যারা লাশ আনতে যায়, সকালে বা সন্ধ্যায়

কোথাও যুদ্ধ হয়, বেশুমার মানুষ মরে। আমরা তার খবর পড়ি আর ভুলে যাই। বাড়ির পাশে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়, পরদিন খবরের কাগজ থেকে জানা যায়, আরও একটি লাশ পড়েছে। যুদ্ধে যে মারে তার জবাবদিহি হয় না। যাদের মারা যায়, তারাও জানে এসব হত্যার বিচার হবে না; হয় না কদাচিৎ। নিহত স্বজনের লাশ পাওয়ার আর আদরযত্নে আর শোকে তাকে দাফন করার সুযোগও থাকে না যুদ্ধের দিনে। যুদ্ধ থামলে হয়তো সুযোগ পেলে তারা স্বজনের শেষনিঃশ্বাস ছাড়ার জায়গাটা দেখে আসে। পারলে গণকবর খুঁজে বের করে ফুল দেয়। তারপর আবার ফিরে আসে যার যার জীবনে। জীবন এমন এক কঠিন কারাগার, যেখানে ফিরতেই হয়। বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুও এক নাছোড় দানব, যার লাশের ক্ষুধা মেটাতে হয় প্রতিদিন। এখানে এখন গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ মারা যাচ্ছে ‘যুদ্ধে’। যুদ্ধই বলছি, কারণ সরকারি বাহিনীগুলো এসব হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধের পরিভাষা দিয়েই চিনিয়েছে: ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি। কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’। এখন আমাদের খবরের কাগজের শিরোনাম হয় ‘প্রতিদিন গড়ে একটি হত্যা’। খুন করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার ‘ঐতিহ্য’ আছে বাংলাদেশে।
প্রায়ই নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে খুন করে লাশ ডোবানোর ঘটনা সংবাদে আসে। লঞ্চডুবির পরও অজস্র লাশ ভাসে। একাত্তর সালে, পাকিস্তানি বাহিনী নদীর ধারে সারবেঁধে বাঙালিদের দাঁড় করিয়ে গুলি করত। দেহগুলো নদীতে পড়ে ভাসতে ভাসতে কাক-শকুন আর মাছের খোরাক হতো। পুরাকালে সাপে কাটা কিংবা বেওয়ারিশ লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার রীতিও ছিল। এখনকার রীতি হলো বন্দুকযুদ্ধ। সবাই জানে এসব আসলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এত মৃত্যুর জন্য পেশাদার বাহিনী লাগে, প্রয়োজন হয় ‘ডেথ স্কোয়াডের’। আমাদেরই চারপাশে তারা থাকে, খায়, ঘুমায়, আনন্দ করে, টহল দেয়। তারপর তালিকা ধরে ধরে মধ্যরাত থেকে ভোরের কোনো সময়ে নদীর বাঁধ বা খেতের কিনারে নিয়ে শিকারকে হত্যা করে। এ রকম করে প্রতিদিন একটি রুমাল এখন কার প্রয়োজন? এই মৃত্যুর চানমারি শুরু হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সহিংস প্রতিরোধের মাধ্যমে। যে সহিংসতা তারা শুরু করেছিল, আজ তা-ই বহুগুণে বড় হয়ে হয়ে তাদের বিনাশ করছে। সেই ককটেল, পেট্রলবোমা—যার শুদ্ধ নাম মলোটভ ককটেল খুবই গরিব-দরদি। বেছে বেছে মেহনতি মানুষকেই তারা হত্যা করত। সেটা এমন সময়, যখন সরকারি দলের সমর্থকদেরও কেউ কেউ বোমা-বারুদসহ জনতার হাতে ধৃত হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের লোকেরা তো আগুন নিয়ে খেলছিলই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর হঠাৎ সেই সব বোমাবাজ গায়েব হয়ে গেল। কোথায় গেল?
