রাষ্ট্রধর্মই কি এখন আওয়ামী লীগের রক্ষাকবচ?

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে দলের যে গঠনতন্ত্র আছে, তার মূলনীতি অংশে বলা আছে: বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হইবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি।’ কিন্তু ৬৭ বছরের আওয়ামী লীগ কি তার এই ঘোষিত মূলনীতি থেকে সরে এসেছে? ঘোষণাপত্রে তারা অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের কথাও বলেছে, যা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এখন নাসিরনগর ও সাঁওতালপল্লির ঘটনায় বিএনপিই আওয়ামী লীগকে সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে গালমন্দ করছে এবং আওয়ামী লীগের নেতারা জোর গলায় তার প্রতিবাদও করতে পারছেন না। এই প্রথম কোনো ঘটনায় আওয়ামী লীগ কিছুটা পিছু হটল। বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা বিএনপি–জামায়াতের শাসনামলে এসব অঘটন হলে আক্রান্ত মানুষগুলো আওয়ামী লীগের কাছেই আশ্রয় খুঁজত। কিন্তু এখন তারা কোথায় যাবে?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিবদমান স্থানীয় আওয়ামী লীগ এক পক্ষ অপর পক্ষকে শায়েস্তা করতে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে অভিযোগ আছে। এটি অনেকটা অপরের যাত্রাভঙ্গ করতে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার মূলে যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সক্রিয় ছিল, সেটি পুলিশ, মানবাধিকার কমিশন ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের তিনজন নেতাকে সাময়িকভাবে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। তবে নাসিরনগর পরিদর্শন করে এসে একজন প্রবীণ রাজনীতিক, যিনি আওয়ামী লীগের সুহৃদ বলেই পরিচিত, বলেছেন, ওই তিনজন নয়, আরও অনেকে সেখানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরিতে সক্রিয় ছিলেন। বাইরে থেকে সেখানে  ট্রাকে–বাসে করে মানুষ এনে হামলা চালানো হয়েছিল। ঘটনার দুই সপ্তাহ পরও প্রকৃত অপরাধীরা চিহ্নিত বা ধরা না পড়ার কারণ সরকারের অক্ষমতা না সদিচ্ছার অভাব? ওই প্রবীণ নেতা স্থানীয় প্রশাসনে উদ্ধৃতি দিয়ে আরও জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই পক্ষেরই মিত্র হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত ও হেফাজতে ইসলাম এবং বড় হুজুরের সমর্থকেরা, ১৯৯৮ সালে যারা সেখানে তাণ্ডব ঘটিয়েছিল প্রশিকা নামে একটি এনজিওর সমাবেশ আহ্বানকে কেন্দ্র করে। এরা একসময় আওয়ামী লীগের প্রচণ্ড বিরোধিতা করলেও সাম্প্রতিককালে গলাগলি করে চলছে।
কয়েক বছর আগেও সেক্যুলার আওয়ামী লীগ ও হেফাজতে ইসলাম মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত নানা অঘটন ঘটায়। এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রশাসন বলছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের অনুরোধে (না হুকুমে!) তারা নাসিরনগরে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরপর সেই সমাবেশ থেকে যখন মিছিল নিয়ে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হয়, তখন স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার দায় এড়াবে কীভাবে? এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার কাউকেই ছাড় দেবে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের দুজন সাংসদ কারাগারে এবং তিনজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনীত মামলা বিচারাধীন বলে জানান। কিন্তু তাঁর এই আশ্বাসে ওই এলাকার আক্রান্ত মানুষগুলো খুব একটা আশ্বস্ত হবেন বলে মনে হয় না। প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ‘হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গ্রেপ্তার বিএনপির নেতা আমিরুল হোসেন চকদারকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। বৃহস্পতিবার তাঁর পক্ষে আদালতে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার বাদী। আমিরুল উপজেলা সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। ৩০ অক্টোবর মন্দিরে হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আসামি হিসেবে গত মঙ্গলবার রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন বুধবার তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ নাসিরনগর থানায় গিয়ে দাবি করেন, আমিরুল হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।’ (প্রথম আলো,
