কালান্তরের কড়চা-দুই বাংলার সাহিত্যিক সুনীল by আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

মনে হয় দুই বন্ধু জোড়া বেঁধেই একই বছরে চলে গেলেন। একজন বাংলাদেশের হুমায়ূন আহমেদ। আরেকজন পশ্চিমবঙ্গের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। মাত্র তিন মাস আগে (১৯ জুলাই) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে শোকবাণী দিয়েছেন।


তখন কি তিনি জানতেন, তিন মাস পরই তাঁর জন্য তাঁর অন্য বন্ধুরা শোকবাণী দেবেন! তাঁর এই মৃত্যুর খবরটা আমার কাছে আকস্মিক। তিনি অসুস্থ ছিলেন বটে, কিন্তু মৃত্যুর এত কাছে দাঁড়িয়ে আছেন, তা জানতাম না। ক্যান্সার আক্রান্ত হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু আকস্মিক ছিল না। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুসংবাদ আমার কাছে আকস্মিক। সিঙ্গাপুরে বসে খবরটা পেয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়নি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার বয়সী। হুমায়ূন আহমেদের চেয়ে বয়সে বড়। কিন্তু বয়সের ব্যবধান অতিক্রম করে তাঁরা গভীর বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আমি এখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে কার সঙ্গে তুলনা করব? আমি উপমা টেনে কোনো সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম বিচার করার ঘোর বিরোধী। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও তাই তাঁর নিজের অবস্থানে রেখেই বিচার করতে চাই।
সুনীল একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও শিশু সাহিত্যিক। তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবন কেটেছে আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত থেকে। তিনি 'নীল লোহিত' ছদ্মনামেও অনেক সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় ষাটের দশকের শেষদিকে। তখন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সৃষ্ট 'সাংস্কৃতিক বার্লিন ওয়াল' ভেদ করে দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির যোগাযোগ প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই যোগাযোগ ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন ঢাকার তরুণ কবিদের কাছে কবি হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। খুবই জনপ্রিয় কথাশিল্পী হিসেবে সমরেশ বসু, প্রফুল্ল রায় ও সেই সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। সুনীল তখন দাপটের সঙ্গে উপন্যাসের পর উপন্যাস লিখে চলেছেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি যখন কলকাতায় যাই এবং আনন্দবাজারের সঙ্গে সাংবাদিকতার সুবাদে জড়িত হই, তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ও সখ্য। কলকাতার সুতারকিন স্ট্রিট, বর্তমানে যা প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, সেখানে আনন্দবাজার অফিসে একটা ছোট ঘরে একসঙ্গে তিনজন বসতেন- গৌরকিশোর ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সম্ভবত শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তিনজনই আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ঘরেই ছিল আমার নিত্যদিনের আড্ডা। সুনীল আমাকে তাঁর গড়িয়াহাটার বাড়িতে দাওয়াত করতেন, আমিও যেতাম এবং তাঁর স্ত্রী স্বাতীর আত্মীয়ের মতো হয়ে উঠি। সুনীলের আরেকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আমাদের বেলাল চৌধুরী।
