সড়কে মৃত্যু: নয়া মহামারি by রোবায়েত ফেরদৌস

সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মহামারির রূপ নিয়েছে, এটি যেমন সত্য; বিপরীতে চেষ্টা থাকলে সড়ক দুর্ঘটনাকে যে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা–ও সমান সত্য। গবেষণা বলছে (হোসেন জিল্লুর, ২০১৫), বিশ্বের ৮৮টি দেশ দুর্ঘটনার হার কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং ৮৭টি দেশে তা বেড়েছে। সড়ক পরিবহন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান খাত। কিন্তু সড়ক পরিবহন খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে সময়োপযোগী ও কার্যকর বিধিবিধান ও উদ্যোগ গ্রহণ করার দরকার ছিল, বাংলাদেশে সেই সমতায় বিরাট ঘাটতি রয়েছে এবং এই সামর্থ্যের অভাবই এ খাতের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়, সড়ক পরিবহন নিয়ে নতুন পলিসি, আইন, বিধিবিধান প্রণীত হয় ঠিকই, কিন্তু প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় যাত্রীদের মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না, যাত্রীদের সেবার মানোন্নয়নের বিষয়টি এবং তাদের কণ্ঠস্বর সব সময়ই উপেক্ষিত রয়ে যায়। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআরটিএ) অ্যাক্ট ২০১৫ এবং রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট (আরটিএ), ২০১৫ নামে সরকার পৃথক দুটি আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে; সেখানেও যাত্রীদের কথা শোনা হচ্ছে না।
সড়ক দুর্ঘটনার ঝোঁক ও প্রবণতা: গবেষণা প্রতিবেদনে (হোসেন জিল্লুর, ২০১৫) দুর্ঘটনার শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ‘হিট-অ্যান্ড-রান’ ধরনের, অর্থাৎ কোনো যানবাহন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বা কাউকে মেরে দিয়ে পালিয়ে যায়, এর হার মোট দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ; এর পরের ধরনগুলো এ রকম: ‘মুখোমুখি সংঘর্ষ’ (১৯%), ‘গাড়ি উল্টে যাওয়া’ (১৩%), ‘পেছন থেকে মেরে দেওয়া’ (৯%), ‘পাশ থেকে ধাক্কা দেওয়া’ (৬%)। সড়ক দুর্ঘটনার যারা শিকার হয়, তাদের সিংহভাগই পথচারী, মোট ভিকটিমের ৪১%; এরপরে রয়েছে বাস/কারের যাত্রী (১৯%), দুই/তিন চাকার যানের চালক ও যাত্রী (১৬%), ট্রাক/বাসের চালক ও যাত্রী (১৪%), সাইকেল আরোহী (৩%)। যারা দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস (৩৮%), এরপর রয়েছে ট্রাক (৩১%), মোটরসাইকেল (১২%), কার/জিপ (১১%) ও তিন চাকার মোটরযান (৮%)।
চালকের বৈশিষ্ট্য: চালকের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৯৭ শতাংশ চালকের কাছে লাইসেন্স আছে, তা সেটা বৈধ বা অবৈধ লাইসেন্স হোক। এর মধ্যে ২০ শতাংশ চালক কোনো পরীক্ষা না দিয়েই লাইসেন্স পেয়েছেন; ৯২ শতাংশ চালককে ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স জোগাড় করতে হয়েছে আর ৫৪ শতাংশ চালককে লাইসেন্স পেতে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়েছে।
তবে চালকেরা প্রায় সবাই সংঘবদ্ধ (৮০%), অর্থাৎ কোনো না কোনো চালক/শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত। তাঁদের বেশির ভাগেরই কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, ‘ওস্তাদ-শাগরেদ’-এর মতো সনাতনী পদ্ধতিতে তাঁরা গাড়ি চালানো শিখেছেন। মাত্র ৯ শতাংশ চালকের মাসিক বেতন আছে, অন্যরা ট্রিপ ভিত্তিতে রোজগার করেন। ফলে তাঁদের ওপর মালিকদের পক্ষ থেকে প্রবল চাপ থাকে ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানোর। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে ২০ শতাংশ চালকের কাজের চাপ (ওয়ার্ক-লোড) ভীষণ রকম বেশি, সপ্তাহে ছয়-সাত দিন এবং দিনে ১৩ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালাতে হয় তাঁদের। আর দুর্ঘটনা ঘটলে ৪২ শতাংশ চালকেরই কোনো শাস্তি হয় না; বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণেই চালকেরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
কেন দুর্ঘটনা ঘটে?: দুর্ঘটনার কারণকে তিন ভাগে দেখানো যেতে পারে। এক. বিধিবিধান ও পরিচালনার দুর্বলতা: এর মধ্যে আছে ট্রাফিক আইনের যথার্থ প্রয়োগ না হওয়া, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে অযোগ্য গাড়ি ও অদক্ষ চালকের লাইসেন্সপ্রাপ্তি, সড়কে বিভিন্ন গতির গাড়ি/বাহন যুগপৎ চলাচল, দুর্ঘটনা বা অনিয়মের ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, যুগোপযোগী আইন না থাকা, বিদ্যমান আইনে প্রতিকার-প্রতিবিধান-ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না থাকা, স্থানীয় অর্থনীতি বিকাশের সঙ্গে নিরাপদ সড়কের চাহিদাকে সমন্বয় করতে না পারা ইত্যাদি। দুই. কারিগরি ত্রুটি: এর ভেতরে রয়েছে সড়ক পরিকল্পনা ও নির্মাণে সমস্যা, সড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পট বা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক থাকা, রোড সিগন্যাল-ডিভাইডার-স্পিডব্রেকার-অ্যাকসেস রোডের সমস্যা। তিন. মানবীয় দুর্বলতা: বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকের ওপর শারীরিক-মানসিক-আর্থিক চাপ, নিরাপদ সড়ক সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল ও আচরণ, সড়কের পাশে দোকান-বাজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড চালানো ইত্যাদি।
দুর্ঘটনা রোধে করণীয় কী: সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে যেসব পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া দরকার, তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান রাখা। কারণ, দোষী চালকদের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ থাকলে চালকেরা সাবধানে গাড়ি চালাতে বাধ্য। সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মামলা দায়েরের বিধান রাখতে হবে; তা না হলে চালকেরা সচেতন হবেন না এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকবে। বিআরটিএর একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকার বিনিময়ে অবৈধ লাইসেন্স দেন, এটি বন্ধ করতে হবে।