১৮ নভেম্বর ২০১৬) অপরাধের প্রধান সাক্ষী আক্রান্ত মানুষ ও পারিপার্শ্বিক আলামত। আক্রান্ত মানুষগুলো যাঁকে নির্দোষ বলে দাবি করছেন, সরকার তাঁকে ধরছে কেন? এর একটি কারণ হতে পারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। আরেকটি হলো প্রকৃত অপরাধীকে  আড়াল করা। এই দুই সূত্র নিয়ে কোনো ঘটনার তদন্ত এবং মামলা এগোলে কোনো দিন সত্য প্রকাশিত হবে না, অপরাধীরা শাস্তির বাইরেই থেকে যাবে। আওয়ামী লীগের ওই নেতা যেমনটি বলেছেন, ‘কেউই ছাড় পাবেন না’, সেটি যদি তাঁদের মনের কথা হয়, তাহলে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি বা গ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে। তখনই একটি মামলার অপমৃত্যু হয়, যখন জজ মিয়া কাহিনি সাজানো হয়। থানা-পুলিশ বিএনপি নেতাকে পাকড়াও এবং গয়রহ ৮০/৮৫ জন মানুষকে ধরতে পারলেও সন্দেহভাজন আওয়ামী লীগের কোনো নেতার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি। সুতোর টানটা কোথায় বুঝতে অসুবিধা হয় না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শ্রেণিচরিত্রে খুব একটা ফারাক নেই। নির্বাচন এলে এ দল থেকে ও দলে যাওয়ার ঘটনাও কম নয়। খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠেন বাংলাদেশি, আর নির্ভেজাল বাংলাদেশি বনে যান নিখাদ বাঙালি। আন্দোলন–সংগ্রাম থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগ ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অধিকতর সংবেদনশীল বলে দাবি করে। কিন্তু নাসিরনগর ও গোবিন্দগঞ্জের ঘটনার পর সেই দাবি কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন উঠবেই। কঠিন সত্য যে সমাজের সবচেয়ে নিগৃহীত ওই জনগোষ্ঠী এখন আর কোনো দলের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। দুটি স্থানেই আওয়ামী লীগের অবস্থান আক্রান্তের পক্ষে নয়, বিপক্ষে। গোবিন্দগঞ্জে যে নেতারা সাঁওতালদের চিনিকলের জায়গায় বসতি গড়তে ইন্ধন জুগিয়েছেন,
উচ্ছেদেও তাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভোটের আগে আওয়ামী লীগের নেতারা জনদরদি ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও ভোটের পর তা অনায়াসে ভুলে যান। তাঁরা মুখে বিএনপি-জামায়াতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করলেও সেক্যুলার পোশাকের আড়ালে নিজেদের সাম্প্রদায়িক চরিত্রটি আর আড়াল করতে পারছেন না। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি আগে থেকেই ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করত, এখন আওয়ামী লীগও ওই পথে হাঁটা শুরু করছে। আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি, জামায়াত এবং ক্ষেত্রবিশেষে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে অহরহ সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করে থাকে। সেই অভিযোগ যে অমূলক, তা–ও বলা যাবে না। এসব দল ধরেই নিয়েছে যে সংখ্যালঘু ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ভোট তারা পাবে না। আর আওয়ামী লীগ ভাবে, সংখ্যালঘুরা কোথায় যাবে, তাদের ভোট নৌকায়ই দিতে হবে। দুই পক্ষের দ্বিমুখী আক্রমণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা ক্রমেই প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে, নিয়ত িনরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। নাসিরনগরে যখন হেফাজতে ইসলাম ও আহলে সুন্নাতের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সদ্ভাবের খবর গণমাধ্যমে এসেছে, তখন আরেকটি খবরও রাজনৈতিক মহলে বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক সম্প্রতি সার্ক কালচারাল সোসাইটির এক সেমিনারে বলেছিলেন, ‘সুযোগ পেলে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা হবে।’ তিনি বাংলাদেশে সামরিক শাসকেরা কীভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি ও সমাজকে কলুষিত করেছেন, তারও চিত্র তুলে ধরেন ওই বক্তৃতায়।
