মারিও বার্গাস য়োসার নোবেল ভাষণ- পঠন ও কাহিনীর নান্দীপাঠ

মি পড়তে শিখি পাঁচ বছর বয়সে, বলিভিয়ার কোচাবাম্বায় ডে লা সালে একাডেমিতে ব্রাদার জাস্টিনিয়াগের ক্লাসে। আমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে তার মধ্যে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় সত্তর বছর পর আমি স্পষ্ট মনে করতে পারছি বইয়ের শব্দগুলো চিত্রকল্পে রূপান্তরিত হওয়ার যে জাদু তা কেমন করে আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে, সময় ও পরিসরের বাঁধ ভেঙে ক্যাপ্টেন নেমোর সঙ্গে সাগরতলায় কুড়ি হাজার জাতির মধ্যে ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে।
গুপ্তসন্ধানী রিচেলিওর দিনগুলোতে রানীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হুমকিদাতা দ্য আর্তাগনান, অ্যাথোস, পোর্তোস ও আরামিসের সঙ্গে লড়াই করতে দিয়েছে, প্যারিসের নর্দমার ভেতর হোঁচট খেয়ে জাঁ ভালজায় রূপান্তরিত হয়ে মারিউসের নিথর দেহ আমার পিঠের ওপর বহন করার সুযোগ দিয়েছে।
পড়া স্বপ্নকে জীবনে এবং জীবনকে স্বপ্নে রূপান্তরিত করেছে এবং সাহিত্যের বিশ্বকে আমি যে একদা বালক ছিলাম সেই বালকের সামনে মেলে ধরেছে। আমার মা আমাকে বলেছেন, আমি প্রথম যা কিছু লিখেছি তা আমার শোনা গল্পের ধারাবাহিকতায় লেখা, কারণ গল্পগুলো যখন শেষ হয়েছে আমাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত করেছে কিংবা সেই গল্পের শেষটা আমি বদলে দিতে চেয়েছি। সম্ভবত না বুঝেই ঠিক এ কাজটা করে আমার জীবন কাটিয়ে দিয়েছি, সময় দীর্ঘায়িত হয়ে আমি বেড়ে উঠেছি, বিকশিত হয়েছি, বয়স বেড়েছে আমার শৈশব পরিপূর্ণ করে দেওয়া আনন্দ ও অভিযানের গল্পগুলো নিয়ে।
আজ আমার মা যদি এখানে থাকতেন_যে নারী আমান্দো নার্ভো ও পাবলো নেরুদার কবিতা পড়ে কেঁদে ফেলতেন, আমার মাতামহ পেদ্রোও যদি থাকতেন, তার বড় নাসিকা ও উজ্জ্বল টাকসহ, যিনি আমার কবিতা উদ্যাপন করেছেন, আমার মামা লুকো, যিনি প্রবল উৎসাহে আকুল হয়ে আমাকে বলেছেন, দেহ ও মন দিয়ে লেখালেখিতে লেগে থাকো, হোক তা সাহিত্য তবুও; সেই সময় লাতিন আমেরিকায় সাহিত্য থেকে প্রাপ্তি খুব কমই হতো। সারা জীবনই আমার পাশে এমন সব মানুষ পেয়েছি, যাঁরা আমাকে ভালোবাসতেন, উৎসাহ দিতেন এবং যখন আমার মধ্যে সন্দেহ উদিত হতো তাঁদের বিশ্বাস দিয়ে আমাকে সংক্রামিত করতেন। ধন্যবাদ তাঁদের। ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য আমার একগুঁয়েমির এবং কিছুটা ভাগ্যেরও_আমার সময়ের অধিকাংশটুকু লেখালেখির তাড়না, পাপ এবং বিস্ময়ের পেছনে নিবেদিত রাখতে পেরেছি, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আশ্রয় নেয়ার মতো সমান্তরাল একটি জীবন সৃষ্টি করতে পেরেছি, অসাধারণকে স্বাভাবিক এবং স্বাভাবিককে অসাধারণ কিছুতে পরিণত করতে শিখেছি, যা নৈরাজ্য দূর করে দেয়, কুৎসিতকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, মুহূর্তকে অনন্তে পরিণত করে আর মৃত্যুকে করে বিলীয়মান দৃশ্যপটে।
গল্প লেখা সহজ ছিল না। যখন গল্প শব্দে পরিণত হতো, গল্পের প্রকল্প কাগজে হারিয়ে যেত, ব্যর্থ হতো ভাব ও চিত্রকল্প। এসবকে কেমন করে পুনরুজ্জীবিত করা? সৌভাগ্যবশত গুরুরা তো ছিলেনই যে সব শিক্ষকের কাছ থেকে শিখতে হবে, অনুসরণ করতে হবে যাঁদের উদাহরণ। ফ্লবেয়র আমাকে শিখিয়েছেন_মেধা হচ্ছে অনমনীয় শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য। উইলিয়াম ফকনার শিখিয়েছেন লেখার ধরন_লেখা ও কাঠামো_যা বিষয়কে তুলে ধরে কিংবা নিঃস্ব করে। মার্তোবেল, সার্ভেন্তেস, চার্লস ডিকেন্স, বালজাক, তলস্তয়, যোসেফ কনরাড, টমাস মান দেখিয়েছেন শৈলীর নৈপুণ্য ও বর্ণনা কৌশলের মতো উপন্যাসে ব্যাপ্তি ও উচ্চাশা একই রকম জরুরি। সার্ত্রে লিখিয়েছেন, শব্দই কার্যক্রম_একটি উপন্যাস, একটি নাটক কিংবা একটি প্রবন্ধ, যা বর্তমান সময় ও উত্তম বিকল্পের সঙ্গে বিজড়িত তা ইতিহাসের ধারা বদলে দিতে পারে। আলবেয়ার কামু ও জর্জ অরওয়েল দেখিয়েছেন, নৈতিকতাবর্জিত সাহিত্য অমানবিক আর ক্রিস্টোফর মারলো শিখিয়েছেন, একালেও বীরত্ব ও মহাকাব্যিক উপাখ্যান সম্ভব_যেমন তা ছিল আরগোনাট, অডেসি ও ইলিয়াডের সময়।
এই ভাষণে সকল লেখককেই আহ্বান জানানোর কথা, যাঁদের কাছে আমি কম-বেশি ঋণী_তাঁদের ছায়া আমাদের অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রাখতে পারত। তাঁদের সংখ্যা অনেক। গল্প বলার গোপন কৌশল প্রকাশ করা ছাড়াও আমাকে বাধিত করেছেন যেন আমি মানবতার অতল গভীর অনুসন্ধান করে আসতে পারি, বীরত্বপূর্ণ কীর্তির প্রশংসা করতে পারি; বশ্যতায় অভিভূত অনুভূতি জাগ্রত হয়। তাঁরাই আমার সবচেয়ে উপকারী, যাঁরা আমার স্বরে শক্তি জুগিয়েছেন, যাঁদের গ্রন্থে আমি আবিষ্কার করেছি যে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও আশা জেগে থাকে আর বেঁচে থাকার প্রচেষ্টাটিকে যুক্তিযুক্ত জীবন ছাড়া আমরা পড়তে পারব না, গল্পের কল্পনা করতে পারব না।
কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে, আমার দেশের মতো একটি দেশে যেখান পাঠকের সংখ্যা হাতে গোনা যায়, যেখানে এত মানুষ দরিদ্র ও অশিক্ষিত, এত অবিচার, যেখানে সংস্কৃতি কেবল গুটিকয় সুবিধাভোগী মানুষের_সেখানে লেখালেখি করাটা কি আত্মপ্রসাদের বিলাসিতা নয়? এই সন্দেহ তবুও এখনো আমার ভেতরে ইচ্ছের টুঁটি চেপে ধরেনি। আমি সব সময়ই লিখে গেছি, যখন এমনকি বেঁচে থাকার জন্য কামাই করতে আমার প্রায় পুরো সময় কেটে যেত, আমি বিশ্বাস করি আমি ঠিক কাজটিই করেছি; সাহিত্যের বিকাশের জন্য যদি সবার আগে সমাজে উন্নত সংস্কৃতি, স্বাধীনতা, বৈভব ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হয়, তা হলে সাহিত্যের অস্তিত্বই থাকত না। সাহিত্যকে সাধুবাদ, সাহিত্য সচেতনার যে আকার সৃষ্টি করে, যে ইচ্ছে ও বাসনাকে উদ্দীপিত করে, আমরা যখন সুদূর কল্পলোক থেকে ফিরে আসি, বাস্তবতার সঙ্গে মোহমুক্তি ঘটায়, গল্পকার যখন তাঁর কাহিনীতে মানবিকতার মিশেল দিতে থাকেন সভ্যতার নিষ্ঠুরতা তখন কমে আসে। আমরা যেসব ভালো বই পড়ছি, সেগুলো না থাকলে আমাদের অবস্থা আরো খারাপ হতো, আরো গতানুগতিক, চাঞ্চল্যহীন, আরো সমর্পিত আর সংকটাকীর্ণ হয়ে পড়ত, প্রগতির ইঞ্জিনের অস্তিত্বই থাকত না। লেখালেখির মতো পড়াও জীবনে অপর্যাপ্ততার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। জীবনে যা মেলে না তার জন্য কাহিনীতে ডুবে যাই, আমরা বলতে থাকি_যদিও বলা কিংবা জানার দরকার নেই_জীবন যেমনটি আছে ঠিক সেভাবে আমাদের তৃষ্ণা মেটাতে পারে না_মানুষের জীবনমানের ভিত্তি আরো উন্নততর হতে হবে। আমাদের হাতে যখন কেবল একটাই জীবন, আমরা গল্প আবিষ্কার করি, যাতে তার মধ্যে আমাদের ইচ্ছামতো যেকোনোভাবে যে জীবন লালন করতে চাই, সে রকম বহু জীবন যাপন করতে থাকি।
