আদালতের সীমানা by মিজানুর রহমান খান

বিচারকদের সীমানা অতিক্রম করা নিয়ে বাদানুবাদ এখন একটি উপমহাদেশীয় প্রবণতা। পাকিস্তানের ডাকসাইটে প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীর বৈপ্লবিক সক্রিয়তা দেখানোর পরে পাকিস্তানে এই বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। তবে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষণীয় হলো, সেখানে তারা সীমানা বিতর্কে জড়িয়েও খেই হারিয়ে ফেলেনি।
সাবেক সচিব ও কলাম লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি আমাকে ভারতের একটি অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দিলেন। বললেন, সেখানেও বিচারকদের সীমানা অতিক্রম করা উচিত নয় বলে কথা উঠল। আর তখন দুটো শব্দ নজরে এল। একটি জুডিশিয়াল ওভাররিচ, অন্যটি এক্সিকিউটিভ আন্ডাররিচ। আসলে প্রথম কথাটি চয়ন করেছিলেন ভারতের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং৷ ২০০১ সালে প্রধান বিচারপতিেদর এক সম্মেলন হলো৷ সেখানে তিনি বললেন, ‘বিচারকেরা বড় বেশি দূর চলে যােচ্ছন৷’ প্রখ্যাত ভারতীয় আইনবিদ ফলি এস নরিম্যান তখন লিখলেন, কিছু জনস্বার্থ মামলায় আদালতের বদনাম হয়েছে বটে, তবে ‘বেশি দূর’ যাওয়ার সঙ্গে আমি দ্বিমত করি৷ নরিম্যান যুক্তি দিলেন ‘এক্সিকিউটিভ আন্ডাররিচ’, ‘জুডিশিয়াল ওভাররিচ’ ডেকে আনে৷ তবে আরেক ভারতীয় সমালোচক আরও উত্তম বলেছেন: ‘সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ আইন তৈরি এবং তা প্রয়োগে বড় বেশি ঘাপলা করছে৷ এরপর বিচার বিভাগ যখন বলতে শুরু করেন এটা কেরা, ওটা করো না৷ খেতের শস্যদানা এটা লাগাও, ওটা লাগিয়ো না৷ কোন প্রকল্প দেশের জন্য ভালো, কোনটা ভালো নয়৷ টুজি/থ্রিজি (ফোন) লাইসেন্স কেবল নিলাম করেই দিতে হবে! তখন বিচার বিভাগ ‘ওভাররিচের’ দায়ে অভিযুক্ত হয়!’

