চোরের দশ দিন, সাধুর একদিন by শামীমুল হক

গ্রামের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে এক লোক মানুষের হাত দেখেন। এই বাড়ি ওই বাড়ি গিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে বউ-ঝিদের কাবু করার চেষ্টা করেন। কারও হাত দেখে বলেন, ইস মাগো তোমার কপালটাই খারাপ।
বাবার বাড়িতে সুখে থাকলেও স্বামীর বাড়িতে বড় কষ্টে আছো। কাউকে বলেন, তোমার হাতের রেখা বলে দিচ্ছে একদিন তুমি বিল্ডিং বাড়ির মালিক হবে। সত্যি সত্যি তাদের জীবনের সঙ্গে গণকের কথা মিলে যায়। আসলে সব মেয়েই বাবার বাড়িতে সুখে থাকে। সেই বাবা কোটিপতি হোক আর ভিক্ষুক হোক। তিনি তার মেয়েকে সাধ্যমতো আদর করেন, স্নেহ করেন। বাজারে গেলে এটা ওটা এনে মেয়ের হাতে তুলে দেন। আর সব মেয়েই স্বামীর বাড়িতে যতই সুখে থাকুক না কেন কি যেন এক কষ্ট অনুভব করেন। গণক ওইসব জেনেই বলেছেন, বাবার বাড়িতে সুখে থাকলেও স্বামীর বাড়িতে বড় কষ্টে আছো। আর সবাই চায় জীবনে উন্নতি করতে। বাড়ি ঘর সুন্দর করে সাজাতে। খড়ের ঘর থেকে বিল্ডিং বাড়ি করতে। এ  মনের কথাগুলোই গণক হাত দেখে বলে দেন। একদিন এক বাড়িতে গিয়ে এভাবেই এক মহিলার হাত দেখছিলেন গণক। আর ঘর থেকে এক ভদ্রলোক তা দেখছিলেন। অনেকক্ষণ দেখার পর লোকটি ঘর থেকে বেরুলেন। তাকে সামনে পেয়ে গণক বললেন, বাবা হাত দেখাবেন? ভদ্রলোক বললেন, এখন তো অফিসে যাচ্ছি, কাল শুক্রবার। অফিস বন্ধ। কাল আসবেন। আমি হাত দেখাবো। পরদিন সকাল সকাল গণক ওই বাড়িতে গিয়ে হাজির। কারণ, হাত দেখতে পারলেই টাকা। গেইটের ভেতর গিয়ে ওই ভদ্রলোককে ডাকলেন। ভদ্রলোক তখন নাস্তা করছিলেন। ডাকাডাকিতে তিনি খবর দিলেন একটু বসতে। নাস্তা সেরেই তিনি আসবেন। প্রায় ১৫ মিনিট পর তিনি ঘর থেকে বের হলেন। গণক হাত দেখবে। আরও দু’-চারজন এগিয়ে এলেন। ভদ্রলোক গণকের সামনে গিয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই গণকের দুই গালে বসিয়ে দিলেন জোরে থাপ্পড়। আর মুখে বললেন, এত মানুষের হাত দেখো- আর নিজেরটা বুঝতে পারোনি। কাল যখন হাত দেখার কথা বলেছিলে তখনই আমি নিয়ত করেছি আজ তোমার গালে থাপ্পড় দেবো। সবাই তো অবাক। আসলে কথায় বলে না চোরের দশ দিন সাওদের একদিন। সহকর্মী ছানাউল্লাহ্‌ নূরী বাসের একটি ঘটনা বললেন- তিনি নিজে ওই বাসের যাত্রী ছিলেন। এ ঘটনায় বুঝা যায় মানুষ কত ক্ষুব্ধ। নূরীর জবানীতে ঘটনার বর্ণনা- পরশু দিনের ঘটনা। মতিঝিল থেকে নিউ ভিশন বাসে চড়ে ফার্মগেট যাচ্ছিলাম। বাসটি মতিঝিলেই সিটিং হয়ে যায়। ফলে হেলপার দরজা বন্ধ করে