জীবনকে বাঁচার মতো করে সাজাতে হলে গল্প ও কাহিনী ছাড়া জীবন স্বাধীনতার গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক কম সচেতন থাকতে হতো_যখন কোনো স্বৈরাচার, কোনো ভাবধারা কিংবা কোনো ধর্মের পদতলে জীবন পিষ্ট হয়, জীবন তখন নারকীয় হয়ে ওঠে। সাহিত্য আমাদের কোনো সুন্দর ও সুখের স্বপ্নে ডুবিয়ে রাখে না, সব ধরনের অনাচার সম্পর্কে সচেতন করে_যাঁরা এ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন, তাঁদের জিজ্ঞেস করুন_সকল শাসনামলেই কোল থেকে কবর পর্যন্ত নাগরিক আচরণ নিয়ন্ত্রণে কেন মরিয়া হয়ে ওঠে, কেন স্বাধীন লেখকের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখে। তারা তাই করে, কারণ তারা জানে বইয়ের ভেতর চিন্তাকে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে দিলে ঝুঁকি কোথায়, তারা জানে কাহিনী কতটা রাষ্ট্রদোহী হয়ে উঠতে পারে, যখন তারা কতটা স্বাধীনতা প্রাপ্য কল্পনা করে এবং বাস্তব পৃথিবীতে বাধা ও ভীতি সঞ্চার করে তাদের ওপর কী প্রয়োগ করা হয় তা বিবেচনায় আনে। লেখকরা চান কিংবা না-ই চান, জানেন কিংবা না-ই জানেন, তাঁরা যখন গল্প আবিষ্কার করেন, গল্পে তাঁরা অসন্তোষ ছড়াতে থাকেন, দেখিয়ে দেন তাঁদের পৃথিবীটা কত বাজেভাবে নির্মিত এবং কল্পনার জীবনটা আমাদের নিত্যকার জীবনের চেয়ে কত সমৃদ্ধ। এই সত্য যখন তাঁদের সংবেদন ও সচেতনতায় প্রোথিত হয়, নাগরিকদের সুবিধা মতো ব্যবহার করা কঠিন হয়ে ওঠে, তদন্তকারী ও কারাকর্তার মিথ্যেগুলোকে গ্রহণ করতে কম ইচ্ছুক হয়, যখন তারা তাদের বিশ্বাস করাতে চায় যে, গারদের ভেতরই নাগরিকরা অধিক নিরাপদ ও উন্নততর জীবন খুঁজে পাবে।
ভালো সাহিত্য বিভিন্ন ধরনের মানুষের মাঝে সেতুবন্ধ রচনা করে, আমাদের উপভোগ করিয়ে, যন্ত্রণা দিয়ে, বিস্মিত করে, ভাষা, বিশ্বাস, অভ্যাস, রীতিনীতি পছন্দ-অপছন্দ, যা আমাদের পৃথক করে রাখে তা ডিঙিয়ে আমাদের ভেতর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। যখন অতিকায় সাদা তিমি ক্যাপ্টেন আহাবকে সমুদ্রে সমাহিত করে, পাঠকের হৃদয় টোকিও, লিমা কিংবা টিম্বাকুট যেখানে হোক এমনই ভাবে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। যখন এমা বোভারি আর্সেনিক সেবন করে, আনা কারেনিনা নিজেকে ছুড়ে দেয় চলন্ত ট্রেনের সামনে, জুলিয়েন সোরেন ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করে যখন 'এল সুর'-এ নাগরিক চিকিৎসক হুয়ান ডালমান দুর্বৃত্তের ছুরির মুখে শুঁড়িখানা থেকে বের হয়ে তৃণক্ষেত্রের দিকে এগোয় কিংবা আমরা যখন বুঝতে পারি পেদ্রো পারামোর গ্রাম কোমালার অধিবাসীরা মৃত তখনকার যে ভীতকম্পিত অবস্থা, তা সবার জন্য একই_যারা বুদ্ধ, কনফুসিয়াস খ্রিস্ট, আল্লাহর উপাসনা করে কিংবা যারা সন্দেহবাদী, যারা জ্যাকেট ও টাই পরে, জালাবা, কিমোনো কিংবা বোম্বাচা পরে সবার জন্য একই রকম। সাহিত্য মানুষের বৈচিত্র্যের মধ্যে ভ্রাতৃভাব সৃষ্টি করে এবং অজ্ঞানতা, ভাবধারা, ধর্ম, ভাষা কিংবা মূর্খতা দিয়ে নর-নারীর সামনে যে সীমান্ত তৈরি করে দেওয়া হয় তা ম্লান করে দেয়।
সমস্ত কালেরই নিজস্ব আতঙ্ক রয়েছে_আমাদেরটা হচ্ছে ধর্মান্ধতার, আত্ম-হন্তারক সন্ত্রাসীর, একটি আদিম প্রজাতির যারা মনে করত_হত্যা করে তারা স্বর্গ লাভ করবে, নিষ্পাপ মানুষের রক্ত সমষ্টির কলঙ্ক ধুয়ে দেবে, অবিচারকে পরিশুদ্ধ করবে এবং মিথ্যে বিশ্বাসের ওপর সত্য আরোপ করবে। যারা মনে করে তাদের অধিকারে চরম সত্য, তাদের হাতে প্রতিদিন সারা বিশ্বে অসংখ্য মানুষ বলি হচ্ছে। সর্বাত্মকবাদী সাম্রাজ্যগুলো ভেঙে যাওয়ার পর আমরা বিশ্বাস করেছিলাম একসঙ্গে বসবাস, শান্তি, বহুত্ববাদ এবং মানবাধিকার বাড়তে থাকবে, আর পৃথিবী পেছনে ফেলে আসবে মহাযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা, অবরোধ এবং নির্মূল করার যুদ্ধ। কিন্তু এর কিছুই ঘটল না। গোঁড়ামি প্ররোচিত নতুন ধরনের বর্বরতার বিকাশ ঘটেছে, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের অস্ত্রের দ্রুত বিস্তার ঘটছে_এই সত্যকে যখন আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই, উন্মুক্ত ত্রাণকর্তাদের কোনো এক অংশ একসময় পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের প্ররোচনা দিতে পারে। আমাদের তা প্রতিহত করতে হবে, মোকাবিলা করতে হবে এবং তাদের পরাস্ত করতে হবে। তারা সংখ্যায় বেশি নয়, কিন্তু তাদের অপরাধের তুমুল কোলাহল পৃথিবী জুড়েই প্রতিধ্বনিত হয়। তারা দুঃস্বপ্নের যে বিভীষিকা ছড়ায়, তা আমাদের ভীত বিহ্বল করে রাখে। সভ্যতার এই দীর্ঘপরিক্রমায় আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তা যারা ছিনিয়ে নিতে চায়, তাদের আতঙ্কত্রাসের কাছে আমরা নিজেদের সপে দিতে পারি না। চলুন আমরা উদার গণতন্ত্রের পক্ষে লড়ি। সব সীমাবদ্ধতার পরও এতেই রয়েছে রাজনৈতিক বন্ধুত্ববাদ, সহাবস্থান, সহনশীলতা, মানবাধিকার, সমালোচনার প্রতি শ্রদ্ধা, বৈধতা, অবাধ নির্বাচন, ক্ষমতার বদল_সব কিছুই, যা আমাদের পাশবিক জীবন থেকে তুলে এনে নৈকট্য প্রদান করেছে_যদিও কখনো সেখানে পেঁৗছতে পারব না_সাহিত্য যে সুন্দর ও সম্পূর্ণ জীবনের সৃষ্টি, যা কেবল ঘটতে পারে আবিষ্কারে লিখে এবং সাহিত্য পাঠ করে। মানুষ হত্যাকারী গোঁড়াদের মোকাবিলা করে আমাদের স্বপ্ন দেখার এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের অধিকার রক্ষা করতে হবে।
