শিক্ষানীতির সূত্রে দুটি প্রসঙ্গ -যুক্তি তর্ক গল্প by আবুল মোমেন

একটি জাতীয় শিক্ষানীতির অভাবের কথা বহুকাল ধরেই বলাবলি হচ্ছে। কিন্তু মূলত রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভাজনের কারণে এ অভাব দূর করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই শিক্ষানীতি প্রণয়নের চেষ্টা চলছে এবং বারবার নীতি প্রণীত হলেও কোনোটিই বাস্তবায়ন করা যায়নি। এভাবে আটটি প্রতিবেদন হিমাগারে জমা রয়েছে। একটু অতীত ঘাঁটলে দেখা যাবে, পাকিস্তান আমলেও শিক্ষানীতি নিয়ে এমন ব্যর্থ প্রয়াসের সংখ্যা কম ছিল না।
স্বাধীনতার পরপর একটি গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সংবিধান রচিত হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেটি যে বারবার কাটাছেঁড়া করা হয়েছে, তার পেছনেও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভূমিকাই আসল। ইসলামের গোঁড়া ও জঙ্গি মতাদর্শের ভিত্তিতে একটি কট্টর গোষ্ঠী দেশে আছে, আর আছে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী রাজনীতির বিপরীতে মুসলিম জাতীয়তাভিত্তিক রাজনীতি।
যুগোপযোগী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পথে উপরোল্লিখিত গোষ্ঠী ও তাঁদের সমর্থকদের দিক থেকে বাধা এসেছে বারবার।

২.
ইতিমধ্যে অনেক সময় গড়িয়েছে, বুড়িগঙ্গা-কর্ণফুলী দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেছে, সমস্যায় জর্জরিত দেশবাসীর পিঠ যেমন দেয়ালে ঠেকেছে, তেমনি অনেক বিষয়ে চোখও খুলেছে।
একসময় ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ইসলামপন্থীদের বিরূপতা ছিল, বর্তমানে তা কেটে গিয়ে বড় একটি অংশের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিই প্রবল আকর্ষণ জমেছে। সেক্যুলার বিষয়সমূহ পঠন-পাঠনেও আগেকার অন্ধ বিরূপতা কেটেছে। বলা যায়, ইহজীবনকে সুন্দর ও সার্থক করার গুরুত্ব অনেকেই বুঝতে পারছেন এবং সেই সূত্রে তাঁরা যুগোপযোগী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা মানছেন।
সেদিক থেকে নতুন একটি শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য এটাই সঠিক সময় ছিল। বলা যায়, জাতির গরিষ্ঠাংশ মানুষ সন্তানদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা পেতে মানসিকভাবে প্রস্তুত এখন।

৩.
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে দিনবদলের ডাক দিয়ে। পরিবর্তনের জন্য সরকারের সদিচ্ছার বড় প্রমাণ—ক্ষমতায় এসেই একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন, তিন মাসের মধ্যে নতুন শিক্ষানীতির চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়ন (এর মূল কৃতিত্ব অবশ্যই কমিটির), এ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার জ্ঞাপন।
সরকার এটি চূড়ান্ত রূপ দিতে যোগ্য ও আগ্রহী মানুষের মতামত নিতে চায়। তাই শিক্ষানীতিটি ওয়েবসাইটে দিয়েছে এবং মতামত পাঠানোর জন্য একাধিক ই-মেইল-ঠিকানা দিয়ে উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, সরকার নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের কাজে অযথা সময় নষ্ট করতে চায় না, আবার তা করতে গিয়ে কারও মতামতকে বিবেচনার বাইরেও রাখতে চায় না। এটা আমাদের দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের সাম্প্রতিক প্রবণতার বিপরীতে সরকারের একটি পরিবর্তনকামী শুভ পদক্ষেপ।

৪.
