সময়ের প্রতিধ্বনি-অনেক 'ফ্রন্ট' খুলে ফেলেছে সরকার by মোস্তফা কামাল

দেশের সিভিল সোসাইটি, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটা আলোচনা চালু আছে; আওয়ামী লীগ সরকার অনেক 'ফ্রট' খুলে ফেলেছে। এগুলো সামাল দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এমনিতেই আওয়ামী লীগ সরকারকে ব্যর্থ করতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তার ওপর আওয়ামী লীগের নিজের সৃষ্ট সমস্যা পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে ফেলছে।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টারা তাঁকে ভুল পথে পরিচালনা করছেন। সরকার ক্রমেই আমলানির্ভর হয়ে পড়ছে। তাঁদের কারণে বর্তমান সরকার কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এতে সরকার অজনপ্রিয় হয়ে পড়ছে।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের পরই সরকারের বোঝা উচিত ছিল, আওয়ামী লীগ স্বাচ্ছন্দ্যে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। নানা বাধা আর ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আওয়ামী লীগকে আটকানোর চেষ্টা চলবে। আওয়ামী লীগকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু সেই সতর্কতা সরকারের আছে কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। কখনো কখনো মনে হয়, সরকার আজীবন ক্ষমতায় থাকবে এমনটাই তারা ধরে নিচ্ছে।
অথচ বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাটি বাদ দিলে আওয়ামী লীগের শুরুটা ভালোই ছিল। অপেক্ষাকৃত তরুণদের নিয়ে ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁরা ছিলেন অপেক্ষাকৃত সৎ। ধারণা করা হয়েছিল, এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতীতের ভুলগুলো সুধরে নেবেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ব্যাপারে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে সরকারের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশ করা হতো, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে অবস্থার পরিবর্তন হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে একের পর এক নেতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের আখড়া হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপতৎপরতা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ায় বাংলাদেশের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারণা পাল্টাতে থাকে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সেনা ও পুলিশ বাহিনী শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে চলে আসে। এতে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে। একটি সম্ভাবনার বাংলাদেশকে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, অচিরেই বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে আবির্ভূত হবে।
সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাজুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপতৎপরতা বন্ধে ভারতকে সহায়তা করে সরকার। এতে ভারতের সরকার এবং জনগণের মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাপারে খুবই ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। চীনের সঙ্গেও অনুরূপ সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় সরকার। ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অথচ ভারত ও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুফল ঘরে তুলতে পারছে না সরকার। দুই বছর গত হলেও ভারতের সঙ্গে ঝুলে থাকা সীমানা চিহ্নিতকরণ, ছিটমহল বিনিময় ও অপদখলীয় জমি হস্তান্তর সমস্যার সমাধান হয়নি। সমুদ্রসীমা নিয়ে জটিলতা রয়েই গেছে। তিস্তার পানি বণ্টনে চুক্তি সইয়ের সব প্রক্রিয়া শেষ করেও শেষ পর্যন্ত ঝুলে গেছে। চীনের সহযোগিতা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সমস্যাটি মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। অথচ এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগের অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইস্যুকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। ইউনূসকে অপসারণের বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা যেত। সরকারের অপসারণ প্রক্রিয়াটি শোভন হয়নি।
আমরা সবাই জানি, ড. ইউনূস ক্লিনটন-হিলারি পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং একাধিকবার হিলারি ক্লিনটন ফার্স্টলেডি হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন। এসব সফরের পেছনে ড. ইউনূসের বড় ভূমিকা ছিল। এবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ড. ইউনূসের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও। তারা ইউনূসের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। যদিও এ কারণে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে হয়তো কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে বিষয়টি যে যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবে নেয়নি, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
এ কথা ঠিক, সবার জন্য এক আইন, আর ড. ইউনূসের জন্য আলাদা আইন কেন হবে? তিনি কেন নির্ধারিত বয়সসীমার চেয়ে বেশি সময় গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকবেন? রাষ্ট্রের চেয়ে অবশ্যই ব্যক্তি বড় নয়। তাঁর আরো অনেক দোষ থাকতে পারে। তাই বলে তিনি দেশের জন্য যে সম্মান বয়ে আনলেন সেটাকে কি খাটো করে দেখব? আমি তো মনে করি, কখনো কখনো ব্যক্তি তাঁর কর্ম দিয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠেন। ড. ইউনূস এখন কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি সাধারণের ঊধর্ে্ব। তিনি নোবেল বিজয় করে দেশের জন্য সম্মান এনেছেন। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি তাঁর কারণে অনেক উজ্জ্বল হয়েছে। তিনি দেশের ভাবমূর্তির প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। সেই মানুষটির মান-মর্যাদা কি আমরা ধুলোয় মিশিয়ে দেব?