যৌবনে আমার প্রজন্মের অনেক লেখকের মতো আমিও একজন মার্কসবাদী ছিলাম এবং বিশ্বাস করতাম আমার দেশে, লাতিন আমেরিকায় ও তৃতীয় বিশ্বের আর সব দেশে সমাজতন্ত্রই হবে শোষণ ও সামাজিক অবিচারের প্রতিকার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সর্বাত্মকবাদ ও যূথবদ্ধতা সম্পর্কে আমার মোহমুক্তি এবং গণতন্ত্র ও উদারপন্থাকে গ্রহণ_এখন আমি যা কিংবা আমি যা হতে চেষ্টা করি_এটা দীর্ঘ ও জটিল একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়েছে, যার পেছনে কাজ করেছে কিউবার বিপ্লবের রূপান্তরের মতো ঘটনা। যে বিপ্লব সম্পর্কে সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ববাদী উলম্ব মডেল সম্পর্কে অতি উৎসাহী ছিলাম; বন্দিশিবির গুলানোর কাঁটাতার ডিঙিয়ে দেশ ছেড়ে ভিন্ন মতাবলম্বী যাঁরা বাইরে আসতে পেরেছেন তাঁদের সাক্ষ্য, ওয়ারশ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর চেকোশ্লোভাকিয়ার আমন্ত্রণ এবং এর পেছনে রয়েছেন র‌্যায়মন্ড অ্যারন, জ্যাঁ ফ্রাঁসোয়া রেভেল, ইসাইয়া বার্লিন ও কার্ল পপারের মতো চিন্তাবিদ যাঁদের কাছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও উন্মুক্ত সমাজ সম্পর্কে আমরা পুনর্মূল্যায়নের জন্য ঋণগ্রস্ত। জ্ঞানের এই গুরুরাই সহজবোধ্যতা ও অসীম সাহসেরই উদাহরণ, যখন পশ্চিমের বুদ্ধিজীবীরা জাপান কিংবা সুবিধাবাদের বশবর্তী হয়ে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের জাদু কিংবা তার চেয়েও খারাপ চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রক্তাক্ত পেত্নীর বিশ্রামের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।
বালক হিসেবে আমি কোনো না কোনো দিন প্যারিসে আমার স্বপ্ন দেখতাম, কারণ ফরাসি সাহিত্যের ঝলকানিতে আমি বিশ্বাস করতাম, সেখানে বাস করলে এবং যে বাতাসে শ্বাস নিয়েছেন বালজাক, স্তাদাল, বোদলেয়র এবং মার্শেল প্রুস্ত সে বাতাস যদি আমিও গ্রহণ করি, তা আমাকে সত্যিকার লেখকে পরিণত করলে আর আমি যদি পেরু ছেড়ে না যাই, তাহলে আমি বড়জোর রবিবার ও অন্যসব ছুটির দিনের ছদ্ম লেখক হয়ে উঠব। সত্যি কথাটি হচ্ছে, ফ্রান্স ও ফরাসি সংস্কৃতির কাছে আমার অবিস্মরণীয় শিক্ষাগ্রহণের ঋণ_যেমন সাহিত্য যতটা ভেতরের তাড়না শৃঙ্খলাও ততোটা, সাহিত্য একটি চাকরির মতোই, সাহিত্য গোয়ার্তুমিও। আমি যখন সেখানে ছিলাম, তখন সার্ত্রে ও কামু বেঁচে আছেন এবং লিখে যাচ্ছেন_যে সময়টা আয়োনেস্কো, বেকেট, বাতিলে ও কিওরানের_ব্রেম্বটের থিয়েটার আবিষ্কার এবং ইঙ্গমার বার্গম্যানের চলচিত্র জ্যাঁ ভিলার থিয়েটার ন্যাশনাল পপুলেয়ার, জ্যাঁ লুই বরন্মের অডিওন, নভেল ভোগ এবং নভো রোমান, বক্তৃতা, চমৎকার সাহিত্যের লেখালেখি, আন্দ্রে সালরো এবং সে সময় ইউরোপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রদর্শনী, সাংবাদিক সম্মেলন ও জেনারেল দ্য গল-এর অলিম্পিক ঘোষণা_এসবের মধ্যে আমার প্যারিস বাস। কিন্তু লাতিন আমেরিকা আবিষ্কার করার জন্যই আমি ফ্রান্সের কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী। সেখানেই আমি শিখলাম ইতিহাস, ভূগোল, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা, একটি বিশেষ ধরনের জীবন কথন ও লিখনের উপাদেয় একটি ভাষা_সব কিছুর বন্ধনে পেরু ছিল একটি বিশাল সম্প্রদায়ের অংশ। আর সেই সব বছরে পেরুতে হয়ে উঠছিল নতুন এবং শক্তিমন্ত সাহিত্যকর্ম। প্যারিসেই আমি পাঠ করি বোর্হেস, ওক্তাবিও পাস, কোর্তাজার, গার্সিয়া মার্কেজ, কার্লোস ফুয়েন্তেস, ক্যাব্রিরা ইনফান্তে, হুয়ান রুলফো, ওনেত্তি, আলেহো কার্পেন্তিয়ার, এডোয়ার্ডস, দোনোসো এবং আরো অনেককেই, যাঁদের লেখা স্প্যানিশ ভাষার কথাসাহিত্যে বিপ্লব এনে দিয়েছিল; আর ধন্যবাদ তাঁদের, যাঁরা ইউরোপ ও পৃথিবীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে দিয়ে আবিষ্কার করিয়েছেন লাতিন আমেরিকা কেবল অভ্যুত্থানের মহাদেশ নয়, স্বৈরাচারের নয়, দাড়িওয়ালা গেরিলাদের নয়, কেবল মাম্বো মারাকাস, চা-চা-চা নৃত্য নয়, লাতিন আমেরিকা কল্পনার মহাদেশ, শিল্পধারার, সাহিত্যের কল্পলোকের, যা চিত্রময়তায় প্রতিভাত, যা একটি বৈশ্বিক ভাষায় কথা বলে।
সেই সময় থেকে আজকের সময় কখনো হোঁচট খেয়ে, কখনো মহাভুল করে এলেও লাতিন আমেরিকা এগিয়েছে, যদিও সেজার ভায়েহো একটি কবিতায় বলেছেন, 'ভাই, এখনো অনেক কিছু করার আছে।' আগের চেয়ে আমরা এখন কমসংখ্যক একনায়কের হাতে, কেবল কিউবা এবং তার ঘোষিত উত্তরসূরি ভেনিজুয়েলায় একনায়কের শাসন, কিছু ছদ্ম লোকরঞ্জনবাদী ও ভাঁড় গণতন্ত্রী শাসন করছে বলিভিয়া, নিকারাগুয়ার মতো দেশ। তবে মহাদেশের আর সব রাষ্ট্রে বৃহত্তর জনমতের সমর্থনেই গণতন্ত্র কাজ করে যাচ্ছে। আর আমাদের ইতিহাসে এই প্রথম ব্রাজিল, চিলি, উরুগুয়ে, পেরু, কলম্বিয়া, ডমিনিকান রিপাবলিক, মেঙ্েিকা এবং প্রায় লাতিন আমেরিকায় আমাদের একটি বাম ও একটি ডান রাজনৈতিক শক্তি আছে, যারা আইনের শাসন, সমালোচনার স্বাধীনতা, নির্বাচন ও ক্ষমতা বদলের প্রশ্নে শ্রদ্ধাশীল। এটিই হচ্ছে সঠিক পথ এবং লাতিন আমেরিকা যদি এই পথে থাকে, কুচক্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে শেষ পর্যন্ত লাতিন আমেরিকাই পরিণত হবে আগামীর মহাদেশ এবং তখন হবে বর্তমানের মহাদেশ।
আমি ইউরোপে কখনোই নিজেকে বিদেশি অনুভব করিনি, আসলে পৃথিবীর কোথাও না। আমি যেসব স্থানে বসবাস করেছি_প্যারিস, লন্ডন, বার্সেলোনা, মাদ্রিদ, বার্লিন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, ব্রাজিল কিংবা ডমিনিকান রিপাবলিক, আমি স্বদেশই বোধ করেছি। আমি সর্বত্রই একটি নিরাপদ গুহা পেয়ে গেছি, যেখানে আমি শান্তিতে থেকেছি, কাজ করেছি শিখেছি, স্বপ্ন লালন করেছি। বন্ধু খুঁজে পেয়েছি, পড়ার মতো ভালো বই পেয়েছি এবং পেয়েছি লেখার বিষয়। এটা আমার কখনো মনে হয়নি অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও আমার এই বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠা আমার 'মূল'কে দুর্বল করে দিয়েছে, আমার নিজের দেশের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে_এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, কারণ তাই যদি হতো আমার পেরুর অভিজ্ঞতা লেখক হিসেবে আমাকে ক্রমাগত পরিপুষ্ট করত না এবং এমনকি আমি যখন পেরু থেকে দূরে থাকি, পেরু বারবার আমার লেখায় ফিরে ফিরে আসত না, বরং আমার মনে হয়, যে দেশে আমার জন্ম হয়েছে সেই পেরু থেকে এতটা দীর্ঘসময় দূরে থাকার কারণে আমার সঙ্গে পেরুর সংযোগগুলো আরো দৃঢ় হয়েছে। আমাকে আরো স্বাচ্ছন্দ্য প্রেক্ষাপট প্রদান করেছে, একটি নস্টালজিয়া দিয়েছে, যা উচ্ছ্বাস থেকে বাস্তবতাকে পৃথক করতে পারে এবং স্মৃতিতে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে পারে। যে দেশে কেউ জন্মগ্রহণ করেছে, সে দেশের জন্য ভালোবাসাটা বাধ্যতামূলক হতে পারে না, তবে অন্য যেকোনো ভালোবাসার মতোই এই ভালোবাসাকেও হৃদয় থেকে স্বতোৎসারিত হতে হবে_যে ভালোবাসা প্রণয়ী যুগল করে বেঁধে রাখে পিতামাতা ও সন্তানদের, বন্ধুদের।
