শিক্ষানবিশকালেই চুরি ও আত্মসাৎ by আলী ইমাম মজুমদার

সমাজের অন্যান্য অংশের পাশাপাশি বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও দুর্নীতির প্রবণতা ক্রমবর্ধমান বলেই বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগের ঊর্ধ্বে থাকছেন না বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারের সদস্যরাও। এমনকি ক্যাডারে যোগ দিয়েই কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও মাঝেমধ্যে গণমাধ্যম থেকে পাওয়া যায়। হয়তোবা এগুলো বেদনাদায়ক আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কেননা, কনিষ্ঠরাই একসময় জ্যেষ্ঠ হবেন। নিয়োজিত হবেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। তাই এ ধরনের প্রবণতা সম্পর্কে জানা গেলে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আবশ্যকতা দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিকারও করা হয়। তবে সেটা পর্যাপ্ত ও বাস্তবসম্মত কি না, ক্ষেত্রবিশেষে এ প্রশ্ন দেখা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন তাঁদের কিছু অগ্রজ বা সহকর্মী কর্মকর্তা। এমনকি বাইরের প্রভাবও যুক্ত হয়। এসব কিছু সত্ত্বেও যথাযথ কর্তৃপক্ষ সময়োচিত সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে বেসামরিক চাকরিগুলোর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ক্লেদে আচ্ছাদিত হয়ে পড়বে।
অতিসম্প্রতি কোনো কোনো পত্রিকায় দুটো খবর এসেছে। খবরগুলোর গুরুত্ব হয়তো সবার কাছে তেমন নেই। তবে সচেতন মহলের ভাবনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একটি খবরে আছে, গত ফেব্রুয়ারিতে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে আমাদের এক তরুণ শিক্ষানবিশ কূটনীতিক একটি ইলেকট্রনিক দোকান থেকে মুঠোফোন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। ডাচ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। কূটনৈতিক দায়মুক্তির জোরে ছাড়া পেয়েছেন। তবে তাঁকে ৩৫০ ইউরো জরিমানা দিতে হয়েছে। ঘটনার পরপরই ডাচ কর্তৃপক্ষ কূটনৈতিক চ্যানেলে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানায়। তারা দাবি করে, সেই তরুণ কূটনীতিক ডাচ পুলিশের কাছে বলেছেন, তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর পথ অনুসরণ করেই তিনি এমনটা করেছেন। ডাচ কর্তৃপক্ষ এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করতে আমাদের সরকারকে অনুরোধ করে। সংবাদপত্রের সূত্রে আরও জানা যায়, তিনি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার দায়ভার অস্বীকার করেছেন এবং তাঁকে সহায়তা করতে জোর লবিং চলছে।
অন্য ঘটনাটিও সাম্প্রতিক কালের। যমুনার অন্য পারের এক জেলার। গণমাধ্যমসূত্রে জানা যায়, একজন শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনার কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন পেশকারকে না নিয়ে। বিচার করে দণ্ডিত করেছেন কিছু ব্যক্তিকে। জরিমানার টাকা তিনি নিজেই গ্রহণ করেছেন। আর রসিদে করেছেন কারচুপি। জরিমানাদাতাকে দেওয়া রসিদে পরিমাণ সঠিক লেখা হলেও সরকারি অংশে অনেক কম লিখে প্রায় দুই লাখ টাকা করেছেন আত্মসাৎ। এখন তিনি ঢাকায় একটি প্রশিক্ষণে আছেন। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন বলেও খবরে উল্লেখ রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী সেই বিচারকের বিচার এখন সরকারের হাতে।
উভয় ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দুজন কর্মকর্তাই এখনো চাকরিতে স্থায়ী হননি। শিক্ষানবিশকাল চলছে। নিয়োগের শর্তানুসারে এ সময়কালে অসন্তোষজনক কাজের জন্য তাঁদের বরখাস্ত করার মতো সর্বোচ্চ দণ্ড দিতেও তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতার আবশ্যকতা থাকে না। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ডাচ সরকার। তিনি ঘটনাস্থলেই জরিমানা দিয়েছেন। অপরাধ স্বীকার করেছেন তাদের কাছে। অন্যজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাঠিয়েছেন জেলা প্রশাসক স্বয়ং। তিনি প্রাথমিক তদন্ত করে নিজে সন্তুষ্ট না হয়ে একজন তরুণ সহকর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাঠানোর কথা নয়। আর দণ্ডিত ব্যক্তিদের দেওয়া রসিদ আর এর সরকারি অংশ পরীক্ষা করলেই সত্য প্রমাণিত হয়। নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কোনো একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। লবিং হবে তাঁর পক্ষেও। আর চলমান সংস্কৃতিতে এটাই তো স্বাভাবিক।
