পাকিস্তানের সহিংস পথচলা by মশিউল আলম

মালিক মমতাজ হুসেইন কাদরি নামের দেহরক্ষীটি যাঁকে রক্ষা করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তাঁকেই হত্যা করলেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাব রাজ্যের গভর্নর সালমান তাসিরকে তিনি গুলি করেছিলেন খুব কাছে থেকে। সাব-মেশিনগান থেকে গুলি করেছেন একটি নয়, পর পর নয়টি। দুটি ম্যাগাজিনের সব কটি বুলেট শেষ করেই কেবল ক্ষান্ত হয়েছেন। বোঝা যায়, কী প্রচণ্ড ঘৃণা থেকে তিনি এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। গুলি শেষ করে অস্ত্র ফেলে দিয়ে তিনি দুই হাত ওপরে তুলেছেন, আত্মসমর্পণ করে স্বীকার করেছেন যে তিনি গভর্নরকে হত্যা করেছেন। কেন? কারণ গভর্নর সালমান তাসির পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইনকে কালাকানুন বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি আইনটি সংশোধনের দাবি তুলেছিলেন এবং আসিয়া বিবি নামের এক খ্রিষ্টান নারীকে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পুলিশের গাড়িতে আটক মালিক কাদরির একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেখা যাচ্ছে, যেন তিনি এক মহান কাজ করেছেন। তিনি এক টিভি চ্যানেলকে বলেছেন, ‘সালমান তাসির একজন ধর্মদ্রোহী। তাঁর শাস্তি এটাই।’
হিলারি ক্লিনটন থেকে শুরু করে বান কি মুন পর্যন্ত বিশ্বের বড় বড় নেতারা সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু খোদ পাকিস্তানের নাগরিক সমাজ অতি সতর্ক, প্রকাশ্যে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানাতে তাঁরা ভয় পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামাবাদের বিবিসির সংবাদ-বিশ্লেষক ইলিয়াস খান। উল্টো দিকে বরং সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন অনেক ধর্মীয় নেতা। অনেকে হত্যাকারী মালিক কাদরির প্রশংসা করেছেন। সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের পরপরই ফেসবুকে হত্যাকারী মালিক কাদরির নামে একটি পাতা খোলা হয়েছে, সেখানে প্রায় দুই হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কাদরির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
শুধু তা-ই নয়, লাহোরে সালমান তাসিরের জানাজা বর্জন করার ডাকও দিয়েছে কয়েকটি ধর্মীয় গোষ্ঠী। সুন্নি মুসলমানদের একটি গোত্রের ৫০০ জন আলেম এক বিবৃতি দিয়ে সবাইকে সাবধান করেছেন: সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডে কেউ শোক প্রকাশ করলে তারও একই পরিণাম হবে। জামায়াত-এ-আহলে সুন্নাত পাকিস্তান নামের এক সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে, কোনো মুসলমান যেন সালমান তাসিরের জানাজায় শরিক না হয়, কেউ যেন তার জন্য দোয়া করার চেষ্টা না করে, কেউ যেন তার জন্য কোনো ধরনের আফসোস বা অনুকম্পা প্রকাশ না করে। সালমান তাসিরকে একজন ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তারা বলেছে, কেউ যদি কোনো ধর্মদ্রোহীর হত্যাকাণ্ডে সমবেদনা প্রকাশ করে, তাহলে সেও তার মতোই ধর্মদ্রোহী বলে গণ্য হবে।
সালমান তাসির পাকিস্তান পিপলস পার্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক উদারপন্থী রাজনীতিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল, বিশেষ করে নারীসমাজের ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর অধিকার রক্ষার পক্ষে তিনি সোচ্চার ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর মৃত্যু একটি ‘বিরাট ক্ষতি’। ষাটের দশকে ছাত্রজীবন থেকে তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির সঙ্গে জড়িত, জুলফিকার আলী ভুট্টোর একজন ভক্ত, ভুট্টো: এ পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি নামে একটি বইও লিখেছেন। তিনি লন্ডনে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়েছেন এবং পরবর্তীকালে রাজনীতির পাশাপাশি একজন সফল ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে ভুট্টোর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে জেল খেটেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডেইলি টাইমস ও উর্দু দৈনিক আজকাল-এর প্রকাশক, দুটি ইংরেজি টিভি চ্যানেলের মালিক এই ভদ্রলোক ইন্টারনেটে ফেসবুক ও টুইটার ব্যবহার করতেন। জীবনযাপনে ছিলেন শৌখিন, আধুনিক ও কেতাদুরস্ত। ডানপন্থী ও ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন গণমাধ্যমে তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিলাসী জীবনযাপনকে অনৈসলামিক আখ্যা দিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা চলে এসেছে।