এই কথাটি মনে রাখলে নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নির্বাহী বিভাগের সক্রিয়তার বিরাট ঘাটতি বিস্মৃত হওয়া চলে না। সোমবার সশস্ত্র বাহিনীর একজন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা আমার সঙ্গে দেখা করে বললেন, তাঁর বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল। অথচ তাঁর বিচার করা হয়নি। তিনি তাঁর বিচার চান। তাঁকে চাকরিচ্যুত করার ওই আদেশটি দেখে নারায়ণগঞ্জের তিন সেনা কর্মকর্তা, যাঁদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে তাঁদের সরানোর প্রক্রিয়া মনে পড়ল। তাঁদের আদেশে অপরাধের বিবরণ বা কারণ নেই বলে জানি। এটি খুঁটিয়ে দেখলাম। এতে লেখা আছে...অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্ত পর্ষদের সুপারিশ অনুযায়ী কোর্ট মার্শালে বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রদান কিংবা প্রশাসনিক আদেশে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা সম্ভব হতো। কিন্তু কর্মকর্তার চাকরিকাল, বয়স, এবং সর্বোপরি তাঁর ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে কোর্ট মার্শালে বিচার কিংবা প্রশাসনিক আদেশে চাকরি থেকে বহিষ্কার না করে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়।’
সেনা আইনে যে কাউকে কোনো কারণ না দেখিয়ে বাধ্যতামূলক অবসরদানের ঔপনিবেশিক আইন বাংলাদেশ কঠোরভাবে আঁকড়ে আছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলো এ থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের দরজা খোলা হয়েছে। ভারতও তাকে অনুসরণ করছে৷ বাংলাদেশ বধির হয়ে আছে।
নারায়ণগঞ্জে ভূমিকম্পসম একটি ট্র্যাজেডি ঘটে যাওয়ার পরে সরকার অভিযুক্ত র্যাব ১১-এর অধিনায়কসহ তিন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল। ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কালে গণমাধ্যমে যে ধরনের খবরাখবর আসছে, তাতে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সন্দেহ-সংশয় ঘনীভূত হয়ে চলেছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগকে ইঙ্গিত করে ধারাবাহিকভাবে মন্তব্য করে চলেছেন। ওই তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়াটা হাইকোর্ট বিভাগের সমীচীন ছিল কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার সংবিধান রাষ্ট্রকে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, কী প্রক্রিয়ায় এই অধিকারের অনুশীলন করা হচ্ছে সেটা নিয়ে। মন্ত্রীদের বাক্স্বাধীনতা অনুশীলন ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার ধারণাকে শাণিত করছে না।
কোনো রাষ্ট্র যদি তার পাবলিক সার্ভেন্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু না করে তাঁকে চাকরি থেকে সুযোগ-সুবিধাসহ অকালে বাড়িতে ফেরত পাঠায়, তাহলে আইনের শাসনের মৌলিক শর্তের ব্যত্যয় ঘটে। আর এই ক্ষেত্রে দৃশ্যত সেটাই ঘটেছে।
গ্রেপ্তারের যে আদেশ হাইকোর্ট বেঞ্চ দিয়েছেন, তার যথার্থতা নিয়ে কথা বলার অধিকার নিশ্চয় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছেন যে র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে আদালত গ্রেপ্তারের নির্দেশ কেন দিলেন, এটা তাঁর বোধগম্য নয়। জজ সাহেবদের কাছে তথ্যপ্রমাণ চাওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বেঞ্চই এখন ব্যবস্থা নিক।’ কিন্তু সেটা তো আদালতের কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘তিন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে যখন সুষ্ঠুভাবে তদন্ত চলছিল, তখন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের এমন নির্দেশ সমস্যার সৃষ্টি করেছে।’ কী সমস্যার সৃষ্টি করেছে সেটার ব্যাখ্যা আমরা আশা করি। কারণ, আমরা বুঝতে পারি না। হয়তো হয়েছে। কিন্তু সেটা কী।
‘এ কথা বলায় আদালত অবমাননা হতে পারে’ বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আমরা তা মনে করি না। আমরা বরং মনে করি, এতে মানবতা ও জনতার অবমাননা ঘটে থাকতে পারে। প্রধানমন্ত্রী কেবল আইনি পয়েন্টে তাঁর সমালোচনা সীমিত রাখতে পারছেন না। তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করায় বিচারপ্রার্থী জনগণ, যাঁরা নারায়ণগঞ্জের বিয়োগান্ত ঘটনায় ব্যথিত ও বিহ্বল, তাঁরা বিস্মিত ও বিচলিত। কারণ, যেদিন তিনি সংবাদ সম্মেলনে ওই মন্তব্য করেন, সেদিনই খবর বেরোয়, সাত খুনের মামলায় রিমান্ডে থাকা র্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
