ছিটমহলবাসীর স্বাধীনতা by তুহিন ওয়াদুদ

দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের বাসিন্দাদের আনন্দ মিছিল
মনির উদ্দীন। বয়স প্রায় ৫৫ বছর। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় ভারতের ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় বাড়ি। ৯ মে সেখানেই তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ছিটমহল সমস্যা নিরসনের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে অনেকের মতো তিনিও আবেগী কণ্ঠে বলেন, ‘এত দিন আমরা মানুষ হিসেবে গণ্য হইতে পারি নাই। কিন্তু আইজ আমার আনন্দে বুক ভরি যাচ্ছে। আজকে বাংলাদেশ সরকার আমাদের সত্যিকার পরিচয় আনি দিল। এর জন্য আমরা তার কাছে চিরঋণী।’
ছিটমহলবাসী বললেন, তাঁদের স্বাধীনতা লাভ হলো। মুক্তির আনন্দে তাঁরা কথা বলার ভাষা হারিয়েছেন। ছিটমহলগুলোতে এখন কী রকম আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, সেটা ওখানে না গেলে বোঝা যাবে না। তবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আবেগকে যাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁরা উপলব্ধি করতে পারবেন ছিটমহলবাসীর আনন্দটা কেমন।
দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের কামারপুরে অনেক মানুষের ভিড়ে প্রায় শতবর্ষী এক বৃদ্ধ বললেন, ‘১৯৪৭ সালের পর গত ৬৮ বছরে আর কোনো উন্নয়ন সেখানে হয়নি।’ ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান পেয়েছে স্বাধীনতা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি (১৭ হাজার ১৫৮ একর) এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি (৭ হাজার ১১০ একর) ছিটমহলের মানুষ হারিয়েছে দেশ। পাকিস্তানিদের শোষণযন্ত্র থেকেও বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে ১৯৭১ সালে। কিন্তু ছিটমহলবাসীর মুক্তি তখনো হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে ছিটমহল সমস্যা দূর করার জন্য মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি করেছিলেন। ৪১ বছর পর সেই চুক্তির বাস্তবায়ন হতে চলেছে। ১৬২টি ছিটমহলের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ সেই অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
সে কারণে ছিটমহলবাসী বারবার বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধায়। বারবার উচ্চারণ করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। আনন্দ মিছিল চলছে প্রতিদিনই। জনসভায় যাঁরাই কথা বলতে আসছেন, তাঁরা সবাই বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা গান্ধী-শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করছেন। ছিটমহলবাসীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করা সংগঠন ‘বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি’-এর সাইনবোর্ডেও ছোট করে ওপরে লেখা ‘৭৪–এর চুক্তি, ছিটবাসীর মুক্তি’।
ছিটের ভেতরে রয়েছে ছিট। দাসিয়ারছড়া ভারতের ছিটমহল। তার মধ্যে বাংলাদেশের ছিটমহল ‘ছিট চন্দ্রঘোনা’। সেখানকার বাসিন্দা ছিটমহলবাসীর মুক্তি আন্দোলনের সংগঠক রফিকুল আলম বলছিলেন, ‘আমরা গত ৬৮ বছর অপরাধ করলে আসামি হয়েছি, কিন্তু আমরা কেউ বাদী হতে পারিনি। ভারতও আমাদের আসামি করেছে, বাংলাদেশও।’ বাজারের মধ্যে ছোট্ট একটা দোকানের ভেতরে দেখি একটি বিছানা পাতানো। দোকানি আবদুল লতিফ বললেন, ‘ছিটে তো কোনো বিচার নেই। রাতে চুরি হলেও কিছুই করার নেই, তাই রাতে এই বিছানায় থেকে দোকান পাহারা দিয়ে রাখি।’
অসুস্থ হলে মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করে ছিটমহলবাসী চিকিৎসা নিয়েছে। হজ করার জন্যও মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করতে হয়েছে। জমি বিক্রি হয়েছে সাদা কাগজে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। বিদ্যুৎ নেই। পথঘাট নেই। ছিটমহলবাসী মাওলানা আবদুল হামিদ খান বললেন, ‘বাইরার ঠিকানা নেওয়া, মিথ্যা কথা কওয়া বন্ধ হলো। জীবনের সব সমস্যার সমাধান আল্লাহর রহমতে হয়ে গেল। আমরা খুবই আনন্দিত।’