এখন কেন আর তাদের প্রয়োজন হচ্ছে না? এসব ককটেল আর পেট্রলবোমা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সাধারণ মানুষের, দ্বিতীয় ক্ষতিগ্রস্ত বিরোধীদের ভাবমূর্তি। এর জন্য তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে। অন্যদিকে হিসাব করলে বোঝা যায়, লাভবান হয়েছে ‘সরকার’। সেই লাভ এমনই লাভ যে নির্বাচন, গণতন্ত্র, জনপ্রতিনিধিত্ব—সবকিছুই ওই ‘পেট্রলবোমার’ ভয়ে উবে গেল, তেমন কোনো আহাজারিও করল না কেউ। আগুন দিয়ে চলন্ত বাস-গাড়ি-ট্রাকে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংসতা কি একাত্তরের পরে দেখেছে বাংলাদেশ? হ্যাঁ, কি স্বৈরশাসক, কি নির্বাচিত শাসক—সব আমলেই গুলি চলেছে। কিন্তু মানুষ হত্যার এমন উৎসব আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৩ সালে এ রকম রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জন নিহত হন। এখন শোনা যাচ্ছে, জামায়াতি সন্ত্রাসীদেরই নাকি খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন নেতা-নেত্রী পরোক্ষভাবে এসব হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করে বক্তব্য দিয়েছেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমরা যাঁরা পকেটমারকে পিটিয়ে মেরে ফেলে উচিত শিক্ষা দিই, তাঁদের অনেকেই এ রকম আইনবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন করছেন। এই সমর্থনের শুরু হয়েছিল বিএনপি আমলের অপারেশন ক্লিন হার্টের সময়। তারপর এল ক্রসফায়ার। অনেকেই এটাকেই সন্ত্রাস দমনের ধন্বন্তরি পথ বলে বাহবা দিলেন। কিন্তু তাতে কি জনগণের নিরাপত্তাহীনতা কমেছে?
রাজনীতি থেকে সহিংসতা দূর হয়েছে? নাকি তা আরও বহুগুণে বেড়েছে। এখন আর বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস হয় না। এখন হয় বেআইনি ও আইনি বাহিনীর সংঘবদ্ধ হত্যাযজ্ঞ। পৌরাণিক কাহিনিতে পরশুরাম পাপের বিনাশে কুঠার হাতে নিজের বংশকেই নাশ করেছিলেন। নদীর তীর ধরে তিনি হত্যা করতে করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পরিণামে সেই কুঠার তাঁর হাতের অংশ হয়ে যায়, কোনোভাবেই তাকে ছাড়ানো যায় না। অবশেষে করতোয়া নদীর জলে হাত ধুলে সেই ঘাতক কুঠার খসে। রাষ্ট্রের হাতে যাঁরা পরশুরামের কুঠার তুলে দিয়েছেন, আশা করছেন প্রতিপক্ষ বিনাশেই সেটা শেষ হবে, তাঁরা ভুল করছেন। র‌্যাবের জন্ম দিয়েছিল বিএনপি, অথচ আজ তারাই এই বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে সোচ্চার। যে আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ার বন্ধের কথা বলেছিল, আজ তারাই হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ প্রবর্তক। হত্যা আরও হত্যা ডেকে আনে; এই সত্য তারা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এমন বিস্মরণ হবে আত্মঘাতী। যারা পেট্রলবোমায় মানুষ মেরেছে, তাদের বিচার করতে অসুবিধা কোথায়?