শিক্ষানীতিটি মূলত শিক্ষার লক্ষ্যাদর্শভিত্তিক এবং দিকনির্দেশনামূলক একটি দলিল। এর ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দসহ বিস্তারিত পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তরসমূহ। তখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকার কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। চূড়ান্ত খসড়া শিক্ষানীতি পর্যালোচনা করে এ প্রসঙ্গে কিছুটা ধারণা দেওয়া যেতে পারে। আমার বিবেচনায় যে দুটি মূল সমস্যা রয়েছে, এখানে সেটুকুই আলোচনা করব। সংবিধানের মূল নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষানীতিতে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে—‘প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, বৈজ্ঞানিক এবং সকলের জন্য একই রকমের।’
বর্তমানে ইংরেজি-বাংলা-মাদ্রাসা এই মূল তিন ধারা ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষার রয়েছে এক ডজনের মতো উপধারা। ধনী-দরিদ্রের ব্যাপক-প্রবল ব্যবধান ছাড়াও ধর্ম, সংস্কার, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, অঞ্চল, রাজনীতি ইত্যাদি নানা সূত্রে বিভাজনের কারণে এ সমাজ বিবদমান, দুর্বল, ভঙ্গুর, গোঁড়া এবং অবশ্যই ক্ষয়িষ্ণু। তিনটি উপাদান সমাজে জাগরণ, উদ্যম এবং ঐক্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাহলো কার্যকর সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও রাজনৈতিক জাগরণ। এর কোনো একটির বা দুটি বা সব কটির যৌথ ভূমিকা ব্যতীত শ্রেণীবিভক্ত অসম ও বৈষম্যপীড়িত সমাজে সাম্যের মনোভাব ও পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে না। কেবল সরকারি উদেযাগ তথা আমলাতান্ত্রিক নির্দেশনায় এ কাজ সম্ভব নয়।
আমাদেরই ইতিহাস থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিই তাহলে দেখব, বায়ান্ন থেকে সূচিত সাংস্কৃতিক স্বাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার এবং সমাজপ্রগতির চেতনার জোরে কেবল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন দেশই পাইনি আমরা, পেয়েছিলাম বাহাত্তরের সংবিধান, কুদরাত-এ-খুদা কমিশন শিক্ষা প্রতিবেদন এবং মুক্ত সাংস্কৃতিক বাতাবরণ। স্বাধীন দেশ ছাড়া আর কোনোটিই আমরা ধরে রাখতে পারিনি। কারণ ১৯৭১ সালে যেন চূড়া স্পর্শ করে রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রে আমাদের পতনের সূচনা হয় স্বাধীনতার পর থেকেই। তাই দিনবদলের হাতিয়ার যদি হয় উপযুক্ত শিক্ষা, তাহলে তা প্রচলন ও অব্যাহত রাখার জন্য চাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সমর্থন। সেটা সমাজ থেকে তৈরি হতে হবে। নতুবা তর্কে-বিতর্কে এবং পরিশেষে বিভ্রান্তিতে ব্যর্থতায় নিঃশেষ হবে সব প্রয়াস।
সমাজের ইতিবাচক শুভশক্তিকে চিহ্নিত করতে হবে, আরও ইতিবাচক শক্তির বিকাশে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সহায়তা দিতে হবে এবং পরিবর্তনের/নতুনের পক্ষে জোরালো আবেদন সৃষ্টি করতে হবে। এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে, যাতে অত্যুত্সাহী দলীয় ক্যাডাররা এ ধরনের উদ্যোগকে বিতর্কিত, বিপথগামী বা অসার্থক করে না তোলে। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের সংগত আচরণই কাম্য।

৫.
ভালো শিক্ষানীতি, সুষ্ঠু পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ সত্ত্বেও শিক্ষার সংস্কার ও শিক্ষার মানোন্নয়নের সব প্রয়াস ব্যর্থ হতে পারে, যদি শিক্ষক এ কাজের উপযুক্ত না হন।
এখন দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষার চাহিদা ও সচেতনতা তৈরি হয়েছে, দিনে দিনে এ চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু যাঁরা শিক্ষাদানের কাজটি করছেন, তাঁদের মান ও মর্যাদা রক্ষা হচ্ছে কিনা সেদিকে আমরা নজর দেইনি। একসময় সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী ও সমর্থ মানুষের সংখ্যা ছিল অল্প, শিক্ষক ও শিক্ষিত মানুষের জীবনযাপন ছিল সাদামাটা, শিক্ষকতা ছিল মানুষ তৈরির ব্রত, চাকরি নয়, বাঁধা বেতনের কাজ নয়। তাই সুশিক্ষিত আদর্শবান মানুষেরা এ কাজে আত্মনিয়োগ করে বাংলায় সুশিক্ষিত একটি শ্রেণী তৈরি করেছিলেন।