আমি দেশ পত্রিকার জন্য একটি কবিতা লিখেছিলাম। সেটি সুনীলকে দেখাই ও দেশ পত্রিকায় ছাপতে অনুরোধ করি। সুনীল কবিতাটি পড়ে বললেন, 'আমার খুব ভালো লেগেছে। এটি আমি দেশ পত্রিকায় ছাপব না, আমাদের কবিতা পত্রিকা কৃত্তিবাসে ছাপব।' তিনি সেটি কৃত্তিবাসে ছেপেছিলেন। তাঁর সঙ্গে সাহিত্যবিচারে আমার মাঝেমধ্যেই মতদ্বৈধতা হতো। তাঁর কবিতা আমার খুবই ভালো লাগত, তিনি সেরা কবিদের একজন, সন্দেহ নেই- কিন্তু প্রকাশ্যেই বলতাম, শামসুর রাহমান হচ্ছেন দুই বাংলার জীবিত কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাতে মাঝেমধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটু ক্ষুণ্ন হতেন। কিন্তু সুনীলকে কখনো ক্ষুণ্ন হতে দেখিনি। তাঁর বিশাল সাহিত্যের ভাণ্ডার, বিশেষ করে তাঁর উপন্যাস বৈচিত্র্যে ভরপুর। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিশাল উপন্যাস লিখেছেন 'পূর্ব-পশ্চিম'। তাতে আমাকেও একটি চরিত্র করেছেন। রবীন্দ্র-জীবন নিয়ে বিশাল উপন্যাস লিখেছেন, 'প্রথম আলো'। লালন ফকিরকে নিয়ে লিখেছেন 'মনের মানুষ', যা ছায়াছবিতেও বিরাট দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু তাঁকে আমি বলেছি, তাঁর সাহিত্যে যত ব্যাপকতা তত গভীরতা নেই। তিনি জীবনীভিত্তিক অনেক উপন্যাস লিখেছেন, কিন্তু সেই জীবনের গভীরতায় ঢুকতে পারেননি। রবীন্দ্র-জীবন নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাসও তাই আমার কাছে অগভীর মনে হয়েছে। মাত্র কয়েক বছর আগে তিনি 'রানু ও ভানু' নামে যে উপন্যাসটি লেখেন, তাতে রবীন্দ্রনাথকে হেয় করা হয়েছে বলে আমি মনে করি এবং সে কথা তাঁকে টেলিফোনে বলেছিও।
সুনীল বাংলাদেশের মানুষ ছিলেন। মাদারীপুরে তাঁর বাড়ি। দেশ ভাগের আগে তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানেই সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কিন্তু বাংলাদেশের মাটির টান তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি নিয়মিত ঢাকায় আসতেন। মাদারীপুরেও যেতেন। শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত, বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন আশাও পোষণ করতেন যে বাংলাদেশই হবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র।
আগেই বলেছি, তাঁর রচনার বিরাট ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও তাতে গভীরতা কম ছিল। তিনি নিজের দৃষ্টিতে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোও নিজের মনের মতো করে সৃষ্টি করতেন। চরিত্রটির আসল রূপ তাতে অনেক সময় ঢাকা পড়ে গেছে। আমার এই বিশ্লেষণটি অনেকের কাছে সত্য মনে না-ও হতে পারে।
সুনীল সাহিত্যিক হিসেবে ছিলেন ডানঘেঁষা। পঞ্চাশের গণসাহিত্যের প্লাবনের যুগে বুদ্ধদেব বসুর নেতৃত্বে যে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, সুনীল ছিলেন তার একজন তরুণ সদস্য। কিন্তু যেহেতু তিনি সিপিএমের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সুকান্তের ভাইপো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কবিবন্ধু ছিলেন, সেহেতু গত বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সরকারকে সমর্থন দিতে গিয়ে তিনি সমালোচিতও হয়েছেন। বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে কলকাতার শেরিফ মনোনীত করেছিল। এটা একটা বড় সম্মান। একসময় যে তসলিমা নাসরিনকে তিনি সমর্থন করেছেন, সম্প্রতি সেই তসলিমার দ্বারা তিনি সমালোচিতও হয়েছিলেন।
সুনীল সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন। লন্ডনে যখনই আসতেন, আমাকে খুঁজে বের করতেন ও নৈশ আড্ডায় বসতেন। লন্ডন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক- সর্বত্র তাঁর অসংখ্য বন্ধু আছেন। তাঁর একমাত্র ছেলেও এখন আমেরিকায়। আমি সিঙ্গাপুরে আসার কয়েক দিন আগে তাঁকে কলকাতায় ফোন করেছিলাম। তিনি বললেন, 'সিঙ্গাপুরে যখন যাচ্ছো, তখন কলকাতা হয়ে ফিরে যাও। আড্ডা দেওয়া যাবে। আমার শরীরটা ভালো নেই।' তখন বুঝতে পারিনি, লন্ডনে ফেরার পথে তাঁর সঙ্গে দেখা হবে না। তার আগেই তিনি চলে যাবেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্র বা সাহিত্য নিয়ে আমার এই লেখা নয়। সে বিচার করা যাবে মন থেকে এই আকস্মিক বিয়োগ-বেদনা দূর হলে। তিনি এক বাংলার সাহিত্যিক ছিলেন না, ছিলেন দুই বাংলার সাহিত্যিক। তাঁর মৃত্যুতে সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এই অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। হুমায়ূনের পর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর যে জোড়া আঘাত- দুই বাংলার বুকেই সে আঘাত দারুণভাবে লাগবে।

সিঙ্গাপুর, ২৪ অক্টোবর, ২০১২

No comments

Powered by Blogger.