মহান আল্লাহ ভালোই করেছেন এখনো করবেন আশা করি by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

ক্যাডেট কলেজে যাওয়া
আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়ালেখার জন্য প্রবেশ করেছিলাম ৭ জুলাই ১৯৬২ সালে। আমার জীবনপথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো এই ১৯৬২ সাল। এক দিকে ভাগ্যবিধাতা কর্তৃক লিখে রাখা নিয়তি, অপর দিকে তাঁরই সৃষ্টি মানুষজন কর্তৃক চেষ্টা। আমার বিনীত মূল্যায়নে উভয়ের সম্মিলিত ফল ছিল ক্যাডেট কলেজে প্রবেশ করা। ওই বছর সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান থেকে আমরা ৪৭ জন কিশোর কলেজে প্রবেশে করেছিলাম। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এর মধ্য থেকে আমিসহ তিনজনই চট্টগ্রাম বন্দর হাইস্কুল তথা চিটাগং পোর্ট ট্রাস্ট হাইস্কুলের ছাত্র ছিলাম। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং ১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে আমরা নিজ নিজ শ্রেণীতে পদোন্নতি পেয়ে লেখাপড়া শুরু করেছিলাম। অতঃপর ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য আবেদনপত্র জমা দিয়েছি, লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছি, মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভায় অংশগ্রহণ করেছি, ডাক্তারের সামনে উপস্থিত হয়ে মেডিক্যাল পরীক্ষা দিয়েছি অতঃপর নির্বাচিত হয়ে ক্যাডেট কলেজে প্রবেশ করে সপ্তম শ্রেণীতে নতুন করে পড়া শুরু করেছি। আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ারত অবস্থা থেকে সপ্তম শ্রেণীতে যাই। ফলে সমসাময়িক বন্ধুদের থেকে আমি এক বছর পিছিয়ে পড়েছিলাম। অর্থাৎ, বন্দর হাইস্কুলে যারা আমার কাসফ্রেন্ড ছিল, তারা ১৯৬৫ সালে এসএসসি দেয়, অপরপে আমি এসএসসি দিই ১৯৬৬ সালে। বন্দর হাইস্কুলের কাসফ্রেন্ডরা ইন্টার বা উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ১৯৬৭ সালে, অপরপে আমি এইচএসসি পাস করি ১৯৬৮ সালে। এক বছরের তি কোনো দিক দিয়ে কি পূরণ হয়েছে? সংপ্তি উত্তর। আমি মনে করি মহান আল্লাহ তায়ালা পুষিয়ে দিয়েছেন। এইচএসসি পরীক্ষায় আমি কুমিল্লা বোর্ডে মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করি।
অন্য তিন বন্ধুর গল্প
পোর্ট ট্রাস্ট থেকে আমরা চারজন ফৌজদারহাটে গিয়েছিলাম। পোর্ট ট্রাস্ট হাইস্কুলের ছাত্র নয়, কিন্তু পোর্ট ট্রাস্ট প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র এবং আমাদের কাসফ্রেন্ড ছিল এমন একজনও পরীক্ষা দিয়ে পাস করে ফৌজদারহাটে গিয়েছিল। তার নাম খন্দকার রফিকুল আলম। পঞ্চম শ্রেণীর পর পোর্ট ট্রাস্ট হাইস্কুলে প্রবেশ না করে, রফিক চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল এবং অষ্টম শ্রেণীতে পড়ারত অবস্থায় ছিল। অতএব আমি, পানাউল্লাহ ও রফিক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম ছোটকাল থেকেই; লুৎফুল বারী বন্ধু হয় কলেজে যাওয়ার পর। অন্য যে তিনজনের কথা বলছিলাম তাদের মধ্যে, বন্দর হাইস্কুলের নবম শ্রেণীতে পড়ারত অবস্থা থেকে ফৌজদারহাটের সপ্তম শ্রেণীতে গিয়েছিল গোলাম মোহাম্মদ পানাউল্লাহ এবং সপ্তম শ্রেণীতে পড়ারত অবস্থা থেকে ফৌজদারহাটেরও সপ্তম শ্রেণীতে গিয়েছিল লুৎফুল বারী ভূইয়া। লুৎফুল বারী ভূইয়া বিজ্ঞান বিভাগে এবং যৌথ সব বিভাগে কুমিল্লা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করে। যদি