প্রয়োজন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকায়ন by এ কে এম শাহনাওয়াজ

নতুন বছর এলে আমাদের মধ্যে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়। পাশাপাশি অনেক হতাশা এসে দুর্বল করে দেয় প্রত্যাশা পূরণের জায়গাটিকে। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক অঙ্গনের ভালো থাকা মন্দ থাকার ওপরই নির্ভর করে এ দেশের সব সম্ভাবনা ও প্রত্যাশিত অগ্রগতি। কিন্তু আমাদের বড় দুর্ভাগ্য, এ দেশের রাজনীতিকদের রাজনৈতিক আচরণ আটকে আছে গৎবাঁধা বলয়ের ভেতর। ক্ষমতাপ্রত্যাশী বড় দলগুলো গণতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে কখনও পথ চলে না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নয়- বাহুবলে ও নানা কৌশলে ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার অভিলাষ সব পক্ষের। এ বাস্তবতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলছে। সবল পক্ষ আরও সবল হতে প্রতিপক্ষকে ছলে-বলে-কৌশলে হীনবল করে দিচ্ছে। এতে যে গণতান্ত্রিক কাঠামো বিপন্ন হচ্ছে তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। অতি আত্মম্ভরিতা স্বয়ংক্রিয় নিয়মেই যে তাদের কক্ষপথ থেকে ছিটকে ফেলে দিচ্ছে, ধপাসধরণীতল না হওয়া পর্যন্ত সে বাস্তবতা তারা অনুধাবন করতে পারছেন না। সময়ের সুবিধায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষ নিজেদের ক্ষেত্রেও অভিন্ন ফর্মুলা আরোপ করে একা অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাধর হতে চায়। এভাবে আরেকবার বিপন্ন করে গণতন্ত্রকে। কেউ একটু বেশি ভুল করে, কেউ খানিকটা কম। এ ধারাতেই বিগত বছরগুলোতে চলেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে যেভাবে সরকারপক্ষকে সমালোচনা করত, বিএনপিও বিরোধী দলে এসে একই অভিযোগ করে। শব্দমালা প্রায় একই থাকে, শুধু পাত্রপাত্রী আলাদা হয়। সবসময়ই বিরোধী দলের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তাদের মতো গণতন্ত্রের প্রতি নিষ্ঠাবান আর কেউ নয়। সব নষ্টের গোড়া সরকারপক্ষ। সব সরকারই একইভাবে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে, আবার বিরোধী দলে এসে সব ভুলে যায়। বিরোধীদলীয় রীতিতে সমালোচনার ঝড় তোলে। কিন্তু দু’পক্ষ কখনও গণতন্ত্রের পক্ষে হাঁটার প্রত্যয়ে এক চিন্তায় আসে না- নিজেদের সংশোধন করে না। দেশবাসী প্রত্যাশা করেও বারবার প্রতারিত হয়, তবু অনন্যোপায় হয়ে করুণা প্রার্থী হয় রাজনীতিকদের কাছেই।
আমাদের আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে একটি দুর্ভাবনা রয়েছে। একুশ শতকে পৃথিবী অনেক আধুনিক হয়েছে। টেকনোলজির দিক থেকে অনেক বেশি উন্নতি করেছে, স্মার্ট হয়েছে। বাংলাদেশে ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে। দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে পা বাড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক মেধাবী বাঙালি আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন। কিন্তু এর সঙ্গে মিল রেখে তারা রাজনীতির ক্ষেত্রে আধুনিক ও স্মার্ট হতে পেরেছেন কি? ডিজিটাল বাংলাদেশে এখানটিতেই রয়ে গেছে পুরোপুরি এনালগ ধারা। সদ্যসমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচন থেকেই আমরা উদাহরণ নিতে পারি।
প্রথমবারের মতো এবার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার হল। এ সিদ্ধান্তটি হওয়ার পর বিরোধী দল ও পেশাজীবী সমালোচকরা প্রচণ্ডভাবে এর সমালোচনা করেছেন। এটি ছিল এনালগ পদ্ধতির সমালোচনা। পাঠক নিশ্চয় খেয়াল করবেন, বিগত দিনগুলোতে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এদেরই অনেকে সমালোচনা করে বলতেন, নির্বাচন তো আসলে দলীয় সমর্থনে এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণেই হয়, তাহলে প্রতীকে নয় কেন! আবার যখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হল, তখন সুর পাল্টে গেল। অর্থাৎ সমালোচনাটি করতেই হবে। আবার নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এই বিতর্কে ভাটা পড়তে লাগল। সরকারপক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করতে লাগল আর বিরোধীপক্ষ সম্ভাব্য কারচুপি নিয়ে অগ্রিম আশংকা প্রকাশ করতে থাকল। এসবে দেশবাসীর মনে নিশ্চয় কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। কারণ এমন ছকবাঁধা সমালোচনা শুনে তারা অভ্যস্ত। কোন সময় কী সমালোচনা হবে বা আশংকা প্রকাশ করা হবে বা সরকারপক্ষ কীভাবে জবানবন্দি দেবে, তা অগ্রিম বলার জন্য এখন আর জ্যোতিষীর প্রয়োজন হয় না। আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফ কীভাবে সাফাই গাইবেন বা বিএনপির নেতাদের সমালোচনা আর আশংকা প্রকাশের শব্দমালা কেমন হবে, তা আগেভাগেই কৌতুকপ্রিয় মানুষ বলতে পারে। শুধু এটুকু দেখার বাকি থাকে- আওয়ামী লীগ নেতাদের এক-একজন বলার জন্য কী কী বা কেমন ‘শব্দ’ বেছে নেন, বিএনপির নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম কতটা পরিমার্জিত ভঙ্গিতে কথা বলেন আর প্রতিদিনের সংবাদ সম্মেলনে রিজভী কতটা সাহিত্যমানসম্পন্ন শব্দ দিয়ে মালা গাঁথেন। বেলা শেষে সবকিছুর নির্যাস একেবারেই সাত পুরনো।
নির্বাচন ঘিরে অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। ভ্রান্ত পথে হাঁটতে গিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগকে অনেক যত্নে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। সময়ের সুবিধায় এবং কুশলী রাজনৈতিক মেধা প্রয়োগ করে এ সময়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান অনেক সুসংহত। পৌর নির্বাচনে হারলে যেহেতু সরকার পতন হয় না, তাই এ সময়ে আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল নির্বাচন নিয়ে বিগত সময়ের দুর্নাম ঘোচানোর চেষ্টা করা। এ কারণে বদনাম হয় তেমন আচরণ যাতে নির্বাচনী প্রচারণায়, নির্বাচন কেন্দ্রে না ঘটে, তার জন্য কেন্দ্রের সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত ছিল। মানছি স্থানীয় নির্বাচনে তেমনভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না। তবুও দলীয় এমপি থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারাটা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কিছুটা রাজনৈতিক ব্যর্থতা বলা বোধহয় অন্যায় হবে না।
আওয়ামী লীগ সরকার দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন কাজে সফল হয়েছে। অর্থনৈতিক কারণে মানুষ এখন অতটা বিপন্ন নয়। এখানে তুলনা করতে গেলে সাধারণ মানুষের বিচারে বিএনপি তেমন পয়েন্ট পাবে বলে মনে হয় না। এমন বাস্তবতায় নির্বাচনকে অনেক বেশি বিতর্কহীন করার চেষ্টা করা উচিত ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের। কিন্তু এ কাজে তারা খুব সফল হয়েছেন বলা যাবে না।
বিএনপির নেতারা তো রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেনই। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারা ৮০ ভাগ ভোট পাবেন- অন্যদের কথা বাদ দিই, বিএনপি নেতারাও কি তা বিশ্বাস করেন? সরকারি নিপীড়নের ভয়েই হোক বা যে কারণেই হোক, নিজ রাজনৈতিক ভুলের খেসারতে দেশজুড়ে চরম অগোছালো অবস্থায় আছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলের জন্য জীবনপাত করার মতো কর্মীর সংখ্যা কমে গেছে বলেই নেতাদের ডাকে মাঠে নামার মতো কর্মী পাওয়া যায় না। নিকট অতীতে বিএনপি আর সহযোগী জামায়াত এমন কোনো সুকীর্তি করেনি যে সাধারণ মানুষ ঘুরে দাঁড়াবে। অন্তত ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নেতা-নেত্রীদের যে মাঠে সক্রিয় থাকতে হয় তেমন চেষ্টাও আমরা দেখিনি। এমন অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তুলে এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে অমার্জিত কথা বলে বিএনপি অনেক ভোটারকেই বিরক্ত করে ফেলেছে।
