তদন্ত কমিটিতে সুপ্রিম কোর্ট ‘নোবডি’! by মিজানুর রহমান খান

আশঙ্কাই সত্যি হলো। বিচারক অপসারণের প্রস্তাবিত তদন্ত কমিটিতে কোনো কর্মরত বিচারককে রাখা হয়নি। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ কখনো অতীতে এটা ভাবেনি। সেদিক থেকে এটা নজিরবিহীন। আইন কমিশন এই সুপারিশ চূড়ান্ত করার আগে তার সভায় আলোচনা করেছে যে কর্মরত বিচারক হয়ে আরেকজন কর্মরত বিচারকের বিষয়ে তদন্ত করায় স্বার্থের সংঘাত হতে পারে। তাই তারা কর্মরত বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আগের কাউন্সিল প্রথা থেকে নাটকীয়ভাবে কর্মরত বিচারকমুক্ত একটি তদন্ত কমিটির সুপারিশ করেছে। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও একজন ‘সম্ভ্রান্ত’ নাগরিক এর সদস্য হবেন। বিচারকের অপসারণে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনের বিধান করা হয়েছিল, যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার রক্ষাকবচটা সুদৃঢ় হয়। আমরা মনে রাখব, বর্তমান সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন কেবল সংসদনেত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। আর সংবিধানের ৭০ ধারার কারণে কোনো সাংসদের পক্ষেই স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ নেই।
অধুনা লুপ্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ১৯৭৭ সাল থেকে একপ্রকার ঘুমিয়ে (একজনকে অপসারণ করেছে) ছিল, তার মূল দায় প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানদের। কারণ, সরকারি সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে কাউন্সিলকে তদন্ত শুরু করার অধিকার দেওয়া হয়নি। এ কারণে পাকিস্তান সম্প্রতি সংবিধান সংশোধন করে সেই অধিকার কাউন্সিলকে দিয়েছে। কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত কে নেবেন, সেটা অনেক বড় স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত। আমাদের জটিল সাংবিধানিক ভারসাম্য সুপ্রিম কোর্টকে বাদ দিয়ে বজায় রাখা সম্ভব নয়। সুপ্রিম কোর্ট বা প্রধান বিচারপতিকে ‘মি. নোবডি’ করাটা ঠিক হবে না (সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর মতামত না নিয়ে বিচারপতি নিয়োগ করায় আইনজীবীদের এক সভায় প্রধান বিচারপতির পদকে ‘মি. নোবডি’র পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন)। বিচারপতি নিয়োগে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলে অপসারণে তাঁকে নো বডি করার যুক্তি কী? ইংল্যান্ডে সবার আগে প্রধান বিচারপতি নিজেই এক সদস্যের তদন্ত কমিটি দিয়ে আনীত অভিযোগের সারবত্তা যাচাই করে নেন। অথচ শুনলাম ‘সহকর্মীদের বিষয়ে তদন্তে কর্মরতদের সীমাবদ্ধতা’র আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়েছে আইন কমিশন। অথচ এটা এমন দেশ, যেখানে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ অন্য বিভাগ দিয়ে তদন্ত করানো হয় না।
আমাদের প্রস্তাবিত আইন বলেছে, স্পিকারের কাছে অভিযোগ দায়ের এবং তা যাচাইয়ের জন্য গঠিত ১০ সদস্যের একটি সংসদীয় কমিটি অভিযোগ ‘তদন্তযোগ্য’ বলে রিপোর্ট দিলেই তবে স্পিকার তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করবেন এবং সেই কমিটি অভিযোগ গঠন থেকে সাক্ষ্য–প্রমাণ ইত্যাদি করবে গোপনীয়তা বজায় রেখে। এতটা বাস্তবসম্মত কি না? তথ্য অধিকার আইন কি এখানে অকার্যকর থাকবে? ১৯৭০ সালে ১৯৯ জন সাংসদ এক বিচারকের বিরুদ্ধে অপসারণ প্রস্তাব আনলেও ভারতীয় স্পিকার তা নাকচ করেছিলেন। এ রকম একটি দৃশ্য আমরা যদি কল্পনা করতে না পারি, তাহলে গোপনে প্রাথমিক বাছাইয়ের জন্য অনধিক ১০ সাংসদকে নিয়ে গঠিত কমিটি কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে?