আমি পেরুকে বহন করি আমার গহীন অন্তস্থলে, কারণ সেখানে আমার জন্ম হয়েছে, আমি বেড়ে উঠেছি, সুগঠিত হয়েছি, শৈশব ও যৌবনের সেইসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছি, যা আমার ব্যক্তিত্ব গড়েছে, আমার ভেতরের তাড়না সৃষ্টি করেছে আর সেখানেই আমি ভালোবেসেছি, ঘৃণা করেছি, আনন্দ প্রকাশ করেছি, যন্ত্রণা পেয়েছি এবং স্বপ্ন দেখেছি। সেখানে যাই ঘটে, তা আমাকে বেশি প্রভাবিত করে, নাড়া দেয় এবং অন্য কোথাও কিছু ঘটলে যা না হয়, আমাকে তার চেয়ে বেশি উত্তেজিত করে পেরুর ঘটনা। আমি চাইনি আমার এমনটা হোক কিংবা আমার ওপর এটা আমি চাপিয়েও দিইনি। এটা এমনই।
কতিপয় স্বদেশবাসী আমার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনে এবং বিগত একনায়কের রাজত্বকালে আমার নাগরিকত্ব হারাতে বসেছিলাম। আমি পৃথিবীর গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে তারা যেন আমার দেশের একনায়ককে শায়েস্তা করে; আমি সব একনায়কের ব্যাপারেই_যেকোনো ধরনের একনায়কই হোক, একই কাজ করছি_পিনোশে, ফিদেল কাস্ত্রো, আফগানিস্তানে তালেবান, ইরানের ইমাম, বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা, বার্মার (এখন নাম মিয়ানমার) উর্দি পরা জান্তা। আমি আবার আগামীকালও তা-ই করব, যদি এমন না হোক, পেরুর লোকজন যেন তা চান, পেরু যদি আরেকবার অভ্যুত্থানের বলি হয়ে যায়, যা আমাদের ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে ছাড়বে। আমি তারও প্রতিবাদ করব। এটা কোনো অধঃক্ষেপণ নয়, বিদ্বেষী মানুষের আবেগের উৎসারণ নয়। কোনো কোনো লেখক লিখেছেন, নিজেদের ক্ষুদ্রতর দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যদের বিচার করা। আমার বেলায় এটা আমার বিশ্বাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ যে একনায়কত্ববাদ একটি দেশের চরম অশুভকে প্রতিনিধিত্ব করে। একনায়কত্ব নির্মমতা ও দুর্নীতির উৎস। বিশাল ক্ষত সৃষ্টি করে, যা সেরে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়; একনায়কত্ব দেশের ভবিষ্যৎ বিষাক্ত করে তোলে, ক্ষতিকর অভ্যাস ও চর্চার সূত্রপাত করে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে থাকে এবং গণতান্ত্রিক পুনর্নির্মাণকে পিছিয়ে দেয়। সে কারণেই কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া উচিত_আমাদের হাতে লড়াই করার জন্য অর্থনৈতিক অবরোধসহ যা কিছু আছে, সব হাতিয়ার নিয়ে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, কিউবার দামাস দে ফ্র্যাঙ্কো, ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল, অং সান সু চি এবং লিও সিয়াওবো, যাঁরা নিপীড়িত হয়ে সাহসের সঙ্গে একনায়কের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন_গণতান্ত্রিক সরকারগুলো তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না; বরং অত্যাচারিতের পরিবর্তে অত্যাচারীর সন্তোষ সৃষ্টিতে নিজেদের ব্যস্ত রাখছে। এই সাহসী মানুষরা কেবল তাঁদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছেন না, আমাদের জন্যও লড়াই করে যাচ্ছেন।
আমার এক স্বদেশি হোসে মারিয়া আর্গুয়েদাস বলেছেন, "পেরু হচ্ছে 'প্রতিজনের রক্তের' একটি দেশ।" আমি বিশ্বাস করি না, কোন সূত্র এর চেয়ে ভালো ব্যাখ্যা দিতে সমর্থ হবে। আমরা তাই, আমরা সব পেরুডিয়ান তাই আমাদের অন্তরে বহন করি। আমরা পছন্দ করি বা না করি, আমাদের বহন করতে হয় চারটি এমন বিষয়ের সারাৎসার_ঐতিহ্য, জাতি, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। প্রাক-হিস্পানিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার হিসেবে আমি গর্ববোধ করি, যারা নাজকা, পারাকাস ও মশিকানদের পোশাক ও পালকের আলখাল্লা তৈরি করেছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাদুঘরে প্রদর্শিত ইনকা সিরামিক করতে পেরেছে, মাচু পিচু, গ্রান চিমু, চান চান, কুয়েলাপের নির্মাতা, লা ব্রুজা, এলসোল, না লুনার সমাধিক্ষেত্র_যাদের ধরে রেখেছি, যেসব স্প্যানিয়ার্ড ঘোড়ার পিঠে দু-পাশ থেকে ঝোলানো ব্যাগ, তরবারি এবং ঘোড়া নিয়ে পেরুকে গ্রিস ও রোমে নিয়ে এসেছেন। ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য, রেনেসাঁ, সার্ভেন্টেস, কুইভেদো এবং কঙ্গোরা। কর্কশ ক্যাস্টাইন ভাষা, যা আন্দেজদের হাতে মুখশ্রাব্য হয়ে উঠেছে_আমি তা নিয়ে গর্বিত। স্পেনের সঙ্গে আফ্রিকা এসেছে তার শক্তি, সংগীত এবং উচ্ছ্বসিত কল্পনাশক্তি নিয়ে। পেরু বৈচিত্র্যমুখিনতাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। আমরা যদি একটু অনুসন্ধান করি, পেয়ে যাব বোর্হেসের আলেফের মতো গোটা বিশ্বের একেকটি ছোট প্রতিচ্ছবি। একটি দেশের জন্য কী অসাধারণ এক সুযোগ_দেশের একটি পরিচিতি নেই। কারণ এই দেশের সব পরিচিতিই রয়েছে।
আর সব বিজয়ের মতো আমেরিকা বিজয়ও ছিল নির্মম ও সহিংস। আমরা এর সমালোচনা করব। কিন্তু যেমন আমরা বিস্মৃত হই, যারা লুণ্ঠন ও অপরাধকর্ম করেছে তাদের অধিকাংশই আমাদের পিতামহ, তাদের পিতামহ_এটা ভুলে গেলে চলবে না। যেসব স্পেনিয়ার্ড আমেরিকায় এসেছে এবং আমেরিকার রীতিনীতি গ্রহণ করেছে তারাই, যারা নিজ দেশে রয়ে গেছে তারা নয়। এই সমালোচনাকে সঠিকভাবে বলতে গেলে বলা যাবে, আত্মসমালোচনা। কারণ ২০০ বছর আগে আমরা যখন স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করি, যারা সেই সাবেক ঔপনিবেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাঁরা ইন্ডিয়ানদের মুক্ত করার পরিবর্তে, পুরনো ভুলের ন্যায়বিচার করার পরিবর্তে বিজয়ীর লালসা ও হিংস্রতা নিয়েই তাদের শোষণ অব্যাহত রেখেছেন এবং কোনো কোনো দেশে তাদের হত্যা করা হয়েছে, সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে। চলুন, আমরা চরম স্পষ্টতার সঙ্গে বলি : ২০০ বছর ধরে এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মুক্তি ছিল আমাদের একক দায়িত্ব। কিন্তু আমরা সেই দায়িত্ব পালন করিনি। পুরো লাতিন আমেরিকায় আদিবাসীর বিষয়টি অনিষ্পন্ন বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। এই কলঙ্ক ও লজ্জার ব্যতিক্রম কোথাও ঘটেনি।