এত মৃত্যু যাদের হাতে ঘটেছে, তাদের নিশ্চয়ই একটা পরিকল্পনা ছিল, উদ্দেশ্য ছিল, সহায়-সরঞ্জাম ও তহবিল ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, তাদের ছিল ‘নিয়োগদাতা, হুকুমদাতা’। আটক করে বিচার করলে তাদের মুখ থেকে সম্পূর্ণ সত্যটা মানুষ জানতে পারত। যে রাজনীতি এ রকম হত্যার আয়োজন চালায়, তাদের মুখোশ খসে পড়ত। কিন্তু সরকার সেই জরুরি কাজটা কেন করছে না? সত্য উন্মোচনে তাদের কিসের ভয়? এ ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শেষাবধি রাজনীতিকেই হত্যা করে। হত্যা করে আইন, যুক্তি ও ন্যায়কে। সত্য নেই, রয়েছে গুজব। ভূতের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি করে না আধুনিক কোনো সরকার; কিন্তু জগতে এমন সরকার কম যে গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই করে না। এ যেন হাওয়ায় তরবারি চালিয়ে গুজবের আগামাথা তরমুজের মতো ফালাফালা করার কারবার। যখন সত্য বিতর্কিত বা জানার অতীত, তেমন সময়ই গুজবের বসন্ত। সময়ের জ্বলন্ত প্রশ্নগুলোয় যে-ই হাত দিচ্ছে, তার হাতই পুড়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রেসনোটের মধ্যিখানে ফোকর ধরা পড়লে জানবেন, সত্যটা ওই পথেই পগারপার। এমন দিনেই তারে বলা যায়: মতিঝিলে নাকি...রানা প্লাজার রেশমা নাকি...বিএনপি নাকি..., বন্দুকযুদ্ধ নাকি... ইত্যাদি। গুজবে উত্তর থাকে না, থাকে সময়ের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও জরুরি প্রশ্ন। সবলের বিরুদ্ধে গুজব দুর্বলের অস্ত্র। যখন সত্যের কারবারিরা জনমনের আস্থা হারায়, তখন ‘নাকি’ শব্দটা আমাদের বাক্যের মধ্যে খিল গেড়ে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াকে প্রশ্ন করে, ‘তোমরা নাকি...’।
আমাদের কালের দুর্ধর্ষ গুজব রাশি সেসব প্রশ্নেরই উত্তর প্রস্তাব করে, একচক্ষু সরকার যার ওপর ধামা হয়ে চেপে বসেছে; যার উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে, প্রতিদিন একটি বা ততোধিক হত্যা নিয়েও গুজব ডানা মেলা শুরু করেছে। তাহলেও সরকার নড়বে না চড়বে না। সাগর-রুনির মতো ব্যাখ্যাতীত অনেক মৃত্যুর প্রতিকারে ব্যাখ্যাতীত দায়িত্বহীনতা দেখিয়েই যাবে। কেবল নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো মায়ের মতো অসীম মমতায় অপঘাতে নিহত সন্তানদের লাশ বুকে নিয়ে বইতে থাকবে। বইতেই থাকবে। যারা বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার বা পেট্রলবোমায় নিহতদের লাশ আনতে যায়, সকালে বা সন্ধ্যায়, তাদের বোবা প্রতিবাদের ভাষা পড়ার ক্ষমতা জাতি হিসেবেই হয়তো আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তুর্কি চলচ্চিত্রকার ইলমাজ গুনের ছবি ইওল। ছবির একটি দৃশ্যে কুর্দিস্তানের বিদ্রোহীদের লাশ নিয়ে আসতে দেখা যায় সেনাদের। তাদের ট্রাকের পেছনটায় সার সার লাশ। ট্রাকটা একের পর এক কুর্দি গ্রামে ঢোকে, আর গ্রামবাসীদের বলা হয় লাশ শনাক্ত করতে। তারা বাধ্য হয় সারবেঁধে নির্বিকার মুখে একে একে লাশগুলো দেখে যেতে। একটি লাশের সামনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াতে দেখা যায় এক বাবাকে। সেনারা এগিয়ে আসে, চোখে প্রশ্ন: আপনার? লোকটি নীরবে মাথা নাড়িয়ে সরে যায়। নিজের ছেলের লাশ শনাক্ত করাও যে বিপদ! বাংলাদেশে আমরা ধন্য, আমাদের বাবাদের নিহত ছেলের লাশ শনাক্ত করার সুযোগ আছে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.