জেনারেল ও গণতন্ত্রের দ্বৈরথ

৯ মার্চের সকাল। ইয়াঙ্গুনের কেন্দ্রস্থলে শিল্প ও বণিক সমিতির ছিমছাম মিলনায়তনটি কয়েক শ সাংবাদিকের পদচারণে মুখরিত। তাঁরা এসেছেন মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিকে একনজর দেখার জন্য। তাঁর বত্তৃদ্ধতা শোনার জন্য। তাঁর পরনে ছিল হালকা মেরুন বর্মি লুঙ্গির ওপর সাদাকালো চেকের জামা। খোঁপায় বাঁধা সাদা ক্রিসেনথিমাম। হলভর্তি অভ্যাগতরা দাঁড়িয়ে ও হাততালি দিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানালেন। তিনিও কিছুটা সামনে ঝুঁকে তার জবাব দিলেন। এই সেই সু চি, যিনি ১৯৮৮ সালে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই সেই সু চি, যিনি প্রায় ২১ বছর অন্তরীণ ছিলেন, যিনি ক্যানসার-আক্রান্ত স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে পারেননি, যিনি ১৯৯৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেলেও নিজ হাতে তা গ্রহণ করতে পারেননি। বাইরে গেলে আর তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়া হতো না। তাই জনগণের সঙ্গে থাকারই সিদ্ধান্ত নিলেন দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের কন্যা। মধ্যাহ্নভোজের পর সু চি মঞ্চে দাঁড়িয়ে সু ফাউন্ডেশনের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন, শিক্ষাই পারে একটি জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে, আর সুস্থ ও সবল জাতির জন্য চাই উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা। সু চির এই কর্মসূচির সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন সাবেক দুই মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন,
লরা বুশসহ অনেক বিশিষ্টজন। মিয়ানমারের আর্থরাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সু চি বলেন, ‘এ অঞ্চলের একদা ধনী দেশটি নিঃস্ব ও দরিদ্র হয়েছে গণতন্ত্রহীনতার কারণেই। গণতন্ত্র ছাড়া আমরা আমাদের অধিকার ও স্বাধীনতা সংরক্ষণ করতে পারব না।’ মুক্ত গণমাধ্যমের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি আরও বললেন, গণমাধ্যমকে অবশ্যই তার শক্তি ও প্রভাব সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে যে আরও বেশি স্বাধীনতা আরও বেশি দায়িত্ব বোধ দাবি করে। ৬ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াঙ্গুনে পৌঁছে আমরা নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। দোকানে, হোটেলে, আড্ডায় যাঁদের সঙ্গেই কথা বলেছি, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সু চি। তাঁদের কাছে সু চি নেত্রী নন, অত্যন্ত আপনজন। বয়সীরা অনেকে ’৮৮ সালের গণ-আন্দোলনের কথা স্মরণ করেন। তাঁদের নিয়ে গঠিত হয়েছে অষ্টাশি প্রজন্ম; যাঁরা সেই গণ-আন্দোলনে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিহতদের পরিবারকে স্মরণ করছেন। আর আমরা বাংলাদেশে নব্বইয়ের প্রজন্মকে ভুলে গেছি। গণতন্ত্রীরা স্বৈরাচারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। মিয়ানমারে সামরিক শাসনের শক্ত মুঠো আলগা হতে শুরু করে ২০০৮ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে; যদিও সেই সংবিধানটি গণতান্ত্রিক ছিল না। ২০১০ সালের নির্বাচন বর্জন করে সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি। তবে প্রেসিডেন্ট থিন চেন ২০১২ সালে উপনির্বাচনে অং সান সু চিসহ তাঁর দলের ৪৩ জন সদস্যকে জয়ী হওয়ার সুযোগ দেন। ৪৫টি আসনের উপনির্বাচনে এনএলডি ৪৩টিতে জয়ী হয়। এ নিয়ে সু চি কিছুটা বিতর্কিতও হন। অনেকের অভিযোগ, তিনি সামরিক শাসকদের সঙ্গে আপস করেছেন।
কিন্তু এ ছাড়া তাঁর করারই বা কী ছিল? ২১ বছর ধরে সু চি ও তাঁর দলের বহু নেতা নির্যাতন ভোগ করেছেন। একটি প্রজন্ম হারিয়ে গেছে। আর সু চি যদি সামরিক চক্রের সঙ্গে সমঝোতা করেও থাকেন, সেটি করেছেন তাঁর দেশ ও জনগণের জন্য। ব্যক্তিগত ফায়দা লাভের জন্য নয়। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ২৫ শতাংশ আসন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত এবং তাদের সম্মতি ব্যতিরেকে সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। আর বর্তমান সংবিধানই সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে প্রধান বাধা। সংবিধানের ৫৯(এফ) ধারায় বলা আছে, মিয়ানমারের কোনো নাগরিক বিদেশি বিয়ে করলে কিংবা তাঁর সন্তান বিদেশি নাগরিক হলে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। সু চির দল চাইছে, নির্বাচনের আগেই সংবিধানের এই ধারা বাতিল করা হোক। এ ব্যাপারে সংসদীয় কমিটির কাছে দলের সাংসদেরা প্রস্তাবও দিয়েছেন। তবে সংবিধানের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট। তাঁর সম্মতির ওপরই অং সান সু চির ভাগ্য নির্ভর করছে। তবে এনএলডি মনে করে যে নির্বাচনে তারা জয়ী হলে প্রেসিডেন্ট সংবিধান পরিবর্তনে বাধ্য হবেন। থিন চেন ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, পরবর্তী নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। ২০১৫ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারে পার্লামেন্ট নির্বাচন। ইয়াঙ্গুনের সাংবাদিক ও পেশাজীবীরা জানিয়েছেন, নির্বাচনে সু চির এনএলডিই জয়ী হবে। কেননা ক্ষমতাসীনদের জনপ্রিয়তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। যদিও গত তিন বছরে দেশে প্রচুর উন্নয়নকাজ হয়েছে,
মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বেড়েছে। কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সু চির ব্যাপারে ক্ষমতাসীন মহলে দ্বিমুখী চিন্তাভাবনা আছে। অপেক্ষাকৃত কট্টরপন্থীরা চাইছেন, বেসামরিক আদলে সেনাবাহিনী আরও পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকুক। আর নরমপন্থীরা সসম্মানে বিদায় নেওয়ার পক্ষপাতী। তাঁরা মনে করেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে ১৯৮৮ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। সেবার নে উইন বিতাড়িত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরাও ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি। পালাবদল ঘটেছে। মিয়ানমারে এ পর্যন্ত দুবার সাধারণ নির্বাচন হলেও গণতন্ত্র আসেনি। সহজ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার হাতবদলও ঘটেনি। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, আগে বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন মিয়ানমারের শাসক চক্র যতটা কট্টর অবস্থান নিতে পেরেছে, এবার সেটি সম্ভব না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অং সান সু চি হতে পারেন তাঁদের নিষ্ক্রমণের বিশ্বস্ত মিত্র। তাঁরা আশ্বস্ত হতে চাইবেন যে ক্ষমতার হাতবদলের পর তাঁদের ওপর নির্যাতন-অত্যাচার হবে না। মিয়ানমারের সংবিধানে স্বীকৃত ১৩৫টি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী স্বায়ত্তশাসনের দাবি করছে। কারেনসহ কেউ কেউ সশস্ত্র বিদ্রোহেও লিপ্ত আছে। নিপীড়নের পুরোনো কৌশলে তাদের নিবৃত্ত করা যাবে না বলেই সরকার তাদের সঙ্গে সংলাপে বসেছে। সীমিত স্বায়ত্তশাসন দিয়ে তাদের বশে রাখতে চাইছে বেসামরিক আদলের সামরিক সরকার। ২০১৫ সালের নির্বাচন সামনে রেখে মিয়ানমারে এখন চলছে নানামুখী সংস্কার তৎপরতা।
গণমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে সেই সংস্কারের সুযোগ নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে। অন্তত ইংরেজি সংবাদপত্রগুলো পড়ে তা-ই মনে হয়েছে। ইরাবতি পত্রিকার ইংরেজিমাধ্যমের সম্পাদক মিয়ানমার: এ নেশন লিভিং লাই-এ লিখেছেন, ‘বর্তমানে দেশটিতে সবাই গণতন্ত্র চায়, এমনকি যে জেনারেলরা অর্ধশত বছর ধরে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিলেন।’ সেনাবাহিনীর প্রধান জ্যেষ্ঠ জেনারেল মিন অং হেলিং থ্রি এ মিয়ো রেডিওর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁরা ‘খাঁটি ও সুবিন্যস্ত’ গণতন্ত্র চান। ২০০৮ সালে জেনারেলরা কারচুপিপূর্ণ গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা সংহত করেন এবং ২০১০ সালে সাধারণ নির্বাচনে তাঁদের সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি পার্টি (ইউএসডিপি) ক্ষমতায় আসে। আবার এও সত্য, থিন চেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনেন, রাজবন্দীদের ছেড়ে দেন এবং বিরোধী দল এনএলডিকে পার্লামেন্টে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এত কিছুর পরও ইরাবতির সম্পাদক বর্তমান সরকারকে বেআইনি সরকারের বর্ধিত কাঠামো বলে মনে করেন। তাঁর মন্তব্য, ‘আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান, স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং এমন একটি সরকার, যা সত্যিকারভাবেই জনগণের পছন্দসই।’
প্রশ্ন উঠেছে, মিয়ানমারের বর্তমান শাসক চক্র সংবিধান পরিবর্তন করতে রাজি হবে কি না? গত নভেম্বরে অং সান সু চি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্দোলনের জন্য প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনীর প্রধান, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং তাঁর মধ্যে চতুষ্পক্ষীয় বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীনেরা সেই আহ্বানের ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলেনি। পার্লামেন্টের স্পিকার ও ইউএসডিসির নেতা উ সান সু চির প্রতি কিছুটা নমনীয়। তাঁর ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ, তিনি জ্যেষ্ঠতম কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর থেকে কনিষ্ঠ এক কর্মকর্তাকে সেনাপ্রধান করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী নেপিডোতে এক সংবাদ সম্মেলনে এই সেনা-কাম রাজনীতিক বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক না কেন, তাঁর বিশ্বাস, শান্তি-প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘আমি বিশ্বাস করি না, আমরা যদি হেরে যাই, তাহলে বর্তমান শান্তি-প্রক্রিয়া এবং গণতন্ত্রায়ণ থেমে যাবে। আমরা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানেরই চেষ্টা করছি। আমরা যদি হেরে যাই, আমরা নির্বাচনের ফল মেনে নেব।’ প্রেসিডেন্ট থিন চেনও একমত যে আন্তর্জাতিক মানের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংবিধান পর্যালোচনা ও পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু সেই কাজটি করতে তাঁরা কি প্রস্তুত?
আগামীকাল: বদলে যাচ্ছে মিয়ানমার
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.