অথচ তারা আবার সাত পুরনো দোষারোপের রাজনীতিই করে যাচ্ছেন অহর্নিশী। এবার বিএনপি আগেই বলেছে, তারা পৌর নির্বাচনে যাচ্ছে নিজেদের দলীয় অবস্থান বোঝা এবং নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার জন্য। তাই ৮০ ভাগ ভোট পাওয়ার সঙ্গে এ বাস্তবতার মিল করানো যাবে না। আত্মবিশ্বাসী নয় বলে নির্বাচনে না যাওয়া বা মাঝপথে নির্বাচন থেকে সরে আসার বদনামতিলক এরই মধ্যে বিএনপি কপালে ধারণ করেছে। এবার সমালোচনার মুখে বিএনপির নেতারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফল ঘোষণার আগে ভোট কেন্দ্র ত্যাগ না করার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ নির্দেশ কি পালিত হয়েছে? কেন্দ্রীয় নির্দেশ অমান্য করে কয়েকজন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মাঝপথে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন, পত্রপত্রিকার সূত্রে জানতে পেরেছি। সরকারদলীয়দের পীড়ন ছাড়াও অনেক জায়গায় ভোট কেন্দ্রে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। পোলিং এজেন্টরা ভোট কেন্দ্রে যাননি। এজেন্ট কার্ড সংগ্রহ করেননি। এসব বাস্তবতা দেখে নির্বাচনের দিনেই অনেকে মন্তব্য করছিলেন, বিএনপি সম্ভবত অভ্যাসমতো মাঝপথে নির্বাচন বর্জন করবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অবশ্য আশ্বস্ত করছিলেন, তারা নির্বাচনে থেকেই মোকাবেলা করবেন। বিএনপির এ আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আশাবাদী করেছিল।
তারপরও রাতে যখন জানা গেল খালেদা জিয়া দলীয় নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসেছেন, তখন আবার আশংকা দোলা দিল। হয়তো পরাজয়ের আশংকা মাথায় নিয়ে আবার তারা সেই গৎবাঁধা এনালগ রাজনীতির পথেই পা বাড়াবেন। শেষ পর্যন্ত হলও তাই। সকালে অনলাইন পত্রিকায় জানলাম, বিএনপি পৌর নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে। আমার মনে হয় না এ সিদ্ধান্তে দেশবাসী খুব অবাক হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তে দলের জন্য আরেকটি ক্ষতি হল বলেই আমাদের ধারণা।
বিএনপির মতে, দেড় শতাধিক পৌরসভায় সরকারি দল কেন্দ্র দখল করেছে। কোনো কোনো পত্রিকা বলেছে শতাধিক। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্যে এ সংখ্যা আরও কম। বিএনপি আর নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে যদি সন্দেহ থাকে, তবে শত বা শতাধিকে আমরা আপাতত স্থির থাকতে পারি। দেশে মোট পৌরসভা ২৩৪টি। তাহলে বাকিগুলোর অবস্থা কী? আমরা মনে করি, ফল প্রত্যাখ্যানের রাজনীতিতে না গিয়ে বিএনপির সেসব পৌরসভায় নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য এবং ভোটারের পরিসংখ্যানে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে কাজ করা উচিত ছিল। স্থানীয় নির্বাচনে সবসময়ই স্থানীয় প্রভাব বলয়ের ভূমিকা কাজ করে। এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই নির্বাচনের মাঠে কাজ করতে হয়। পত্রিকার পরিসংখ্যানে দেখা যাবে, সরকারি দলের আধিপত্য বিস্তারের তেমন অভিযোগ যেসব পৌরসভায় নেই, সেখানেও বিএনপির ভোট কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক নয়। ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি) ৫৫৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৯৮টি পর্যবেক্ষণ করে বলেছে ‘অনেক কেন্দ্রে অনিয়ম হলেও তা পুরো পৌরসভা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি।’ পর্যবেক্ষক দল ১২ ভাগ কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টের উপস্থিতি দেখেনি।
আমরা অনেক পৌরসভায় দেখেছি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে ধানের শীষ আর নৌকার মধ্যে। অনেক জায়গায় লড়াই করে বিএনপির প্রার্থী জিতে গেছেন। সেসব জায়গায় সরকারি শক্তি প্রয়োগ হলে এমনটি হতো না। আমরা মনে করি, নির্বাচন বর্জন না করে এসব নিয়ে পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা উচিত ছিল বিএনপি নেতৃত্বের। দলের বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থায় এ ফল প্রত্যাখ্যানে বিএনপির ১৯ নির্বাচিত মেয়র আর কাউন্সিলরদের ভাগ্যে কী ঘটবে! যে হতাশার দিকে স্থানীয় নেতাদের ঠেলে দেয়া হল, তাতে কি দলের জন্য মঙ্গল হবে?
এসব বাস্তবতা সামনে রেখে আমরা তাই আমাদের ভাগ্যবিধাতা রাজনীতিকদের কাছে নতুন বছরে প্রার্থনা রাখব, ক্ষমতা কেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছার জন্য গৎবাঁধা রাজনৈতিক পথহাঁটা পরিহার করে একটু আধুনিক-স্মার্ট রাজনীতির দিকে এগিয়ে যান। যেখানে সত্যিকার অর্থে পরিচর্যা করা হবে গণতন্ত্রের।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.