অকপটে নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতেন সালমান তাসির। সে জন্য তাঁকে বিতর্কিত ব্যক্তিও বলা হয়। গত বছর আসিয়া বিবি নামের এক খ্রিষ্টান নারীর বিরুদ্ধে ইসলামের নবীর অবমাননার অভিযোগে ব্লাসফেমি আইনে মামলা হয়, পাঞ্জাবের এক নিম্ন আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আসিয়া বিবি সেই থেকে কারারুদ্ধ। উচ্চ আদালতে তিনি আপিল করেছেন। এই সংখ্যালঘু নারী ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার বলে উল্লেখ করে সালমান তাসির তাঁর দণ্ড মওকুফের আবেদন জানান, একই সঙ্গে ব্লাসফেমি আইন সংশোধনের দাবি তোলেন। তখন থেকেই তিনি উগ্রপন্থী ধর্মীয় সংগঠনগুলোর রোষানলে পড়েন, তাঁকে ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি নিজেও একাধিকবার বলেছেন যে তাঁর জীবনের ঝুঁকি আছে, কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসবেন না। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির খুব ঘনিষ্ঠ তিনি; ধারণা করা হয়, উচ্চ আদালতের রায়ে যদি আসিয়া বিবির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, তাহলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সালমান তাসির এটা করিয়ে নেবেন। তাই তিনি উগ্রপন্থীদের ঘৃণার পাত্র।
জেনারেল জিয়াউল হকের জারি করা ব্লাসফেমি আইনটির বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে ভয় পায়। সালমান তাসিরের নিজের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টিও এ ব্যাপারে বরাবর নীরবতা পালন করে আসছে। শুধু সালমান তাসির ও শেরি রেহমান নামের একজন জাতীয় পরিষদের সদস্য ছাড়া পিপিপির কোনো নেতা ব্লাসফেমি আইন বাতিল বা সংশোধনের কথা তোলেননি। এর আগে এ আইনটি বাতিল বা সংশোধনের কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। উগ্রপন্থা ও তালেবানীকরণের বিরুদ্ধেও বেনজির অবস্থান নিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, এসব কারণেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সুতরাং সালমান তাসিরও যে হত্যার শিকার হতে পারেন, এমন আশঙ্কা অনেকেই প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাঁরই দেহরক্ষী দলের কোনো সদস্য যে কাজটি করতে পারেন, এটা বোধ হয় কেউ ভাবেনি।
সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডটি মালিক কাদরির একার কাজ, নাকি তাঁর পেছনে আরও কেউ আছে, এ বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বিবিসিকে জানিয়েছেন। পাঞ্জাব এলিট ফোর্স নামের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর যে দলটি সেদিন সালমান তাসিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল, তার সব সদস্যকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাকিস্তানের ডেইলি টাইমস পত্রিকায় ৪ জানুরির সম্পাদকীয় নিবন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, মালিক কাদরির পেছনে আরও কোনো ব্যক্তি বা মহলের হাত থাকতে পারে। মালিক কাদরির মতো একজন উগ্র মানসিকতার ব্যক্তিকে গভর্নরের নিরাপত্তারক্ষীর দলে কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, এই প্রশ্নটিও ডেইলি টাইমস তুলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কাদরি গভর্নরের নিরাপত্তারক্ষী দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে পত্রিকাটি লিখেছে, হত্যাকাণ্ডটি যদি একান্তই মালিক কাদরির একার কাজ হয়ে থাকে, তাহলে এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্র ও সমাজের এক ভয়াবহ চরিত্র ফুটে ওঠে। প্রমাণিত হয় যে ধর্মীয় উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতা পাকিস্তানের সমাজকে নৈরাজ্য ও বর্বরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ, বুদ্ধিবিবেচনার কোনো জায়গা আর এ সমাজে থাকছে না, হিংস্র অন্ধবিশ্বাস পুরো সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে, এমনকি একটি প্রদেশের গভর্নরের মতো উচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিও ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের ক্রোধের আগুন থেকে আজ নিরাপদ নন।