বন্দর হাইস্কুলে পড়তেই থাকতাম, তাহলে আমি বা লুৎফুল বারী কি বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করতে পারতাম? হয়তো বা না। আমি যেন প্রথম স্থান অধিকার করতে পারি, সম্ভবত তার জন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা যিনি আমার ভাগ্যবিধাতা, তিনি আমাকে এক বছর তি দিয়ে ফৌজদারহাটে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। রফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিয়োলজিতে মাস্টার্স করে, কিছু বছর পর বিদেশ থেকে পিএইচডি করে ২০-২৫ বছর যাবৎ আমেরিকাতে আছে। লুৎফুল বারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিকসে মাস্টার্স করে লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স থেকে পিএইচডি করে, ২৫-৩০ বছর যাবৎ মধ্য আমেরিকার পুয়েরটোরিকো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক। পানাউল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে মাস্টার্স করে, ম্যানিলা থেকে পিএইচডি করে গাজীপুরে ইরি (ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট)-এ ২০-২৫ বছর ছিল, পরে একটি এনজিওতে চলে যায়। আর আমিও অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে এ জায়গায় এসেছি। যেহেতু মিলিটারি একাডেমি থেকে বিএ পাস করার সুযোগ পাইনি তাই ১৯৭৪-এ বিএ পাস করি প্রাইভেট ক্যান্ডিডেট হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। উচ্চশিক্ষার অদম্য আগ্রহে ২০০৪-এ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ইন ডিফেন্স স্টাডিজ পাস করি প্রথম শ্রেণীতে। ছয় বছর আগে পিএইচডি প্রোগ্রামে নাম লিখিয়েছিলাম, সময়ের অভাবে ও ব্যস্ততার কারণে পিছিয়ে পড়েছি। আমরা ওই চার বন্ধু সবার জন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা দয়াবান ছিলেন বলে আমার মূল্যায়ন।
জীবনের বৈচিত্র্য
সাধারণত প্রতিটি মানুষের েেত্রই জীবনের অভিজ্ঞতা বিচিত্র হয়। বিচিত্র শব্দটির বিকল্প হিসেবে বহুমাত্রিকও বলা যেতে পারে। আমি কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে আলাপ করব। প্রথম উদাহরণ পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষা। দ্বিতীয় উদাহরণ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের লেখাপড়া। তৃতীয় উদাহরণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অসময়ে প্রবেশ করা। চতুর্থ উদাহরণ সেনাবাহিনীর মধ্যমেয়াদি উচ্চ প্রশিণ স্টাফ কলেজ সম্পন্ন করা এবং পঞ্চম ও শেষ উদাহরণ রাজনীতিতে প্রবেশ করা। ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলাম ১৯৬২ সালে। তার আগের ঘটনাটি না বললেই নয়।
পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষা
হাটহাজারী থানার উত্তর বুড়িশ্চর গ্রামের রশিদিয়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলাম। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি একসময় চট্টগ্রাম বন্দর উত্তর আবাসিক এলাকায় আব্বা পরিবার নিয়ে উঠেছিলেন। অতএব আমার বিদ্যালয় বদলাতে বাধ্য। আবাসিক এলাকার ভেতরেই ছিল বন্দর প্রাথমিক বিদ্যালয় নম্বর এক। ওখানে কাস থ্রিতে প্রবেশ করলাম। ছাত্র হিসেবে ছিলাম দুর্বল। দুর্বলতার মূল কারণ বিজ্ঞান ও অঙ্ক। প্রাইমারি স্কুলে বিজ্ঞান গৌণ ছিল, অঙ্ক মুখ্য ছিল। কাস ফাইভে ওঠা পর্যন্ত দুর্বলই ছিলাম। কাস ফাইভে পড়ার সময় অর্থাৎ ১৯৫৯ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ছাত্র বাছাই হয়েছিল। ৫০-এর অধিক ছাত্রছাত্রী থেকে মেধাবী বা ভালো ২০ জনকে নেয়া হয়েছিল। স্কুলই তাদের কোচিং করালো, তারা পরীক্ষা দিলো, সবাই বৃত্তি পেল এবং নিয়ম মোতাবেক অটোমেটিক্যালি ষষ্ঠ শ্রেণীতে প্রমোশন পেল। আমরা বাকি ৩০-৪০ জন যারা দুর্বল ছিলাম তারা বার্ষিক পরীক্ষা দিতে বাধ্য। ওই অমেধাবী দুর্বলদের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষায় আমি প্রথম স্থান অধিকার করলাম। বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ সভায় পুরস্কার পেলাম। স্যার বললেন, ‘তুই হলি গাধাদের মধ্যে উত্তম গাধা।’ ওই উত্তম গাধা ইবরাহিমই ষষ্ঠ শ্রেণীতে প্রথম হলো, সপ্তম শ্রেণীতেও প্রথম হলো, ক্যাডেট কলেজে ঢোকারও সুযোগ পেল। কারণ, পঞ্চম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ায় একটি অদম্য প্রেরণা সৃষ্টি হয়েছিল। কাসফ্রেন্ডরাও প্রচণ্ড সহযোগিতা করেছিল যেন আমি আমার অবস্থান বজায় রাখতে পারি। বৃত্তি পাইনি সত্য, কিন্তু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অন্য দিক দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছিলেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান
জুন ১৯৬৮ সালে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের মেয়াদ শেষ। ক্যাডেট কলেজের ১৫-২০ জন বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৬৮-এর জুলাই-আগস্টে। প্রকৌশলীরা থেকে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা হয় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেল, নয়তো পাকিস্তান সেনা ও বিমানবাহিনীতে চলে গেল। যারা সেনাবাহিনীতে গেল তারা ১৯৬৮-এর নভেম্বর-ডিসেম্বরে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে যোগদান করল ৪৩তম পিএমএ লং কোর্সের ক্যাডেট হিসেবে। দু-একজন ’৬৯-এর মে-জুনে একই কাকুলে যোগদান করল, ৪৪তম পিএমএ লং কোর্সের ক্যাডেট হিসেবে। একজন আরো পাঁচ মাস পর যোগদান করল ৪৫তম পিএমএ লং কোর্সের ক্যাডেট হিসেবে। মাঝখানে জানুয়ারি ১৯৬৯-এ মোখলেস গিয়েছিল ১৯তম ওয়ার কোর্সে এবং মার্চের শেষে আব্দুল্লাহ গিয়েছিল ২০তম ওয়ার কোর্সে। দেখতে দেখতে ১৫-১৬ মাস পর আমি একদম একা। ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন চলছিল। অনেকের সাথে তথা হাজার হাজার ছাত্রদের মধ্যে আমরাও মিটিং-মিছিলে থাকতাম; যেমন কিনা হ্যামিলনের বংশীবাদকের পেছনে শিশুরা ছিল। একপর্যায়ে লেখাপড়া থেকে মন উঠে গেল। সিদ্ধান্ত নিলাম, সবচেয়ে আগে যেই ব্যাচ বা কোর্সে সবার আগে সুযোগ পাবো সেটাতে যোগ দেবো। ক্যাডেট কলেজের ছাত্র হওয়ায় লিখিত পরীক্ষা মওকুফ ছিল। প্রাথমিক মৌখিক পরীক্ষার জন্য রুমের এক দরজা দিয়ে ঢুকে আরেক দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলাম। বসতেও পারলাম না। পরীক তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জর্জ কায়েরনেন্ডার বললেন, ‘তুমি ব্রাউনের ছেলে, অতএব পাস।’ অর্থাৎ ক্যাডেট কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল লেফটেনেন্ট কর্নেল উইলিয়াম মরিস ব্রাউনের ছাত্র হিসেবে আমি নিঃসন্দেহে যোগ্য। আইএসএসবিতে গেলাম। জনৈক কর্নেল আফ্রিদি ছিলেন সভাপতি। নিবেই না। তার মত হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্ররা সেনাবাহিনীতে যেতে চায় রাজনীতি করার জন্য। দীর্ঘ পরীক্ষার পর, তিনি সম্মত হলেন আমাকে সেনাবাহিনীতে নিতে। ৯ জানুয়ারি ১৯৭০ তারিখে কাকুল পৌঁছেছিলাম, ২৪তম ওয়ার কোর্সের ক্যাডেট হিসেবে। