প্রতিবেশীকে ভালোবাসা সম্প্রীতির সোপান by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের জীবনে প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব অপরিসীম। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মিলেমিশে বসবাস করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে। এর সুবাদে গড়ে উঠেছে প্রতিবেশী ও বন্ধুসুলভ মানসিকতা ও আচার-আচরণ। প্রতিবেশী কারা? কতদূর এর সীমা? এ প্রশ্নের জবাবে হজরত হাসান (রা.) বলেছেন, ‘নিজের ঘর থেকে সামনে ৪০ ঘর, পেছনে ৪০ ঘর, ডানে ৪০ ঘর এবং বাঁয়ে ৪০ ঘরের অধিবাসীরা হচ্ছে প্রতিবেশী।’ তিন শ্রেণীর লোক প্রতিবেশী—১. যারা আত্মীয় এবং প্রতিবেশী। ২. যারা শুধু প্রতিবেশী। ৩. সহচর, সহকর্মী এবং অধীনস্থ লোক। যতক্ষণ সমাজের লোকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে না ওঠে, ততক্ষণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবনধারণ করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণের তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা পিতামাতা, নিকট আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন, নিকটতম প্রতিবেশী, দূরবর্তী প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথিক এবং যারা তোমাদের অধিকারে এসেছে তাদের সকলের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬)
প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন ও সদাচরণের বিষয়ে ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছে। সমাজজীবনে প্রতিবেশী সবচেয়ে কাছের লোক। সুখে-দুঃখে সবার আগে তাকে পাওয়া যায়, এজন্য তার হকও বেশি। বিপদ-আপদ, সুখে-দুঃখে সার্বক্ষণিক তার সান্নিধ্য পাওয়া যেতে পারে। সব মানুষের প্রতি উদার, সহনশীল মনোভাব পোষণ ও মানবীয় আচরণ প্রদর্শন ইসলামে অবশ্যপালনীয়। মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশীর সঙ্গে ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ একজন মুসলমানের ঈমানের অঙ্গ। প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসার বিষয়ে ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে, মুসলিম-অমুসলিম, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান এনেছে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে, মর্যাদার চোখে দেখে।’
সমাজে প্রত্যেক শ্রেণীর লোকের অধিকার রয়েছে। মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কারণে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা যায়। তাই প্রত্যেকের সঙ্গে তার প্রাপ্য অধিকার অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখা, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, মেহমানের যত্ন নেওয়া, বিবদমান দুই ব্যক্তির মাঝে পারস্পরিক সন্ধি-সমঝোতা সৃষ্টি করে দেওয়া—এগুলো ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মানবিক কর্তব্য। মানুষ যখন তার এসব দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হবে। কিন্তু অযথা বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রায়ই বাক-বিতণ্ডা, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, প্রতিযোগিতা, প্রতিহিংসা লেগেই থাকে। একপর্যায়ে এটি ঘৃণ্য বর্বরতায় রূপ নেয়। সামাজিক সম্প্রীতির অবনতি ঘটিয়ে মারাত্মক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। প্রতিবেশীকে জব্দ করতে দৃঢ়চিত্তে অঙ্গীকার করে। অথচ একজন বাড়িওয়ালার জন্য সৌভাগ্য হচ্ছে ভালো প্রতিবেশী পাওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘একজন মুসলিমের জন্য খোলামেলা বাড়ি, প্রশস্ত বাসভবন, সত্ প্রতিবেশী এবং রুচিসম্মত বাহন সৌভাগ্যস্বরূপ।’
