ভারতের নতুন সরকার ও বাংলাদেশের রাজনীতি by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এক অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্য জয় পেয়েছে, যাকে বলে ভূমিধস বিজয়। এ জয় ভারতবর্ষের রাজনীতিতে সৃষ্টি করেছে ইতিহাস। নির্বাচনে কংগ্রেসের হয়েছে ভরাডুবি। আশ্চর্যের ব্যাপার হল- গুজরাট, রাজস্থান ও দিল্লিসহ বেশক’টি রাজ্যে কংগ্রেস কোনো আসনই পায়নি। বলতে কষ্ট হয়, বিশ্বের অবিসংবাদিত নেত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসকে আজ মনে হচ্ছে ভারতবর্ষের সবচেয়ে অসহায় একটি রাজনৈতিক দল। ভারতের জনগণ কংগ্রেসের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অকল্পনীয়ভাবে। কেন ভারতের জনগণ কংগ্রেসের কাছ থেকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং কংগ্রেসের নির্বাচনী বিপর্যয় ঘটল এর কারণ অনুসন্ধান জরুরি।

ভারতে নির্বাচনের এ ফলাফলে নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশের ঝিমিয়ে পড়া রাজনীতি। চলছে বিশ্লেষণ। কেউ বলছে, ভারতে সরকার পরিবর্তন বিএনপির রাজনীতির জন্য সহায়ক হবে- বেকায়দায় পড়বে ক্ষমতাসীন দল; আবার কেউ বলছে, সরকার পরিবর্তন হলেও ভারতের বিদেশ নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে না। এসব বিতর্কের মধ্যেই এখন বাংলাদেশের রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। ভারতের কংগ্রেস পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের আওয়ামী পরিবারের সখ্য সর্বজনবিদিত। কংগ্রেস ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ একটু বাড়তি সুবিধা যে পায়- এটি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, কংগ্রেসের এ ফলাফল ও বিজেপির ক্ষমতায় যাওয়া ক্ষমতাসীন দল তথা আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের দুঃসংবাদ। তবে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকে, কোনো শত্র“ থাকে না। রাজনীতিতে কোনো এক জায়গায় এসে চরম প্রতিপক্ষও মিত্রে পরিণত হয়। কার সঙ্গে কী সম্পর্ক হবে, সেটা দেখার জন্য আমাদের ধৈর্য সহকারে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
যদিও মোদি বলেছেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি দেশ পরিচালনা করবেন, তবে তার এ কথা কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে- এটি নিয়ে সন্দেহ আছে সর্বমহলে। কারণ মোদি নিজেই একজন উগ্র ধর্মান্ধ। তিনি আরএসএসের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংস ও হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগানোর সুস্পষ্ট অভিযোগ আছে। গুজরাটে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার অভিযোগে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগও করেছিলেন। ওই দাঙ্গায় কয়েক হাজার মুসলমান নিহত হয়েছিল, ধ্বংস হয়েছিল বিপুল সম্পদ। সাম্প্রদায়িক চরিত্রের জন্য মোদির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা প্রত্যাহার করা হয় গত ১৯ মে।
দৃশ্যত একজন ব্যক্তি আরোহীর আসন থেকে যখন চালকের আসনে চলে যান, তখন তার ভেতর দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয় প্রাকৃতিকভাবেই। আমরা প্রত্যাশা করি, নরেন্দ্র মোদির ভেতরও দায়িত্ববোধ তৈরি হোক। পথের দৃশ্য তার জন্য বদলে যাক, তার সংকীর্ণ মন বড় হোক, তার দৃষ্টি হোক প্রসারিত। ভারত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। একজন আঞ্চলিক নেতা হয়ে মোদি ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতি তার দৃষ্টি প্রসারিত করতে হবে বন্ধুর মতো। কারণ বাংলাদেশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। শত শত কোটি ডলারের পণ্য বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করে থাকে। তাতে চাঙ্গা থাকে ভারতের অর্থনীতি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে অমীমাংসিত। এর মধ্যে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ঘাটতি অন্যতম।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নানা বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের তিন দিক দিয়েই ভারতের অবস্থান। সেজন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সব নদীর উৎসই ভারতে। ভারত ৩৫টি আন্তঃসীমান্তীয় নদীতে ৫০টি বাঁধ নির্মাণ করেছে, যার ফলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নিকট প্রতিবেশী হিসেবে ভারত আমাদের সঙ্গে এমন বৈরী আচরণ করতে পারে না। আমরা ভারতের নতুন সরকারের কাছে সুবিচার চাই। আমরা আমাদের পানির ন্যায্য অধিকার চাই। আশা করি, ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
আমরা জানি, ভারতের সরকার পরিবর্তন হলেও নীতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। কারণ ভারতের নীতিনির্ধারণী যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, এরা অনেক পাকাপোক্ত। এ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের সরকারকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে থাকে। অতীতে আমরা তাই দেখেছি। এবার অন্তত বাংলাদেশের বেলায় যেন সেটি না ঘটে। কারণ মোদির নেতৃত্বে সরকারটি ভারতের ইতিহাসে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সরকার। এ সরকারের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নাতীত। ভারতীয় জনগণের সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে এ সরকারের পক্ষে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে মোদির সরকারকে কারও ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। কাজেই সদিচ্ছা থাকলে বাংলাদেশের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধান করা মোদির সরকারের জন্য হবে অত্যন্ত সহজ।
অন্য দেশের একটি শক্তিশালী সরকারের কাছ থেকে দ্বিপক্ষীয় সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে দরকার আরেকটি শক্তিশালী সরকারের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, বাংলাদেশে বর্তমানে সেটি নেই। বর্তমান সরকারের জনসমর্থন প্রশ্নবিদ্ধ। জনসমর্থনহীন ও নৈতিক ভিত্তিহীন একটি দুর্বল সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য বড় ধরনের দুর্বলতা। এ দুর্বলতা ভারতের স্বার্থের জন্য অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে- এমনটিই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা করতে দরকার একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকারের আর সেটি হতে পারে ভারতের মতো সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও পক্ষপাতহীন নির্বাচনের মাধ্যমে।
নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ঘাটতিসহ ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত কোনো বিষয়ই বর্তমান সরকারের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব হয়নি। উল্টো ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। বিনিময়ে দেয়নি কিছুই। তবে ভারতে নতুন সরকার এখন ক্ষমতায়। আশা করি, এ নতুন সরকার বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার মূল্য দেবে এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনসহ সব অমীমাংমিত বিষয় সমাধানে বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নেবে। অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের অধিকার। আর কাপুরুষোচিত মন নিয়ে অধিকার আদায় করা যায় না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আর সেটা যদি হয় পানির মতো অত্যাবশ্যকীয় কিছু, তাহলে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে থাকতে হবে প্রস্তুত।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
belayet-1@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.