আজ জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে, মানুষের আগ্রহ ও রাষ্ট্রের অঙ্গীকার মিলে প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রসংখ্যা (অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ধরলে) বেড়ে হয়েছে প্রায় সোয়া দুই কোটি। ফলে স্কুল লাগছে অনেক, শিক্ষক লাগছে বিপুল। শিক্ষানীতি অনুযায়ী ছাত্র-শিক্ষক হার ১ ঃ ৩০ ধরলে প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষক প্রয়োজন প্রায় সোয়া সাত লাখ।
এদিকে বাজারমূল্যের তুলনায় অতি কম বেতন, শিক্ষাবহির্ভূত সরকারি নানা কাজের চাপ, শিক্ষার অনুপযোগী ও অকার্যকর ছাত্র-শিক্ষক হার (১ ঃ ১০০ও আছে) অপরিসর শ্রেণীকক্ষ, অপ্রতুল আসবাব, স্কুল সময়ের স্বল্পতা, অসচেতন অভিভাবক, রাজনৈতিক চাপ, স্থানীয় টাউট-মাস্তানদের দৌরাত্ম্য, বিভিন্ন রকম সরকারি কর্মকর্তার অধস্তনতা মিলে ‘শিক্ষক’ নামের প্রতিষ্ঠানের নিদারুণ ও সকরুণ অবক্ষয় হয়েছে, যা আমরা সম্মিলিতভাবে হতে দিয়েছি।
এককালে শিক্ষকেরাই, স্কুলশিক্ষকও ছিলেন সমাজের মাথা ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তাঁদের অভিভাবক ও মুরব্বি হিসেবে মানত সমাজ। এ অবস্থা পাল্টে গেছে। বিদ্বানকে ডিঙিয়ে ক্ষমতাবানই সমাজের মাথা হয়ে বসেছেন। আর অর্থ ও ক্ষমতা জোট বেঁধে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল সম্পদ ও সুযোগকে কুক্ষিগত করে নিচ্ছে। শিক্ষক সম্প্রদায় এর বাইরে রয়েছেন, স্কুলশিক্ষক চলে গেছেন সমাজের একেবারে নিচের স্তরে। দারিদ্র্য ও ক্ষমতাহীন অবস্থা শিক্ষকের অবক্ষয়কে নিশ্চিত ও ত্বরান্বিত করেছে। মানতেই হবে দীর্ঘদিনের এই সামগ্রিক অবক্ষয়ের শিকার এই সমাজ জ্ঞান ও মননের স্থবিরতা ও অবক্ষয়ে ভুগছে। এর ফলে স্কুলশিক্ষকেরা চিন্তা-চেতনায় অনেকাংশে তামাদি ও গতানুগতিক হয়ে পড়েছেন। আমাদের শিক্ষার ব্যর্থতার এটি একটি বড় কারণ। এটি সরকারের জন্য নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। কারণ এ সমস্যা মূলত মানবিক, সংবেদনশীলতা ও সমঝোতার মনোভাব নিয়েই এতকালের ঔদাসীন্য ও অন্যায়ের প্রতিকার করতে হবে।
এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে?
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, একজন যোগ্য ছাত্রবত্সল স্কুলগতপ্রাণ বিদ্যানুরাগী প্রধান শিক্ষক একাই একটি স্কুলের শিক্ষার ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মানের চমকপ্রদ উন্নয়ন ঘটাতে পারেন, স্কুলে তৈরি করতে পারেন উদ্দীপনাময় ইতিবাচক বাতাবরণ।
এই অভিজ্ঞতা থেকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার, মান, যোগ্যতার সূচক নির্ধারিত হতে পারে। প্রধান শিক্ষকের চাই মেধা, ডিগ্রি, বিদ্যানুরাগ, ছাত্রবাত্সল্য, সাংগঠনিক দক্ষতা, প্রশাসনিক যোগ্যতা, নেতৃত্বগুণ, অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা।
যোগ্য প্রধান শিক্ষকের বেতন অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী প্রফেসরের সমান হওয়া উচিত।
শিক্ষকদের বেতন-ভাতা উন্নত করে নতুন শিক্ষক নেওয়ার সময় মেধাবী, সৃজনশীল, উদ্যমী ছাত্রবত্সল তরুণদের নেওয়া উচিত। শিক্ষকদের দল হিসেবে উজ্জীবিত রাখা ও তাঁদের অব্যাহত জ্ঞানচর্চার মধ্যে রাখার জন্য প্রধান শিক্ষকের পরিচালনায় সাপ্তাহিক পাঠচক্র থাকতে হবে। শিক্ষা বিভাগ প্রতিবছর শিক্ষকদের সেই বছরে পড়ার জন্য নির্বাচিত ১০টি বইয়ের তালিকা প্রকাশ করবে এবং প্রতিটি স্কুলে প্রতিটি বইয়ের দুই কপি করে সরবরাহ করবে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষকদের পাঠচক্র বসবে দুই ঘণ্টার জন্য। তিন ভাগে এটি বিভক্ত থাকবে—মাসের নির্বাচিত গ্রন্থের ওপর আলোচনা (আমন্ত্রিত আলোচকও আসতে পারেন), নির্বাচিত গ্রন্থের নির্বাচিত অংশবিশেষ পাঠ এবং স্কুল ও পাঠ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনা। মাসে একবার পাঠচক্রের পরে অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে, যেখানে সাধারণভাবে ও নির্দিষ্ট ছাত্রভিত্তিক মুক্ত আলোচনা হতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের জন্য একটি মাসিক জার্নাল প্রকাশ করতে পারেন, যা স্কুলের মাধ্যমে শিক্ষকেরা পড়বেন এবং শিক্ষা সম্পর্কিত সর্বশেষ চিন্তাভাবনা ও তথ্যের সঙ্গে পরিচিত হবেন।