সুতরাং তাঁরা আইনের টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে বাহাস করছেন এমন একটি প্রেক্ষাপটে, যখন জনগণের কাছে এটা ক্রমশ স্পষ্ট যে তিন সন্দেহভাজন সেনা কর্মকর্তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে নির্বাহী বিভাগ রাজি ছিলেন না। জনগণ এখন আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে চাইবেন যে আদালত যদি নির্দেশ না দিতেন, তাহলে তাঁদের গ্রেপ্তার আদৌ সম্ভব হতো কি না। সরকারি সমালোচনা গ্রহণযোগ্যতা পেত, যদি ইতিমধ্যে রিমান্ডে থাকা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে তাঁদের জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো তথ্য না বের হতো। তাঁদের নির্দোষ থাকার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেলে আদালতকে বরং লজ্জায় পড়তে হতো। কিন্তু সেটা তো ঘটেনি; বরং যখন মানুষের কাছে তাঁদের গ্রেপ্তারই সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, তখন খোদ প্রতিরক্ষা ও আইনমন্ত্রীর তরফে আদালতের প্রতি অনবরত অসন্তোষ প্রকাশ কাম্য নয়। এতে নির্বাহী বিভাগের অপরিণামদর্শিতাই ফুটে উঠছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক নীতিগতভাবে অযৌক্তিক বলেননি যে বিচারকদের এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে করে বিচারিক নৈরাজ্য তৈরি হয়। অবশ্য আদালতের কাছ থেকে যখন যে বিরোধী রাজনীতিক বা দল সুবিধা পান, তখন তাঁরা তাতে আদালতের স্বাধীনতা দেখেন। আর সরকার সুবিধা পেলে বলে, আইন আপন গতিতে চলে। আর না পেলে কী প্রতিক্রিয়া হয় সেটাই এখন দেখছি।
গত ২৫ এপ্রিল ভারতের বর্তমান প্রধান বিচারপতি পি. সত্যশিবমের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে দ্য হিন্দুতে। জুডিশিয়াল ওভাররিচ নিয়ে সমালোচনার উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা প্রতিটি মামলার তথ্যের ওপর নির্ভর করে। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ—এই তিনটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকেই তাদের সীমানা এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। আমি কিছুটা একমত যে কতিপয় ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল ওভাররিচ পরিহার করা উচিত হবে।’ নারায়ণগঞ্জ একটি ব্যতিক্রম, এটা পরিহার না করার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব আমরা দেখিনি৷ এ প্রসঙ্গে আমরা আইরিশ দার্শনিক এডমন্ড বার্কের উদ্ধৃতিটি বিবেচনায় নিতে পারি৷ ‘মধ্যরাতে অগ্নিকাণ্ডের ভয়ধ্বনি আপনাকে ঘুম ভাঙিয়ে বিরক্ত করতে পারে, কিন্তু তা আপনাকে রাতে পুড়ে মরা থেকে বাঁচিয়ে রাখে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কামিনী কুমার স্মারক বক্তৃতায় সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামাল বলেছিলেন, তিনটি স্তম্ভ নিজ নিজ সীমানায় থাকবে ঠিকই, তবে এমন কতগুলো অবস্থা আসবে যখন ‘ওভারল্যাপিং’ হবে। হাইকোর্টের ওই গ্রেপ্তার আদেশ নিয়ে আইনগত ভিন্নমত থাকতে পারে। যার যা কাজ তা-ই তার করা উচিত। আমরা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কারণ, ব্যতিক্রম বা অসাধারণ প্রতিকার মেনেও আসলে কোথায় যাচ্ছি তা জানি না। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা কী? ওই আদেশকে ‘ওভারল্যাপিং’ ধরলেও আজ যে তিন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তাতে আইনের শাসনই জয়ী হয়েছে। কারও মনে বিদ্বেষ বা অন্য কিছু হিসাব-নিকাশ না থাকলে, আইনের শাসনকে জয়ী হতে দিলে কারও অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়। নির্বাহী বিভাগের সম্ভবত উচিত হবে এই অসামান্য গ্রেপ্তার আদেশের যথার্থতা নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনায় অধিকতর সংযত ও সতর্ক হওয়া।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

1 comment:

  1. শেখ হাসিনার পাচায় দুইডা লাত্তি মারি

    ReplyDelete

Powered by Blogger.