ভারতের অগ্রগতিটা আমাদের অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বা ঔচিত্যবোধ প্রশ্নে আমাদের সংসদ নিশ্চয় লোকসভাকে অতিক্রম করেনি।
সেই ভারতীয় রাজনীতিকেরা মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে ২০১২ সালে যে বিল পাস করেছিল, তাতে অভিযোগ তদন্তযোগ্য কি না, তা প্রাথমিকভাবে যাচাইয়ের ভার কার্যত স্পিকারের কাছ থেকে তুলে নিয়েছে। তিন সদস্যের ‘কমপ্লেইন্টস স্ক্রুটিনি প্যানেলে’ সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং বর্তমান প্রধান বিচারপতির মনোনয়নে সুপ্রিম কোর্টের দুজন কর্মরত বিচারক রাখা হয়েছে। তাঁরা অভিযোগের সারবত্তা পেলে ওভারসাইট কমিটি তদন্ত শুরু করবে। এই নতুন নিয়ম এখনো কার্যকর হয়নি।
আমাদের প্রস্তাবিত আইনে বলা নেই যে অভিযুক্ত বিচারক তাঁর তদন্ত ও বিচারের প্রক্রিয়ার কোনো বৈধতার প্রশ্ন চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে কখন দ্বারস্থ হতে পারবেন। ২০১০ সালে ভারতের কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচারপতি দিনাকরণকে অপসারণে রাজ্যসভায় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি বহু ঝড়-তুফানের মধ্য দিয়ে অন্তত দুবার পুনর্গঠিত হয়েছিল। সুতরাং গোপনীয়তা লিখে দিলেই তদন্ত উদ্যোগ গোপন রাখা সম্ভব হবে না। পত্রিকায় খবর বেরোবে। দিনাকরণের তদন্ত কমিটিতে সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারকের নামভুক্তির খবর ছাপার পরে সংশ্লিষ্ট বিচারক লক্ষ করেন যে হিন্দুস্তান টাইমস-এ তাঁর বিষয়ে আপত্তির খবর বেরিয়েছে। সেটা দেখে তিনি কমিটি গঠনের আগেই সরে দাঁড়ান। তিনি চিঠি লেখেন যে ‘যদিও আমার কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই, তদুপরি বিচার শুধু হলে হবে না, প্রতীয়মান হতে হবে। তাই নিজকে তফাতে রাখলাম।’ এ রকম আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক যাঁরা ডাক পাবেন, তাঁরা একই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এ রকম চিঠি কি লিখবেন? আবার আপত্তি তুললেই সরে দাঁড়াতে হলে হয়তো কাউকে পাওয়া যাবে না। ওই দিনাকরণের তদন্ত কমিটিতে অভিযুক্ত বিচারক নিজেই এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর ব্যাপারে আপত্তি তুললে আইনজীবী সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ব্যক্ত করে চিঠি দেন। কিন্তু ভারতের তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি, যিনি রাজ্যসভার চেয়ারম্যান, তিনি তা অদরকারি মনে করেছিলেন। অভিযুক্ত বিচারক দিনাকরণ সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে কঠিন পরিশ্রমসাধ্য লেখা দীর্ঘ রায় বেরোল। আর তাতে বলা হলো, ওই আইনজীবীর পক্ষপাত প্রমাণিত। তাই তাঁকে রাখা যাবে না। এ রকম বৈধতার প্রশ্নে আমরা কি দ্রুত রায় পাব? নাকি অভিযুক্ত বিচারক তদন্তটা ঝুলিয়ে ফেলবেন।
সরকারি মহল ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে তারা অভিযুক্ত বিচারককে ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের’ বড় রকমের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। ১৯৭৫ সালে প্রথম সংসদীয় অপসারণ প্রথা রহিত করা হয়। চতুর্থ সংশোধনীতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি নোটিশ দিয়ে বিচারক অপসারণ করবেন। সেই তুলনায় এবারেরটা বিরাট রক্ষাকবচ। সরকারি মহলের দাবি, তারা ভারতের ১৯৬৮ সালের আইনের মতো কমিটি করছে। তথ্য হিসেবে তা ঠিক নয়। কারণ, ভারত তার ইতিহাসের কোনো পর্বেই কর্মরত বিচারকমুক্ত কোনো তদন্ত কমিটি করার ঝোঁক দেখায়নি। এখন আমরা যখন সাবেক বিচারপতিদের নেব, তখন তাঁদের নিয়োগ কী করে হয়েছিল তা মনে রাখব।