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ তারিখে আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ হলো এবং ৬ সেপ্টেম্বর তারিখে কমিশন পেলাম। ৯ মাসের প্রশিণে, সার্বণিক বিভিন্ন পর্যায়ের ও বিভিন্ন আঙ্গিকের সর্বপ্রকার মূল্যায়নে, আমি ১৭২ জন তরুণের মধ্যে সর্বোত্তম ক্যাডেট বিবেচিত হয়ে প্রথম পুরস্কার পেলাম। প্রথম হওয়ার সুবাদে চাকরির প্রথম দিন থেকেই একটা সুনামের আবহ সৃষ্টি হলো। প্রথম হওয়ার সুবাদে নিজের পছন্দের জায়গায় প্রথম চাকরি শুরু করার আনুষ্ঠানিক সুযোগ পেলাম। আমি, তৎকালীন ঢাকা মহানগরের আনুমানিক ২০-২১ মাইল উত্তরে অবস্থিত ইতিহাসখ্যাত ভাওয়াল রাজাদের রাজধানী জয়দেবপুর রাজবাড়িতে অবস্থিত (বর্তমান গাজীপুর জেলা সদর) দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করি। সাত মাস পর, মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের প্রশস্ত কিন্তু কঠিন পথে কদম রাখি সবার সাথে। যদিও মিলিটারি একাডেমিতে দেরিতে গিয়েছিলাম, যদিও বন্ধুবান্ধব থেকে চাকরির শুরুতেই পিছিয়ে পড়েছিলাম, তারপরও মহান আল্লাহ তায়ালা বিরাট একটি উপহার দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সুযোগ দিয়ে।
সেনাবাহিনীর স্টাফ কোর্স
পৃথিবীর প্রত্যেক সেনাবাহিনীতেই অফিসারদের প্রশিণের জন্য বিভিন্ন প্রকারের প্রশিণ মডিউল বা কোর্স থাকে। কিছু করতে হয় প্রথম তিন-চার বছরের মধ্যেই। কিছু করতে হয় আট থেকে ১২-১৩ বছরের মধ্যেই। কিছু করতে হয় ১৬ থেকে ২০ বছরের মধ্যেই। কিছু করতে হয় ২০ বছরের ওপরে চাকরি হলে। যেহেতু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নতুন ছিল, অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে গঠিত হচ্ছিল তাই, ৭০ বা ৮০’র দশকের অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশিণগুলোর সুযোগ পেতে বিলম্ব হয়েছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর স্টাফ কলেজের অবস্থান ছিল লন্ডন মহানগরী থেকে আনুমানিক ৪০ মাইল দেিণ, সাররে কাউন্টিতে অবস্থিত ক্যাম্বারলি নামের ুদ্র থেকেও ুদ্র শহরে। ক্যাম্বারলির আদলে গড়ে উঠেছিল ভারত ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্টাফ কলেজগুলো। ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্টাফ কলেজের অবস্থান হচ্ছে দণি ভারতের ওয়েলিংটন নামের ুদ্রাতিুদ্র শহরে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী স্টাফ কলেজের অবস্থান হচ্ছে প্রাচীন কোয়েটা সেনানিবাসে। স্বাধীন বাংলাদেশে একটি ব্রিটিশ টিমের সহযোগিতায় স্টাফ কলেজ স্থাপিত হয়েছিল ঢাকা মহানগরের উত্তর অংশে মিরপুর সেনানিবাসে, ১৯৭৭-এর শেষাংশে। ১৯৮০ সালে লেফটেনেন্ট কর্নেল ইবরাহিম প্রথমবার পরীক্ষার আবেদন জমা দিলাম। পরীক্ষার দুই মাস আগে লেফটেনেন্ট কর্নেল দিদারুল আলম বীর প্রতীকের নেতৃত্বে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়েছিল। আমার ব্যাটালিয়ন বা সপ্তম বেঙ্গলের কাছেই। অন্য সব অধিনায়কের মতো, আমারও জীবন কঠিন হয়ে গেল; অফিসে ঘুমাই, অফিসে থাকি দিবারাত্র তিন মাস। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছি না দেখে, আবেদনপত্র প্রত্যাহার করলাম। ১৯৮১ সালে দ্বিতীয়বার পরীক্ষার আবেদন জমা দিলাম। ৩০ মে সেনাবিদ্রোহ হলো চট্টগ্রামে। অভিযুক্ত অফিসারদের কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে বিচার হবে। সেনাবাহিনীর আইন মোতাবেক অভিযুক্তরা একজন করে বন্ধু পাবেন (অর্থাৎ উকিল)। ২৯ জন অভিযুক্তের জন্য মোট তিনজন বন্ধু বা ডিফেন্ডিং অফিসার নিযুক্ত হলাম। আমি কনিষ্ঠতম। পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি বাক্সবন্দী করে বাসার স্টোর রুমে রেখে দিলাম। পরীক্ষার ২০ দিন আগে ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হলাম। প্রস্তুতি নেই দেখে আবেদনপত্র প্রত্যাহার করলাম। এটা দ্বিতীয়বারের মতো। ১৯৮২ সালে আবার বা তৃতীয়বারের মতো আবেদন করলাম। ২৪ মার্চ তারিখে এরশাদ সাহেব সামরিক শাসন জারি করলেন। পয়লা এপ্রিল থেকে এক উৎকট ঝামেলায় আমাকে নিমজ্জিত করলেন। ব্রিগেডিয়ার বদরুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত হলো মার্শাল ল ভিজিলেন্স টিম। চার সদস্যের আমি একজন। সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হই, রাত ৯-১০টায় ফিরি। এখন পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি, সময়ের একটি মহা অপচয় ছিল সেটা। প্রস্তুতি নিতে পারছিলাম না। আবার প্রত্যাহারের আবেদন করলাম। অর্থাৎ তৃতীয়বারের মতো স্টাফ কলেজ ভর্তি পরীক্ষা না দেয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করছি। তখনকার আমলের সিজিএস মেজর জেনারেল নুরুদ্দীন খান আন্তরিকভাবেই শুভাকাক্সী ছিলেন। আমার প্রত্যাহার আবেদন না মঞ্জুর হলো। জেনারেল নুরুদ্দীন আমাকে বাধ্য করলেন ১৫ দিনের জন্য কঠোরভাবে প্রস্তুতি নিতে। তিনিই জানালেন, মালয়েশিয়া থেকে একটা স্কলারশিপ ইতোমধ্যে এসে গেছে এবং ইংল্যান্ড থেকে একটা স্কলারশিপ আসতেই পারে এ বছর। তুমি পরীক্ষা দাও। তিন-চার বছর পরপর ইংল্যান্ড থেকে এ রকম একটা স্কলারশিপ আসত। আমি ইনিয়ে-বিনিয়ে নিবেদন করেছিলাম যে, যেহেতু প্রস্তুতি কম সেহেতু ফলাফল খারাপ হলে লজ্জা হবে ও সুনামের তি হবে। নুরুদ্দীন সাহেবের শুভেচ্ছা-স্পর্শিত চাপে বাধ্য হয়ে পরীক্ষা দিলাম। লিখিত পরীক্ষায় খুব ভালো করলাম। প্রথম তিনজনকে ডাকা হলো। একজনকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হবে, আরেকজনকে মালয়েশিয়া পাঠানো হবে। দীর্ঘ এবং কঠিন মৌখিক পরীক্ষার পর ইংল্যান্ডে যাওয়ার জন্য মনোনীত হলাম। ১৮ অক্টোবর ১৯৮২ থেকে ২৩ নভেম্বর ১৯৮২, ইংল্যান্ডের ‘ দ্য রয়েল স্টাফ কলেজ ক্যাম্বারলি’-এ লেখাপড়া করলাম। মোট ছাত্র ১৮০ জন ছিলাম। যার মধ্যে ৪৪ জন ছিলাম বিদেশী। ১৯৮০ ও ১৯৮১ এই দুই বছর আবেদন প্রত্যাহার করার পর, মন খারাপ ছিল। ১৮৮২ তেও মন খারাপ ছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরীক্ষা দিয়েছি। মহান আল্লাহ তায়ালা যোগ্যতা অর্জনের পথ ও সম্মানপ্রাপ্তির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ এবং কলাম লেখা প্রসঙ্গ
