অবরোধবাসিনী

অবরোধবাসিনী
অবরোধ প্রথা আর সেভাবে নেই, যেভাবে বেগম রোকেয়া অবলোকন করেছিলেন শতাধিক বছর আগে এ দেশে। তখনকার দিনে পরিবার-সমাজ অবরোধ আরোপ করত, এখন রাজনীতি। এখনকার নারীরা অর্ধশতক আগের নারীদের অপেক্ষায় বেশি অবগুণ্ঠিত হলেও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে আর অবরোধবাসিনী হয়ে থাকছেন না বা থাকতে পারছেন না। রাজনীতি অবরোধ আরোপ করলেও নারীদের কাজে বের হতে হচ্ছে।
লাখ লাখ নারী তাঁদের পোশাক তৈরির কারখানায় সব অবরোধ উপেক্ষা করে সকালে বের হচ্ছেন, কাজ শেষে সন্ধ্যার পর ফিরছেন। দিনমজুর বা অন্যান্য চাকরিজীবী নারীকেও জীবনের মায়া ত্যাগ করে বোমা, ককটেল, গুলি, আগুন, ইট, লাঠির আক্রমণ থেকে গা বাঁচিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অফিস-আদালত কোনো অজুহাত শুনতে নারাজ। এমনকি রাস্তায় বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে অফিস শুরুর সময়ের কিছুক্ষণ পরে হাজির হলেও হাজিরা খাতায় লাল দাগ পড়ে। আর না যেতে পারলে তো চাকরি নিয়ে টানাটানি। কর্মক্ষেত্রে যাঁরা অফিসের গাড়িতে আসা-যাওয়ার সুবিধা পান, হরতাল-অবরোধে কর্তৃপক্ষ গাড়ি বের করতে দেন না। অগত্যা বাস না হয় রিকশা বা অটোরিকশা। কিছুই পাওয়া না গেলে পদব্রজে। অবরোধ আরোপকারীরা বলেন, শতভাগ অবরোধ পালিত হচ্ছে আর ক্ষমতাসীনেরা একদিকে বলেন কেউ অবরোধ মানছে না, অপরদিকে এক অবরোধ বা হরতালে দেশের আর্থিক ক্ষতি কয়েক হাজার কোটি টাকা বলে দোষারোপ করছেন। তাহলে সত্যিকার অবরোধবাসিনী বোধ হয় গৃহব্যবস্থাপক নারীরা? সে গুড়েও বালু। যাঁরা ঘরে থাকেন, তাঁদের দায়িত্ব একটুও কম নয়।
তাঁরা বাজারঘাট করেন, সন্তানদের কোচিংয়ে আনা-নেওয়া করেন, অসুস্থদের ডাক্তার-বদ্যি দেখান। কিন্তু কোথায় নিরাপত্তা? মা রিকশায় করে মেয়েকে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন, ধাঁ করে ইট এসে মেয়ের মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে। নারী যাচ্ছেন সন্তানকে নিয়ে বাসে চেপে পৌঁছে দিতে গন্তব্যে, পেট্রলবোমা মেরে মা-মেয়েকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। হায় রোকেয়া! তোমার অবরোধবাসিনীরা আজ অনবরোধবাসিনী হয়েও অবরোধের আগুনে পুড়ে মরছেন। বরং অবরোধ আহ্বানকারীরাই এখন স্বেচ্ছা-অবরোধবাসিনী। অবরোধের ডাক দিয়ে উঁচু দেয়ালঘেরা বাড়িতে নিরাপত্তাপ্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে অন্দরমহলে অবস্থান করছেন। আর যাঁদের আছে অঢেল ধনসম্পদ, তাঁরা এ অবরোধকে রীতিমতো উপভোগ করছেন। অবরোধ-হরতাল আসছে জানতে পেরেই তাঁরা মজুতদারদের মতো আগেভাগেই প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী নিজেদের ভাঁড়ারে জমা করে রাখছেন। অবরোধের প্রতিদিন তাদের টেবিলভরা খাবার, নরম বিছানা, দেয়ালে বিনোদনের চলচ্চিত্র। মনে পড়ে, একবার ভয়ংকর বন্যায় দরিদ্র মানুষেরা অপরিসীম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছিলেন আর ধনীর পোলারা সে প্লাবনের পানিতে নৌবিহারে বের হয়ে অকূলপাথার উপভোগে মেতে উঠেছিল। গোপালের সেই আলুপোড়া খাওয়ার গল্পের মতো। দিনমজুর নারীরা প্রত্যহ কাজের আশায় এসে বসে থাকছেন। মালিকেরা সাহস করছেন না দিনের কাজ শুরু করার। বসে থেকে থেকে সন্ধ্যায় খালি হাতে ফিরছেন অভুক্ত সন্তানদের কাছে। কেউ ফিরছেন আগুনে দগ্ধ হয়ে, কেউ বা একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী-ভাই-সন্তানের লাশ নিয়ে আহাজারিতে অবরোধের বাতাস ভারী করে তুলছেন।
কেউ অবরোধ শেষ হওয়ার দিন গুনছেন, অবরোধ শেষ হলে কাজ পাবেন, ঘরে ফিরবেন চাল-ডাল-আনাজের ব্যাগ নিয়ে। বেগম রোকেয়ার সুলতানা নারীস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ দেশ নারীস্থান না হলেও নারীর অঙ্গুলি হেলনেই দেশ চলছে, থেমে আছে, উত্তাল হচ্ছে। অবরোধের প্রতিদিন গড়ে ছয়জন করে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। অথচ সুলতানারূপী বেগম রোকেয়া নারীশাসিত যে দেশ কল্পনা করেছিলেন, সেখানে তিনি ব্যক্ত করেছিলেন ‘আমাদের ধর্ম প্রেম ও সত্য। আমরা পরস্পরকে ভালবাসিতে ধর্মত: বাধ্য এবং প্রাণান্তেও সত্য ত্যাগ করিতে পারি না।...আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টিজগতের জীবহত্যায়—বিশেষত মানবহত্যায় আমোদ বোধ করি না। কাহারও প্রাণনাশ করিতে অপর প্রাণীর কী অধিকার?’ সুলতানার স্বপ্নের বেশ খানিকটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি—সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে অবরোধবাসিনী হয়েও অবরোধ মানতে না পারার দোটানায় জীবন দোদুল্যমান। অবরোধ মানলে কাজ থেকে ছাঁটাই, না মানলে আগুন দিয়ে পোড়ানো। রোকেয়া তাই বলতে বাধ্য হয়েছিলেন— ‘এ তো ভারী বিপদ না ধরিলে রাজা বধে, —ধরিলে ভুজঙ্গ’।
উম্মে মুসলিমা: সাহিত্যিক।

No comments

Powered by Blogger.