দেয়। বাসের যাত্রী হিসেবে একজন ড্রেসপরা পুলিশ সদস্যও ছিলেন। বাসটি দৈনিক বাংলায় এসে যানজটে পরে। এ সময় এক লোক বাসের দরজা ধাক্কাচ্ছেন। হেলপারকে বলছেন দরজা খুলতে। হেলপার তাকে জানালেন, বাসে সিট নেই। তখন ওই লোক তার পরিচয় দেন এভাবে- ওই ব্যাটা দরজা খোল। আমি পুলিশের লোক। তখন হেলপার তাকে ফের জানান, আমার বাসে একজন ড্রেসপরা পুলিশ আছেন। দু’জন আমি নিতে পারবো না। কারণ, হেলপার জানেন পুলিশ গাড়িতে চড়লে ভাড়া লাগে না। অর্থাৎ তারা ভাড়া দেন না। হেলপারের কথা শুনে সিভিল ড্রেসের পুলিশ রেগে যান। বাসের দরজার উপরের দিকে গ্লাস নেই। তিনি ওই ফাঁকা জায়গা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে হেলপারের গেঞ্জি ধরে টান দেন। সঙ্গে সঙ্গে হেলপারের গেঞ্জি ছিঁড়ে যায়। এ সময় বাসের সব যাত্রী হেলপারকে বলে তাকে গাড়িতে ওঠাতে। হেলপার দরজা খুলে তাকে ওঠায়। আর যায় কোথায়? সকল যাত্রী একসঙ্গে তাকে নানা বিদ্রূপ করতে থাকে। অনেকে বিশ্রী সব গাল দিতে থাকে। এসব কথা শুনে ড্রেসপরা পুলিশ সদস্য সেখানেই নেমে যান। তার জায়গায় গিয়ে বসেন সিভিল ড্রেসের পুলিশ। ততক্ষণে যানজট ছেড়ে দিয়েছে। গাড়ি চলতে থাকে। গাড়িটি মৎস্য ভবনের সামনে গেলে ড্রেসপরা পুলিশ হেলপারকে ডেকে বলেন, আমি দুঃখিত, তোমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করায়। তুমি মনে কিছু করো না। এ সময় হেলপার বলে, আপনার বাড়ি কোথায়? সিভিল ড্রেসের পুলিশ একটি বিশেষ জেলার নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির সব যাত্রী একসঙ্গে আবার কথামালা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন তার ওপর। এরই মধ্যে বাসটি শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সামনে চলে আসে। সেখানে সিগন্যালে আটকা পরে বাসটি। পুলিশ সদস্য দ্রুত নামার উদ্যোগ নিলে দুই ক্ষুব্ধ যাত্রী তাকে টেনে ধরেন। এবার তারা বলেন, তোর শার্ট খোল। পুলিশ সদস্য একটু উত্তেজিত হলে আরও দু’যাত্রী এগিয়ে গিয়ে তার শার্ট খুলে ফেলেন। বলেন, হেলপারের গেঞ্জি ছিঁড়েছিস, তাকে শার্ট দিয়ে দিলাম। খালি গায়ে পুলিশ সদস্য গাড়ি থেকে নামার সময় সব যাত্রী একসঙ্গে চিৎকার দিয়ে বলে, ধর ধর। আর যায় কোথায়! পুলিশ সদস্য দেয় দৌড়। এ দৃশ্য দেখে বাসের এক বৃদ্ধ যাত্রী বললেন- ‘চোরের দশ দিন, সাধুর একদিন’। মানুষ যে কত ক্ষুব্ধ এই একটি উদাহরণই যথেষ্ট। গণকের মতো ওই পুলিশ সদস্যও ধরা খেলো জনতার হাতে।

samim.mzamin@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.