ড. ইউনূস ইস্যুটি অন্যভাবেও সমাধান করা যেত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে ডেকে কথা বলতে পারতেন। একজন নোবেল বিজয়ীকে ডেকে কথা বললে প্রধানমন্ত্রী ছোট হতেন না। আর বড় হতে হলে অনেক সময় ছোট হতে হয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলতে পারতেন, এখন আর গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি নয়, দেশের জন্য আরো বড় কাজ করুন। আমাকে সহায়তা করুন। এতে দেশবাসীর বাহবা পাওয়া যেত। ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদটিও দেওয়া যেত। তা ছাড়া দেশের উন্নয়নে তাঁকে কাজে লাগানো যেত। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তিনি ভালো ভূমিকা রাখতে পারতেন।
এর আগে সরকার খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে প্রতিপক্ষকে ইস্যু তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, ক্যান্টনমেন্টে খালেদা জিয়া যে বাড়িতে থাকতেন সেখানে বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। যে কারণে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়েছে সেই একই কারণে পরবর্তীকালে সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার উচ্ছেদ হতে পারে। সেনানিবাসে বেসামরিক লোকদের পুনর্বাসনের নামে নতুন করে সমস্যা সৃষ্টির কোনো মানে হয় না। এ ইস্যুতে খালেদা জিয়া সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পেয়েছেন। যদিও খালেদা জিয়ারই উচিত ছিল, প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই সেনানিবাসের বাড়িটি ছেড়ে দেওয়া। তা না করে তিনি ওই বাড়িতে থেকে রাজনীতি করেছেন, যা সেনানিবাসের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি ছিল।
আমরা একটা কথা সব সময়ই বলি, এবার আওয়ামী লীগের কাঁধে বড় দুটি কাজ। আওয়ামী লীগ সরকার করতে না পারলে অন্য কোনো সরকারই কাজ দুটি করবে না। একটি ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করে আওয়ামী লীগ জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে। অন্যটি হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এ বিচার এখন প্রক্রিয়াধীন আছে। এটা করতে পারলে আওয়ামী লীগের আর কিছুই করতে হবে না। তাই বলে কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তো পূরণ করবে!
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে আওয়ামী লীগকে সফল হতে হবে। এ তিনটি ইস্যুই দেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এখনো ধৈর্য ধারণ করছে। মানুষকে শুধু আশা দিয়ে, কথা দিয়ে ভুলিয়ে রাখা যাবে না। এখন বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপালেও মানুষ তা গ্রহণ করবে না। এখন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে মানুষ কাজ দেখতে চায়। শেয়ারবাজার নিয়ে যা হচ্ছে তা রীতিমতো সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে। শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের নানা উদ্যোগ আছে। কিন্তু কোনোটাই কাজে আসছে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শেয়ারবাজার থেকে যারা টাকা তুলে নিয়েছে তারা সরকারের যত ঘনিষ্ঠই হোক, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।
এ ছাড়া বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের হুমকি-ধমকি দিয়ে সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন। ব্যবসায়ীদের আস্থায় নিতে না পারলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কোনো কৌশলই কাজে আসবে না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারলে মানুষ বিকল্প খুঁজবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে। দলীয় লোকদের খাঁই খাঁই মনোভাব দূর করতে হবে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতির মধ্যে রাখা যাবে না। গ্রামেগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। তারা নাকি কথায় কথায় ক্ষমতার দাপট দেখান।
চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির অভিযোগ তো অনেক আগে থেকেই উঠেছে। এখন নিজেরাই টেন্ডার ডেকে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। কোনো কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রেও কারো কারো লেজেগোবরে অবস্থা। কোনো কোনো মন্ত্রীর লাগামছাড়া কথাবার্তায় সরকার বিভিন্ন সময় বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার মন্ত্রীদের কম কথা বলার পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।
সুষ্ঠুভাবে সরকার পরিচালনায় মন্ত্রিসভার পুনর্গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। চার-পাঁচজন মন্ত্রী এতই দুর্বল যে তাঁরা মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কাজও পরিচালনা করতে পারেন না। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের সচিবরা মন্ত্রীদের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর! তাদের ক্ষমতার দাপটে মন্ত্রীরা মোটামুটি কোণঠাসা। এ অবস্থার অবসান দরকার। অতি দ্রুত কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে মন্ত্রিসভায় সম্পৃক্ত করা দরকার। এদিকে মহাজোট থাকবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ সরাসরি সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যেকোনো মূল্যে মহাজোট রাখা দরকার। মহাজোট ভেঙে গেলে তার সুফল ভোগ করবে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষরা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা মহাজোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। প্রয়োজনে মহাজোট নেতাদের কাউকে কাউকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়ে দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারেন। এখন সময় এসেছে আত্মশুদ্ধির। সরকারের উচিত, নিজেদের দোষত্রুটি শুধরে নিয়ে দেশের উন্নয়নে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। এ জন্য সমঝোতার রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
mkamalbd@hotmail.com

No comments

Powered by Blogger.