গার্মেন্ট মালিকরা, শ্রমিকের কান্না কি শুনিতে পাও? by পীর হাবিবুর রহমান

ভাগ্যের চাকা ঘোরে গার্মেন্ট মালিকদের। পোশাকশিল্পের বিকাশ তাদের জন্য সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দেয়।
আলাদীনের চেরাগের মতো পোশাকশিল্পের বরাতে বিত্তবৈভব আর বিলাসী জীবন তাদের হাতের মুঠোয়।

বিদেশে বাড়ি-গাড়ি, সন্তানদের লেখাপড়া, নিয়মিত চেকআপ ও অবকাশ যাপন কোনো কিছুই বন্ধ হয় না। কিন্তু ভাগ্য খোলে না শুধু পোশাকশ্রমিকদের। সর্বশেষ পোশাকশ্রমিকরা চরম অসন্তোষ নিয়ে ফের রাস্তায় নেমেছে। আহামরি দাবিও নয়। নূন্যতম মজুরি মাসিক ৮ হাজার টাকার দাবিতে তাদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার মালিক ও শ্রমিক সংগঠন নিয়ে বৈঠক করলেও শ্রমিকদের জন্য সুসংবাদ নেই।

এ ঘটনার প্রায় দুই বছর আগে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে পোশাকশ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা করা হয়েছিল। সরকারের মধ্যস্থতায় সেদিন এমনটি হয়েছে। তবুও গার্মেন্ট মালিকরা যেন খুশি হতে পারেননি। এবার তারা বলছেন, শ্রমিকের এই দাবি মানলে তাদের ব্যবসায় নাকি লালবাতি জ্বলবে। গার্মেন্ট বন্ধ করে দিতে হবে। বিনা পারিশ্রমিকে পোশাকশ্রমিকদের খাটাতে পারলেই যেন গার্মেন্ট মালিকরা খুশি। তাই বলে সবাই নন।

অনেক গার্মেন্টর শ্রমিকরা অসন্তোষের আগুনে পুড়ে রাজপথ উত্তাল করেন না। সেই গার্মেন্টের মালিকরা মানবিক বলেই শ্রমিকদের সন্তুষ্ট রাখতে পারেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকরাই তাদের সুপারভাইজারসহ লোকবল দিয়ে শ্রমিকের কণ্ঠ রোধ করে হাড়ভাঙা খাটুনি আদায় করে মুনাফা লোটেন। তাদের হৃদয়ে আধপেটা পোশাকশ্রমিকের বুকভরা কান্না স্পর্শ করে না। একজন শ্রমিক নূন্যতম মজুরি ৩ হাজার টাকা নিয়ে এক বেলা পেট পুরে খেতে পারে কি না, ঘরভাড়া দিয়ে, চিকিৎসাসেবা নিয়ে বেঁচে থাকার নূ্যনতম চেষ্টা করতে পারে কি না, তাও ভাবেন না। ভাবখানা এমন তাদের যদি প্রশ্ন করা হয়- পোশাকশ্রমিকের কান্না শুনিতে কি পাও?

উত্তরে তারা নির্বিকার। জীবনের যত ভোগবিলাস, আরাম-আয়েশ যেন সব হবে মালিকের। আর খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার নিদারুণ দুঃখ, কষ্ট ও অমানবিক জীবনের গ্লানি দিনের পর দিন টানতে থাকবে শ্রমিকরা।

একজন নির্মাণশ্রমিকের মজুরি যেখানে ৯ হাজার ৮৮২ টাকা, ট্যানারিশ্রমিকের ৯ হাজার ৩০০ টাকা, চাতালশ্রমিকের ৭ হাজার ১৪০ টাকা এমনকি গৃহকর্মীর বেতনের চেয়েও কত কম মাত্র ৩ হাজার টাকা মজুরি নিয়ে বুকের দহন বুকে চেপে অসহায়ের মতো ঘরে ফিরতে হয় পোশাকশ্রমিকদের!

এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পোশাকশ্রমিকের মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। চীন ছাড়া এশিয়ার সব দেশ থেকে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে আছে। বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের নূন্যতম মজুরি ৫২ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে চীনের পোশাকশ্রমিকের মজুরি ২২৩ ডলার। কম্বোডিয়া ও ভারতে ৭০ ডলার করে হলেও ইন্দোনেশিয়ায় ১১৪, ভিয়েতনামে ১০৯, ফিলিপাইনে ১৭৫ আর থাইল্যান্ডে ২২১ ডলার মজুরি পান শ্রমিকরা।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক সরকার শ্রমিকের জন্য সস্তায় আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে থাকে। রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩২ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ও তাজরীন ফ্যাশনে ১১২ জন শ্রমিকের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক খবর বাংলাদেশের মানুষকেই ব্যথিত-ক্ষুব্ধ করেনি, গোটা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। বাইরের গণমাধ্যমে বলা হয়েছে- এখানে ধারাবাহিক শ্রমিক অসন্তোষের মূলে রয়েছে কম মজুরি। এ কারণে গোটা পোশাক খাতের ভবিষ্যৎই ঝুঁকির মুখে পড়বে। শ্রমিকরা যেখানে দাবি জানাচ্ছে নূ্যনতম মজুরি ৫ হাজার টাকা বাড়ানোর, সেখানে মালিক পক্ষ বলছে ৬০০ টাকার কথা।