এখন কথা থাকে, সরকার তাঁদের চাকরিতে রাখবে কেন? বলা হবে, এ ধরনের ঘটনার চেয়ে অনেক বড় কিছু করেও তো অনেকেই পার পেয়ে যান। কিছু হয় না তাঁদের। হয়তোবা তা-ই। তাঁদেরও সম্ভব হলে শনাক্ত করা এবং অযৌক্তিক অজুহাত আমলে না নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়াই তো সংগত। যে তরুণ কূটনীতিক এমনটা ঘটালেন, তিনি একবারও ভাবলেন না দেশের ভাবমূর্তির কথা। এমনকি নিজের অর্জিত মর্যাদা কিংবা গৌরবময় ভবিষ্যতের হাতছানিকেও তিনি দেখলেন না। কূটনৈতিক দায়মুক্তির সুযোগে তিনি কারাবাস হয়তো এড়াতে পেরেছেন। কিন্তু তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখানোর কি কোনো বিন্দুমাত্র সুযোগ আছে? তরুণ কর্মকর্তা কাজ করতে গিয়ে বিধিবিধান সম্পর্কে ভুল করে বসলে ঊর্ধ্বতনেরা সে বিষয়টা হয়তো গৌণভাবে দেখেন। মৃদু তিরস্কারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় এ ধরনের ঘটনার। তবে আলোচিত ঘটনায় তা হওয়ার জো নেই। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই কর্মকর্তার স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। তবে এটাই যথেষ্ট নয়। একটি মুঠোফোনের মতো সামান্য বিষয়ে যিনি লোভ সামলাতে পারেন না, তিনি লবিংয়ের জোরে পার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে সংশোধন হয়ে যাবেন, এমনটা বিশ্বাস করার মতো কারণ নেই।
এরপর আসে সেই সহকারী কমিশনারের কথা। এটাও তো সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ। এতে তো চাকরিচ্যুতির মতো গুরুদণ্ডেরই বিধান রয়েছে। তদুপরি তিনি শিক্ষানবিশ। কাজটি করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে গিয়ে। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রসঙ্গ আলোচিত হতে থাকলে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ধার্যকৃত জরিমানা সরকারি কোষাগারে যথাযথভাবে জমা হয় কি না, এটা নিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে। হয়তোবা সর্বত্রই তা নয়। খুব কম ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে পারে। তবে তা যে ঘটে, এটা তো দেখাই গেল। ভ্রাম্যমাণ আদালত একটি সংক্ষিপ্ত বিচারিক প্রক্রিয়া। শাসনব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে এটা পরিচালনা করা হয়। আইনত বাধা না থাকলেও শিক্ষানবিশ ম্যাজিস্ট্রেটদের এ কাজের দায়িত্ব বিশেষ প্রয়োজন না হলে না দেওয়াই সংগত। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন বলে আশা রইল। তাঁদের ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করা আবশ্যক।
উল্লেখ্য, বাল্যবিবাহ রোধ, ইভ টিজিং, পরিবেশ বিপর্যয় রোধ, ভেজাল প্রতিরোধ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস চুরিসহ বেশ কিছু অপরাধ দমনেও ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কও রয়েছে। এই আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ খুবই সীমিত। তাই দণ্ড বিধান কিংবা এর মাত্রা সম্পর্কে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যথেষ্ট সংযম আশা করা অসংগত হবে না। অপরাধ তাঁদের সামনে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হতে হবে। আর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে করতে হবে দোষ স্বীকার। এ দুটো বিষয়ে নিশ্চিত করেই ভ্রাম্যমাণ আদালত দণ্ড বিধান করতে পারেন।
নচেৎ সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করে তঁাকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিতে হবে। সে জন্যই এ ধরনের বিচারকাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কিছুটা পরিপক্বতা আবশ্যক। এ বিবেচনাতেই শিক্ষানবিশ ম্যাজিস্ট্রেটদের এ দায়িত্ব দেওয়া যথাসম্ভব পরিহার করা সংগত। ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে উপরিউক্ত আলোচনা প্রাসঙ্গিক। তবে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত জরিমানা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক স্বয়ং আত্মসাৎ যেকোনো বিবেচনায় গুরুতর অপরাধ। এটা তঁার অসদাচরণের শামিল। আগেই আলোচিত হয়েছে শিক্ষানবিশকালে কোনো কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করতে দীর্ঘ কোনো প্রক্রিয়ার আবশ্যকতা থাকে না। ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলে অতি সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে তা করা যায়। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ নিশ্চয়ই অবগত আছে। তারা সুবিবেচনাপ্রসূত ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেবে, এমন প্রত্যাশা সংগত। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনও বিবেচনায় নিতে পারে। উল্লেখ্য, অধীনস্থ কর্মকর্তাদের অকারণ হয়রানি থেকে রক্ষা করা যেমন শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, তেমনি তাঁদের অপরাধমূলক কাজের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করাও তাঁদের দায়িত্ব।
বেসামরিক চাকরিগুলোর প্রায় সব ক্ষেত্রেই আজ যে দুর্বলতা বিরাজ করছে, তার কারণ নানাবিধ। তবে এ ধরনের প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের কোনো না কোনো ফাঁকে দায়মুক্তি পাওয়া সেসব কারণের গুরুত্বপূর্ণ একটি, এমনটি বললে ভুল হবে না। এগুলো করতে করতে আমরা দেশের শাসনব্যবস্থাকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে ফেলেছি। যারা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের মর্যাদা আর সরকার ও ক্ষেত্রবিশেষে দেশের ভাবমূর্তি সম্পর্কে নিরাসক্ত থাকে, তাদের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য দেখানো কেবল অযৌক্তিক নয়, অন্যায্যও বটে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.