আমি পেরুর মতোই স্পেনকে ভালোবাসি এবং স্পেনের কাছে আমার ঋণ আমার কৃতজ্ঞতার সমান। যদি স্পেন না হতো, আমি কখনো এই বক্তৃতামঞ্চে আসার সুযোগ পেতাম না; কিংবা পরিচিত কোনো লেখক হয়েও উঠতে পারতাম না এবং আমার অনেক হতভাগ্য সহকর্মীর মতো অক্ষম লেখকের দলে ঘুরে বেড়াতাম। কোনো প্রাপ্তি নেই, প্রকাশক নেই, পুরস্কার নেই, পাঠক নেই, যাদের মেধা, সান্ত্বনার জন্য বলতে হয়, উত্তরকাল এসে একদা তাদের আবিষ্কার করতে পারে। আমার সব বই স্পেনে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে আমি বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের স্বীকৃতি পেয়েছি এবং কার্লোস ব্যারাল, কারমেন ব্যালসেলসের মতো বন্ধুরা এবং আরো অনেকে আমার গল্পের পাঠকের জন্য বরাবরই উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। যখন আমার নিজ দেশের নাগরিকত্ব হরণ করে নেওয়ার কথা, স্পেন তখন আমাকে দ্বিতীয় নাগরিকত্ব দিয়েছে। পেরুর নাগরিক হওয়ার পরও স্পেনের পাসপোর্টে আমার কখনো মনে হয়নি একটা অন্যটার সঙ্গে যুতসই হয়ে খাপ খাচ্ছে না। কারণ, আমি বরাবরই স্পেন ও পেরুকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বিবেচনা করেছি, কেবল আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায়ই নয়, এই খাপ খাওয়ার প্রকৃত বাস্তবতা নিহিত উভয় দেশের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে।
আমি যত বছর স্প্যানিশ ভূমিতে জীবন কাটিয়েছি, আমার মনে পড়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল পাঁচটি বছর ১৯৭০ দশকে আমি কাটিয়েছি প্রিয় বার্সিলোনায়। ফ্রাঙ্কোর একনায়ক শাসন তখনো চলছে এবং ক্ষমতা জাহির করে যাচ্ছে। কিন্তু তত দিনে তা জরাজীর্ণ ফসিলের মতো হয়ে গেছে। কারণ বিশেষ করে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আগের সেই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ফাটল ও ফাঁকফোকর বেরিয়ে আসছে, যা সেন্সরের তালিতে জোড়া লাগানো সম্ভব হচ্ছিল না এবং তার মাধ্যমেই স্পেনের সমাজ নতুন ধারণা, বইপত্র, চিন্তাস্রোত শিল্পের মূল্যবোধ এবং শিল্পের প্রকরণ যতক্ষণ না নাশকতামূলক বলে প্রমাণিত হচ্ছে, অবলীলায় গ্রহণ করে নিয়েছে। এভাবে দরজা খুলে যাওয়ার শুরুতে বার্সেলোনা ছাড়া অন্য কোনো শহর এতটা কিংবা এর চেয়ে বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে পারেনি। কিংবা চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে বার্সেলোনার সমতুল্য উত্তেজনাকর অভিজ্ঞতা আর কোনো শহরের হয়নি। বার্সেলোনা স্পেনের সাংস্কৃতিক রাজধানীতে পরিণত হয়_এমন একটি স্থান, যেখানে থাকলেই মুক্তির প্রত্যাশা শ্বাসগ্রহণের সঙ্গে মিশে যায়।
আরেক অর্থে, বার্সেলোনাকে লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা চলত। কারণ লাতিন আমেরিকার বিপুলসংখ্যক চিত্রশিল্পী, লেখক, প্রকাশক এবং শিল্পী এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছেন কিংবা আসা-যাওয়ার পথে বার্সেলোনা হয়ে যাচ্ছেন। এটা এমন এক স্থান, আমাদের সময় কবি, ঔপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী কিংবা সুরকার হতে হলে এখানে আসতেই হতো। আমার জন্য এই বছরগুলো ছিল কমরেড বানানোর, বন্ধু বানানোর, লেখার প্লট পাওয়ার এবং সুসমা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করার অবিস্মরণীয় সময়। প্যারিসের মতো বার্সেলোনাও ছিল এক 'টাওয়ার অব বাবেল'_একটি কসমোপলিটান বৈশ্বিক নগর, যেখানে বাস করা ও কাজ করা উদ্দীপনামূলক। গণযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই স্প্যানিশ ও লাতিন আমেরিকার লেখকরা পরস্পর মেলামেশা করতে শুরু করেন। ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একই ঐতিহ্যে, একই উদ্যোগী কর্মকাণ্ডে ও নিশ্চয়তায় মৈত্রী ভাব প্রতিষ্ঠা করে পরস্পরকে স্বীকৃতি দেন; তখন একনায়কত্বের বিদায় আসন্ন হয়ে আসছে, গণতান্ত্রিক স্পেনে সংস্কৃতিই হয়ে উঠবে এমন চালিকাশক্তি।
যদিও পুরোপুরি সেভাবে ঘটেনি, একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণে স্পেনীয় ক্রান্তিকাল আধুনিককালের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প, যখন শুভবুদ্ধির উদয় হয়, যৌক্তিকতা বিরাজ করে। সাধারণ মঙ্গলের জন্য রাজনৈতিক বিরোধীরাও উপদলীয় স্বার্থকে নাকচ করে দিয়েছে, জাদু বাস্তবতাধর্মী উপন্যাসে যেমন ঘটে সে রকম বিস্ময়করভাবে একটার পর একটা ঘটনা ঘটেছে। কর্তৃত্ববাদ থেকে স্বাধীনতা, অনুন্নয়ন থেকে বৈভব, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের আর্থিক অবদান ও বৈষম্য থেকে মধ্য-আয়ের একটি দেশে উত্তরণ, ইউরোপে নিজেকে একীভূতকরণ, কয়েক বছরের মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বরণের এই যে স্পেনীয় ক্রান্তিকাল, তা গোটা বিশ্বকে বিস্মিত করেছে এবং স্পেনের আধুনিকায়নের পথ ত্বরান্বিত করেছে। সে সময় ভেতর থেকে এ পরিবর্তনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা আমার ভেতর নাড়া দেওয়ার এবং পথ দেখানোর অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছে। আমি একান্তভাবে আশা করব, আধুনিক বিশ্বের দুরারোগ্য ব্যাধি জাতীয়তাবাদ, যে ব্যাধি স্পেনের রয়েছে, তা এই সুখকর গল্পটিকে ধ্বংস করে দেবে না।
জাতীয়তাবাদ তা যে ধরনেরই হোক, আমি ঘৃণা করি। এটি এক ধরনের আঞ্চলিক ভাবধারা_অথবা ধর্ম, তা-ও হ্রস্বদৃষ্টি, বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তির দিগন্তকে ছেঁটে ফেলে আর ভেতরে লালন করে জাতিগত ও বর্ণবাদী পছন্দ-অপছন্দ_এটাই পরিণত হয় সর্বোচ্চ মূল্যবোধে, একটি নৈতিক ও অস্তিত্বে স্বরূপ বিকাশের সুযোগ করে দেয়, কারো জন্মস্থান হওয়ার দৈবাৎ পরিস্থিতির কারণে। ধর্মের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদই হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য নরহত্যাগুলোর অন্যতম কারণ, যেমন ঘটেছে দুই মহাযুদ্ধে এবং এখন ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর খণ্ডীকরণ, অযৌক্তিক যুদ্ধে ও দ্বন্দ্বে রক্তে রঞ্জিত হওয়া, স্কুল, পাঠাগার ও হাসপাতাল না বানিয়ে অস্ত্রাগারে অবিশ্বাস্য পরিমাণ সম্পদ অপচয় করা ছাড়াও জাতীয়তাবাদ লাতিন আমেরিকাকে আর কিছু দেয়নি।