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের স্কুল কমিটির প্রধান করলে এমপিওভুক্তি বা উন্নয়নকাজে সুবিধা হয় বটে, কিন্তু শিক্ষকের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং স্কুলের সুষ্ঠু শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ক্ষুণ্ন হয়। শিশুদের ক্ষমতার দাপট-দৌরাত্ম্য থেকে দূরে ও আড়ালে রাখাই বাঞ্ছনীয়। তারা শিক্ষকের নিবিড় পরিচর্যায় এক ধরনের স্বকীয় পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে সাবলীলভাবে বেড়ে উঠবে, সেটাই মঙ্গল। সেদিক থেকে প্রধান শিক্ষকের মতোই কমিটির প্রধান হিসেবে এলাকার উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষাবিদ, অন্যান্য পেশাজীবী শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকেই দায়িত্ব দেওয়া উচিত। স্কুলে বাগাড়ম্বর বা উচ্চকিত তত্পরতার চেয়ে অনুশীলন, সৃজন ও বিকাশের মতো নিবেদিত চিত্তের নিষ্ঠাপূর্ণ সক্রিয়তাই দরকার।
প্রতিটি স্কুলেই ন্যূনপক্ষে ৫০০ বইয়ের পাঠাগার, বিজ্ঞান গণশিক্ষাকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কিট একটি এবং একটি ভালো হারমোনিয়াম দরকার। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নয়টি শ্রেণীর একটি স্কুলে যদি প্রতি শ্রেণীতে দুটি শাখা থাকে তাহলে ১ ঃ ৩০ হারে (ধরা যাক প্রতি শাখায় ছাত্র থাকবে ৩০ জন) মোট ছাত্র হবে ৪৮০, আর শিক্ষক থাকবেন ১৬ জন। বর্তমান আমরা যে বাস্তবতায় আছি তাতে নয় বছরেও এ সংখ্যায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে কিছুটা সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে ‘শিক্ষাকর্মী’ নিয়োগ। প্রতিটি স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক ও আটজন সহকারী শিক্ষক, প্রাক-প্রাথমিকের দুজন বিশেষ প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং আটজন করে শিক্ষাকর্মী থাকবেন। পশ্চিমের অনেক দেশে ‘এ’ লেভেল শেষ করার পর দুই বছরের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ অথবা সমাজকর্মে সেবা দিতে হয়।
আমরা জাতীয় অগ্রগতির জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তরুণদের দেশ গড়ার মহান ব্রতে উদ্বুদ্ধ করে দুই বছরের জন্য শিক্ষাকর্মী (বা ব্রতী শিক্ষক) হিসেবে জাতীয় সেবা কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারি। যারা মাধ্যমিক পরীক্ষায় (আগেকার এইচএসসি) বাংলা, ইংরেজি, গণিতে ৪+ সহ গ্রেড বি+ পাবে, তারা শিক্ষাকর্মী হওয়ার জন্য জাতীয় সেবা কার্যক্রমের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তালিকাভুক্ত হবে। তাদের শিক্ষকতায় সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে নির্ধারিত স্কুলে পাঠানো হবে। তাদের নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসিক সম্মানি ভাতাও দেওয়া হবে।
দেশের ক্ষয়িষ্ণু বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কার করে যুগোপযোগী, মানসম্পন্ন এবং আনন্দময় করে তুলতে চাইলে এই শিক্ষানীতিকে সামনে রেখে সরকারকে এ দুটো কাজ করতে হবে বলে মনে করি—১. জনগণের মধ্যে এগিয়ে যাওয়ার ও জানা-শেখার জন্য ঐকান্তিক আগ্রহ সৃষ্টি করে মানসম্পন্ন শিক্ষার পক্ষে উদ্দীপনাময় জাতীয় জাগরণ। ২. স্কুলে যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে একদল মেধাবী, উদ্যমী, পরিশ্রমী, ছাত্রবত্সল শিক্ষক ও তরুণ শিক্ষাকর্মীর নিয়োগ।
তাহলেই পিছিয়ে পড়া এ দেশ এগিয়ে যাওয়া দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিতে পারবে, পাঁচ বছরের মধ্যে অবক্ষয় কাটিয়ে প্রাণের জোয়ারে জেগে উঠবে সমাজ, সংকট কাটবে রাষ্ট্রেরও।
সবার জন্য মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাই হোক আমাদের আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকারভিত্তিক জাতীয় এজেন্ডা। জাতীয় সম্পদ (এ পাঁচ বছর জিডিপির ১০ শতাংশ, উন্নয়ন বাজেটের ৩০ শতাংশ), মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা এই কাজে, এই সময়কালের জন্য জোগান দিতে হবে। তাহলেই পরিবর্তনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ দেওয়া হবে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.