প্রধান বিচারপতি অপসারণে শ্রীলঙ্কা সরকারের গোঁয়ার্তুমি আমরা দেখলাম। তাদের তদন্ত কমিটির সবাই রাজনীতিক। এ প্রসঙ্গে আমরা ১৯৮৮ সালের মালয়েশীয় সংকটের দিকেও নজর দিতে পারি। মালয়েশীয় সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদে পাঁচজনের তদন্ত ট্রাইব্যুনালের বিধান আছে। এতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, এমনকি মালয়েশিয়ার বাইরের বিচারক আনারও বিধান রাখা হয়েছে। ওই সময়ে প্রধান বিচারপতিকে অপসারণে গঠিত তদন্ত ট্রাইব্যুনালের একটি অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত পাঁচ সদস্যের একটি বেঞ্চ স্থগিত করেছিল। সেটা সরকারের মনঃপূত হয়নি, তাই তারা ওই বেঞ্চের প্রত্যেককে অপসারণে উদ্যোগী হলো, পরে তাঁদের দুজন অপসারিতও হন। সুতরাং সরকার যদি ক্ষমতার অপব্যবহারই চায়, তাহলে তা প্রতিহত করা কঠিন। তাই কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা আসলে অভিযুক্ত বিচারককে নয়, সরকারকেই বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।
প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে বিচার বিভাগকে যুক্ত রেখেই তদন্ত কমিটি হয়। ভারত ১৯৬৮ থেকে তাদের তিন সদস্যের কমিটিতে সুপ্রিম কোর্ট থেকে একজন (প্রধান বিচারপতি বা সুপ্রিম কোর্টের অন্য কেউ), রাজ্য হাইকোর্টের একজন প্রধান বিচারপতি এবং বাইরের একজন বিশিষ্ট আইনবিদকে রেখেছে। ২০১২ সালের উল্লেখিত বিলে পাঁচ সদস্যের ওভারসাইট কমিটির প্রস্তাব করেছে। আগে যে তিন সদস্যের বাছাই কমিটির কথা বলেছি, তারা যদি কোনো অভিযোগ তদন্তযোগ্য মনে করে তাহলেই এই ওভারসাইট কমিটি মূল তদন্ত শুরু করবে। ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যানও একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। এতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মনোনয়নে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের একজন প্রধান বিচারপতি থাকবেন। আর থাকবেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে একজন বিশিষ্ট আইনবিদ। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাহী বিভাগ কেউ যাতে তদন্ত কমিটিতে প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখা হয়েছে। আর আমাদের আইন কমিশন নিরঙ্কুশভাবে শুধু স্পিকারের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছে। ওই বিল অবশ্য বলেছে, তদন্ত কমিটি ইন-ক্যামেরা বা গোপনে সভা করবে।
সুতরাং বিচারক অপসারণে কর্মরত বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের গঠনের দিকে নজর দিতেই হবে। সেখানে প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের পরবর্তী দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারক ছিলেন। এখন সেখান থেকে শতকরা ১০০ ভাগ সরে আসা সমীচীন হবে না। ওই তিনজনের সঙ্গে বাইরে থেকে দুজন আইনবিদকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো বিকল্প ভাবা যেতে পারে। এটা সুখকর যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আশ্বস্ত করেছেন যে এই আইন করার আগে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করবেন। আইন কমিশনের খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় আইন কমিশনের কাছে একটি খসড়া পাঠিয়েছিল, সেটাকেই তারা সংশোধন করে ১৩ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট দিয়েছে, যা গত ডিসেম্বরে সরকারের হাতে ফিরে গেছে। এই রিপোর্ট পড়ে বোঝা যায় না, এই আইনের খসড়া তৈরিতে সরকারের মনে কী ছিল। কারণ, আইন মন্ত্রণালয় যে আদৌ আইন কমিশনকে খসড়া দিয়েছিল তার কোনো উল্লেখ নেই। সেই খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পেতে চাই। সুপ্রিম কোর্টের মতামতও আমরা তাদের ওয়েবসাইটে পাওয়ার আশা করি। সংসদীয় অপসারণ প্রথা প্রসঙ্গে আইন কমিশনের রিপোর্টে ইংল্যান্ডের সুখপাঠ্য প্রাচীন ইতিহাসের বিবরণ আছে কিন্তু কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে এই প্রথাটাই যে জনপ্রিয় তা কিন্তু নয়।
আর সব অসদাচরণ বা অদক্ষতাই অপসারণযোগ্য নয়, অথচ তার লঘু প্রতিকার দরকার। এ জন্য একটি পিয়ার রিভিউ কমিটি থাকতেই হবে, আইন কমিশনের প্রতিবেদনে এর কোনো উল্লেখ না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। সেই কাজ করাতে বিলুপ্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে জীবিত করতে হবে। অপসারণ তদন্তে যখন অ্যাডহক তদন্ত কমিটি হবে, তখন এই কাউন্সিলের তিনজনের সঙ্গে বাইরের দুজন যুক্ত হবেন। আর অসদাচরণের সংজ্ঞায় গুরুতর অদক্ষতাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.