রাজ্জাকের এই বক্তব্যে বাংলাদেশ ইসলামি আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ওলামা লীগসহ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন হইচই করে উঠল। তারা দল থেকে তাঁকে বহিষ্কারেরও দাবি জানায়। অথচ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সদা উদ্বিগ্ন কোনো প্রগতিশীল দল, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠন ড. রাজ্জাকের পক্ষে দাঁড়িয়েছে বলে জানা যায়নি। বরং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ওটি তাঁর (আব্দুর রাজ্জাক) ব্যক্তিগত মত। সরকার বা আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা কিংবা সংবিধান সংশোধনের চিন্তা করছে না। তবে তিনি এ–ও বলেছেন, দলের একজন নেতা ব্যক্তিগত অভিমত দিতেই পারেন। পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পর সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও বলেছিলেন, ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগ বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাবে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেসব প্রতিক্রিয়াশীলতা জেঁকে বসেছে, তার জন্য আওয়ামী লীগের নেতারা দুই সামরিক শাসককে দায়ী করলেও অজ্ঞাত কারণে তাঁরা এরশাদকে ছাড় দিয়ে চলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক চরিত্র নির্মাণে জিয়ার ভূমিকা যদি চার আনা হয়, এরশাদের বারো আনা। অথচ আওয়ামী লীগ সেই বারো আনাকে সঙ্গে নিয়ে চার আনার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। এখন প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে যে আওয়ামী লীগ কি সত্যি সত্যি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে চার মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করবে, না পতিত স্বৈরশাসক–প্রবর্তিত সংবিধানের ক্ষত বয়ে বেড়াবে? এখানে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে ১৯৮৮ সালে এরশাদ যখন রাষ্ট্রধর্ম চালু করেন, তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দল ও পাঁচদলীয় বাম জোট তার প্রতিবাদে হরতাল পালন করেছিল। তারা কি এখন সেই হরতালটি ফিরিয়ে নেবে?
কেবল নেতারা নন, আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও মনে করেন, রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করার আগে সমাজকে তৈরি করতে হবে। কিন্তু সমাজ যে তৈরি নয়, সেই কথাটি তাঁদের কে বলল? তাঁরা কি কোনো জরিপ করে দেখেছেন যে সাধারণ মানুষ ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির পক্ষে। উনসত্তরের, একাত্তরের কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি ধর্মবাদী রাজনীতিকে নাকচ করতে পারে, আজকের বাংলাদেশ কেন পারবে না? অনেক বিষয়ে আওয়ামী লীগ স্ববিরোধিতায় ভুগছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারকে এগিয়ে নিতে গণজাগরণ মঞ্চ যখন সাহসী ভূমিকা নেয়, তখন আওয়ামী লীগ তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই গণজাগরণ মঞ্চকে তারা কীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে, সেটিও সবার জানা। আওয়ামী লীগের পতাকায় চারটি তারকা আছে চার মূলনীতির প্রতীক হিসেবে—জাতীয়তাবাদ (বাঙালি), গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। গণতন্ত্র অত্যন্ত ভঙ্গুর। মুক্তবাজার অর্থনীতি ধারণ করে আওয়ামী লীগ অনেক আগেই সমাজতন্ত্রকে পরিত্যাগ করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদও এরশাদের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে আপস করে চলেছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কি বঙ্গবন্ধুর চার মূলনীতি থেকে সরে এসে এরশাদ–প্রবর্তিত রাষ্ট্রধর্মকেই রক্ষাকবচ হিসেবে মেনে নিচ্ছে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.