দেশপ্রেমের সঙ্গে চোখে ঠুলি পরানো জাতীয়তাবাদকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না_জাতীয়তাবাদ অন্য সবকে প্রত্যাখ্যান করে আর সেখানেই রয়েছে সহিংসতার বীজ। আর দেশপ্রেম হচ্ছে যে মাটিতে জন্ম তার জন্য কল্যাণকর, উদার এক অনুভূতি_যে মাটিতে আমাদের পূর্বপুরুষ বসবাস করতেন, যেখানে আমাদের প্রথম স্বপ্নের বিকাশ ঘটেছে, একটি পরিচিত ভৌগোলিক অঞ্চল, যেখানে বসবাস করত প্রিয়জন, যেখানে ঘটেছে এমন সব ঘটনা_স্মৃতিতে সাইনপোস্ট হয়ে আছে এবং নির্জনতার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হয়ে অবস্থান করছে। বাসভূমি তো পতাকা, কিংবা জাতীয় সংগীত কিংবা প্রতীকী বীরদের নিয়ে উদ্দীপক বক্তৃতা নয়; তা আসলে একমুঠো জায়গা। কিছু মানুষ, যারা আমাদের স্মৃতি ঘিরে রাখে, বিষণ্নতায় ভরে দেয়_একটি উষ্ণ অনুভূতির যে আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের ফেরার মতো একটি বাড়ি আছে।
পেরু আমার জন্য আমেরিকা, যেখানে আমি জন্মগ্রহণ করেছি; কিন্তু কখনো বাস করিনি। যে শহরকে আমার মা, আমার নানা-নানি, মামা-খালারা আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতি ও আকুলতার মধ্য দিয়ে। কারণ আমেরিকার মানুষের মতো আমাদের গোটা পরিবারও গেল নিজেদের সঙ্গে, নিজেদের ভ্রাম্যমাণ জীবনে একটি শ্বেত শহর বহন করত। মরুভূমিতে পাইউরা, কতিপয় বৃক্ষ এবং দীর্ঘ যন্ত্রণার 'বারোস', যাকে পাইউরানরা বলত 'অন্য কারো পা'_একটি রুচিশীল, বেদনাসূচক নাম_যেখানে আমি আবিষ্কার করলাম, বক মানব শিশু পৃথিবীতে আনে না; বরং একজোড় মানব-মানবী বলাৎকারের মতো পাপকার্য করে মানবশিশু বানায়। সানমিগুয়েল একাডেমি এবং ভ্যারাইটিস থিয়েটারে দেখলাম, আমার নিজের এক ছোট লেখা মঞ্চে উঠেছে। রাজধানী লিমার মিরাফ্লসে দিয়েগো ফেরে এবং কোলন, আমরা যে জায়গাটাকে বলতাম সুখী প্রতিবেশী, সেখানেই আমি খাটো প্যান্ট ফেলে লম্বা ট্রাউজার পরলাম। জীবনের প্রথম সিগারেট খেলাম, নাচতে শিখলাম, প্রেমে পড়লাম এবং মেয়েদের জন্য আমার হৃদয় খুলে দিলাম। এখানে লা ক্রনিকা সংবাদপত্রে ধূলিময় প্রাণবন্ত সম্পাদকীয় দপ্তরে ১৬ বছর বয়সে সাংবাদিক হিসেবে হাতে খড়ি নিলাম_সাংবাদিকতা একটি পেশা, যা সাহিত্যের সঙ্গে আমার গোটা জীবনই দখল করে আছে, বইয়ের মতো আমাকে আরো বাঁচতে শিখিয়েছে। পৃথিবীকে আরো ভালোভাবে জানতে সর্বত্র সব শ্রেণীর চমৎকার ভালো কাজে এবং জঘন্য ধরনের পুরুষ ও নারীর সঙ্গে মিশতে শিখিয়েছে। লিওনসিও পেড্রো মিলিটারি একাডেমি। আমি জেনেছি, পেরু একটি ছোট মধ্যবিত্ত সমাজ নয়_যত দিন সেখানে ছিলাম, বন্দি ও সংরক্ষিত সন্দেহ জেগেছে; পেরু একটি বিশাল, প্রাচীন, তিক্ততাপূর্ণ, অসম একটি দেশ_সব ধরনের ঝড়ের আঘাতে যা কেঁপে ওঠে। কাহুইদের গোপন কুঠুরিতে সান মার্কোসের কয়েকজন ছাত্র নিয়ে আমরা বিশ্ব-বিপ্লবের প্রস্তুতি নিলাম। স্বাধীনতা আন্দোলনে পেরু আমার বন্ধু, যার সঙ্গে তিন বছর বোমা, ব্ল্যাকআউট ও সন্ত্রাসী হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সংস্কৃতির পক্ষে কাজ করে গেছি।
পেরু হচ্ছে প্যাট্রিসিয়া, আমার মামাতো বোন, ঊর্ধ্বমুখী নাক, অপারেজয় চরিত্র, আমার সৌভাগ্য ৪৫ বছর আগে তাকে বিয়ে করেছিলাম। এখনো তার সেই বাতিক, স্নায়ুপীড়ন ও ক্ষুব্ধ মেজাজ ধরে রেখেছে, যা আমাকে লিখতে সাহায্য করে। তাকে ছাড়া আমার জীবন অনেক আগেই বিক্ষুব্ধ ঘূর্ণিপাকে মিলিয়ে যেত এবং অ্যালভারো, গনজালো, মরগানা এবং ছয়টি নাতি-নাতনি আমাদের অস্তিত্বকে আরো বর্ধিত ও আমোদিত করছে, তাদের জন্ম না হলে যা কখনো হতো না। প্যাট্রিসিয়া সব কাজ করে এবং ভালোভাবে করে। সমস্যার সমাধান করে, অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা করে, নৈরাজ্য হলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে, সাংবাদিক এবং অনাহূত অতিথিদের ঠেকিয়ে দেয়, আমার সময়ের প্রতিরক্ষা করে, দেখা-সাক্ষাৎ ও সফরসূচি ঠিক করে আমার স্যুটকেস গুছিয়ে দেয় আবার খোলে এবং এমনই সদয় সে নারী যখন ভাবে আমাকে বকাঝকা করছে, তখনই আমাকে শোনায় সর্বোচ্চ প্রশংসাসূচক বাক্য_'মারিও তুমি লেখালেখি ছাড়া আর কিছু পারো না?'
আবার সাহিত্যে ফিরে যাই। শৈশবের স্বর্গ আমার বেলায় সাহিত্যের কোনো পুরাণ নয়, বরং তা একটি বাস্তবতা, যা যে শৈশবকাল আমি যাপন করেছি এবং কোচাবাম্বার তিন উঠোনের বড় বাড়িতে উপভোগ করেছি_যেখানে আমার মামাতো-খালাতো ভাইবোন এবং স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে টারজান ও মালগাড়ির গল্পগুলোর পুনর্নির্মাণ করেছি, যেখানে পাইওরার সরকারি এলাকায় বাদুড় ছাদে বাসা বাঁধে, রহস্যময় উষ্ণভূমিতে নিঃশব্দ ছায়া ভরে দেয় নক্ষত্রের রাত।
সেই বছরগুলোতে লেখালেখিটা ছিল খেলার মতো, যে খেলা আমার পরিবারের সদস্যরা উদ্যাপন করত, আর তা এমনই আকর্ষণীয় যা আমার জন্য বয়ে আনত করতালি_আমি পিতাহীন পুত্র, আমি একজন নাতি, একজন ভাগ্নে। আমার বাবা মৃত এবং তখন স্বর্গবাসী। তিনি একজন লম্বা সুদর্শন পুরুষ, নৌবাহিনীর পোশাক পরা_যার ছবি আমার রাতের টেবিল মাতিয়ে রাখত, আমি সে ছবির সামনে প্রার্থনা করতাম, তাঁর ছবিতে চুমো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। পাইওরায় এক সকালে, আমি এখনো মনে করি না সেই ঘোর আমি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি_আমার মা আবিষ্কার করলেন আমার বাবা, সেই ভদ্রলোক আসলে তখনো বেঁচে আছেন। আর সেদিনই বাবার সঙ্গে থাকার জন্য আমরা লিমাতে তাঁর কাছে রওনা হলাম। আমার বয়স তখন এগারো, আর সে মুহূর্ত থেকেই বদলে গেল সব। আমি হারালাম আমার নিষ্পাপ শৈশব, আবিষ্কার করলাম নৈঃসঙ্গ, কর্তৃত্ব, প্রাপ্তবয়স্কের জীবন এবং ভীতি। আমার মুক্তি তখন পাঠে, ভালো বই পড়ায়_যে জগতে জীবন মহিমান্বিত, তীব্র যেখানে অনুভূতি। একটার পর একটা অভিযান, যেখানে আমি স্বাধীনতা অনুভব করতে পারি, যেখানে আমি আমার সুখ খুঁজে পাই। শুরু হয় আমার গোপনে লিখতে থাকা যেমন করে কেউ নিজেকে সমর্পণ করে অবর্ণনীয় পাপ, নিষিদ্ধ আবেগের কাছে। সাহিত্য তখন খেলার বিষয় হওয়া থেকে সরে এল। আমার জন্য সাহিত্য হয়ে উঠল দৈব-দুর্বিপাক ঠেকানোর পন্থা, প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের হাতিয়ার, অসহনীয়তা থেকে পালানোর পথ এবং আমার বেঁচে থাকার যৌক্তিকতা। তখন থেকে এ পর্যন্ত যেকোনো পরিস্থিতিতে যখন আমার মন ভেঙে গেছে, পরাস্ত বোধ করেছি, যখন হতাশার প্রান্তসীমায় এসে পেঁৗছেছি_তখন গল্পকার হিসেবে লেখালেখিতে পূর্ণ আত্মনিয়োগ করাটাই হয়ে উঠেছে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলো দেখার মতো, জাহাজ ডোবা মানুষের ভাসমান কাঠ ধরে তীরে পেঁৗছার মতো একটি ব্যাপার। আর সব লেখকের