হোসেন আলী নামের এক কৃষক অনুভূতি ব্যক্ত করছিলেন এই বলে, ‘এখন আমাদের খুব ভালো লেগেছে। যে আনন্দের কোনো শেষ নাই, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এত আনন্দ লেগেছে আমাদের। আমরা তো এত দিন খাঁচার ভেতরে বন্দী ছিলাম। এখন মুক্ত আকাশ দেখতে পাব।’
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ারছড়া ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মেজাফফর হোসেন এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রথমেই একটা ন্যাশনাল আইডি কার্ড দরকার। হাসপাতাল দরকার। বিদ্যুৎ দরকার। আমার মেয়ে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। তাকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা করি। বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরকার, রাস্তাঘাট দরকার।’
অনেককেই জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কেউ ভারতে যেতে চায় কি না। তারা কেউই ভারতে যেতে চায় না। জন্মভূমি ছেড়ে যেতে তারা নারাজ। ‘জননী, জন্মভূমি স্বর্গাদপী গরীয়সী’। তবে কেউই যাবে না, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ছিটমহলে কিছু মানুষ আছে, যারা চেয়েছিল ছিটমহল বিনিময় না হোক। এর নেপথ্যে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য বিরাজমান। শোনা যায়, তারা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত। যারা ছিটমহল সমস্যার নিষ্পত্তি চেয়েছে, তারা এই অসাধুদের রাজাকার বলে উল্লেখ করছে। অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক ঘর ভারতে যেতে চায়, তারা এই সংগঠনের। ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভায় ৬ ও ৭ মে সীমান্ত বিল পেশ হওয়ার পর যাতে করে ছিটমহলগুলোতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য বাংলাদেশ-ভারত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্স করে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছিটমহল পরিদর্শন করেছেন।
ছিমহলগুলো ছিল অপরাধীদের অভয়ারণ্য। বাংলাদেশ-ভারতের অনেকেই অপরাধ করে ছিটমহলগুলোতে আশ্রয় নিত। কী রকম অপরাধ হতো, তার অনেক তথ্য–প্রমাণ আছে। দাসিয়ারছড়া ছিটমহলে একটি বাজারের নাম ‘টংকার মোড় ডাইলের বাজার’। এখানে ৬ মে পর্যন্ত প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হতো। সব সময় কয়েক শ মোটরসাইকেল সেখানে থাকত। ঈদের সময় কয়েক হাজার মোটরবাইকে সেখানে যেত নেশার উদ্দেশ্যে। ৬ তারিখের পর প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি বন্ধ হয়েছে।
ছিটমহলবাসীর কষ্ট স্বতন্ত্র, সমস্যাও স্বতন্ত্র। সে জন্য উভয় দেশের এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই হলো তাদের সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ইতিহাসের অন্ধকার গলিতে আলোর পথ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকার, ভারত সরকার তথা যারা চেষ্টা করেছে, তাদের সবাইকে প্রজন্ম পরম্পরায় গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে ছিটমহলবাসী। সর্বোপরি এ কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর। আর বাস্তবায়নের কৃতিত্ব শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির। ছিটমহলবাসী একবার নিজ চোখে এ দুই প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে চায়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তাতে করে বাংলাদেশের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যে আগামী মাসে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে তিস্তার পানি বণ্টনসহ চুক্তিও হবে।
রাষ্ট্রিক আনুকূল্যে রচিত হোক মানুষের জয়গাথা।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudutuhin@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.