পাকিস্তানে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে দায়ের করা মামলার আসামি জেলখানায় বন্দী অবস্থায়ও খুন হয়ে যায়। অন্য কয়েদিরা তাদের খুন করে। আসামিদের আত্মীয়স্বজনও খুন হয়, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে পালিয়ে বেড়ায়। পাকিস্তানের জাস্টিস অ্যান্ড পিস কমিশন নামের এক বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৪ জন মানুষ এভাবে খুন হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজন বিচারকও ছিলেন। আদালতে মামলার শুনানি চলা অবস্থায় আসামিদের গুলি করে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আসিয়া বিবি নামের খ্রিষ্টান নারীর মৃত্যুদণ্ড উচ্চ আদালতে মওকুফ হলে বা প্রেসিডেন্ট তাঁকে ক্ষমা করে দিলেও তিনি মুক্তভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন না। কারণ ইতিমধ্যে এক মোল্লা ঘোষণা করেছেন, জেলের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই হোক, আসিয়া বিবিকে যে হত্যা করতে পারবে, তাকে তিনি পাঁচ লাখ রুপি পুরস্কার দেবেন। এক মসজিদের ইমাম আগাম বলে রেখেছেন, ‘আইন যদি কোনো ধর্মদ্রোহীকে সাজা দেয়, আর তাকে যদি ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেব।’
পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ধর্মীয় ব্যাপারে সব ধরনের ভিন্নমতকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার প্রবণতা বাড়ছে, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এতে মদদ দিচ্ছে। ‘অরাজনৈতিক’ আলেম সমাজে যাঁরা অপেক্ষাকৃত উদার ও সহনশীল, তাঁদের অনেকেই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, ইতিমধ্যে অনেকে আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা গেছেন, অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। শিয়া সম্প্রদায়ের অনেক সুফি সাধকের মাজার বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে ওহাবি উগ্রপন্থীরা। প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার মানুষেরা ক্রমশ আরও বেশি করে কোণঠাসা হচ্ছে। সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাদের অবস্থান আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।
যে পাকিস্তানে ধর্মভিত্তিক দলগুলো কখনো নির্বাচনে জয়ী হয় না বা সরকার গঠন করতে পারে না, সেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রপন্থা হিংস্রতার পর্যায়ে উঠে যাচ্ছে। এর কারণ কী? প্রচণ্ড আমেরিকা-বিদ্বেষ; পশ্চিমা ভাবধারা ও সভ্যতা-সংস্কৃতি বলে যা কিছু পরিচিত, তার সবকিছুর প্রতিই প্রচণ্ড ঘৃণা। ইসলামাবাদের কায়েদে আজম ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পারভেজ হুদভয় মনে করেন, পাকিস্তানি সমাজে আমেরিকা-বিদ্বেষ ভারত-বিদ্বেষকেও ছাড়িয়ে গেছে। মালিক কাদরি ও তাঁর মতো মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিকনির্বিশেষে সব ধর্মীয় উগ্রপন্থী ব্যক্তির কাছে সালমান তাসির ছিলেন পাশ্চাত্য ভাবধারা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি। উপরন্তু তিনি পক্ষ নিয়েছেন একজন খ্রিষ্টান নারীর, যিনি নবীর অবমাননা করেছেন।
আমেরিকানরা যত দিন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি পশ্চিমা ভাবপণ্য রপ্তানি করার সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে যাবে, তত দিন সেখানে মালিক কাদরির মতো উগ্রপন্থীদের জন্ম হতে থাকবে। তালেবানীকরণ প্রতিহত করতে গিয়ে আমেরিকা, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পুরো সমাজকে মনেপ্রাণে তালেবান বানিয়ে ফেলছে, এটা তারা নিজেরাই হয়তো বুঝতে পারছে না।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.