মতো আমার বেলায়ও কখনো কখনো নিশ্চল হয়ে যাওয়ার এবং কল্পজগৎ শুষ্ক হয়ে যাওয়ার হুমকির মোকাবিলা করা কঠিন এবং রক্তক্ষরণ; তখন মাসের পর মাস ও বছর একটি গল্পের বয়নে অনিশ্চিত সূচনা থেকে স্মৃতিতে অস্থিরতা, উৎসাহ, দিবাস্বপ্নের অভিজ্ঞতা শাসন করার মতো উপভোগ্য আমার বেলায় আর কিছুই হতে পারে না_সেই অভিজ্ঞতায় একটি প্রকল্পের অঙ্কুরোদগম ঘটে_উত্তেজিত মেঘের আবছায়ার ধীরে ধীরে গল্পে রূপান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত আমার জীবনে দেয় সেই আমোদ। ফ্লবেয়র বলেছেন, 'লেখালেখি জীবনের একটি ধরন'। হ্যাঁ, অবশ্যই, মায়া ও আনন্দ নিয়েই জীবনের এ ধরন_মস্তিষ্কে ঢেলে দেওয়া অগি্নচ্ছটা, যতক্ষণ না আয়ত্তে আসছে অধরা শব্দগুচ্ছ, তার সঙ্গে সংগ্রাম, শিকারির মতো কাঙ্ক্ষিত শিকারটি ধরে কাহিনীর ভ্রূণকে পরিপুষ্ট করে গল্পের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা মেটা যতই বেড়ে ওঠে আর সব গল্পকে গিলে খায়। যে উপন্যাসটি হয়ে উঠবে_তার ঘোরলাগা অবস্থা অনুভব করতে শুরু করি, যখন তা একটি আশায় ধারণ করে। মনে হয় নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, যখন চরিত্রগুলো নড়েচড়ে ওঠে, কাজ করে, ভাবে, অনুভব করে, সম্মান ও বিবেচনার দাবি জানায়_যখন তাদের ওপর আর লেখকের ইচ্ছেমাফিক আচরণ চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না, হত্যা না করা পর্যন্ত তাদের চরিত্রের স্বাধীন ইচ্ছে থেকে আর বঞ্চিত করা যায় না, গল্পের প্রভাবিত করার শক্তি না হারিয়ে উপন্যাস আমাদের যেভাবে পরিচালিত করে_এটা এমন এক অভিজ্ঞতা যা আমাকে সেই প্রথমবারের মতো এখনো মোহমুগ্ধ করে রাখছে, যা ভালোবাসার রমণীর সঙ্গে দিন-সপ্তাহ-মাস অবিরাম রমণের মতো সম্পূর্ণ এবং ঘোর লেগে থাকার একটি অভিজ্ঞতার মতো।
কাহিনীর কথা বলতে গিয়ে আমি উপন্যাসের কথাই অনেক বলে ফেলেছি, নাটকের কথা বলা হয়নি, নাটক ফিকশনের আর একটি অগ্রগণ্য রূপ। অবিচারই হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। আমার প্রথম প্রেম নাটক, আমার বয়ঃসন্ধি থেকে যখন লিমার সেগুরা থিয়েটারে আর্থার মিলারের 'ডেথ অব দ্য সেলসম্যান' দেখেছি_যে নাটক আমাকে আবেগে বিবশ করে দিয়েছে এবং ইনকাদের নিয়ে নাটক লিখতে আমাকে প্রণোদিত করেছে। পঞ্চাশের দশকে লিমায় যদি কোনো নাট্য আন্দোলন হতো, ঔপন্যাসিক না হয়ে আমি হতাম নাট্যকার। কিন্তু তা হয়নি, ফলে তাই আমাকে বিবরণধর্মী লেখার দিকে ধাবিত করেছে। কিন্তু নাটকের জন্য আমার ভালোবাসার কোনো ঘাটতি পড়েনি। উপন্যাসের ছায়ার ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছে, লতিয়ে উঠেছে, লোভ ও নষ্টালজিয়ার মতো_সর্বোপরি যখন আমি আমোদিত করা কোনো নাটক দেখতে গিয়েছি, তখন। সত্তরের দশকের শেষ ভাগে শতবর্ষের বৃদ্ধা এক দিদিমা-মামে, যিনি জীবনের শেষ সময়ে এসে তাঁর চারপাশের বাস্তবতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন, আশ্রয় গ্রহণ করেন স্মৃতি ও কাহিনীতে, তিনি আমাকে একটি গল্পের পরামর্শ দিলেন। ভুয়োদর্শীর মতো আমার মনে হলো, এত নাটকের গল্প এবং শুধু মঞ্চেই সফল কাহিনীর জীবন্ত অভিব্যক্তি নিয়ে তা রূপায়ণ করা সম্ভব হবে। একজন নবীন লেখকের প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে আমি লিখে ফেললাম, নায়িকার ভূমিকায় নোরমা আলেয়েন্দ্রোকে মঞ্চে দেখে দারুণ উপভোগ করলাম। তখন থেকে উপন্যাস ও প্রবন্ধের মধ্যে আমি বহুবার নাটকে ফিরে এসেছি। আমি অবশ্যই যোগ করতে চাই সত্তর বছর বয়সে নাট্যমঞ্চে আরোহণের (বরং বলা যায় হোঁচট খাওয়ার) কল্পনা কখনো করিনি। সেই বেপরোয়া অভিযানের কারণেই তখন নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুধাবন করতে পারি_এটা কারো জন্য কেমন অলৌকিক ব্যাপার যিনি উপন্যাস লিখে তাঁর জীবন শেষ করেছেন, তাঁরই কল্পলোকের কিছু চরিত্র যখন উপন্যাস হয়ে দর্শকের সামনে মঞ্চে অবস্থান নিচ্ছে। আমার বন্ধু পরিচালক জোয়ান ওলে এবং অভিনেত্রী আইতানা সানচেজ জিহনকে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করতে পারব না, তাঁদের সঙ্গে এই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা ভাগ করার সুযোগ করে দিয়েছিল (যদি এর সঙ্গে আতঙ্কও জড়িয়ে ছিল)।
সাহিত্য জীবনের ভুয়া প্রতিবিম্ব, তা সত্ত্বেও সাহিত্যই জীবনকে ভালোভাবে বুঝতে, যে গোলক ধাঁধায় আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা ও মৃত্যু তার সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করে। বাস্তবজীবন আমাদের ওপর যে হতাশা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আরোপ করে থাকে, সাহিত্যের কারণে আমরা আংশিকভাবে হলেও তার অর্থোদ্ধার করতে পারি; যে দুর্বোধ্যতা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর বিরাজ করছে, বিশেষ করে আমরা যারা নিশ্চয়তার চেয়ে সন্দেহই বেশি মাত্রায় সৃষ্টি করছি; দুর্জ্ঞেয়, ব্যক্তিক ও সামষ্টিক নিয়তি, আত্মা, ইতিহাসের অচৈতন্য সম্পর্কে চেতনা, ইতস্তত যৌক্তিক জ্ঞান_এ ধরনের বিষয়ের সামনে আমরা যে হতবুদ্ধি তা প্রকাশ করছি_সাহিত্যই তার স্পষ্টীকরণ করতে পারে।
আমাদের পূর্বপুরুষদের অনিশ্চিত অবস্থার কল্পনা আমাকে বরাবরই মোহিত করেছে_সে সময় জন্তুর সঙ্গে আমাদের পূর্বপুরুষদের তেমন কোনো তফাত ছিল না, সদ্যোজাত যে ভাষায় পরস্পরের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করতে পেরেছে_গুহায়, প্রজ্বলিত আগুনের পাশে, বিজলি চমক ও বজ্রপাতের আতঙ্কভরা রাতে, গর্জনরত বন্য জন্তুর মুখোমুখি হয়ে কেমন করে তারা গল্প আবিষ্কার করেছে এবং বলতে শুরু করেছে। আমাদের নিয়তির সেটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ আমাদের সেই আদিবাসী পূর্বপুরুষের সেসব চক্র কল্পলোকের গল্পকথকের কণ্ঠ ধরে রেখেছে; সভ্যতার শুরু সেখানেই। তারপর দীর্ঘসময় ধীরে ধীরে মানবীকৃত করেছে, আমাদের দিয়ে স্বায়ত্তশাসিত ব্যক্তিসত্তা আবিষ্কার করিয়েছে, তারপর তাকে তার গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে; বিজ্ঞান, আইন, স্বাধীনতা আবিষ্কার করিয়েছে, প্রকৃতি, মানবদেহ, মহাকাশ, নাক্ষত্রিক ভ্রমণের গুপ্তকথা আবিষ্কার করিয়েছে। সেসব গল্প, রূপকথা, উপকথা প্রথমবারের মতো শ্রোতাদের সামনে নতুন গানের মতো মনে হয়েছে_যারা তখন অজ্ঞাত ও বিপজ্জনক একটি পৃথিবীর রহস্য ও আতঙ্কে সন্ত্রস্ত ছিল, যাদের কাছে বেঁচে থাকার মানে ছিল শুধু খাওয়া, গা বাঁচানোর জন্য আশ্রয় নেওয়া, হত্যা করা এবং লাম্পট্যে গা ভাসিয়ে দেওয়া।
