একরকম স্বস্তিতে কাটানোর সুযোগ পাবে বলেই আশা করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীও ডিসেম্বর নাগাদ মূল্যস্ফীতি (পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার নির্দেশক) অনেকখানি কমে ৫.৫ শতাংশে নামতে পারে বলে আশা করছেন। আর বছর শেষে তা বড়জোর ৭ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, পূর্বাভাস অনুযায়ী জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারদর ২০১৪ সালেও স্থিতিশীল থাকবে। পাশাপাশি সার ও খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা কমবে। সংযত মুদ্রানীতি (টাকার সরবরাহ কম রাখা) ও স্থিতিশীল বিনিময় হার মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের কল্যাণে জিনিসপত্রের দাম স্থিতিশীল আছে। প্রায় বছরখানেক ধরে ঠিক আছে ভোজ্য তেলের দাম। চিনির দাম আরো বেশি সময় ধরে স্থিতিশীল। পেঁয়াজ, রসুন, আদার উৎপাদন আগের চেয়ে বেড়েছে বলে বছরের বড় একটা সময়জুড়ে এগুলোর দাম সাধারণের নাগালেই থাকে। চালের দামও বছরখানেক ধরে অস্বাভাবিক বাড়েনি, বরং মৌসুমের সময় তা অনেকাংশে কমে যাওয়ার নজির আছে। আটার দাম কিছুটা বেড়েছে, তবে এ বছর দেশে ভালো ফলন ও আন্তর্জাতিক বাজারের কমতির ধারার কারণে সামনের দিনগুলোতে আটার দাম কমতে পারে।
বাজার থেকে মোটা চাল কিনতে এখন ৩০-৩২ টাকা লাগছে প্রতি কেজিতে। খোলা আটার কেজিপ্রতি দামও মোটা চালের সমান। খোলা সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দর ১১০ টাকার নিচে। আলুর কেজি ১২-১৫ টাকা। মসুর ডাল ৮০-১৩০ টাকা। এসব পণ্যের দাম পাঁচ-ছয় বছর আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের তুলনায় কম। তখন এক কেজি মোটা চালের দাম উঠেছিল ৩৫ টাকা। এমনকি গত বছরের তুলনায় দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতিও এখন অনুকূল।
এমন অনুকূল পরিস্থিতি আগামী অর্থবছরও থাকতে পারে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (এফএও) পূর্ভাবাস অনুযায়ী, এ বছর বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে। আর দাম কমা এখন থেকেই শুরু হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যসূচক বলছে, গত বছরের এ সময়ের তুলনায় এখন চিনি ও তেলবীজের মূল্যসূচক অনেকখানি কমে গেছে। গত বছর মে মাসে চিনির মূল্যসূচক ছিল ২৯৫ পয়েন্ট। তা গত মাসে কমে ২৫০ পয়েন্টে নামে। একইভাবে তেলবীজের মূল্যসূচকও ৩৩ পয়েন্ট কমে ২০০ পয়েন্টের নিচে নেমে যায়।
২০১৩ ও '১৪ সালে গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ ভোগ্য ও শিল্পপণ্যের দাম কমে আসতে পারে বলে আগেই জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান সিটিগ্রুপ। তাদের '২০১৩ কমোডিটি আউটলুক' নামে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, চিনি ও সয়াবিনের দাম ২০১৩ সালে কমবে। গমের দাম ২০১৩ সালে কিছুটা বাড়লেও ২০১৪ সালে তা অনেকটাই কমে আসবে।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেলের গবেষণা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বিশ্ববাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, বিভিন্ন পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে কমছে। এ কারণে আগামীতে বাজারদর স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা আছে।
এদিকে দেশবাসীকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য করমুক্ত আয়সীমা দুই লাখ ২০ হাজার টাকা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পাশাপাশি বাড়িভাড়া ভাতা ও পরিবহন ভাতার করমুক্ত সীমার পরিমাণ বাড়িয়েছেন। এর ফলে চাকরিজীবীরা উপকৃত হবেন। যাঁদের বাড়িভাড়া ও পরিবহন ভাতা বছরে মোট দুই লাখ ৭০ হাজার টাকার কম, তাঁদের কর দিতে হবে না। বাড়িভাড়া ও পরিবহন ভাতা থেকে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা বাদ দিয়ে বাকি টাকার সঙ্গে বছরের মোট মূল বেতন ও দুটি বোনাস যোগ করে দুই লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি না হলেও কর দিতে হবে না। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের বাইরে নূ্যনতম কর তিন হাজার টাকা থেকে কমিয়ে জেলা সদরের পৌরসভায় দুই হাজার এবং উপজেলা ও অন্যান্য এলাকায় এক হাজার টাকা করা হয়েছে।
যেসব পণ্যের শুল্কহারে নতুন বাজেটে পরিবর্তন এসেছে, এর মধ্যে দুটি কেবল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। বাকিগুলো মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে তেমন প্রভাব ফেলবে না। দেশে উৎপাদিত ত্বক ও চুল চর্চার প্রশাধন, শেভিং ও টয়লেট্রিজ সামগ্রীর ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্কহার কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। এর ফলে সাবানসহ প্রসাধন সামগ্রীর দাম কমতে পারে।
বাজেটে গুঁড়ো দুধের শুল্কহার পরিবর্তন হয়েছে যেটি অত্যাবশকীয়। কিন্তু এতে খুচরা পর্যায়ে গুঁড়ো দুধের দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই। দেশে দুধ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে বাল্কে গুঁড়ো দুধ আমদানির ওপর আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। তবে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক পাঁচ শতাংশই থাকছে। দেশের খুচরা পর্যায়ে যারা প্যাকেটজাত গুঁড়ো দুধ বিক্রি করে তাদের প্রায় সবই ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। ফলে খুচরা পর্যায়ে গুঁড়ো দুধের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। তবে বেকারিসহ বিভিন্ন খাদ্য শিল্পে ব্যবহারের জন্য যারা ২৫ কেজির ব্যাগে গুঁড়ো দুধ আমদানি করে, তাদের খরচ বাড়বে বলে জানিয়েছে দেশে গুঁড়ো দুধ বিক্রিয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাজেটে করের আওতা তেমন বাড়েনি। খুচরা দোকানের মালিকরা যাঁরা প্যাকেজভিত্তিতে ভ্যাট দেন, তাঁদের জন্য ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। তবে তা বছরে সর্বনিম্ন ধাপে ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে পণ্যের দামের ওপর খুব একটা প্রভাব পড়বে না। অপরিশোধিত সয়াবিন, পাম ও সূর্যমুখী তেলের ওপর ভ্যাট ছাড়ের মেয়াদ ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। চাল, ডাল, গম ও পেঁয়াজ আমদানির শুল্কছাড়ের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা ভলান্টারি কনজ্যুমার অ্যাওয়ারনেস অ্যান্ড ট্রেনিং সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান বাজেট প্রস্তাব জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য স্বস্তিদায়ক উল্লেখ করে বলেন, নির্বাচনের বছরে সরকার মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রাখতেই চেষ্টা করবে। ফলে পণ্যের দাম কম থাকার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু নির্বাচনের সময় মানুষের হাতে বেশি টাকা ছড়িয়ে পড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

No comments

Powered by Blogger.