১৯৮৩ সালের পুরোনো মোটরযান আইনকে আধুনিক, কার্যকর ও জনবান্ধব করতে হবে। দোষী চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিলে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও শ্রমিকনেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে তাঁদের ছাড়িয়ে আনতে পরিবহন সেক্টর একরকমের জিম্মি করে রাখা হয়। এই জিম্মিদশা থেকে পরিবহন খাতকে মুক্ত করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং বিআরটিএর প্রতিরোধ সেলগুলো কার্যকর করতে হবে। সারা দেশের ১৪৪টি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক বা কেন্দ্র মেরামতের কাজ দ্রুত শুরু করে তা শেষ করতে হবে। সড়ক-মহাসড়কে নকশা-সংক্রান্ত ত্রুটি দ্রুত সারাতে হবে। সারা দেশে গাড়ির চালকদের ব্যবহারিক, তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে একেবারে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং কেউ এটি চালালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তি দিতে হবে।
সড়কের পাশে কিংবা সড়কের মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাজার, দোকানপাট, প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের সাইনবোর্ড–সর্বস্ব অফিস তুলে দিতে হবে। পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার রোধে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া ক্যাম্পেইনের ব্যবস্থা করতে হবে। মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও নছিমন-করিমনের মতো বিপজ্জনক যানবাহন বন্ধ করা খুব জরুরি। বিআরটিএর জনবল বাড়াতে হবে, প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও কার্যকর করতে হবে। পুরোনো, লক্কড়ঝক্কড় মার্কা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে নিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমাতে সড়কে প্রয়োজনমতো ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট’ বা ‘গণপরিবহন’ নামাতে হবে, প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, প্রয়োজনে প্রাইভেট কারে গ্যাস-সুবিধা বাতিল করতে হবে। সারা দেশে সড়ক-মহাসড়কগুলোতে অত্যন্ত ধীরগতিতে ‘চার লেনের’ কাজ চলছে, এতে বাড়ছে যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনা; তাই দ্রুতগতিতে চার লেনের কাজ শেষ করতে হবে।
[তথ্যসূত্র: এক. হোসেন জিল্লুর রহমান, ‘সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আইনগত উদ্যোগ’, পিপিআরসি, ঢাকা; দুই. সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ২৫ অক্টোবর, ২০১৫ ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের মতামত]
রোবায়েত ফেরদৌস: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
robaet.ferdous@gmail.com
ভালুকায় যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৭ @মানবজমিন
৭ নভেম্বর ২০১৫, শনিবার
গতকাল সারা দেশে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নয়জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ভালুকায় নিহত হয়েছেন সাতজন। এ ছাড়া টঙ্গী ও লক্ষ্মীপুরে দুজন নিহত হয়েছেন। ভোরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকা উপজেলার মেহেরাবাড়ী নামকস্থানে বাস খাদে পড়ে মহিলাসহ ৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ জন। আহতদের ভালুকা স্বাস্থ্যকমপ্লেঙ ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী এফএম পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৩৬৬৬) ভালুকার মেহেরাবাড়ী নামক স্থানে পৌঁছলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বালুবোঝাই ট্রাকে ধাক্কা দেয়। পরে বাস ও ট্রাকটি উলটে রাস্তার পূর্বপাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ভালুকা পৌরসভার ভাণ্ডাব গ্রামের ফুরকান আলীর ছেলে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ফজলুল হক (৪৫) ও আসমাউল হোসনা নামে এক নারী নিহত হন। এতে আরও ১৫ যাত্রী আহত হন। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে ভর্তি করেন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আহতদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে ত্রিশালের আবদুল মোতালেব (৪২) ও নিলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার নওশেদ (৩৫), খাইরুল ইসলাম (৪০), কাজল (৪৫) ও কুদ্দুস পাঠান মারা যান। ভালুকা মডেল থানার ওসি মামুনুর রশিদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। লক্ষ্মীপুর-মজুচৌধুরীরহাট সড়কের কাদিরাগোঁজ এলাকায় গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মোটরসাইকেল আরোহী রাফি হোসেন নিহত হয়েছে। নিহত রাফি সদর উপজেলার শাকচর গ্রামের মো. খোকন হোসেনের ছেলে। গত শুকবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। টঙ্গীতে বালুবাহী ট্রলির চাপায় অর্পিতা (৪) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুরের সরকার বাড়ি রোডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ ট্রলিসহ চালক সাত্তারকে আটক করেছে। জানা যায়, স্বপন চন্দ্র দে সপরিবারে পূর্ব আরিচপুর এলাকার সরকার বাড়ি রোডের নূরুল ইসলামের বাড়িতে ভাড়া থাকে। বাড়ির পাশে রাস্তায় খেলা করার সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অর্পিতাকে ইঞ্জিনচালিত বালুবাহী একটি ট্রলি চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। নিহত অর্পিতা নেত্রকোনার সাধুপাড়া গ্রামের স্বপন চন্দ্র দের মেয়ে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.