যে সময় থেকে তারা গল্পকথকের প্ররোচনায় যূথবদ্ধ হয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখল, স্বপ্ন ভাগাভাগি করতে শিখল, তখনই তারা কেবল টিকে থাকার ঘানিতে তাদের যে বন্ধন তা ছিন্ন করতে পারল, নির্মম পাশবিক কর্মকাণ্ডের ঘূর্ণাবর্ত থেকে বেরিয়ে এল আর তাদের জীবনই হয়ে উঠল স্বপ্ন, আনন্দ, কল্পনা ও বিপ্লবী-কর্মপরিকল্পনা; তাদের বন্দিদশা ভাঙার, বদলানোর, উন্নত করার, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে পরিতুষ্ট করার জন্য তারা নিজেদের কল্পিত জীবনের ভিত নাড়িয়ে দিল, কৌতূহল জেগে উঠল তাদের চারপাশে যেসব রহস্য ঘিরে আছে তার রহস্যজাল ভেদ করতে শুরু করল।
এই অবাধ প্রক্রিয়া আরো সমৃদ্ধ হলো_যখন লেখা জন্মগ্রহণ করল, শোনা ছাড়াও গল্পটা পড়াও যাচ্ছে, সাহিত্য এবার একে স্থায়িত্বের সুযোগ করে দিল। এ কারণেই প্রক্রিয়াটি অবিরাম পুনঃ পুনঃ ঘটতে থাকবে, যতক্ষণ না নতুন প্রজন্ম একে গ্রহণ করছে। উপন্যাস বিনোদনের চেয়েও বেশি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার চেয়েও বেশি, যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সংবেদনকে জাগায়, সমালোচকসত্তাকে সচেতন করে। আমাদের ভেতরের মানবসত্তার নবায়নের মাধ্যমে মানুষের শ্রেষ্ঠাংশটুকু সংরক্ষণ করে, সভ্যতা যাতে বহাল থাকে সে জন্য এ প্রক্রিয়াটির চরমভাবে প্রয়োজনীয়_যাতে আমরা আর নৈঃসঙ্গের বর্বরতায় ফিরে না যাই এবং জীবন যাতে প্রয়োগবাদী বিশেষজ্ঞের হাতে সংকুচিত না হয়_যারা বস্তুকে গভীরভাবে দেখে কিন্তু উপেক্ষা করে তার চারপাশ, তার অতীত এবং প্রবহমান ভবিষ্যৎ। ফলে মানুষের সেবায় যে যন্ত্র আবিষ্কার করি আমরা, না আবার সে যন্ত্রেরই ভৃত্য ও ক্রীতদাস হয়ে পড়ি। কারণ সাহিত্য ছাড়া পৃথিবী বাসনা কিংবা আদর্শহীন পৃথিবীতে পরিণত হবে, তা অশ্রদ্ধার পৃথিবী হয়ে যাবে; যা মানুষকে সত্যিকার মানবিক গুণসম্পন্ন করে তা থেকে বঞ্চিত করবে; আমাদের স্বপ্নের মৃত্তিকা দিয়ে গড়া সত্তা নিজের ভেতর থেকে বের হয়ে অন্যের ভেতরে, অন্যদের ভেতরে প্রবেশের অধিকার হারাবে।
গুহা থেকে গগনচুম্বী ভবন পর্যন্ত, মুগুর থেকে গণনিধনের অস্ত্র, গোত্রবাসীর অর্থহীন পুনরাবৃত্তি থেকে বিশ্বায়ন পর্যন্ত সাহিত্যের কাহিনী মানুষের অভিজ্ঞতাকে বহুগণিত করেছে, আলস্য, আত্মমগ্নতা ও জীবনবিমুখিনতার সমর্পিত হওয়া থেকে আমাদের বাধা দিয়েছে। সাহিত্যকে ধন্যবাদ, কোনো কিছুই আমাদের উদ্বিগ্ন করেনি, আমাদের কল্পশক্তি ও জীবনতৃষ্ণাকে বাধাগ্রস্ত করেনি, আমাদের সাহিত্য বড় অভিযান আমাদের অগ্রনায়ক করে তুলেছে, বাস্তবজীবন এই আবেগ কখনো দিতে পারবে না। সাহিত্যের মিথ্যা কাহিনী আমাদের মধ্য দিয়ে সত্যে পরিণত হয়, পাঠকের রূপান্তর ঘটে, বাসনার ছোঁয়াচে প্রভাবে, কাহিনীর গরমিলের মধ্য দিয়ে সাধারণ বাস্তবতাকে স্থায়ীভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের যা নেই তা থাকার অনুভূতি সাহিত্যের যে জাদু আমাদের দেয়, সেই অসম্ভব অস্তিত্বে সম্মতি জাগায়, যেখানে প্যাগান ঈশ্বরের মতো আমাদের মধ্যে একই সঙ্গে মরণশীলতা ও অমরত্বের বোধ সৃষ্টি করে, যা আমাদের আত্মসত্তায় আচার-বিরুদ্ধতা ও বিদ্রোহের সূচনা করে_যা রয়ে গেছে সব বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের পেছনে, যা মানবিক সম্পর্কে সহিংসতা লাঘবে অবদান রেখেছে। সহিংসতা হ্রাস করেছে, সহিংসতার অবসান ঘটায়নি। কারণ সৌভাগ্যবশত আমাদের গল্পটা সব সময়ের জন্যই একটি অসমাপ্ত গল্প। সে কারণেই আমাদের স্বপ্ন দেখা, বই পড়া, লেখা অব্যাহত রাখতে হবে আর এটাই আমাদের নশ্বর অবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে, সময়ের ক্ষয় পরাভূত করবে এবং অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করবে।
===================================
লন্ডন পুলিশ জলকামানও নিল না  রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ ও যুদ্ধাপরাধী বিচারের দায়বদ্ধতা  পোশাক শিল্পে অস্থিরতার উৎস-সন্ধান সূত্র  বাতাসের শব্দ  গোলাপি গল্প  বজ্র অটুঁনি অথবাঃ  উদ্ভট উটের পিঠে আইভরি কোস্ট  আনল বয়ে কোন বারতা!  ফেলানীর মৃত্যুতে পশ্চিমবঙ্গ- নিজ ভূমেই প্রশ্নবিদ্ধ ভারতের মানবিক চেহারা  বাজার চলে কার নিয়ন্ত্রণে  উঠতি বয়সের সংকট : অভিভাবকের দায়িত্ব  বিকল্প ভাবনা বিকল্প সংস্কৃতি  অন্ধত্ব ও আরোগ্য পরম্পরা  খুলে যাক সম্ভাবনার দুয়ার  কক্সবাজার সাফারি পার্কঃ প্রাণীর প্রাচুর্য আছে, নেই অর্থ, দক্ষতা  জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের গুপ্ত জীবন  ছাব্বিশটি মৃতদেহ ও একটি গ্রেপ্তার  ৩৯ বছর পরও আমরা স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি  সাইবারযুদ্ধের দামামা  সরলতার খোঁজে  সেই আমি এই আমি  আমেরিকান অর্থনীতি ডলারের চ্যালেঞ্জ  বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ইশতেহার- আশানুরূপ সুফল নেই এক বছরেও  ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাজনীতি  মাস্টারদা সূর্যসেন ও যুব বিদ্রোহ সাতাত্তর  রসভা নির্বাচন ২০১১: একটি পর্যালোচনা  ড. ইউনূস অর্থ আত্মসাৎ করেননি  প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ৩৯ বছর  স্বাধীনতাযুদ্ধের 'বিস্মৃত' কূটনৈতিক মুক্তিযোদ্ধারা  আতঙ্কে শেয়ারবাজার বন্ধঃ বিক্ষোভ  আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম হয়েছে  মানবকল্যাণ আমাদের মন্ত্র  ট্রানজিট নিয়ে সবে গবেষণা শুরু  ভারতের একতরফা সেচ প্রকল্পঃ বাংলাদেশের আপত্তিতে বিশ্বব্যাংকের সাড়া  আমলাদের যাচ্ছেতাই বিদেশ সফর  সরকারের ব্যর্থতায় হতাশাঃ বিরোধী দলের ব্যর্থতায় বিকল্পের অনুপস্থিতি  ক্ষমতা ও গণতন্ত্র  পানি সংকট পানি বাণিজ্য  ২০১০ সালের অর্থনীতি কেমন গেল  গণতান্ত্রিক বিকাশের পথে বাধা অনেক


দৈনিক কালের কন্ঠ এর সৌজন্যে
অনুবাদঃ আন্দালিব রাশদী
[৭ ডিসেম্বর ২০১০ মারিও বার্গাস য়োসার এই নোবেল ভাষণটি প্রচারিত। স্প্যানিশ ভাষায় প্রদত্ত ভাষণটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এডিথ গ্রসম্যান। বাংলা অনুবাদে এডিথ গ্রসম্যানকে অনুসরণ করা হয়েছে। স্বীকার করছি এই অনুবাদকর্মটি আদৌ সহজসাধ্য ছিল না।]


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.