এখনো ধামাচাপা দিয়েই এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন তারা। কিন্তু ছাইচাপা দিয়ে আগুন যে থামিয়ে রাখা যায় না এটা উপলব্ধি করতেই নারাজ। যে শ্রমিকের রক্ত পানি করা হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ওপর পোশাকশিল্প মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে আর মালিকরা শানশওকতের জীবন পেয়েছেন, সেখানে শ্রমিকের প্রতি ফিরে তাকানোর যৌক্তিকতা রয়েছে। এটি নিয়ে রাজনীতির কিছু নয়, এখানে শুধু এক পক্ষের মুনাফা লাভের বিষয় নয়, দেশের অর্থনীতিতে পোশাকশিল্প বিশাল ভূমিকাই রাখেনি, বাইরের দুনিয়ায় দেশের মানও বাড়িয়েছে।

কিন্তু যখন নূ্যনতম মজুরির দাবিতে রাজপথ অগ্নিগর্ভ হয়, অশান্ত হয়ে ওঠে, পোশাক কারখানার মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারণে ভবন ধস আর আগুনেই হোক লাশের মিছিল শোকার্ত করে এই জনপদ, তখন বাইরের দুনিয়ায় বাংলাদেশের ইমেজই হোঁচট খায় না, পোশাকশিল্প প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একজন শ্রমিক ৩ হাজার টাকা হাতে নিয়ে মাস শেষে যখন ঘরে ফেরে তখন না পারে পেট পুরে খেতে, না পারে আবাসন সংকট মেটাতে। ছোট্ট শিশুটির যে কোনো আবদার পূরণ বা কান্না থামানোর চেষ্টাও করতে পারে না।

কিন্তু এই শ্রমিকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমে গার্মেন্ট মালিকরা সারা দুনিয়া ভ্রমণ করে বেড়ান। সমাজে হয়ে ওঠেন অভিজাত। কিন্তু শ্রমিকের ভাঙা ঘরের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে পাথরচাপা বুকের বেদনা কমানোর কোনো উদ্যোগই নেন না।

তখন পোশাকশিল্প হয়ে ওঠে শ্রমিক শোষণ ও মুনাফা লাভের এক বিশাল খাত। এখানে নীতি হয়ে ওঠে গার্মেন্ট মালিকরা একতরফা মুনাফা লুটবেন, নিজেদের ভাগ্য প্রতিনিয়ত বদলাবেন কিন্তু শ্রমিকের ভাগ্য ঘোরাবেন না। শ্রমিকের নূন্যতম মজুরি ৮ হাজার টাকা না দিলেও কাছাকাছি নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক চেতনায় দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পোশাকশিল্পে এ বৈষম্য চলতে পারে না। এতটা শোষণ ও মুনাফা লাভ অব্যাহত থাকলে এ শিল্পের বিপর্যয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএকে এ ব্যাপারে গভীর চিন্তা-ভাবনার আলোকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সামনে ঈদ আসছে। বেতন-বোনাস নিয়ে মালিকরা যেমন চাপের মুখে তেমনি চলমান অসন্তোষ আরও বেড়ে যাবে অতীত অভিজ্ঞতায় নিঃসন্দেহে বলা যায়। গার্মেন্টে গার্মেন্টে আইন, বিধিবিধান নিশ্চিত না করার কারণে কখনো ভবন ধসে, কখনো বা আগুনে পুড়ে পোশাকশ্রমিকের লাশ পড়ে। তবুও তাদের কাজের পরিবেশ যেমন নিশ্চিত করা হয় না, তেমনি অনেক সময় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী গার্মেন্ট মালিকদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয় না কোনো ব্যবস্থা।

জনগণের রায়ে সংসদ আছে, সংসদে জনগণের প্রতিনিধি রয়েছে। কিন্তু গরিব মানুষের জন্য যারা কল্যাণের রাজনীতির কথা বলেন তারা পোশাকশিল্প শ্রমিকদের জন্য সংসদে দায়িত্বশীল ভূমিকাই পালন করেন না। গার্মেন্ট মালিকদের সব আছে। সরকার আছে, বিরোধী দল আছে, অর্থবিত্ত সবই আছে। কেউ নেই শুধু রিক্ত-নিঃস্ব পোশাকশ্রমিকদের জন্য। তাদের জন্য মালিক নেই, সরকার নেই, বিরোধী দল নেই। পরিশ্রমী পোশাকশ্রমিকদের জন্য প্যাকেজ প্রস্তাব নিয়ে এখনই ত্রিমুখী বৈঠকে সমাধান বের করা উচিত। না হয় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে বাংলাদেশ এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। এ পরিস্থিতি কেউ আশা করে না। শ্রমিকের পাওনা শোধ করেই গার্মেন্ট মালিকদের মুনাফার টাকা গুনতে হবে। আর শ্রমিক অসন্তোষ, ভাঙচুর মানুষ দেখতে চায় না।

1 comment:

  1. পুলিশ হেসে হেসে গার্মেন্ট শ্রমিকদের পেটানো, কেমন কালচার??

    ReplyDelete

Powered by Blogger.