সামাজিক জীবনে অনেক শক্তিধর প্রতিবেশীকে দেখা যায়, দুর্বল বা সংখ্যালঘিষ্ঠ প্রতিবেশীকে তাড়িয়ে তার বাড়িঘর জবরদখল করার জন্য তার ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হয়; তার ঘরের সামনে ময়লা- আবর্জনা ফেলে রাখা হয়, গালিগালাজ করা হয়, ঘর থেকে বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়, শিশু-কিশোরদের মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দেওয়া হয়, অহেতুক ও মিথ্যা মামলা দায়ের করে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়, মিথ্যা অপবাদ রটানো হয়। ইসলাম এ ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপকে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে। মহানবী (সা.) এগুলোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বলেছেন, ‘যে প্রতিবেশী তার কোনো প্রতিবেশীকে নির্যাতন করে বা তার সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করে, যার ফলে সে ব্যক্তি গৃহত্যাগ করতে বাধ্য হয়, সে ব্যক্তি নিশ্চিত ধ্বংসের মধ্যে পতিত হয়।’
পাড়া-প্রতিবেশীর প্রয়োজন মেটানোর অগ্রাধিকার ইসলামে রয়েছে। প্রতিবেশী অভাবগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত ও দুর্যোগে পতিত হলে প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য করে তার অভাব-অনটন মোচন করে দেবে, সে ক্ষুধার্ত হলে প্রয়োজনে তাকে খাদ্য দান করবে—ইসলাম এই শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেট ভরে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত অবস্থায় অনাহারে রাত্রিযাপন করে থাকে সে ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানদার নয়।’ (বায়হাকি) প্রতিবেশীর অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিবেশীর অধিকার হচ্ছে—তোমার কাছে সাহায্য চাইলে সাহায্য করবে, ঋণ চাইলে ঋণ দেবে, অভাবগ্রস্ত হলে অভাব মোচন করবে, অসুস্থ হলে তত্ত্বাবধান করবে, প্রাণত্যাগ করলে জানাজায় যাবে, আনন্দে অভিবাদন এবং দুঃখে সমবেদনা জানাবে। তোমার ঘরের দেয়াল উঁচু করে তার বাতাস বন্ধ করবে না। ফল ক্রয় করলে তাকে পাঠিয়ে দাও, না পারলে গোপন রাখো এবং নিজ সন্তানদের ফল হাতে বের হতে দিয়ো না, যেন প্রতিবেশীর সন্তান দুঃখ না পায়। নিজের রান্নাঘরের ধোঁয়া দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়ো না। কিন্তু তাকে যদি খাদ্য দাও তাহলে অসুবিধা নেই।’ (তাবারানী)
প্রতিবেশীর মধ্যে পরস্পরে দেনা-পাওনার সম্পর্ক রয়েছে। ভারসাম্যপূর্ণ দেনা-পাওনার মাধ্যমে গড়ে ওঠে সত্প্রতিবেশীমূলক সুসম্পর্ক। প্রতিবেশীর প্রতি তার আচরণ দ্বারা একজন মুসলমানের ঈমান কত বেশি মজবুত তা বোঝা যায়। কেননা একজন খাঁটি মুমিন বান্দা কখনো তার প্রতিবেশীর অনিষ্টের বা অশান্তির কারণ হতে পারে না। একজন সত্যিকার মানুষ নিজের জন্য যা ভালো মনে করে, অন্যের জন্যও তা ভালো মনে করে। নিজের জন্য যা খারাপ মনে করে, অন্যের জন্যও তা খারাপ মনে করে। কে ভালো, কে মন্দ, কে ঈমানদার, প্রতিবেশীর চেয়ে আর কেউ নির্ভুলভাবে তা বলতে পারে না। নবী করিম (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! সেই ব্যক্তি ঈমানদার নয়...’ বলা হলো: কোন্ ব্যক্তি হে রাসূলুল্লাহ! তিনি বললেন, ‘যার প্রতিবেশী তার কাছ থেকে নিরাপদ বোধ করে না।’ (বুখারী ও মুসলিম)
ইসলাম মুসলমানদের প্রতিবেশীর সঙ্গে সামাজিক কর্তব্য পালনের নির্দেশ দিয়েছে। বাস্তবে কোমল হূদয়ের না হলে প্রতিবেশীর পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয় না। আর ভালোবাসা সৃষ্টি না হলে সমাজের বন্ধনও ঠিক থাকে না। তাই পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতি কোমল হূদয়বান হওয়া উচিত। অসত্ ও মন্দ প্রতিবেশী দ্বারা যাতে মানুষের কল্যাণ বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য ইসলাম সত্ প্রতিবেশী সৃষ্টির উপায়-উপকরণের শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মানুষের ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিবেশীর হক আদায়ের বিষয়ে ইসলাম যে গুরুত্ব আরোপ করেছে, তা যদি দৈনন্দিন জীবনে যথাযথভাবে অনুসরণ করা যায় তাহলে সমাজে কোনো অশান্তি, অসম্প্রীতি ও দুঃখ থাকবে না। সব ধরনের ক্লেশ ও পরস্পরের হানাহানি বিদূরিত হবে আর সমাজে শান্তির সোপান স্বরূপ প্রতিবেশীর যথাযথ অধিকারও সংরক্ষিত হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.