ওপরের চারটি উদাহরণের বর্ণনা বলতে গেলে আত্মজীবনীরই অংশ। মালয়েশিয়ার বিখ্যাত মাহাথির মুহাম্মদ ১৯৪৯ সালে ইংল্যান্ড যেতে চেয়েছিলেন বৃত্তি নিয়ে আইন পড়ার জন্য। কর্তৃপ তাকে বৃত্তি দিয়েছিল সিঙ্গাপুরে ডাক্তারি পড়ার জন্য। ডাক্তারি পড়তে গিয়ে তিনি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। ৫৯ বছর বয়সে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আমি ১৯৪৯ সালে মাত্র জন্মগ্রহণ করেছি। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে আমার বয়স ৫৮ বছর তিন মাসের সময় আমি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির পতাকাতলে রাজনীতির কর্মী হিসেবে নাম লেখাই। রাজনৈতিক দলের নীতিবাক্য হচ্ছেÑ ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’ তথা ইংরেজি পরিভাষায় পলিটিকস ফর চেঞ্জ। গত প্রায় তিন বছর প্রতি সপ্তাহে একটি করে কলাম লিখছি নয়া দিগন্তের জন্য। প্রথমে মঙ্গলবারে বের হতো, পাঁচ মাস ধরে বুধবারে বের হয়। আজ থেকে নিয়ে বিগত পাঁচ মাস রাজনীতি নিয়েই বেশি লিখেছি। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির জন্মের পেছনে কী প্রোপট ছিল, কল্যাণ পার্টির প্রেরণা, দর্শন, ল্য কী ইত্যাদি নিয়ে লিখেছি। তরুণ সম্প্রদায় এবং সৎ ও মেধাবী ব্যক্তিরা যেন রাজনীতিতে আগ্রহী হন, সে সম্পর্কে লিখেছি। জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতির ব্যাখ্যা তথা যুগপৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনার মিশ্রিত প্রকাশ ঘটিয়েছি আমার কলামগুলোতে। বিশাল বাংলাদেশের বিশাল রাজনৈতিক অঙ্গনে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কলাম লিখেছি। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি তুলে দেয়া এবং গণভোটের বিধান বাদ দেয়া প্রসঙ্গে লিখেছি। সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে লিখেছি। আমার জন্মস্থান চট্টগ্রাম বা হাটহাজারী জনগণের চিন্তাকে সাধারণ মানদণ্ড মনে করে মানুষের কথা লিখেছি। গত তিন বছর পাঁচ মাস খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জোটবদ্ধ আছি, যদিও জোটের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা দিবস ১৮ এপ্রিল ২০১২। রাজনীতির অঙ্গন এই মুহূর্তে এতই জটিল, এতই বিতর্কিত, এতই আক্রান্ত যে; আমি যথেষ্টভাবে এর ব্যাখ্যা করতে পারিনি এবং পারব কি না তা-ও সন্দেহ। অনেক সময় মনে হয়, এত কষ্ট করে কলাম লিখেই বা কী হবে? কিন্তু নিয়ত পরিষ্কার থাকলে মহান আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করবেন বলে একটা বিশ্বাস আছে। অন্ততপে এইটুকু দৃঢ়বিশ্বাস আছে যে, আমি যা চাই তা পেতেও পারি অথবা না-ও পেতে পারি। কিন্তু যেই সিদ্ধান্তই মহান আল্লাহ তায়ালা দেন, সেটা আমার মঙ্গলের জন্যই দেবেন। আমার আজকের কলাম শেষ করতে চাই ছোট একটি প্রবাদবাক্যের ুদ্র ব্যাখ্যা দিয়ে।
প্রকাশিত সংবাদ থেকে, অপ্রকাশিতের সংখ্যা বেশি
কোনো একজন মহান ব্যক্তি কোনো এক অতীতে বলেছিলেন ইংরেজি ভাষায়Ñ ‘দেয়ার আর মোর নিউজ, দ্যান আর রিপোর্টেড ইন দি নিউজ পেপারস।’ একবিংশ শতাব্দীতে বললে হয়তো বলতেনÑ ‘দেয়ার আর মোর নিউজ, দ্যান আর রিপোর্টেড ইন দি নিউজ পেপারস অর ইন দি অনলাইন পোর্টালস অর ইন দি টেলিভিশন চ্যানেলস।’ আসলেই বারো-তেরোটা পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে, কুড়ি-বাইশটা চ্যানেলের মধ্যে অন্তত দু-চারটির সংবাদ শুনে এবং অনলাইনের সংবাদ ফেসবুকে দেখে তৃপ্তি মেটাতে পারি না। আমার কাণ্ডজ্ঞানই বলে, সব কথা বলা হয়নি তাই আমি সব কথা জানতে পারছি না। কথার ফাঁক থাকলে বিশ্বাসের ফাঁক থেকে যায়। বিশ্বাসের ফাঁক থাকলে সহযোগিতা পূর্ণ হয় না। সহযোগিতা না থাকলে সমস্যার সমাধান দুষ্কর। সমস্যার সমাধান না হলে আমরা অন্ধকারের দিকেই হাঁটব।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

No comments

Powered by Blogger.