ক্ষতি করার ক্ষমতা by সাযযাদ কাদির

শুরু হয়ে গেল কি সংঘাত-সহিংসতা? আন্দোলনের আগাম ঘোষণা আছে আগে থেকেই, তবে তার শুরু আগামী মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই হওয়ার কথা।
এখন জামায়াত-শিবিরের দু’দিনের সাপ্তাহিক ছুটি ঠেকিয়ে দেয়া দু’দিনের হরতালে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ধরনের তাণ্ডব দেখা যাচ্ছে তাতে ওই আশঙ্কাই বড় হয়ে উঠেছে এখন। রাজধানীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া তৎপরতায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা যদিও তেমন মেতে উঠতে পারে নি ধ্বংসযজ্ঞে, তবে যানবাহনের চলাচল ছিল কম। বিভিন্ন রুটে বাস-টেম্পো চলেছে অল্প। ফলে রাজধানীবাসীর একমাত্র ভরসা ছিল রিকশা। ভরসা বলছি বটে, কিন্তু তাতে চড়তে হয়েছে হাতে প্রাণটা ধরে। কারণ চোরাগোপ্তা হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে পদে-পদে। মুহূর্তের মধ্যে কখন কোথায় কি ঘটে যায় কিছুই বলা সম্ভব নয় আগে থেকে। এভাবে এক ধরনের কাতর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে জনজীবনে। সামনের দিনগুলোতে এ অস্থিরতা আরও বাড়বে বলেই বলছেন রাজনৈতিক পণ্ডিতরা। অবশ্য আমরা এই আমজনতা ম্যাঙ্গো পিপলের কাছে এগুলো জানা কথাই। সেই নব্বই দশক থেকে রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন দুই নেত্রী, কিন্তু শান্তি দিতে পারলেন না কিছুতেই। বরং অশান্তিকেই ধূমায়িত করে তুলে ক্রমশ জ্বালিয়ে তুলছেন দাউ-দাউ উত্তেজনার প্রবল অস্থিরতা। এমন হওয়ার কারণ একটাই- রাজনীতির নামে দলবাজি। এই দলসর্বস্বতা টিকিয়ে রাখতে চাই ক্ষমতা। অর্থাৎ ক্ষমতায় যাওয়া, আর ক্ষমতায় থাকা। অব্যাহতভাবে থাকা। এখানে অতীতের অভিজ্ঞতা বা অন্য কোন কিছুই কাজ দেয় না কোন। ক্ষমতার জন্য দুই পক্ষের বিবাদ-বিরোধ নিয়ে দেশে-বিদেশে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তা আগেও ছিল। তখন দেখেছি আন্তর্জাতিক সমাজের নানা উদ্যোগ-তৎপরতা, কূটনীতিকদের ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ। এবার সে সব কিছু নেই। সবাই জেনে গেছেন, সবই হবে বৃথা চেষ্টা। নিষ্ফল প্রয়াস। পণ্ডশ্রম। তবে নানা মতের কলামনিস্ট-টকিস্টরা এখনও বাতলে চলেছেন নানা পথের খবর। সেই সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক দলও চেষ্টা করছে আলোর মুখ দেখতে। সুশীল ব্যক্তিত্বরা খুঁজছেন সুড়ঙ্গের শেষ কোথায়? তবে বড় বেশি অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েছে দেশের মানুষ। এখানে কোথায় দিশা, কোথায় আলোর রেখা? এক পক্ষের আশঙ্কা, নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলে জয়ের আশা নেই তাদের। তাই আগেভাগেই এ ব্যবস্থা বাতিল করে রেখেছেন তারা। এখন কারও কথাতেই তাদের চিড়া ভিজবে না। যে যা-ই বলুন তারা ওই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবেন না আর। অন্য পক্ষের আশঙ্কা, নির্বাচনকালে এই সরকারই যদি থেকে যায় তাহলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব নয় তাদের পক্ষে। তাই নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চান তারা। এ অবস্থায় ওই সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনাই তাদের প্রধান, বলতে গেলে, একমাত্র দাবি। এখন পরিস্থিতি আর সংলাপ-সমঝোতা নয় জোরাজুরির পর্যায়ে চলে গেছে। কারণ নির্বাচন কমিশনের ওপর ভরসা করার কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছে না বিরোধী পক্ষ। অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো সেখানেও নগ্ন দলীয়করণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর সে অভিযোগের পক্ষে ইদানীং সমর্থনও মিলেছে কিছু। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের সচিবের কিছু কথাবার্তা। সে কথাবার্তা নির্বাচনের তারিখ সংক্রান্ত, আর কিছু কথাবার্তা শেষ সচিব সভায় প্রধানমন্ত্রীর সামনে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী নেতার ‘মেরুদণ্ড সোজা রাখুন’ আহ্বানের জবাবে এক নির্বাচন কমিশনারের মশকরা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমাজ কতখানি কি ভূমিকা-ই বা রাখতে পারে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে? ভারত তার মিত্র আওয়ামী লীগকেই দেখতে চায় ক্ষমতায়, সে দৃঢ়ভাবে তার পাশেই আছে বরাবরের মতো। ইউরোপ-আমেরিকা মানবাধিকার, দুর্নীতি ইত্যাদি প্রশ্নে সমালোচনা করলেও এ দেশে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান চায় না কোন ভাবেই। তাদের আশঙ্কা, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তার মিত্র ইসলামি রাজনীতিকরা আমাদের সেকুলার-বৈশিষ্ট্যের ক্ষতি করবে অনেকখানি। আর দুই পক্ষের বাইরে যারা- সেই ছোট-ছোট রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, কলামনিস্ট-টকিস্ট- তাঁদের কথা কে শোনে? আসলে যাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা নেই, তাদের কথা কেউ শোনে না। তবে ক্ষতি করার ক্ষমতা যে কারও নেই তা নয়। এই মুহূর্তে সে ক্ষমতা আছে কেবল দেশের মানুষের হাতে। তাই একমাত্র তারাই পারেন রাজনীতিকদের চলমান খেয়ালখুশির চরম ক্ষতি করে দেশকে স্থায়ী কোন ব্যবস্থার শান্তিতে পৌঁছে দিতে। ১৯.০৯.২০১৩
sazzadqadir@rediffmail.com

No comments

Powered by Blogger.